শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বলরাম ও কৃষ্ণ কর্তৃক অত্যন্ত সম্মানিত হয়ে পালঙ্কে সুখে উপবিষ্ট হয়ে অক্রূর অনুভব করলেন পথিমধ্যে তিনি যে সকল আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন তা সবই পূর্ণ হয়েছে। হে রাজন, লক্ষ্ণীদেবীর আশ্রয়স্বরূপ পরমেশ্বর ভগবানকে যে সন্তুষ্ট করেছে, তার আর কিই বা অপ্রাপ্ত থাকতে পারে? তবুও তাঁর ঐকান্তিক ভক্তগণ তাঁর কাছ থেকে কোন কিছুই প্রার্থনা করেন না। সান্ধ্য ভোজনের পর দেবকী-নন্দন শ্রীকৃষ্ণ, কংস তাঁর আত্মীয় বন্ধুদের প্রতি কিরকম আচরণ করছে এবং রাজা আর কি করার পরিকল্পনা করছে, সেই বিষযে অক্রূরকে জিজ্ঞাসা করলেন।”
ভগবান বললেন- “হে তাত, হে সৌম্য অক্রূর, তোমার সুখে আগমন হয়েছে তো? তোমার মঙ্গল হউক। আমাদের নিকট ও দূরসম্পর্কের আত্মীয় ও শুভানুধ্যায়ী বন্ধুরা সুখে ও সুস্বাস্থ্যে রয়েছে তো? কিন্তু, হে প্রিয় অক্রূর, যখন আমাদের পরিবারের ব্যাধিস্বরূপ মাতুল নামধারী রাজা কঙস বৃদ্ধিশীল রয়েছে, তখন আমাদের পরিবারের সদস্য ও তার অন্যান্য প্রজাগণের সম্পর্কে আমার আর কিই বা জিজ্ঞাসা করা উচিত? দেখ, আমি কতখানি আমার নিরপরাধ পিতা-মাতার দুঃখের কারণ হয়েছি! আমার জন্যই তাঁদের পুত্রগণ বধ হয়েছেন এবং তাঁরা নিজেরো কারারুদ্ধ হয়েছেন। সৌভাগ্যবশত, আমাদের জাতি, তোমাকে দর্শন করার অভীষ্ট আজ পূর্ণ হল। হে সৌম্য তাত, দয়া করে তোমার আগমনের কারণ আমাদের বর্ণনা কর।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ভগবানের জিজ্ঞাসার উত্তরে মধুবংশজাত অক্রূর রাজা কংসের যদুগণের প্রতি শত্রুতাচরণ এবং বসুদেবকে তার হত্যার চেষ্টা সহ সকল পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করলেন। যে সংবাদ প্রদান করার জন্য তিনি প্রেরিত হয়েছেন, অক্রূর তা নিবেদন করলেন। তিনি কংসের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং কৃষ্ণ যে বসুদেবপুত্র রূপে জন্ম নিয়েছেন, নারদ কর্তৃক কংসকে তা জ্ঞাপন করার কথাও বর্ণনা করলেন। মহাবল শত্রুবিনাশন শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীবলরাম অক্রূরের কথাগুলি শ্রবণ করে হেসে উঠলেন। উভয়েই তখন তাঁদের পিতা নন্দ মহারাজের কাছে রাজা কংসের নির্দেশ জ্ঞাপন করলেন। নন্দ মহারাজ তখন গ্রামরক্ষক দ্বারা ব্রজে নন্দের এলাকা জুড়ে নিম্নরূপ ঘোষণা করে গোপগণের প্রতি নির্দেশ জারী করলেন, “সকল প্রাপ্য দুগ্ধজাত দ্রব্য সংগ্রহ করে, মূল্যবান উপহান আনয়ন করে শকট যোজনা কর। আগামীকাল আমরা মথুরা গমন করে আমাদের দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি রাজাকে প্রদান করব এবং এক অত্যন্ত বিশাল উৎসব দর্শন করব। সকল জনপদবাসীরাও গমন করছে।”
“গোপীগণ যখন শ্রবণ করলেন যে, কৃষ্ণ ও বলরামকে মথুরা নগরীতে নিয়ে যাবার জন্য অক্রূর ব্রজে আগমন করেছেন, তখন তাঁরা অত্যন্ত দুঃখিতা হলেন। কোন কোন গোপীর হৃদয়ে অত্যন্ত সন্তাপ অনুভবজনিত কষ্টকর নিঃশ্বাসের ফলে তাঁদের মুখমণ্ডল মলিন হয়ে উঠেছিল। নিদারুণ মনস্তাপে অন্যান্য গোপীদের বসন, বলয় ও কেশগ্রন্থি শিথিল হয়ে পড়ল। অন্য গোপীগণ কৃষ্ণানুধ্যানে স্থির হয়ে যাওয়ায় তাঁদের ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপ সম্পূর্ণত নিরুদ্ধ হয়েছিল। আত্মোপলব্ধির স্তরে উপনীত মানুষদের মতো বাহ্যজগৎ বিষয়ে তাঁদের সকল চেতনা লুপ্ত হয়েছিল। অপর ব্রজস্ত্রীগণ কেবলমাত্র ভগবান শৌরির (কৃষ্ণ) বাক্যসমূহ স্মরণ করতে করতে মূর্ছিতা হলেন। অনুরাগব্যঞ্জক ঈষৎ হাস্যসহ উচ্চারিত বিচিত্র পদশোভিত এই সমস্ত বাক্য তাঁদের হৃদয় গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। শ্রীমুকুন্দ হতে স্বল্প-বিরহ সম্ভাবনার ভয়েও ভীতা গোপীগণ এখন তাঁর সুললিত গীত, তাঁর লীলা, তাঁর অনুরাগ, হাস্য, তাঁর বীরত্বব্যঞ্জক-আচরণ এবং তাঁদের শোক-বিনাশক তাঁর পরিহাস বাক্য স্মরণ করতে করতে সম্ভাব্য মহা-বিরহ ভাবনায় উদ্বিগ্না হয়ে পরস্পর সমবেত হলেন। অশ্রুপূর্ণ মুখমণ্ডলে ও পূর্ণভাবে ভগবান অচ্যুতে মগ্নচিত্ত হয়ে তাঁরা দলবদ্ধভাবে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছিলেন।”
গোপীগণ বললেন- “হায় বিধাতা, তোমার কোন দয়া নেই! তুমি দেহীগণকে মৈত্রী ও প্রেমে সংযুক্ত কর আর তারপর তাদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবার আগেই তুমি নিরর্থক তাদের বিচ্ছিন্ন কর। তোমার এই অস্থিরচিত্ত লীলা ঠিক শিশুর খেলার মতো। কুঞ্চিত কৃষ্ণ-কেশরাশি দ্বারা আবৃত, সুন্দর গাল, উন্নত নাক ও সর্বসন্তাপহারী শান্ত হাস্যময় মুকুন্দের সেই মুখমণ্ডল আমাদের দর্শন করিয়ে তুমি এখন তা অদৃশ্য করছ। তোমার এই আচরণ মোটেই ভাল নয়। হে বিধাতা, যদিও তুমি এখানে অক্রূর নাম নিয়ে এসেছ, প্রকৃতপক্ষে তুমি ক্রূর। একবার যা আমাদের প্রদান করেছিলে- সেই চক্ষু দ্বারা তোমার সমগ্র সৃষ্টির পূর্ণতা, এমন কি শ্রীমধুদ্বিষের রূপের একদেশ দর্শন করছিলাম- মূর্খের মতো তুমি তা হরণ করছ। হায়, নন্দপুত্রের সৌহার্দ্য এত ক্ষণভঙ্গুর যে আমাদের দিকে ফিরেও তাকাবেন না। জোর করে তাঁর বশে আকৃষ্ট আমরা কেবলমাত্র তাঁকে সেবা করার জন্য গৃহ, স্বজন, পুত্র ও পতি পরিত্যাগ করেছি, কিন্তু তিনি সর্বদা নতুন প্রিয়তমার সন্ধান করছেন। এই রাত্রির পরবর্তী প্রভাত মথুরার রমণীগণের জন্য অবশ্যই শুভ। তাঁদের সকল আশা এখন পূর্ণ হবে, কারণ ব্রজেশ্বর তাঁদের নগরীতে প্রবেশ করলে তাঁর মুখ হতে তাঁর নেত্রপ্রাপ্ত দ্বারা প্রকাশিত হাস্যের অমৃত পান করতে তাঁরা সমর্থ হবেন।”
“হে অবলাগণ, যদিও মুকুন্দ ধীর স্বভাবসম্পন্ন এবং পিতামাতার অত্যন্ত অনুগত, তথাপি একবার সে মধুর মতো মিষ্টভাষী মথুরার ঐ রমণীদের বশীভূত হলে এবং তাদের মনোমুগ্ধকর সলজ্জ হাস্যে বিভ্রান্ত হলে, কিভাবে সে আবার আমাদের মতো গাম্যনারীদের কাছে ফিরে আসবে? দশার্হ, ভোজ, অন্ধক, বৃষ্ণি ও সাত্বতগণ যখন মথুরায় সকল দিব্য গুণের আধার লক্ষ্ণীরমণ দেবকীনন্দনকে দর্শন করবেন এবং সেই সঙ্গে যারা তাঁকে নগরীতে গমনের সময় পথিমধ্যে দর্শন করবেন, তাদের নয়নের অবশ্যই মহোৎসব হবে। যে এরূপ নিষ্ঠুর আচরণ করছে, তার নাম অক্রূর হওয়ার উচিত নয়। সে এতই নিষ্ঠুর যে, ব্রজের দুঃখিতজনদের আশ্বাস প্রদানের চেষ্টা না করেই সে আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় কৃষ্ণকে নিয়ে যাচ্ছে। কঠিন হৃদয়ের শ্রীকৃষ্ণ ইতিমধ্যেই রথে সমারূঢ় হয়েছেন এবং মূর্খ গোপগণ তাঁর পেছনে গো-শকটে ত্বরা করছেন। এমন কি জ্যেষ্ঠগণও তাঁকে নিবৃত্ত হওয়ার জন্য কিছুই বলছেন না। আজ ভাগ্য আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। চল, আমরা সরাসরি মাধবের কাছে গিয়ে তাকে যাত্রা থেকে নিবৃত্ত করি। আমাদের পরিবারের বৃদ্ধার ও অন্যান্য আত্মীয়বর্গ আমাদের কি করতে পারেন? এখন ভাগ্য আমাদের মুকুন্দের কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইতিমধ্যেই আমাদের হৃদয়কে দীন করেছে, কারণ ক্ষণকালের জন্যও আমরা কৃষ্ণসঙ্গ পরিত্যাগ সহ্য করতে পারি না। তিনি যখন রাসনৃত্য সভায় আমাদের আনয়ন করতেন, তখন তাঁর অনুরাগ ও মধুর হাস্য, তাঁর মনোহর গোপন সংলাপ, তাঁর লীলাময় দৃষ্টিপাত ও তাঁর আলিঙ্গন উপভোগ করে আমরা অসংখ্য রাত্রিকে ক্ষণমাত্র কাল রূপে অতিবাহিত করতাম। হে গোপীগণ, আমরা কিভাবে তাঁর অনুপস্থিতির দুষ্পার অন্ধকার অতিক্রম করব? যিনি সন্ধ্যায় গোপবালক সহযোগে ব্রজে ফিরে আসেন, যাঁর কেশ ও মাল্য গো-খুর উত্থিত ধুলায় রঞ্জিত, অনন্তসখা সেই কৃষ্ণ বিনা আমরা কিভাবে বাঁচব? তিনি যখন বেণুবাদন করেন, তাঁর সস্মিত কটাক্ষবলোকন আমাদের হৃদয়কে মুগ্ধ করে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইসব কথাগুলি বলবার পর কৃষ্ণগতচিত্তা ব্রজ-রমণীগণ তাঁদের আসন্ন কৃষ্ণ-বিরহে অত্যন্ত কাতরতা অনুভব করলেন। তাঁরা সকল লজ্জা বিস্মৃত হয়ে ‘হে গোবিন্দ, হে দামোদর, হে মাধব’ বলে উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করতে লাগলেন। কিন্তু এইভাবে গোপীগণের ক্রন্দন সত্ত্বেও অক্রূর সূর্যোদয় হলে তাঁর প্রভাতের পূজা ও অন্যান্য কর্মসমূহ সম্পাদন করে রথ পরিচালনা শুরু করলেন। নন্দ মহারাজের নেতৃত্বে গোপগণ তাঁদের শকটে করে শ্রীকৃষ্ণের পশ্চাতে অনুগমন করলেন। তাঁরা রাজার জন্য কলসপূর্ণ ঘি ও অন্যান্য দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি সহ প্রচুর উপহারাদি সঙ্গে নিয়েছিলেন। (তার দৃষ্টির দ্বারা) শ্রীকৃষ্ণ গোপীদের কিছুটা শান্ত করলেন এবং তাঁরাও কিছুক্ষণ তাঁর অনুগমন করলেন। অতঃপর তাঁর প্রত্যাদেশ আকঙ্ক্ষা করে তাঁরা দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর প্রস্থানে গোপীগণ কিভাবে সন্তপ্তা ছিলেন তা দর্শন করে, “আমি ফিরে আসব” এই প্রেমপূর্ণ প্রতিজ্ঞা দূত মাধ্যমে প্রেরণ করে তিনি তাঁদের সান্ত্বনা প্রদান করলেন। যতক্ষণ রথ-চূড়ার ধ্বজা দেখা গেল এবং যতক্ষণ রথের চাকা দ্বারা উত্থিত ধুলা দেখা যাচ্ছিল, ততক্ষণ কৃষ্ণানুগতচিত্তা গোপীগণ গতিহীন চিত্রার্পিত অবয়বের মতো অবস্থান করছিলেন। অতঃপর গোপীগণ গোবিন্দের প্রত্যাবর্তন বিষয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে চললেন। দুঃখে তাঁদের প্রিয়তমের লীলাসমূহ কীর্তন করতে করতে তাঁরা দিবারাত্র অতিবাহিত করতে লাগলেন।”
“হে রাজন, অক্রূর ও শ্রীবলরামের সঙ্গে বায়ুবেগে সেই রথে ভ্রমণ করতে করতে ভগবান কৃষ্ণ পাপনাশিনী কালিন্দী নদীর সমীপে উপস্থিত হলেন। উজ্জ্বল মণির চেয়েও সেই নদীর জল অধিক স্বচ্ছ ছিল। শ্রীকৃষ্ণ আচমন করে নিজ হস্তে জলপান করলেন। অতঃপর তিনি রথটিকে নিয়ে বৃক্ষরাজির কাছে গিয়ে বলরামের সাথে আবার রথে আরোহণ করলেন। অক্রূর তাঁদের দুজনকে রথে আসন গ্রহণ করতে বললেন। অতঃপর তাঁদের অনুমতি গ্রহণ করে, যমুনার এক হ্রদে গমন করে শাস্ত্রবিধি অনুসানে স্নান করলেন। তিনি জলে নিমজ্জিত হয়ে সনাতন বৈদিক মন্ত্র জপ করতে করতে সহসা বলরাম ও কৃষ্ণকে তাঁর সম্মুখে দর্শন করলেন। অক্রূর ভাবলেন, ‘কিভাবে রথে সমাসীন আনকদুন্দুভির দুই পুত্র এখানে জলমধ্যে দণ্ডায়মান হতে পারেন? তাঁরা নিশ্চয়ই রথ থেকে নেমে এসেছেন।’ কিন্তু যখন তিনি নদী থেকে উঠে এলেন পূর্ববৎ তাঁদের রথেই দর্শন করলেন। ‘তবে আমি যে তাঁদের জলমধ্যে দর্শন করলাম তা কি মিথ্যা?’ আপন মনে প্রশ্ন করতে করতে অক্রূর পুনরায় হৃদে প্রবেশ করলেন। সেখানে অক্রূর এখন সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব ও অসুরগণের দ্বারা অবনতমস্তকে স্তূয়মান, সর্পরাজ অনন্তশেষকে দর্শন করলেন। অক্রূর দর্শন করলেন যে, সহস্রশীর্ষ, সহস্রফণা ও সহস্র শিরস্ত্রাণ সমন্বিত মৃণালতুল্য শ্বেতবর্ণ, নীলবসন ভগবান কৈলাস পর্বতের মতো বহুশৃঙ্গযুক্ত হয়ে অবস্থান করছেন। অক্রূর অতঃপর পরমেশ্বর ভগবানকে অনন্তশেষের ক্রোড়ে শান্তভাবে শায়িত দর্শন করলেন। সেই পরম পুরুষের বর্ণ ঘনশ্যাম। তিনি পীত বসন পরিহিত, চতুর্ভুজ এবং নয়নযুগল কমলপত্রবৎ অরুণবর্ণ। তাঁর মনোরম মুখমণ্ডল, প্রসন্ন দৃষ্টিপাত, সুরম্য ভ্রূযুগল ও মধুরহাস্যসমন্বিত। তাঁর উন্নত নাসিকা, সুগঠিত কর্ণদ্বয়, এবং অরুণবর্ণ ওষ্ঠযুক্ত সুন্দর কপোল। তাঁর সুন্দর উন্নত স্কন্ধ ও প্রশস্ত বক্ষ, বাহুদ্বয় আজানুলম্বিত ও স্থূল। তাঁর কন্ঠদেশ শঙ্খসদৃশ, নাভি সুগভীর এবং উদর অশ্বত্থপত্র সদৃশ রেখাযুক্ত। তাঁর শ্রোণি ও কটিদেশ বিশাল, ঊরুদ্বয় হস্তী-শুঁড়-তুল্য এবং জানু ও জঙ্ঘা সুগঠিত। তাঁর ফুলদলতুল্য আঙুলের নখ হতে প্রকাশিত উজ্জ্বল কিরণ তাঁর উন্নত গুল্ফদ্বয় প্রতিফলিত করে তাঁর চরণকমল শোভিত করছে। বহু মূল্যবান রত্নে বিভূষিত কিরীট, বলয়, অঙ্গদ, কোমরবন্ধনী, যজ্ঞ-সূত্র, কন্ঠহার, নূপুর ও কুণ্ডলে সুশোভিত ভগবান পূর্ণজ্যোতিতে বিরাজ করছিলেন। তিনি এক হাতে পদ্ম ধারণ করেছিলেন, আর অন্য হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা। তাঁর বক্ষে শ্রীবৎস চিহ্ন, কৌস্তুভমণি ও বনমালা শোভা পাচ্ছিল। নন্দ, সুনন্দ ও তাঁর অন্যান্য ব্যক্তিগত পার্ষদগণ, সনক ও অন্যান্য কুমারগণ, ব্রহ্মা, রুদ্র ও অন্যান্য প্রধান দেবতাগণ, নয়জন শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ ও সর্বোত্তম ভক্তবৃন্দ, প্রহ্লাদ, নারদ ও উপরিচর বসুর নেতৃত্বে ভগবানকে পরিবেষ্টন করে তাঁর স্তুতি করছেন। এইসব মহান পুরুষগণ প্রত্যেকেই তাঁকে নিজ অনুপম ভাবে পবিত্র বচন কীর্তন করে ভগবানের স্তুতি করছিলেন। ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তির প্রধান, শ্রী, পুষ্টি, গীঃ, কান্তি, কীর্তি, তুষ্টি, ইলা ও ঊর্জা এবং তাঁর বহিরঙ্গা শক্তির বিদ্যা, অবিদ্যা ও মায়া আর তাঁর ‘শক্তি’ নামক অন্তরঙ্গা হ্লাদিনী শক্তিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মহান ভক্তরূপে অক্রূর এই সমস্ত দর্শন করে তিনি অত্যন্ত প্রীত ও দিব্যভক্তিতে যুক্ত অনুভব করলেন। তাঁর গভীর ভাবের ফলে তাঁর দেহ পুলকিত হয়েছিল ও নয়নদ্বয় হতে অশ্রু প্রবাহিত হয়ে তাঁর শরীরকে আর্দ্র করেছিল। কোনভাবে নিজেকে সংযত রেখে অক্রূর ভূমিতে মস্তক অবনত করে কৃতাঞ্জলিপুটে বিনীতভাবে ভাব-গদ্গদ কন্ঠে ধীরে ধীরে সাবধানে স্তব শুরু করলেন।”
একোনচত্বারিংশ অধ্যায়- অক্রূরের বিষ্ণুলোক দর্শন
03 Sep 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়