ত্রিচত্বারিংশ অধ্যায়- কুবলয়াপীড় বধ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে পরন্তপ, কৃষ্ণ ও বলরাম সকল প্রয়োজনীয় শৌচ সম্পাদন করে, মল্লক্ষেত্রের দুন্দুভি নির্ঘোষ শ্রবণ করে, কী হচ্ছে তা দর্শন করার জন্য সেখানে গমন করলেন। শ্রীকৃষ্ণ মল্লভূমির প্রবেশদ্বারে উপস্থিত হয়ে দেখলেন যে, মাহুতের প্ররোচনায় কুবলয়াপীড় নামক হস্তী তাঁর পথ রুদ্ধ করেছে। তাঁর পরিধেয় বস্ত্রকে দৃঢ়ভাবে বন্ধন করে এবং কুঞ্চিত অলকরাশিকে পশ্চাতে একত্রে আবদ্ধ করে শ্রীকৃষ্ণ মাহুতকে উদ্দেশ্য করে মেঘগম্ভীর বাক্যে বললেন- হে মাহুত, মাহুত, এখনই সরে যাও এবং আমাদের যেতে দাও! যদি তা না কর, আজই, আমি তোমাকে এবং তোমার হাতী, উভয়কেই যমালয়ে প্রেরণ করব। এইভাবে তিরস্কৃত হয়ে ক্রুদ্ধ মাহুত তার কালান্তক যমসদৃশ ক্ষুব্ধ হাতীকে শ্রীকৃষ্ণকে আক্রমণ করার জন্য পরিচালিত করল। সেই হস্তীরাজ কৃষ্ণের দিকে ধাবিত হয়ে ভয়ঙ্করভাবে তার শুঁড় দিয়ে তাঁকে ধারণ করল। কিন্তু কৃষ্ণ স্খলিত হয়ে তাকে আঘাত করে তার দৃষ্টির বাইরে তার পাগুলির মাঝে অন্তর্হিত হলেন। ভগবান কেশবকে দর্শনে অসমর্থ হয়ে ক্রুদ্ধ হাতীটি তার ঘ্রাণেন্দ্রিয় দ্বারা তাঁকে অন্বেষণ করতে লাগল। কুবলয়াপীড় ভগবানকে পুনরায় তার শুঁড় দিয়ে ধারণ করলে ভগবান নিজেকে বলপূর্বক মুক্ত করলেন। অতঃপর শ্রীকৃষ্ণ গরুড় যেমন সর্পকে আকর্ষন করে তেমনি শক্তিশালী কুবলয়াপীড়কে তার পুচ্ছ ধরে পঞ্চবিংশতি ধনুক-দৈর্ঘ্য পরিমাণ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলেন। ভগবান অচ্যুত যখন হস্তীটির পুচ্ছ ধারণ করলেন, তখন পশুটি তাঁকে ধরবার জন্য ডানদিকে ফিরলে শ্রীকৃষ্ণ তাকে বাম দিকে ঘোরালেন এবং যখন সে বাম দিকে ফিরল, কৃষ্ণ তাকে ডান দিকে ঘোরালেন। ঠিক যেমন কোন বালক কোন গোবৎসের পুচ্ছ ধরে তাকে আকর্ষণ করে নানাদিকে ফেরায়। কৃষ্ণ তখন হাতীটির মুখোমুখি হয়ে তাকে চাপড় মেরে ধাবিত হলেন। কুবলয়াপীড় ভগবানের পশ্চাতে ধাবিত হয়ে বার বার প্রতি পদক্ষেপে তাঁকে স্পর্শ করছিল, কিন্তু কৃষ্ণ কৌশলে তাকে হোঁচট খাইয়ে ভূতলে নিপাতিত করলেন। কৃষ্ণও সরে গিয়ে ক্রীড়াচ্ছলে ভূমিতে পতিত হয়েই সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লেন। কিন্তু ক্রোধোন্মত্ত হস্তী কৃষ্ণকে পতিত মনে করে তার দাঁত দিয়ে তাঁকে বিদ্ধ করতে চেষ্টা করল, কিন্তু তার পরিবর্তে সে ভূমিকে আঘাত করল। তার বিক্রম ব্যর্থ হওয়ায় সেই হস্তীরাজ কুবলয়াপীড় অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। মাহুত দ্বারা পরিচালিত হয়ে সে পুনরায় কৃষ্ণের দিকে ক্রুদ্ধভাবে ধাবিত হল। ভগবান মধুসূদন আক্রমণোদ্যত হস্তীর সম্মুখীন হলেন। এক হাতে তার শুঁড় ধারণ করে কৃষ্ণ তাকে ভূপাতিত করলেন। অতঃপর ভগবান শ্রীহরি শক্তিশালী সিংহের মতো সেই হাতিটিকে আক্রমণ করে তার একটি দাঁত উৎপাটন করে সেটি দিয়েই সেই পশু ও তার পালককে বধ করলেন। মৃত হাতীটিকে পরিত্যাগ করে শ্রীকৃষ্ণ হাতীর দাঁতটি ধারণ করে মল্ল-স্থলে প্রবেশ করলেন। তাঁর স্কন্ধে হাতীর দাঁতটি স্থাপিত, হাতীর রক্ত ও স্বেদবিন্দু সমূহ তাঁর সমস্ত শরীরে ছড়ানো এবং তাঁর পদ্ম-সদৃশ মুখমণ্ডলে আপন উদ্‌গত স্বেদবিন্দু, এরূপ পরম সৌন্দর্যে ভগবান তখন শোভিত ছিলেন।”
“হে রাজন, শ্রীবলদেব ও শ্রীজনার্দন প্রত্যেকেই একটি গজদন্ত রূপ অস্ত্র হাতে কতিপয় গোপবালক পরিবেষ্টিত হয়ে মল্লক্রীড়া স্থলে প্রবেশ করলেন। মল্লক্রীড়া স্থানে শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর অগ্রজ সহ প্রবেশ করলেন, তখন ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর মানুষের কাছে তিনি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হলেন। মল্লযোদ্ধাগণ তাঁকে বজ্রের মতো, মথুরার জনসাধারণ তাঁকে নরশ্রেষ্ঠ রূপে, রমণীগণ তাঁকে মূর্তিমান কামরূপে, গোপগণ তাঁকে স্বজন রূপে, অধার্মিক রাজারা তাঁকে দণ্ডদাতা রূপে, তাঁর পিতা-মাতা তাঁকে তাঁদের সন্তান রূপে, ভোজরাজ কংসের কাছে মৃত্যু রূপে, অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের কাছে ভগবানের বিরাট মূর্তি রূপে, যোগিগণের কাছে পরম ব্রহ্মরূপে এবং বৃষ্ণীগণ তাদের পরম পূর্জ্য বিগ্রহ রূপে তাঁকে দর্শন করল। হে রাজন, কুবলয়াপীড়কে মৃত এবং সেই দুইভাইকে অপরাজেয় দর্শন করে কংস অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়েছিল। বিচিত্র আভরণ, মালা ও বসনে সজ্জিত হয়ে ঠিক যেন মনোহর বেশধারী অবিনেতার মতো মহাবাহু শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীবলরাম মল্লক্রীড়াস্থলে দীপ্তিমান রূপে শোভিত রইলেন। প্রকৃতপক্ষে, তাঁদের প্রভায় দর্শক মাত্রেরই চিত্ত বিক্ষিপ্ত হয়েছিল। হে রাজন, নগরবাসী ও জনপদবাসীগণ দর্শক মঞ্চ হতে সেই দুই পরম-পুরুষদ্বয়কে অপলক নয়নে দর্শন করছিল। অনন্দোচ্ছ্বাসে বিস্ফারিত নয়নে ও উৎফুল্ল বদনে তারা তৃপ্তিহীন ভাবে ভগবানদ্বয়ের মুখসুধা পান করছিল। জনসাধারণ তাদের নয়ন দিয়ে যেন কৃষ্ণ ও বলরামকে পান করছিল, তাদের জিহ্বা দিয়ে তাঁদের লেহন করছিল, নাসিকা দিয়ে তাঁদের ঘ্রাণ গ্রহণ করছিল এবং দুই বাহু দিয়ে তাঁদের আলিঙ্গন করছিল। ভগবানদ্বয়ের রূপ, গুণ, মাধুর্য ও বীরত্ব সমূহ স্মরণ করে, তারা যা দর্শন করেছিল এবং তারা যা শ্রবণ করেছিল, সেইসব একে অপরকে বর্ণনা করছিল- এই দুই বালক নিশ্চয়ই ভগবান নারায়ণের অংশপ্রকাশ রূপে এই জগতে বসুদেবের গৃহে অবতীর্ণ হয়েছেন। ইনি (কৃষ্ণ) মাতা দেবকীর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে গোকুলে আনয়ন করা হয়, যেখানে এতাবৎকাল তিনি গুপ্তভাবে অবস্থান করে নন্দ-মহারাজের গৃহে বর্ধিত হচ্ছিলেন। তিনি পূতনা ও তৃণাবর্ত দানবকে সংহার করেছেন, যমলার্জুন বৃক্ষ দুটিতে ভূপাতিত করেছেন এবং শঙ্খচূড়, কেশী, ধেনুক ও অন্যান্য অসুরদের বধ করেছেন। তিনি দাবানল হতে গো ও গোপগণকে রক্ষা করেছেন এবং কালিয় নাগকে দমন করেছেন। তিনি সপ্তাহকাল এক হাতে পর্বত-প্রধানকে ধারণ করে ঝঞ্ঝা, বর্ষ ও বজ্রপাত হতে গোকুলের অধিবাসীগণকে রক্ষা করে ইন্দ্রের অহঙ্কার দূর করেছেন। গোপীগণ তাঁর চিরপ্রফুল্ল হাস্য ও কটাক্ষযুক্ত মুখমণ্ডল অবলোকন করে অক্লেশে সকল সন্তাপ অতিক্রম করে পরমানন্দ প্রাপ্ত হন। বলা হয় যে, তাঁর পূর্ণ সুরক্ষাধীনে যদুবংশ অতি বিখ্যাত হয়ে শ্রী, যশ ও মহত্ত্ব লাভ করবে। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা এই কমলনয়ন শ্রীবলরাম সকল অপ্রাকৃত ঐশ্বর্যের অধিকারী। তিনি প্রলম্ব, বৎস, বক প্রভৃতি অসুরকে বধ করেছেন।”
“জনসাধারণ যখন এইভাবে কথা বলছিল এবং বাদ্যযন্ত্রাদি বাজানো হচ্ছিল, তখন কৃষ্ণ ও বলরামকে উদ্দেশ্যে করে মল্লযোদ্ধা চাণূর এই কথাগুলি বলতে লাগল- হে নন্দপুত্র, হে রাম, তোমরা দুজনে বীরগণ দ্বারা মল্লযুদ্ধে সুনিপুণ বলে সম্মানিত। তোমাদের শক্তির কথা শ্রবণ করে রাজা স্বয়ং তা দর্শন করতে চেয়ে এখানে তোমাদের আহ্বান করেছেন। প্রজাগণ, যারা তাদের মনন, কর্ম ও বাক্যের দ্বারা রাজার আনন্দ বিধানের চেষ্টা করে, তারা নিশ্চিতরূপে মঙ্গল লাভ করে, কিন্তু যারা তা করতে ব্যর্থ, তারা বিপরীত ফল ভোগ করে। এটা সর্বজ্ঞাত যে, গোপবালকেরা সর্বদা আনন্দিত ভাবে তাদের গোবৎস পালন করে এবং বিভিন্ন বনে যখন তাদের পশুরা চারণ করে, তখন বালকেরা ক্রীড়াচ্ছলে একে অপরের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করে। সুতরাং রাজা যা চাইছেন তা করা যাক। যেহেতু রাজাই সর্বভূত স্বরূপ, তাই প্রত্যেকেই আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবে। এই কথা শ্রবণ করে মল্লযুদ্ধে লড়তে ইচ্ছুক শ্রীকৃষ্ণ স্থান ও কালের উপযুক্ত বাক্যে উত্তর প্রদান করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে স্বাগত জানালেন। বনবাসী হলেও আমরা ভোজ রাজারই প্রজা। আমরা অবশ্যই তার আকাঙ্ক্ষা সন্তুষ্ট করব, কারণ তা আমাদের জন্য পরম অনুগ্রহ স্বরূপ। আমরা বালক মাত্র এবং সমশক্তি সম্পন্নদের সঙ্গেই ক্রীড়া করা উচিত। মল্লযুদ্ধের ক্রীড়া ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিত যাতে মাননীয় দর্শকবৃন্দে অধর্ম স্পর্শ না করে।”
চাণূর বলল- “মহাবলশালী তুমি ও বলরাম শিশুও নও অথবা এমন কি কিশোরও নও। শেষ পর্যন্ত সহস্র হস্তীর বল সম এক হস্তীকে তুমি ক্রীড়াচ্ছলে বধ করেছ। অতএব তোমাদের দুজনেরই উচিত বলশালী যোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা। হে বৃষ্ণিবংশজ, যদি তুমি আমার বিরুদ্ধে তোমার শক্তির প্রদর্শন কর এবং বলরাম মুষ্টিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, সেখানে অবশ্যই কোন অধর্ম হবে না।”

Leave a Reply

September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

Blog Stats

  • 140,942 hits