অষ্টচত্বারিংশ অধ্যায়- শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের তুষ্ট করেন

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তারপর, উদ্ধবের সংবাদ অবগত হওয়ার পর, পরমেশ্বর ভগবান, সর্বদর্শী সর্বাত্মা, কাম দ্বারা সন্তপ্ত ত্রিবক্রা দাসীকে সন্তুষ্ট করতে ইচ্ছা করলেন। তাই তিনি তাঁর গৃহে গমন করলেন। ত্রিবক্রার গৃহ বহুমূল্য গৃহোপকরণ এবং কাম বাসনা উদ্ধুদ্ধ করার সজ্জায় পরিপূর্ণ ছিল। সেখানে ছিল পতাকা, সার সার মুক্তার মালা, চন্দ্রাপত, সুন্দর শয্যা, উপবেশন স্থান এবং সেই সঙ্গে সুগন্ধি ধুপ, দীপ, ফুলের মালা ও সুগন্ধি চন্দন অনুলেপ। ত্রিবক্রা যখন তাঁকে তাঁর গৃহে সমাগত দর্শন করলেন, তৎক্ষণাৎ তাঁর আসন হতে সসম্ভ্রমে উঠে পড়লেন। তাঁর সখীদের নিয়ে অগ্রসর হয়ে তিনি ভগবান অচ্যুতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে একটি উত্তম আসন ও অন্যান্য পূজার সামগ্রী নিবেদন করে অর্চনা করলেন। উদ্ধবও একটি সম্মানের আসন পেয়েছিলেন, যেহেতু তিনি ছিলেন একজন সাধুপুরুষ তাই তিনি কেবলমাত্র তা স্পর্শ করে ভূমিতে আসন গ্রহণ করলেন। তখন ভগবান কৃষ্ণ, মানব সমাজের আচারসমূহ অনুকরণ করে, শ্রীঘ্রই একটি বহুমূল্য শয্যায় নিজেকে সুখাসীন করলেন। ত্রিবক্রা স্নান করে, দেহ গন্ধ অনুলেপন ও সুন্দর বস্ত্র পরিধান করে, অলঙ্কার, মালা ও সুগন্ধি ধারণ করে, এবং তাম্বুল চর্বণ, সুগন্ধি পানীয় গ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করলেন। তারপর তিনি ভগবান মাধবের দিকে সলজ্জ হাস্যবিলাস ও কটাক্ষ সমন্বিত ভাব সহকারে অগ্রসর হলেন। এই নব সংস্পর্শের সম্ভাবনাজনিত লজ্জা ও শঙ্কাযুক্ত তাঁকে ভগবান তাঁর কঙ্কণশোভিত হাত দুটি ধরে শয্যায় আকর্ষণ করলেন। এইভাবে তিনি সেই সুন্দরী কন্যার সঙ্গে আনন্দ উপভোগ করলেন- যে-কন্যা কেবলমাত্র ভগবানকে অনুলেপন অর্পণ করেই লেশমাত্র পুণ্য সঞ্চয় করেছিল। কেবলমাত্র কৃষ্ণের পাদপদ্মের ঘ্রাণ গ্রহণ করে ত্রিবক্রা তাঁর স্তনদ্বয়, বক্ষ ও নয়নযুগলের উদ্যত কামপীড়া দূরীভূত করেছিল। তাঁর দুই বাহু দ্বারা তাঁর দুই স্তনের মধ্যে তাঁর প্রিয়তম, আনন্দমূর্তিস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণকে আলিঙ্গন করলেন এবং এইভাবে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সন্তাপ তিনি পরিত্যাগ করেছিলেন। দুর্লভ ভগবানকে সামান্য অঙ্গরাগ অর্পণের মাধ্যমে লাভ করেও দুর্ভাগা ত্রিবক্রা সেই কৈবল্যনাথের কাছে নিম্নোক্ত প্রার্থনাই নিবেদন করেছিলেন- “হে প্রিয়তম, দয়া করে এখানে আমার সঙ্গে কিছুদিন অবস্থান করুন এবং আনন্দ উপভোগ করুন। হে কমলনয়ণ, আমি আপনার সঙ্গ পরিত্যাগ করা সহ্য করতে পারব না। তাঁকে এই কামনাময় আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রতিশ্রুতি দান করে, সুবিবেচক সর্বেশ্বর কৃষ্ণ ত্রিবক্রাকে তাঁর সম্মান জ্ঞাপন করলেন এবং তারপর উদ্ধবসহ তাঁর পরম ঐশ্বর্যপূর্ণ আপন আলয়ে প্রত্যাবর্তন করলেন। ঈশ্বরগণের পরম ঈশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সমীপবর্তী হওয়া সাধারণত কঠিন। যে তাঁকে যথাযথভাবে অর্চন করে অবশেষে জড়জাগতিক ইন্দ্রিয়ের তুষ্টির জন্য বর পছন্দ করে, সে অবশ্যই হীনবুদ্ধিসম্পন্ন, কারণ সে একটি তুচ্ছ ফল লাভেই সন্তুষ্ট থাকে।”
“অতঃপর, ভগবান কৃষ্ণ, কিছু কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে বলরাম ও উদ্ধব সহ অক্রূরের গৃহে গমন করলেন। ভগবান, অক্রূরের প্রীতি সাধনের আকাঙ্ক্ষাও করেছিলেন। অক্রূর যখন তাঁদের, তাঁর আপন বান্ধব ও পরম উন্নত ব্যক্তিত্বদের দূর থেকে আসতে দেখলেন, তখন তিনি মহানন্দে উত্থিত হলেন। তাঁদের আলিঙ্গন ও অভিনন্দিত করে, অক্রূর কৃষ্ণ ও বলরামকে প্রণতি নিবেদন করলেন এবং প্রত্যুত্তরে তাঁদের দ্বারাও অভিনন্দিত হলেন। তারপর, তাঁর অতিথিগণ আসন গ্রহণ করলে, শাস্ত্র বিধি অনুসারে তিনি তাদের অর্চনা করলেন। হে রাজন, অক্রূর শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীবলরামের পাদ-প্রক্ষালন করলেন এবং তারপর সেই স্নাত জল তাঁর নিজ মস্তকে ঢাললেন। তিনি তাদের উত্তম বস্ত্র, সুগন্ধি চন্দন পিষ্টক, পুষ্পমাল্য এবং অপূর্ব অলঙ্কার যুক্ত উপহার প্রদান করলেন। এইভাবে সেই দুই ভগবানকে অর্চনা করার পর, তিনি ভূমিতে তাঁর মস্তক অবনত করলেন। এরপর তিনি তাঁর ক্রোড়ে শ্রীকৃষ্ণের পাদদ্বয় স্থাপন করে মর্দন করতে লাগলেন এবং বিনয়ের সঙ্গে তাঁর মস্তক অবনত করে কৃষ্ণ ও বলরামের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন- এটি আমাদের সৌভাগ্য যে, আপনারা দুই ভগবান পাপী কংস ও তার অনুচরদের হত্যা করেছেন; এইভাবে আপনাদের কুলকে অন্তহীন কষ্ট থেকে উদ্ধার করেছেন এবং সমৃদ্ধ করেছেন। আপনারা উভয়েই পরম পুরুষোত্তম, জগৎ ও তার সৃষ্টিসমূহের কারণ। আপনাদের ছাড়া সামান্যতম কারণ বা সৃষ্টির প্রকাশিত পদার্থ অস্তিত্বহীন।”
“হে পরম ব্রাহ্মণ, আপনার আপন শক্তিসমূহ দ্বারা আপনি এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেন এবং তারপর সেখানে প্রবিষ্ট হন। এইভাবে শাস্ত্র হতে শ্রুত হয়ে বা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দ্বারা কেউ বহুবিধরূপে আপনাকে অনুধাবন করতে পারে। ঠিক যেমন সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদানগুলি- ভূমি প্রভৃতি- স্থাবর, জঙ্গমরূপ জীবনের সকল জীবের মধ্যে প্রভূত বৈচিত্র্যে নিজেদের প্রকাশিত করে, তেমনই আপনি, স্বতন্ত্র পরমাত্মা, আপনার সৃষ্টির বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে নানারূপে প্রকাশিত হন। সত্ত্ব, রজ, তমগুণ- আপনার স্বীয় শক্তিসমূহ দ্বারা আপনি এই জগতের সৃষ্টি, পালন ও বিনাশও করেন- তবুও আপনি সেই গুণসমূহ দ্বারা বা তাদের উৎপন্ন কার্যাবলীর দ্বারা কখনও আবদ্ধ হন না। যেহেতু আপনি সকল জ্ঞানের প্রকৃত উৎস, তাই কীসের কারণেই- বা আপনি মায়ার দ্বারা বদ্ধ হতে পারেন? যেহেতু কখনও যুক্তিসহকারে প্রমাণিত হয়নি যে, আপনি কোন জড়জাগতিক দেহরূপী নামে আচ্ছাদিত রয়েছেন, তাই অবশ্যই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে, আপনার ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থে কোন জন্মও নেই, স্বরূপতঃ জন্মভেদও নেই। সুতরাং আপনি কখনই বন্ধন বা মুক্তির অধীনস্থ হন না এবং আপনি তেমনভাবে প্রতিভাত হলেও, সেটি একান্তই আপনার অভিলাষের ফলে, অথবা নিতান্তই আমাদের বিচার বিবেচনার অভাবে, আমরা সেইভাবে আপনাকে দর্শন করে থাকি। সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের মঙ্গলের জন্য বেদের সুপ্রাচীন ধর্মীয় পথ আপনিই প্রথমে উদ্ভাসিত করেছেন। যখনই সেই পথ নিরীশ্বরবাদের পথ অনুসরণকারী অসৎ ব্যক্তিদের দ্বারা বাধা প্রাপ্ত হয়, তখনই আপনি অপ্রাকৃত শুদ্ধসত্ত্বে আপনার কোনও এক অবতাররূপ ধারণ করেন।”
“হে প্রভু, আপনিই সেই ভগবান, এখন বসুদেবের গৃহে আপনার অংশপ্রকাশসহ আবির্ভূত হয়েছেন। আপনি, দেবতাদের শত্রুদের স্বাংশপ্রকাশ রাজাদের নেতৃত্বাধীন শত শত সৈন্যদের হত্যা করে ভূ-ভার দূর করার জন্য এবং আমাদের বংশের যশ প্রচারের জন্যও, এখন অবতরণ করেছেন। হে প্রভু, আজ আমার গৃহ অত্যন্ত ধন্য হয়েছে, কারণ আপনি এখানে প্রবেশ করেছেন। পরম সত্যরূপে, আপনি পিতৃপুরুষ, জীব, মনুষ্য ও দেবতা-মূর্তি, এবং আপনার পাদধৌত জল ত্রিভুবনকে পবিত্র করছে। প্রকৃতপক্ষে, হে অধোক্ষজ আপনি জগদ্‌গুরু। আপনার ভক্তবন্দের প্রতি আপনি স্নেহপ্রবণ, কৃতজ্ঞ ও যথার্থ শুভানুধ্যায়ী, তাই, আপনাকে ছাড়া অন্য কার কাছে আশ্রয়ের জন্য কোনও পণ্ডিত ব্যক্তি যাবে? যাঁরা ঐকান্তিক সখ্যতায় আপনার অর্চনা করেন, আপনি তাঁদের কাঙ্ক্ষিত সমস্ত কিছুই, এমন কি আপনার আপন সত্তাকেও প্রদান করেন, যদিও আপনি কখনই বৃদ্ধি পান না বা হ্রাসও পান না। হে জনার্দন, আমাদের মহা সৌভাগ্যের দ্বারা এখন আপনি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছেন, কারণ যোগেশ্বরগণ এবং দেবেন্দ্রগণও অতি কষ্টের দ্বারা কেবল এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন। হে প্রভু, কৃপা করে আমাদের স্ত্রী-পুত্র, ধন, স্বজন ও গৃহ-দেহাদির মোহবন্ধন সত্বর ছেদন করুন। এই সকল আসক্তি আপনারই মায়াশক্তি জাত। এইভাবে তাঁর ভক্ত দ্বারা অর্চিত এবং সম্যক্‌ভাবে বন্দিত হয়ে, ভগবান শ্রীহরি তাঁর বাক্য দ্বারা সম্পূর্ণ মোহিত করে অক্রূরকে সহাস্যে বললেন- “আপনি আমাদের গুরু, পিতৃব্য ও প্রশংসনীয় বন্ধু, এবং আপনার পুত্রের মতোই আমরা সর্বদা আপনারা সুরক্ষা, পালন ও অনুকম্পার উপর নির্ভরশীল। আপনার মতো সুমহান মানুষেরাই প্রকৃত সেব্য এবং জীবনের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষীদের পরম পূজনীয়। সাধারণ দেবতারা তাঁদের আপন স্বার্থ সচেতন, কিন্তু সাধুসুলভ ভক্তেরা কখনও তেমন নন। কেউ অস্বীকার করতে পারে না যে, পবিত্র নদ-নদী সমন্বিত তীর্থস্থানগুলি রয়েছে, অথবা মৃত্তিকা ও শিলা নির্মিত বিগ্রহরূপে দেবতারা আবির্ভূত হন। কিন্তু এই সমস্তকিছুই কেবলমাত্র দীর্ঘকাল পরে আত্মাকে পবিত্র করে, অথচ সাধু ব্যক্তিদের কেবল দর্শন ফলে পবিত্র হওয়া যায়। আপনি অবশ্যই আমাদের সুহৃদগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, তাই দয়া করে হস্তিনাপুর গমন করুন এবং পাণ্ডবগণের শুভাকাঙ্ক্ষীরূপে, তাঁরা কেমন আছেন, অনুসন্ধান করুন। আমরা শুনেছি যে, তাঁদের পিতা যখন পরলোক গমন করলেন, তখন বাল্য বয়সে পাণ্ডবদের তাঁদের শোকগ্রস্তা মায়ের সঙ্গে রাজা ধৃতরাষ্ট্র রাজধানী নগরীতে এনেছেন এবং তাঁরা এখন সেখানে বাস করছেন। বাস্তবিকই, দুর্বল মনের অম্বিকাপুত্র ধৃতরাষ্ট্র তাঁর দুষ্ট পুত্রদের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়েছেন এবং তাই সেই অন্ধ রাজা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করছেন না। সেখানে গিয়ে দেখুন- ধৃতরাষ্ট্র যথাযথ আচরণ করছেন কি না। আমরা জানতে পারলে, আমাদের সুহৃদবর্গের সাহায্যের জন্য আমরা প্রয়োজনীয় আয়োজন করব। এইভাবে অক্রূরকে সম্পূর্ণ নির্দেশ প্রদান করে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি অতঃপর শ্রীসঙ্কর্ষণ ও উদ্ধবের সঙ্গে তাঁর গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন।”

Leave a Reply

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,942 hits