শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “কংস কর্তৃক প্রেরিত কেশী দানব বৃহদাকার অশ্বরূপে ব্রজে উপস্থিত হল। মনের গতিতে ধাবিত হয়ে সে তার খুর দিয়ে পৃথিবীকে বিদীর্ণ করছিল। আকাশব্যাপী দেবতাগণের বিমান ও মেঘরাশিকে তার কেশর দ্বারা বিক্ষিপ্ত করে তার উচ্চ হ্রেষাধ্বনি দ্বারা উপস্থিত সবাইকে সে আতঙ্কিত করছিল।”
“পরমেশ্বর ভগবান যখন দেখলেন যে, কিভাবে ভয়াবহ হ্রেষাধ্বনি ও তার পুচ্ছ দ্বারা মেঘরাশিকে সঞ্চালিত করে দানব তাঁর নিজ গোকুলকে ভীত করে তুলেছে, তখন তিনি তার সম্মুখীন হওয়ার জন্য এগিয়ে এলেন। যুদ্ধ করার জন্য কেশী কৃষ্ণের অনুসন্ধান করছিল, তাই ভগবান যখন তার সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়ে তাকে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান করলেন, তখন অশ্বটি সিংহের মতো গর্জন করে সাড়া ধিল। তার সম্মুখে ভগবানকে দণ্ডায়মান দর্শন করে আকাশকে গলাধঃকরণের মতো মুখব্যাদান করে অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে কেশী তাঁর দিকে ধাবিত হল। প্রচণ্ড গতিতে দুরতিক্রম্য এবং কারও কাছে পরাজয়ের অযোগ্য অশ্বাসুর তার সামনের পা দুটি দিয়ে কমলনয়ন ভগবানকে আঘাত করার চেষ্টা করল। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ কেশীর আঘাত এড়িয়ে গিয়ে, ক্রুদ্ধভাবে তার হাত দিয়ে দানবের পা দুখানি ধরে চতুর্দিকে শূণ্যে ঘূর্ণন করে শত ধনুক দূরত্বে হেলায় নিক্ষেপ করলেন, ঠিক যেমন গরুড় কোন সাপকে নিক্ষেপ করে। অতঃপর ভগবান কৃষ্ণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন। চেতনা ফিরে পেয়ে ক্রুদ্ধভাবে উত্থিত হয়ে মুখ ব্যাদান করে সে পুনরায় শ্রীকৃষ্ণকে আক্রমণের জন্য ধাবিত হল। কিন্তু ভগবান হাসতে হাসতে তাঁর বাম বাহু অশ্বের মুখের ভিতর প্রবেশ করালেন যেন অতি সহজেই একটি সর্প গর্তমধ্যে প্রবেশ করল। পরমেশ্বর ভগবানের বাহু স্পর্শ করা মাত্র কেশীর দন্তসমূহ তৎক্ষণাৎ পতিত হল যেন সেই বাহুটি দানবের কাছে তপ্ত লৌহের ন্যায় মনে হচ্ছিল। কেশীর দেহের মধ্যে পরমেশ্বর ভগবানের বাহু তখন উপেক্ষিত উদরস্ফীতি রোগের ন্যায় বিরাটভাবে বৃদ্ধি পেতে লাগল। শ্রীকৃষ্ণের ক্রমবর্ধমান বাহু সম্পূর্ণরূপে কেশীর শ্বাসরোধ করলে, সে ইতস্তত পদনিক্ষেপ করে ঘর্মাক্ত কলেবরে, বিস্ফারিত নয়নে, পূরীষ ত্যাগ করতে করতে প্রাণহীন হয়ে ভূমিতে পতিত হল। মহাবাহু কৃষ্ণ তখন কেশীর দেহমধ্য হতে দীর্ঘ কর্কটিকা ফলের ন্যায় তাঁর বাহু আকর্ষণ করে নিলেন। অনায়াসে তাঁর শত্রুকে বধ করা সত্ত্বেও গর্বশূন্য হয়ে ভগবান উপর থেকে দেবতাদের পুষ্প-বৃষ্টিরূপ পূজা গ্রহণ করেছিলেন।”
“হে রাজন, অতঃপর ভগবদ্ভক্তশ্রেষ্ঠ দেবর্ষি নারদ মুনি অক্লিষ্টকর্মা শ্রীকৃষ্ণের কাছে আগমন করে একান্তে তাঁকে বলতে লাগলেন। হে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ, অজ্ঞেয় স্বরূপ, যোগেশ, জগন্নাথ! হে বাসুদেব, সর্বজীবাশ্রয়, যাদবশ্রেষ্ঠ! হে প্রভু, আপনি কাষ্ঠমধ্যে গুপ্ত বহ্নির মতো হৃদয় অভ্যন্তরে অদৃশ্যভাবে আসীন সর্বজীবের পরমাত্মা। আপনি সর্বসাক্ষী, মহাপুরুষ ও পরম নিয়ন্তা স্বরূপ। আপনি সর্ব আত্মার আশ্রয় এবং পরম নিয়ন্তারূপে কেবলমাত্র আপনার ইচ্ছার দ্বারাই আপনি আপনার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করেন। আপনার মায়াশক্তি দ্বারা আদিতে আপনি জড়া প্রকৃতির গুণসমূহ প্রকাশ করেছেন এবং তাদের মাধ্যমেই আপনি এই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, পালন ও পরে বিনাশ সাধন করে থাকেন। নরপতিরূপে, দৈত্য, প্রমথ ও রাক্ষস রূপে বিরাজমান বিভিন্ন অসুরদের সংহার করে সাধুজনের রক্ষার জন্যই আপনি সেই একই স্রষ্টা এখন এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন। অশ্বরূপী অসুর এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে, তার হ্রেষাধ্বনিতে ভীত হয়ে দেবতারা তাঁদের স্বর্গরাজ্য পরিত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্যক্রমে আপনি তাকে বিনাশের ক্রীড়া উপভোগ করেছেন। আর দুদিনের মধ্যেই, হে সর্বশক্তিমান ভগবান, চাণূর, মুষ্টিক ও অন্যান্য মল্লগণকে সেই কুবলয়াপীড় হস্তী ও রাজা কংস সহ আপনার হাতে নিহত হতে দেখব। এরপর আমি আপনাকে কালযবন, মুর, নরক এবং শঙ্খাসুরকে বধ করতে দেখব এবং আমি আপনাকে, ইন্দ্রকে পরাজিত করে পারিজাত ফুলও হরণ করতে দর্শন করব। অতঃপর আমি দর্শন করব যে, বীরত্বরূপ শুল্কের বিনিময়ে বীর রাজাদের কন্যাগণকে আপনি বিবাহ করছেন। তারপর, আপনি দ্বারকায় রাজা নৃগকে অভিশাপ থেকে উদ্ধার করবেন এবং আপনার জন্য আরো এক পত্নী (জাম্ববতী) সহ স্যমন্তক মণি গ্রহণ করবেন। আপনার সেবক যমরাজের আলয় থেকে আপনি এক ব্রাহ্মণের মৃত পুত্রকে ফিরিয়ে আনবেন আর তারপর আপনি পৌণ্ড্রককে বধ করবেন, কাশী নগরী দাহ করবেন, দন্তবক্রের বিনাশ করবেন ও বিশাল রাজসূয় যজ্ঞের সময় চেদি-রাজকে বধ করবেন। আপনার দ্বারকায় বাসের সময় অন্যান্য আরো কর্ম যা আপনি সম্পাদন করবেন সেই সঙ্গে এই সমস্ত বীরত্ব লীলাসমূহও আমি দর্শন করব। দিব্য কবিগণের গানে এই সকল লীলা পৃথিবীতে কীর্তিত হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে ভূভার হরণের জন্য অর্জুনের সারথিরূপে সমগ্র অক্ষৌহিণী সেনা বিনাশক কালরূপী আপনাকে আমি দর্শন করব।”
“হে পরমেশ্বর ভগবান, আপনার আশ্রয়ের জন্য আমরা আপনার শরণ গ্রহণ করছি। আপনি বিশুদ্ধ দিব্যচেতনা পূর্ণ পরমানন্দ স্বরূপে সর্বদা অবস্থান করেন। যেহেতু আপনার ইচ্ছা অপ্রতিহত তাই সকল অভীষ্ট বিষয় প্রাপ্ত হন এবং আপনার চিৎ শক্তির প্রভাবে মায়াময় গুনপ্রবাহ থেকে আপনি নিত্যত পৃথক অবস্থান করেন। আপনি পরম নিয়ন্তা, স্বাশ্রয়, আপনাকে অvমার প্রণাম নিবেদন করি। আপনার নিজ শক্তি দ্বারা এই প্রপঞ্চের অগণিত পরিকল্পনা বিশেষ রচনা করেন। এখন আপনি মানবিক যুদ্ধবিগ্রহে অংশগ্রহণে মনস্থ করে যদু, বৃষ্টি ও সাত্বতগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বীররূপে আবিভূত হয়েছেন।”
“শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এই যদুপতি ভগবান কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে স্তব নিবেদন করে নারদ অবনত হয়ে তাঁকে প্রণাম নিবেদন করলেন। অতঃপর ভক্তশ্রেষ্ঠ দেবর্ষি নরদ প্রত্যক্ষভাবে ভগবানকে দর্শন করার পরমানন্দ অনুভব করতে করতে, ভগবানের অনুজ্ঞাক্রমে প্রস্থান করলেন। কেশী দানবকে যুদ্ধে বধ করার পর পরমেশ্বর ভগবান তাঁর আনন্দিত গোপবালক সহচরগণের সঙ্গে গাভী ও অন্যান্য পশুদের পালন করতে লাগলেন। এইভাবে তিনি সকল বৃন্দাবনবাসীর জন্য সুখ আনয়ন করলেন।”
“একদিন গোপবালকেরা যখন পর্বতের তটভাগে তাঁদের পশুদের চারণ করছিলেন, তখন চোর ও পশুপালকের ভূমিকায় অভিনয় করে তাঁরা ‘চুরি করে লুকানো’-র খেলা খেলতে শুরু করলেন। হে রাজন, ঐ খেলায় কেউ চোর, কেউ মেষপালক এবং অন্যান্যরা মেষ রূপে অভিনয় করছিলেন। তাঁরা আনন্দে ও নির্ভয়ে তাঁদের খেলা খেলছিলেন। ব্যোম নামক ময় দানবের এক মহা মায়াবী পুত্র তখন গোপবালকের ছদ্মবেশে সেখানে অবতীর্ণ হল। চোর রূপে খেলায় যোগদান করার ভান করে সে মেষরূপে অভিনয়কারী অধিকাংশ গোপবালককে চুরি করতে লাগল। ধীরে ধীরে সেই মহাদানব আরও বহু গোপবালককে অপহরণ করে এক পর্বতের গুহায় নিক্ষেপ করে তা প্রস্তরখণ্ড দিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত মেষ রূপে অভিনয়কারী আর চার-পাঁচজন মাত্র বালক খেলায় অবশিষ্ট ছিলেন। সাধু ভক্তগণের আশ্রয় প্রদাতা শ্রীকৃষ্ণ, ব্যোমাসুর যা করছিল তা সম্পূর্ণত অবগত হয়ে, যে সময়ে সে আরও গোপবালককে নিয়ে যাচ্ছিল তখন, সিংহ যেমনিভাবে নেকড়ে বাঘকে ধারণ করে, তেমননিভাবে বলপূর্বক দানবকে ধরলেন। দানব তখন তার বিশাল পর্বতসদৃশ বিরাট ও বলশালী নিজ রূপে পরিবর্তিত হল। কিন্তু নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করলেও ভগবানের দৃঢ় মুষ্টির ধারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, সে তা করতে সমর্থ হল না। ভগবান অচ্যুত ব্যোমাসুরকে তাঁর বাহুমধ্যে দৃঢ়রূপে ধারণ করে ভূতলে নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর দর্শনকারী স্বর্গের দেবতাদের সমক্ষে কৃষ্ণ তাকে, যজ্ঞের পশুকে যেভাবে বধ করা হয়, তেমনিভাবে বধ করলেন। কৃষ্ণ তখন গুহার প্রবেশপথের প্রস্তরখণ্ডের অবরোধ চূর্ণ করে আটক গোপবালকগণকে নিরাপদে নিঃসারিত করলেন। অতঃপর দেবতা ও গোপবালকগণ তাঁর মহিমা গান করলে তিনি তাঁর গোকুলে প্রত্যাবর্তন করলেন।”
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়- কেশী ও ব্যোমাসুর বধ
30 Aug 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়