শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “পৌরব রাজগণের কীর্তি দ্বারা প্রসিদ্ধ নগরী হস্তিনাপুরে অক্রূর গমন করলেন। সেখানে তিনি ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, বিদুর এবং বাহ্লীক ও তাঁর পুত্র সোমদত্ত সহ কুন্তীকে দর্শন করলেন। তিনি দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, কর্ণ, দুর্যোধন, অশ্বত্থামা, পাণ্ডবগণ ও অন্যান্য ঘনিষ্ট সুহৃদগণকেও দর্শন করলেন। গান্দিনীনন্দন অক্রূর যথা নিয়মে তাঁর সকল আত্মীয় ও বন্ধুগণকে অভিনন্দিত করার পর, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সংবাদ তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন এবং তিনিও তাঁদের কুশল বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। দুষ্টকর্মা পুত্রাদির পিতা এবং খলধর্মী মানুষদের ইচ্ছাধীন দুর্বলমতি রাজার আচার-আচরণ বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে তিনি হস্তিনাপুরে কয়েকমাস থাকলেন। কুন্তী ও বিদুর অক্রূরকে সবিস্তারে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের অসৎ উদ্দেশ্যগুলি বর্ণনা করলেন- যারা কুন্তীপুত্রদের মহৎ গুণসমূহ- যেমন, তাদের দৃঢ় প্রভাব, সামরিক দক্ষতা, শারীরিক বল, সাহস ও বিনয়- অথবা তাদের জন্য প্রজাদের গভীর অনুরাগ- সহ্য করতে পারত না। কিভাবে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা পাণ্ডবদের বিষ প্রদানের চেষ্টা করেছিল এবং ঐ ধরনের অন্যান্য ষড়যন্ত্র করেছিল, কুন্তী ও বিদুর অক্রূরকে তাও বলেছিলেন। কুন্তীদেবী তাঁর ভ্রাতার আগমনের সুযোগ গ্রহণ করে, সঙ্গোপনে তাঁর কাছে উপস্থিত হলেন। তখন তাঁর জন্মস্থানকে স্মরণ করে, অশ্রুপূর্ণ নয়নে তিনি বললেন- হে সৌম্য, আমার পিতা-মাতা, ভ্রাতাগণ, ভগিনীগণ, ভ্রাতুষ্পুত্ররা, কুলস্ত্রীগণ ও সখীগণ আমাদের কি এখনও স্মরণ করেন? আমার ভ্রাতুষ্পুত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, যিনি তাঁর ভক্তগণের করুণাময় আশ্রয় স্বরূপ, তিনি এখনও তাঁর পিসীর পুত্রদের স্মরণ করেন কি? আর কমননয়ন বলরামও কি তাদের স্মরণ করেন? নেকড়েদের মাঝে এক হরিণীর মতো আমার শত্রুদের মধ্যে অমি যে যন্ত্রণা ভোগ করছি, এখন কৃষ্ণ আমাকে ও আমার পিতৃহীন পুত্রদের তাঁর বাক্য দ্বারা সান্ত্বনা প্রদানের জন্য আসবে কি? কৃষ্ণ, কৃষ্ণ! হে পরম যোগী! হে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পরমাত্মা ও রক্ষক! হে গোবিন্দ! দয়া করে আপনার শরণাগত আমাকে রক্ষা করুন। আমি এবং আমার পুত্ররা দুর্দশায় সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হচ্ছি। পুনর্জন্ম ও মৃত্যুতে ভীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য, আপনার মোক্ষপ্রদ পাদপদ্ম ব্যতীত আমি আর কোনও আশ্রয় দেখি না, কারণ আপনিই পরমেশ্বর ভগবান। পরম শুদ্ধ, পরম ব্রহ্ম ও পরমাত্মা, যোগেশ্বর ও সকল জ্ঞানের উৎস স্বরূপ হে কৃষ্ণ, আমি আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি। অপনার কাছে আশ্রয়ের জন্য আমি উপস্থিত হয়েছি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন, এইভাবে তাঁর পরিবারবর্গের ও জগদীশ্বর শ্রীকৃষ্ণের স্মরণে আপনার প্রপিতামহী কুন্তীদেবী শোকে কাঁদতে থাকলেন। যে অসাধারণ উপায়ে রানী কুন্তীর পুত্ররা জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই কথা তাঁকে স্মরণ করিযে দিয়ে, কুন্তীদেবীর সুখ ও দুঃখভাগী অক্রূর এবং মহাযশস্বী বিদুর দুজনেই তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন। রাজা ধৃতরাষ্ট্র তাঁর পুত্রদের প্রতি একান্ত স্নেহ অনুভব করার ফলে পাণ্ডবদের প্রতি অন্যায় আচরণ করতেন। অক্রূর বিদায়ের ঠিক আগে, যখন রাজা ধৃতরাষ্ট্র তাঁর বন্ধুবর্গ এবং সমর্থকদের নিয়ে বসেছিলেন, তখন তাঁর কাছে গিয়ে, শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীবলরাম তাঁর আত্মীয়স্বজনদের প্রতি সৌজন্যবশত যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, তা বর্ণনা করলেন।”
অক্রূর বললেন- “হে আমার প্রিয় বিচিত্রবীর্যের পুত্র, হে কুরুগণের কীর্তি বর্ধনকারী, আপনার ভ্রাতা পাণ্ডু পরলোক গমন করলে, আপনি এখন রাজ সিংহাসনে আরোহন করেছেন। ধর্মানুসারে পৃথিবীকে পালন, সৎ চরিত্র দ্বারা আপনার প্রজাগণের আনন্দ বিধান এবং সকল আত্মীয়বর্গের প্রতি সমভাবে আচরণ করার মাধ্যমে আপনি নিশ্চিতভাবে সাফল্য ও কীর্তি অর্জন করবেন। আপনি যদি এর অন্যথা করেন, তাহলে অবশ্যই এই জগতের মানুষ আপনাকে নিন্দা করবে এবং পরবর্তী জীবনে আপনি নরকের অন্ধকারে প্রবেশ করবেন। সুতরাং আপনার নিজের এবং পান্ডুর পুত্রগনের প্রতি সমদর্শী হউন।”
“হে রাজন, এই জগতে কারও সঙ্গে কারও চিরস্থায়ী সম্পর্ক নেই। এমন কি আমাদের দেহটিকে নিয়েও আমরা চিরদিন থাকতে পারি না, আমাদের স্ত্রী, পুত্র ও অন্যান্যদের কথা আর বলার কি আছে! প্রতিটি জীবই একাকী জন্মগ্রহণ করে আর একাকীই মৃত্যু বরণ করে, এবং মানুষ নিজেই তার সকল সৎ ও অসৎ কর্মের ফলাফল ভোগ করে। যে-জল মাছকে বাঁচিয়ে রাখে, সেই জলই যেমন মাছের সন্তানেরা পান করে, তেমনই অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও অধর্মের পথে যা কিছু অর্জন করে, সেই সমস্ত সম্পদই প্রিয় পোষ্যগণের ছদ্মরূপে নবাগতেরাই হরণ করে নেয়। মূর্খ মানুষ তার জীবন, সম্পদ, সন্তানাদি এবং অন্যান্য আত্মীস্বজন পালন করার জন্য পাপের প্রশ্রয় দেয়, কারণ সে মনে করে, “এই সমস্ত কিছুই আমার।” পরিশেষে, অবশ্য, সেই সবই তাকে হতাশ করে চলে যায়। আপাতদৃষ্ট পোষ্যদের কাছে পরিত্যক্ত হয়ে, জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য সম্পর্কে অজ্ঞ, যথার্থ কর্তব্যে বিমুখ, এবং উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ মূর্খ জীব তার পাপময় কর্মফলের বোঝা নিয়ে নরকের অন্ধকারে প্রবেশ করে। সুতরাং, হে রাজন, এই জগতকে স্বপ্ন, মায়া বা অস্থির হৃদয়ের কল্পনা জ্ঞান করে বুদ্ধির দ্বারা আপনার মনকে নিয়ন্ত্রণ করুন এং হে প্রভু, শান্ত ও সমদর্শী হউন।”
ধৃতরাষ্ট্র বললেন- “হে অক্রূর, আপনি যেভাবে মঙ্গলময় কথা বলছেন, মানুষ অমৃত লাভে যেমন কখনই তৃপ্তির সীমা অতিক্রম করতে পারে না, তেমনই আমিও আপনার কথায় সম্পূর্ণ তৃপ্তি লাভ করতে পারছি না। হে সৌম্য অক্রূর, আপনার এই সমস্ত সুমধুর বাক্য খুবই কল্যাণকর হলেও, মেঘের মধ্যে বিদ্যুৎ যেমন স্থির থাকতে পারে না, তেমনই পুত্রস্নেহবশত বিষমভাবাপন্ন আমার চঞ্চল হৃদয়ে এই সব উপদেশ স্থির হয়ে থাকতে পারে না। যিনি ভূভার হরণের জন্য এখন যদুকুলে অবতীর্ণ হয়েছেন, সেই পরমেশ্বর ভগবানের বিধান কে লঙ্ঘন করতে পারে? যিনি তাঁর অচিন্তনীয় মায়া শক্তির ক্রিয়ার মাধ্যমে এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন এবং পরে সেই সৃষ্টির মধ্যে প্রবেশ করে প্রকৃতির বিভিন্ন গুণাবলী বিতরণ করেন, সেই পরমেশ্বর ভগবানকে আমার প্রণাম নিবেদন করি। যাঁর লীলার অর্থ দুর্জ্ঞেয়, তাঁর কাছ থেকেই, জন্ম ও মৃত্যু চক্রের বন্ধন ও তা থেকে মুক্তির পন্থা, উভয়ই আমাদের লাভ হয়ে থাকে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে তিনি নিজে রাজার মনোভাব সম্বন্ধে জ্ঞাত হয়ে যাদব অক্রূর, তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী আত্মীয় ও স্বজনবর্গের কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ করে যাদবগণের রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করলেন। পাণ্ডবদের সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্র কিরকম আচরণ করেছিলেন শ্রীবলরাম ও শ্রীকৃষ্ণের নিকট অক্রূর তা বর্ণনা করলেন। হে কুরুবংশজ, যে উদ্দেশ্যে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল এইভাবে তিনি সেই উদ্দেশ্যে পূর্ণ করলেন।”
একোনপঞ্চাশ অধ্যায়- অক্রূরের হস্তিনাপুর গমন
28 Oct 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়