শ্রীঅক্রূর বললেন- “সর্বকারণের কারণ পরম আদি অক্ষয় পুরুষ নারায়ণ, আপনাকে আমার প্রণাম নিবেদন করি। আপনার নাভিজাত পদ্মের কোষ হতে ব্রহ্মা আবির্ভাব হয়েছিলেন আর তাঁর দ্বারাই এই জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ ও তাদের উৎস অহঙ্কার, মহত্তত্ত্ব, প্রকৃতি ও তার উৎস ভগবানের পুরুষ প্রকাশ, মন, ইন্দ্রিয়সকল, ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমুহ ও অধীশ্বরগণ- জগৎ সৃষ্টির এই সকল কারণসমুদয় আপনার শ্রীঅঙ্গজাত। জড়া প্রকৃতি ও সৃষ্টির অন্যান্য সমস্ত উপাদানসমূহ অনাত্মবস্তু হওয়ায় আপনার প্রকৃত স্বরূপ জানতে পারে না। যেহেতু আপনি গুণাতীত, তাই ব্রহ্মাও এই জড় গুণসমূহে আবদ্ধ হওয়ায় আপনার প্রকৃত স্বরূপ অবগত নন। শুদ্ধ যোগীগণ আপনার অধ্যাত্ম (জীবাত্মারূপ), অধিভূত (জীবের জড় উপাদানরূপ), এবং অধিদৈব (জড়জাগতিক উপাদানগুলির নিয়ন্ত্রণকারী দেবতাদির রূপ)- এই ত্রিমাত্রিক রূপের কল্পনার মাধ্যমে, পরমেশ্বর ভগবান, আপনারই আরাধনা করেন। ব্রাহ্মণগণ তিনিটি-বেদ হতে মন্ত্র কীর্তন করে ত্রি-যজ্ঞের বিধিসমূহ অনুসরণ করে আপনার আরাধনা করেন এবং বহু রূপ ও নামের বিভিন্ন দেবতাদের বিশদভাবে যজ্ঞ সম্পাদন করেন। দিব্য জ্ঞান লাভের জন্য কেউ কেউ সকল জাগতিক কর্ম পরিত্যাগ করে শান্ত হয়ে জ্ঞান যজ্ঞ সম্পাদন করে জ্ঞান-বিগ্রহ স্বরূপ আপনাকে আরাধনা করেন। শুদ্ধ বুদ্ধিসম্পন্ন অন্যান্য ব্যক্তিগণ আপনার ঘোষিত বৈষ্ণব শাস্ত্রীয় বিধিসমুহ অনুসরণ করেন। তাঁদের মনকে আপনার ভাবনায় মগ্ন করে তাঁরা বহুর রূপে প্রকাশিত একই ভগবান, আপনাকে আরাধনা করেন। আরও অন্যান্যরা রয়েছেন, যাঁরা ভগবান শিব রূপে আপনার উপাসনা করেন। তাঁদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ফলেই তাঁরা শিব বর্ণিত ও বহু আচার্য দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেন। হে প্রভু, কিন্তু এই সমস্ত মানুষেরা, যাঁরা আপনার থেকে অন্যত্র মনোনিবেশ করে অন্য দেবতাদের উপাসনা করছেন, তাঁরাও প্রকৃতপক্ষে, সর্বদেবময় একমাত্র আপনারই উপাসনা করছেন। পর্বত হতে উৎপন্ন নদী যেমন বৃষ্টি জলে পরিপূর্ণ হয়ে চতুর্দিক হতে সমুদ্রে প্রবাহিত হয়, তেমনই এই সমস্ত মার্গ অবশেষে, হে প্রভু আপনাতে প্রবিষ্ট হয়। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ, আপনার জড়া প্রকৃতির গুণাবলী ব্রহ্মা হতে শুরু করে স্থাবর প্রাণী পর্যন্ত সকল বদ্ধ জীবকে আবদ্ধ করে। আপনি সমস্ত জীবের পরমাত্মারূপে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে সকলের বুদ্ধির সাক্ষীস্বরূপ, আমি আপনাকে আমার প্রণাম নিবেদন করি। অবিদ্যার বেগপ্রসূত আপনার জড়-গুণ-প্রবাহ দেবতা, মানুষ ও প্রাণীরূপ দেহাভিমানীগণের মধ্যে প্রবাহিত হয়। অগ্নি আপনার মুখ, পৃথিবী আপনার চরণ, সূর্য আপনার চক্ষু এবং আকাশ আপনার নাভি। দিকসকল আপনার শ্রবণেন্দ্রিয় ও দেবশ্রেষ্ঠগণ আপনর বাহুদ্বয় এবং সমুদ্র আপনার উদর। স্বর্গ আপনার মস্তুক, বায়ু আপনার প্রাণ ও বল। বৃক্ষ ও ওষধিসমূহ আপনার শরীরের রোমরাশি, মেঘ আপনার মস্তকের কেশরাশি এবং পর্বত আপনার, পরম পুরুষের অস্থি ও নখ। রাত্রি ও দিন আপনার চক্ষুর নিমেষ মাত্র, প্রজাপতি ব্রহ্মা আপনার প্রজনন-অঙ্গস্বরূপ ও বৃষ্টি আপনার বীর্য।”
“হে অক্ষয় পুরুষ পরমেশ্বর ভগবান, বহুজীবসঙ্কুল নিখিল ভুবন সবই তাদের নিজ নিজ পালকগণ সহ আপনার মধ্যেই উৎপন্ন হয়। ঠিক যেমন জলচর জীবেরা সাগরে সন্তরণ করে বা ক্ষুদ্র কীটগুলি উড়ুম্বর ফলের মধ্যে বাস করে, তেমনই মন ও ইন্দ্রিয়সমূহের আধার স্বরূপ আপনারই মধ্যে এই সকল ভুবন সঞ্চরনশীল। আপনার লীলা উপভোগার্থে এই জগতে আপনি নিজেকে বিভিন্ন রূপে প্রকট করেন আর যাঁরা আনন্দে আপনার মহিমা কীর্তন করেন, এই সকল অবতারগণ তাঁদের সমস্ত শোক মার্জন করেন। সৃষ্টির কারণ আপনি, প্রলয় সমুদ্রে সন্তরণশীল মৎসরূপী আপনাকে, আমি আমার প্রণাম নিবেদন করি। হয়গ্রীবরূপে মধু-কৈটভ বিনাশক, বৃহৎ কূর্মরূপে মন্দর পর্বতধারী এবং বরাহ অবতারে যিনি পৃথিবীকে সানন্দে উদ্ধার করেন, সেই আপনাকে আমি আমার প্রণাম নিবেদন করি। অদ্ভুতসিংহরূপী (নৃসিংহদেব) সাধু ভক্তগণের ভয় বিনাশকারী ও বামনরূপী ত্রিভুবনে পদবিন্যাসকারী আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি। ভৃগুপতি রূপধারী ক্ষত্রিয়বনচ্ছেদী ও রাবণান্তকারী রঘুকুলশ্রেষ্ঠ শ্রীরামরূপ আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি। হে প্রভু, বাসুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যুম্ন ও অনিরুদ্ধরূপী যাদবাধিপতি আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি। দৈত্যদানব-মোহনকারী শুদ্ধ বৃদ্ধরূপী ও ম্লেচ্ছতুল্য রাজাগণের বিনাশকারী কল্কিরূপী আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি।”
“হে ভগবান, এই জগতে আপনার মায়া শক্তি দ্বারা মোহিত জীব ‘আমি’ ও ‘আমার’ রূপ মিথ্যা অভিমানে যুক্ত হয়ে কর্মমার্গে ভ্রমণ করতে বাধ্য হয়। হে প্রভো, আমিও এইভাবে বিভ্রান্ত হয়ে মূর্খের মতো আমার দেহ, সন্তান, গৃহ, পত্নী, অর্থ ও স্বজনবৃন্দকে সত্য বলে মনে করছি, যদিও তারা প্রকৃতপক্ষে স্বপ্নবৎ অসত্য। এইভাবে অনিত্যকে নিত্য, আমার দেহকে আমার আত্মা এবং দুঃখের উৎস-সমূহকে সুখের উৎসরূপে ভুল করে, আমি জাগতিক দ্বন্দের মধ্যেই আনন্দ অনুভবের চেষ্টা করছি। এইভাবে তমোগুণে আচ্ছন্ন হয়ে আমার প্রকৃত প্রেমাস্পদরূপে আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারিনি। মূর্খ যেমন জলোৎপন্ন তৃণ দ্বারা আচ্ছাদিত জলকে লক্ষ্য না করে মরীচিকার দিকে ধাবিত হয়, আমিও তেমনি আপনার কাছ থেকে অন্য দিকে ধাবিত হয়েছি। আমার বুদ্ধি এতটাই অক্ষম যে, জড়জাগতিক কামনা ও কর্ম দ্বারা ক্ষোভিত এবং ক্রমাগত আমার বলবান ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারা আকৃষ্যমান আমার মনকে নিবৃত্ত করার শক্তি লাভ করতে আমি অসমর্থ। যদিও অসাধুজনেরা কখনই আপনার পদদ্বয় প্রাপ্ত হতে পারে না, তবুও পতিত রূপ আমি যে আপনার চরণের শরণাগত হয়েছি, আপনার কৃপা ভিন্ন তা কখনই সম্ভব নয় বলে আমি মনে করি। একমাত্র যখন জীবের জাগতিক জীবনের অবসান হয়, হে পদ্মনাভ, তখনই আপনার শুদ্ধ ভক্তের সেবার দ্বারা আপনার প্রতি মতি জন্মে। অনন্ত শক্তিমান পরম ব্রহ্মকে আমি প্রণাম নিবেদন করি। তিনি বিজ্ঞানময় বিগ্রহ, সকল চেতনার কারণস্বরূপ এবং জীবের প্রধান নিয়ন্তা। হে বাসুদেব, সকল জীবের আশ্রয় স্বরূপ, আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি। হে হৃষীকেশ, আপনাকে পুনরায় আমার প্রণাম নিবেদন করি। হে প্রভো, আমি আপনার শরণাগত, দয়া করে আমাকে রক্ষা করুন।”
চত্বারিংশ অধ্যায়- অক্রূরের প্রার্থনা
06 Sep 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়