শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তাঁর চিন্ময় ঐশ্বর্য সম্বন্ধে তাঁর পিতা-মাতা সচেতন হয়েছেন হৃদয়ঙ্গম করে পরম পুরুষোত্তম ভগবান ভাবলেন, এটি হতে দেওয়া উচিত নয়। তাই তাঁর ভক্তদের মোহিত করে তাঁর যে যোগমায়া তিনি তাঁরই বিস্তার করলেন। সাত্বতশ্রেষ্ঠ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গে একত্রে তাঁর পিতা-মাতার কাছে গেলেন। বিনম্রভাবে মাথা নিচু করে তাঁদের ‘হে মাতা’, হে পিতা’ বলে সশ্রদ্ধ সম্ভাষণের মাধ্যমে কৃষ্ণ বলতে লাগলেন- হে পিতা, আপনি ও মাতা দেবকী সকল সময়েই আপনাদের দুই পুত্র, আমাদের জন্য উদ্বিগ্ন থাকতেন আর তাই কখনও আমাদের বাল্য, পৌগণ্ড ও কৈশোর উপভোগ করতে পারেননি। অধিকাংশ শিশু তাদের পিতা-মাতার গৃহে যা উপভোগ করে, দৈব বিড়ম্বনার ফলে আমরা আপনার সঙ্গে বাস করতে না পেরে সেই আদর ও সুখ উপভোগ করতে পারিনি। জীবনের সকল উদ্দেশ্য সাধক এই দেহটিকে পিতা-মাতাই জন্ম দেন ও লালন করেন। তাই, শত-বর্ষ পরমায়ু পর্যন্ত তাঁদের সেবা করলেও মানুষ তাদের ঋণ শোধ করতে পারে না। সমর্থ হয়েও যে পুত্র দেহ ও ধন দ্বারা তার পিতা-মাতার জীবিকা প্রদান করে না, তার মৃত্যুর পর পরলোকে যমদূতেরা তার নিজ মাংস ভক্ষণে বাধ্য করে। যে সমর্থ মানুষ তার বৃদ্ধ পিতা-মাতা, সাধ্বী স্ত্রী, শিশু সন্তান ও গুরুদেবকে পালন করে না, অথবা ব্রাহ্মণ ও আশ্রিতজনকে অবজ্ঞা করে, সে জীবিত হলেও মৃতবৎ বিবেচিত হয়। আমাদের মন কংসের ভয়ে সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকার জন্য আপনাদের যথাযোগ্যভাবে সম্মান প্রদর্শন করতে আমরা অসমর্থ ছিলাম আর এইভাবে আমাদের ঐ সমস্ত দিনগুলি বৃথাই নষ্ট করেছি। হে পিতা, হে মাতা, আপনাদের শুশ্রূষা করতে না পারার জন্য দয়া করে আমাদের ক্ষমা করুন। আমরা পরাধীন হয়ে রয়েছি এবং দুরাত্মা কংসের দ্বারা অতিশয় উৎপীড়িত।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে নিজ অন্তরঙ্গা শক্তি দ্বারা মানবরূপে আবির্ভূত, বিশ্ব-পরমাত্মা, ভগবান শ্রীহরির কথায় মোহিত তাঁর পিতা-মাতা আনন্দে তাঁকে ক্রোড়ে তুলে নিয়ে আলিঙ্গন করলেন। ভগবানের উপর অশ্রুধারা বর্ষন করতে করতে স্নেহপাশে আবদ্ধ তাঁর পিতা-মাতা কথা বলতে পারলেন না। হে রাজন্, বাষ্পরুদ্ধ কন্ঠে তাঁরা বিমোহিত হয়েছিলেন। দেবকীনন্দন রূপে আবির্ভূত পরমেশ্বর ভগবান এইভাবে তাঁর পিতা-মাতাকে আশ্বস্ত করে তাঁর মাতামহ উগ্রসেনকে যদুগণের রাজা করলেন।”
ভগবান তাঁকে বললেন- “হে মহারাজ, আমরা আপনার প্রজা, তাই আমাদের আদেশ করুন। প্রকৃতপক্ষে, যযাতির অভিশাপের ফলে কোন যদুই রাজ সিংহাসনে উপবেশন করতে পারেন না। আপনার পার্ষদগণের মধ্যে আপনার ব্যক্তিগত সেবক রূপে আমি উপস্থিত থাকলে, সকল দেবতা ও অন্যান্য মহান ব্যক্তিরাও অবনত মস্তকে আগমন করে আপনাকে উপহার প্রদান করবে। নরপতিগণের কথা আর বলার কি আছে? ভগবান অতঃপর কংসভয়ে পলায়নকারী তাঁর নিকট জ্ঞাতি ও অন্যান্য আত্মীয়বর্গকে বিভিন্ন স্থান থেকে ফিরিয়ে আনলেন। প্রবাস পীড়িত যদু, বৃষ্ণি, অন্ধক, মধু, দাশার্হ, কুকুর ও অন্যান্য বংশজগণকে সসম্মানে গ্রহণ করে আশ্বস্ত করলেন। মহামূল্যবান উপহার প্রদান করে তাঁদের প্রীতি উৎপাদন করে বিশ্বকর্তা ভগবান কৃষ্ণ তাঁদের নিজ নিজ গৃহে পুনর্বাসিত করলেন। শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীসংকর্ষণের বাহু দ্বারা পরিরক্ষিত এইসকল বংশের সদস্যেরা অনুভব করলেন যে, তাঁদের আকাঙ্ক্ষাগুলি পূর্ণ হয়েছে। এইভাবে তাঁদের পরিবার সহ গৃহে বাস করার সময়ে তাঁরা পূর্ণসুখ উপভোগ করলেন। কৃষ্ণ ও বলরামের উপস্থিতির ফলে তাঁরা কখনও জাগতিক সন্তাপ জ্বরে পীড়িত হননি। প্রতিদিনই এই সকল প্রেমময়ী ভক্তগণ মুকুন্দের সুন্দর কৃপাময় ঈষৎ হাস্য শোভিত চির আনন্দময় মুখপদ্ম দর্শন করতেন। নগরীর বৃদ্ধ অধিবাসীরাও তাঁদের দু’চোখ ভরে অবিরত ভগবান মুকুন্দের মুখপদ্ম সুধা পান করে বল ও ওজঃশালী তরুণভাব লাভ করেছিলেন। এরপর, হে রাজেন্দ্র পরীক্ষিৎ, দেবকীনন্দন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবলরামের সঙ্গে নন্দ মহারাজের কাছে গেলেন। ভগবানদ্বয় তাঁকে আলিঙ্গন করে, তাঁর উদ্দেশে বললেন- হে পিতা, আপনি ও জননী যশোদা স্নেহ দিয়ে আমাদের অনেক যত্নে লালন পালন করেছেন। বাস্তবিকই মাতা-পিতা তাঁদের নিজ জীবনের চেয়েও তাঁদের সন্তানকে বেশি ভালবাসেন। ভরণ-পোষণে অসমর্থ হয়ে আত্মীয়দের দ্বারা পরিত্যক্ত শিশুকে যাঁরা নিজের সন্তানের মতো প্রতিপালন করেন, তাঁরাই প্রকৃত পিতা-মাতা। হে পিতা, এখন আপনাদের সকলের ব্রজে ফিরে যাওয়া উচিত। আপনার সুহৃদবর্গের কিছু সুখ বিধান করার পর যত শ্রীঘ্র সম্ভব আমাদের বিচ্ছেদে উদ্বিগ্ন আমাদের আত্মীয়বর্গ, আপনাদের দর্শন করতে আমরা আসব। এইভাবে নন্দ মহারাজ ও ব্রজের অন্যান্য মানুষদের সান্ত্বনা প্রদান করে পরমেশ্বর ভগবান অচ্যুত তাঁদের বস্ত্র, অলঙ্কার, গৃহস্থালী বাসনপত্রাদি উপহার প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত করলেন। কৃষ্ণের বাক্যসমূহ শ্রবণ করে নন্দ মহারাজ স্নেহে অভিভূত হয়ে উঠলেন আর ভগবানদ্বয়কে আলিঙ্গন করার সময় তাঁর নেত্রদ্বয় অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠল। অতঃপর গোপগণ সহ তিনি ব্রজে প্রত্যাবর্তন করলেন।”
“হে রাজন্, তখন শূরসেনের পুত্র বসুদেব, একজন পুরোহিত ও অন্যান্য ব্রাহ্মণদের দ্বারা তাঁর দুই পুত্রের উপনয়ন সংস্কার সম্পাদনের আয়োজন করলেন। সেই সকল ব্রাহ্মণদের, সুন্দর অলঙ্কার ও সুন্দর অলঙ্কারে বিভূষিত বৎসসহ গাভীদের প্রদান ও পূজা করার মাধ্যমে বসুদেব তাদের সম্মান প্রদর্শন করলেন। এই সমস্ত গাভীরা সোনার কন্ঠহার এবং রেশমী বস্ত্র পরিধান করেছিল। কৃষ্ণ ও বলরামের জন্ম উপলক্ষ্যে মহামতি বসুদেব মনে মনে যে গাভীদের প্রদান করেছিলেন, কংস সেই সমস্ত গাভী অন্যায়ভাবে হরণ করেছিল। সেই কথা স্মরণ করে বসুদেব এখন তাদের উদ্ধার করে দান করলেন। সংস্কারের মাধ্যমে দ্বিজত্ব প্রাপ্ত হবার পর, ঐকান্তিক ব্রতধারী ভগবানদ্বয়, যদুকুলাচার্য গর্গমুনির কাছ থেকে ব্রহ্মচর্যের ব্রত গ্রহণ করলেন।”
“সকল জ্ঞানের উৎস-স্বরূপ সেই সর্বজ্ঞ জগদীশ্বরদ্বয় মনুষ্যোচিত আচরণের দ্বারা তাঁদের সহজাত পূর্ণজ্ঞান গোপন করে এরপর গুরুকুলে বাসের আকাঙ্ক্ষা করে অবন্তীপুরবাসী, কাশীদেশজাত, সান্দীপনি মুনির কাছে গমন করলেন। অত্যন্ত আকস্মিকভাবে প্রাপ্ত এই দুই আত্ম-সংযমী শিষ্য সম্পর্কে সান্দীপনি মুনি অত্যন্ত উচ্চ-ভাব পোষণ করতেন। স্বয়ং ভগবানকে ভক্তিসহকারে সেবা করার মতো গুরুদেবের সেবা করে, গুরুদেবকে কিভাবে সেবা করতে হয়, এই বিষয়ে তাঁরা অন্যদের কাছে অনিন্দনীয় দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করলেন। সেই দ্বিজবর গুরু সান্দীপনি তাঁদের অনুগত আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের সমগ্র বেদ, বেদাঙ্গ ও উপনিষদ সমূহ উপদেশ প্রদান করলেন। তিনি তাঁদের অত্যন্ত গূঢ় অংশ সহ ধনুর্বেদ, ধর্মশাস্ত্র, মীমাংসা প্রণালী, দর্শনগত তর্কবিদ্যা ও ছয় প্রকার রাজনীতিরও শিক্ষা প্রদান করলেন। হে রাজন, সেই পুরুষ শ্রেষ্ঠ কৃষ্ণ ও বলরাম তাঁরা স্বয়ং সকল জ্ঞানের আদি উদ্গাতা হওয়ায় প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখ্যা একবার মাত্র শ্রবণ করে তৎক্ষণাৎ সেই বিষয়সমূহ আয়ত্ত করছিলেন। এইভাবে চৌষট্টি অহোরাত্র তাঁরা একাগ্রচিত্তে চৌষট্টি প্রকার কলা-বিদ্যা শিক্ষা করলেন। এরপর হে রাজন, তাঁদের গুরুদেবকে গুরু-দক্ষিণা নিবেদনের দ্বারা তাঁরা সন্তুষ্ট করলেন। হে রাজন, সেই ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সান্দীপনি ভগবানদ্বয়ের মহিমা ও অদ্ভুত গুণাবলী এবং তাঁদের অতি-মানবীয় বুদ্ধি-মত্তা বিবেচনা করলেন। তারপর তাঁর পত্নীর সঙ্গে পরামর্শ করে তাঁর দক্ষিণা স্বরূপ প্রভাস সমুদ্রে মৃত তাঁর নিজ পুত্রকে ফিরে পেতে মনস্থ করলেন। সেই দুই অসীম পরাক্রমশালী মহারথী ‘তথাস্তু’ উত্তর প্রদান করে তৎক্ষণাৎ তাঁদের রথে আরোহণ করে প্রভাসের উদ্দেশে গমন করলেন। তাঁরা যখন সেই স্থানে উপস্থিত হলেন তখন তারা সমুদ্রতটে বিচরণ করে উপবেশন করলেন। সমুদ্র-বিগ্রহ তৎক্ষণাৎ তাঁদের পরমেশ্বর ভগবান বলে চিনতে পেরে শ্রদ্ধার্ঘাদি সঙ্গে নিয়ে তাঁদের কাছে এল।”
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সমুদ্রের অধিপতির উদ্দেশ্যে বললেন- “যাকে তুমি তোমার মহাতরঙ্গ দ্বারা অপহরণ করেছ, আমার গুরুর সেই পুত্রকে এখনি উপস্থাপিত কর।”
সমুদ্র উত্তর দিল- “হে ভগবান কৃষ্ণ, আমি তাকে অহরণ করিনি, একটি শঙ্খের রূপ ধারণকারী পঞ্চজন নামে দিতির বংশের এক জলচারী দৈত্য তাঁকে অপহরণ করেছে। নিশ্চয়ই সমুদ্র বলল, সেই দৈত্য তাকে অপহরণ করেছে। এই কথা শ্রবণ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সমুদ্রে প্রবেশ করে পঞ্চজনকে পেয়ে তাকে বধ করলেন। কিন্তু দৈত্যের উদরের মধ্যে বালকটিকে ভগবান পেলেন না। ভগবান জনার্দন দৈত্যের দেহ মধ্যে জাত শঙ্খ গ্রহণ করে রথে ফিরে এলেন। তারপর তিনি মৃত্যুদেব যমরাজের প্রিয় রাজধানী সংযমনীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। শ্রীবলরাম সহ সেখানে উপস্থিত হয়ে তিনি তাঁর শঙ্খে জোরে ফুৎকার করলেন এবং যমরাজ, যিনি বদ্ধজীবকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তিনি সেই তরঙ্গায়িত ধ্বনি শ্রবণ করা মাত্রই আগমন করলেন। যমরাজ, বিস্তৃতভাবে অত্যন্ত ভক্তিসহকারে সেই দুই ভগবানকে পূজা করলেন এবং তারপর তিনি সর্বভূতের হৃদয়ে বিরাজমান ভগবান কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে বললেন- হে ভগবান বিষ্ণু, সাধারণ মনুষ্যরূপে ক্রীড়ারত আপনার ও শ্রীবলরামের জন্য আমি কি করতে পারি?”
পরমেশ্বর ভগবান বললেন- “পূর্ব কর্মের দাসত্ব-বন্ধন ভোগ করার জন্য আমার গুরুদেবের পুত্রকে এখানে তোমার কাছে আনা হয়েছে। হে মহারাজ, আমার আদেশ পালন কর এবং অনতিবিলম্বে সেই বালককে আমার কাছে নিয়ে এস।”
যমরাজ বললেন, “ ‘তথাস্তু’, এবং গুরুর পুত্রকে নিয়ে এলেন। তখন সেই দুই পরম উন্নত যদু তাঁদের গুরুদেবের কাছে সেই বালককে উপস্থিত করলেন এবং তাঁকে বললেন, “দয়া করে অন্য আর একটি বর নির্বাচন করুন।”
গুরুদেব বললেন- “হে বৎস, তোমরা দুজনে গুরুদেবের প্রতি শিষ্যের কৃতজ্ঞতাজনিত দক্ষিণা প্রদান সম্পূর্ণ করেছ। বস্তুত তোমাদের মতো শিষ্য যার, সেই গুরুর আর কি আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে? হে বীরদ্বয়, এখন গৃহে প্রত্যাবর্তন কর। তোমাদের কীর্তি পৃথিবীকে পবিত্র করুক এবং ইহ জন্মে ও পর জন্মে তোমাদের হৃদয়ে বৈদিক মন্ত্র সকল চির নতুন থাকুক। এইভাবে প্রত্যাবর্তনের জন্য গুরুর অনুমতি লাভ করে ভগবানদ্বয় তাঁদের মেঘগম্ভীর ধ্বনি সদৃশ ও বায়ুবেগ তুল্য রথে আরোহণ করে তাঁদের নগরীতে প্রত্যাবর্তন করলেন। বহুদিন অদর্শনের পর কৃষ্ণ ও বলরামকে দর্শন করার ফলে সকল নাগরিক আনন্দিত হল। নষ্ট সম্পদ পুনরায় লাভ করার পর যেরকম অনুভব হয়, জনগণ ঠিক তেমনই অনুভব করেছিল।”
পঞ্চচত্বারিংশ অধ্যায়- শ্রীকৃষ্ণ তাঁর গুরুপুত্রকে উদ্ধার করলেন
28 Sep 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়