শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- পরম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন উদ্ধব ছিলেন বৃষ্ণিবংশের শ্রেষ্ঠ পরামর্শদাতা, ভগবান কৃষ্ণের প্রিয় সখা এবং বৃহস্পতির সাক্ষাৎ শিষ্য। ভগবান হরি, যিনি তাঁর সকল শরণাগতজনের দুঃখ দূর করেন, তিনি একবার তাঁর পূর্ণভক্ত ও প্রিয়তম বন্ধু উদ্ধবের হাত ধারণ করে তাঁকে বলতে লাগলেন- হে সৌম্য উদ্ধব, ব্রজে গমন করে আমাদের পিতা-মাতাকে আনন্দ প্রদান কর, এবং আমার বিরহে কাতর গোপীগণকেও আমার বার্তা প্রদান করে তাদের মনস্তাপ নিরসন কর। এই সকল গোপীগণের মন সর্বদা আমাতে মগ্ন এবং তাদের জীবন আমাতে চির-উসর্গীকৃত। আমার জন্য তাদের এই জীবনে দৈহিক, ঐহিক সকল সুখই, এমনকি পরবর্তী জীবনে এরূপ সুখ লাভ করার জন্য প্রয়োজনীয় ধর্মীয় কর্তব্যও তারা পরিত্যাগ করেছে। আমিই একমাত্র তাদের প্রিয়তম প্রিয় এবং নিঃসন্দেহে তাদের প্রাণস্বরূপ। সুতরাং সকল অবস্থায় তাদের ভরণ পোষণের ভার আমিই গ্রহণ করি। হে প্রিয় উদ্ধব গোকুলের এই রমণীগণের কাছে আমি পরম প্রেমাস্পদ। তাই তাঁরা যখন দূরে অবস্থিত আমাকে স্মরণ করে, তখন বিরহের উৎকন্ঠায় তাঁরা বিহ্বল হয়ে ওঠে। কেবলমাত্র আমি তাদের কাছে প্রত্যাগমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম বলেই, আমার প্রতি পূর্ণরূপে উৎসর্গীকৃত গোপীগণ কোনরকমে তাদের জীবন ধারণ করার জন্য সংগ্রাম করছে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, ভগবান এইভাবে বললে উদ্ধব সাদরে তাঁর প্রভুর বার্তা গ্রহণ করে তাঁর রথে আরোহণ করলেন এবং নন্দ মহারাজের গোকুলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। ঠিক যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, ভাগ্যবান উদ্ধব তখন নন্দ মহারাজের গোষ্ঠে পৌছলেন এবং গবাদি পশুদের প্রত্যাগমনে তাদের খুরের উত্থিত ধুলিতে, তাঁর রথ অলক্ষ্যে অতিক্রান্ত হয়েছিল। ঋতুমতী গাভীদের জন্য বৃষগুলির পারস্পারিক লড়াইয়ের শব্দে, নিজ নিজ বৎসদের পেছনে স্তনভারে ধাবমান গাভীদের হাম্বা রবে, শুভ্র বৎসদের ইতস্তত লম্ফপ্রদান ও গো-দোহনের শব্দে, তাদের অপূর্ব অলঙ্কৃত আভরণে গ্রামখানি যারা সুশোভিত করেছিল, সেই গোপ ও গোপীগণের কৃষ্ণ ও বলরামের পবিত্র কীর্তিগান সহ বেণুবাদনের উচ্চ নিনাদে, গোকুলের চতুর্দিক অনুরণিত হচ্ছিল। গোকুলে গোপগণের গৃহগুলি অগ্নি, সূর্য, অতিথি, গাভী, বিপ্র, পূর্বপুরুষ ও দেবতার পূজার উপচারের প্রাচুর্যে অত্যন্ত মনোরম ছিল। চতুর্দিকের পুষ্পিত বন পাখির দল ও ভ্রমরকুল দ্বারা নিনাদিত এবং হ্রদসমূহ হংস, কারণ্ডব হাঁস ও পদ্মে সুশোভিত ছিল। উদ্ধব নন্দ মহারাজের গৃহে পৌঁছানো মাত্র, নন্দ তাঁর সঙ্গে মিলিত হবার জন্য অগ্রসর হলেন। গোপরাজ প্রীতিভরে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন এবং তাঁকে অভিন্ন ভগবান বাসুদেব-জ্ঞানে অর্চনা করলেন। উদ্ধবকে উৎকৃষ্ট অন্ন ভোজন করিয়ে শয্যায় সুখাসীন করে এবং পাদমর্দনাদি দ্বারা তাঁর শ্রম দূর করার পর নন্দ তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন- হে প্রিয় মহানুভব, এখন রাজা শূরের পুত্র বসুদেব বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে তাঁর সন্তানাদি এবং স্বজনবর্গের সাথে পুনর্মিলিত হয়ে ভাল আছেন তো? সৌভাগ্যক্রমে তার স্বীয় পাপের জন্য, পাপাত্মা কংস, তাঁর সকল ভ্রাতাসহ নিহত হয়েছে। সকল সময়েই সাধু ও ধর্মশীল যদুগণের প্রতি সে বিদ্বেষপরায়ণ ছিল। কৃষ্ণ কি আমাদের স্মরণ করেন? তিনি কি তাঁর মাতা, তাঁর সখা ও সুহৃদবৃন্দকে স্মরণ করেন? স্বয়ং তিনি যার নাথ সেই ব্রজমণ্ডল ও তার গোপগণকে তিনি কি স্মরণ করেন? তিনি কি গাভীদের, বৃন্দাবন অরণ্য এবং গিরি গোবর্ধনকে স্মরণ করেন? তাঁর আত্মীয়স্বজনকে দর্শন করার জন্য গোবিন্দ কি একবারের জন্যও ফিরে আসবেন? যদি তিনি কখনও তা করেন, আমরা তখন তাঁর মনোরম নয়ন যুগল, নাসিকা ও হাস্য সমন্বিত সুন্দর মুখমণ্ডল দর্শন করতে পারব। আমরা দাবানল, প্রবল বায়ু ও বর্ষন, বৃষ ও সর্প দানবসমূহ- এরকম সকল অনতিক্রম্য মৃত্যুভয় থেকে- সেই পরম মহাত্মা কৃষ্ণের দ্বারা সুরক্ষিত হয়েছিলাম। আমরা যখন কৃষ্ণের অপূর্ব কর্মকাণ্ড, তাঁর কটাক্ষপাত, তাঁর হাসি এবং তাঁর বাক্য স্মরণ করি, হে উদ্ধব, তখন আমাদের সকল জড় বন্ধন বিস্মৃত হই। যেখানে মুকুন্দ তাঁর ক্রীড়া-লীলা উপভোগ করেছিলেন, তাঁর পদচিহ্নশোভিত সেই নদী, পর্বত এবং অরণ্যানী আমরা যখন দর্শন করি, তখন আমাদের মন সম্পূর্ণরূপে তাঁর চন্তিায় মগ্ন হয়ে ওঠে। আমার মতে, কৃষ্ণ ও বলরাম নিশ্চয়ই দুই উন্নত দেবতা হবেন, যারা দেবতাদের কোন মহৎ ব্রত পূর্ণ করার জন্য এই গ্রহে এসেছেন। গর্গ ঋষির দ্বারাও এমনই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দশ সহস্র হস্তীর মতো বলশালী কংসকে, সেই মঞ্চে মল্লযোদ্ধা চাণূর ও মুষ্টিককে, এবং কুবলয়াপীড় হস্তীকে কৃষ্ণ ও বলরাম হত্যা করেছিলেন। সিংহ যেমন সহজেই ক্ষুদ্র প্রাণীদের হত্যা করে, তাঁরাও তেমনি অবলীলাক্রমে তাদের হত্যা করেছিলেন। গজরাজ যেমন একটি যষ্ঠিকে সহজেই ভঙ্গ করে, কৃষ্ণও তিনটি তাল গাছের মতো দীর্ঘ বিশাল, সুদৃঢ় ধনুক ভঙ্গ করেছিলেন। তিনি কেবলমাত্র এক হাতে একটি পর্বত সাত দিন ধারণ করেছিলেন। এখানে বৃন্দাবনে কৃষ্ণ ও বলরাম অনায়াসেই প্রলম্ব, ধেনুক, অরিষ্ট, তৃণাবর্ত এবং বকের মতো সুরাসুর বিজয়ী অসুরদের সংহার করেছিলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- এই ভাবে গভীরভাবে কৃষ্ণকে বারংবার স্মরণ করতে করতে তাঁর মন সম্পূর্ণরূপে ভগবানের প্রতি অনুরক্ত হলে, নন্দ মহারাজ অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত বোধ করায় মৌন হয়ে তাঁর প্রেমের শক্তি দ্বরা সেই উৎকন্ঠা জয় করলেন। তাঁর পুত্রের চরিত্রাবলীর বর্ণনা শ্রবণ করা মাত্র মা যশোদা অশ্রু বর্ষণ করতে লাগলেন এবং স্নেহবশতঃ তাঁর স্তনদ্বয় হতে দুগ্ধ ক্ষরিত হতে থাকল। পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্য অনুভূত নন্দ ও যশোদার পরম অনুরাগ সুস্পষ্টভাবে দর্শন করে উদ্ধব সানন্দে নন্দ মহারাজকে বললেন- “হে শ্রদ্ধেয় নন্দ, সমগ্র জগতের মধ্যে আপনি ও মা যশোদা নিশ্চিতভাবে পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, কারণ সকল জীবের গুরুদেব স্বরূপ ভগবান নারায়ণের প্রতি আপনারা এমন প্রেমময়ী মনোভাবের বিকাশ ঘটিয়েছেন। মুকুন্দ ও বলরাম, এই দুই ভগবান, প্রত্যেকেই বিশ্বের বীজ ও গর্ভ স্বরূপ, স্রষ্ট ও তাঁর সৃষ্টি-শক্তি। তাঁরা জীবের হৃদয়ে প্রবিষ্ট হয়ে তাদের বদ্ধ চেতনা নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁরা পরম পুরাণ-পুরুষ। অবিশুদ্ধ স্তরের কোনও ব্যক্তিও, যদি প্রয়াণকালে তার মনকে কেবল এক মুহূর্তের জন্যও তাঁর প্রতি নিবিষ্ট করে, তবে সে তৎক্ষণাৎ সকল পাপ কর্মফলের সকল চিহ্ন দগ্ধ করে সূর্যসম দ্যুতিময় শুদ্ধ চিন্ময় স্বরূপে পরম অপ্রাকৃত গতি লাভ করে। আপনারা দুজনে সকল স্থিতির কারণ, সকলের পরমাত্মাস্বরূপ সর্বকারনের মূল কারণ হওয়া সত্ত্বেও যাঁর মনুষ্য সদৃশ রূপ রয়েছে, সেই ভগবান নারায়ণের প্রতি নিরতিশয় অতুলনীয় প্রেমময়ী সেবা সম্পাদন করছেন। আর কোন্ পুণ্য কর্ম আপনাদের প্রয়োজন? ভক্তবৃন্দের নাথ, অচ্যুত কৃষ্ণ, তাঁর পিতা-মাতার প্রীতি বিধান করার জন্য শ্রীঘ্রই ব্রজে ফিরে আসবেন। সমস্ত যদুগণের শত্রু কংসকে মল্লভূমিতে হত্যা করার পর, ফিরে এসে আপনাদের প্রতি প্রতিজ্ঞা, কৃষ্ণ এখন নিশ্চয়ই পালন করবেন। হে মহাভাগে, বিলাপ করবেন না। খুব শ্রীঘ্রই আবার আপনারা কৃষ্ণকে দর্শন করবেন। কাঠের মধ্যে যেমন অগ্নি সুপ্ত থাকে, সেইভাবে তিনিও সকল জীবের অন্তরে উপস্থিত রয়েছেন। তাঁর কাছে কেউই বিশেষ প্রিয় বা অপ্রিয় নয়, উত্তম বা অধম নয় এবং তিনি কারও প্রতি অসমদর্শীও নন। তিনি অমানী, কিন্তু অন্যান্য সকলকে মান দান করেন। তাঁর মাতা, পিতা, পত্নী, পুত্র বা অন্যান্য আত্মীয় নেই। কেউই তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এবং তবুও কেউই তাঁর কাছে অপরিচিত নয়। তাঁর কোন জড় দেহ নেই এবং জন্ম নেই। এই জগতে তাঁর এমন কোন কর্ম নেই যা তাঁকে শুদ্ধ, অশুদ্ধ বা মিশ্র প্রজাতির জীবনে জন্ম লাভ করতে বাধ্য করবে। তবু তাঁর লীলা উপভোগার্থে এবং তাঁর সাধু ভক্তগণের উদ্ধারের জন্য তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন। তিনি যদিও জড়া প্রকৃতির সত্ত্ব, রজ ও তম- এই তিনটি গুণের অতীত, তবু চিন্ময় ভগবান তাঁর ক্রীড়ারূপে তাদের সঙ্গ গ্রহণ করেন। এইভাবে অজ ভগবান সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের জন্য জড়া প্রকৃতির গুণসমূহকে ব্যবহার করেন। ঠিক যেমন ঘূর্ণনরত কোন ব্যক্তি মনে করে যে ভূমিতলও ঘুরছে, তেমনই অহঙ্কার দ্বারা প্রভাবিত কেউও মনে করে যে, সে নিজেই কর্তা, যদিও প্রকৃতপক্ষে তার মনই কেবলমাত্র কার্য করছে। পরমেশ্বর ভগবান হরি একমাত্র আপনাদেরই পুত্র নন। পরন্তু, ঈশ্বর রূপে, তিনি সকলের পুত্র, আত্মা, পিতা এবং মাতা। শ্রুত বা দৃষ্ট, অতীতে, বর্তমানে বা ভবিষ্যতে, স্থিতিশীল বা গতিশীল, বৃহৎ বা ক্ষুদ্র কোন কিছুই ভগবান অচ্যুত ব্যতীত স্বতন্ত্ররূপে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না। যেহেতু তিনি পরম-আত্মা, তাই তিনিই সমস্ত কিছু।”
“হে রাজন, কৃষ্ণের দূত নন্দের সঙ্গে ক্রমাগত কথা বলতে বলতে, রাত্রি শেষ হয়ে এল। গোষ্ঠের রমণীগণ শয্যা হতে গাত্রোত্থান করলেন এবং প্রদীপ প্রজ্বলন করে তাঁদের বাস্তু বিগ্রহাদির অর্চনা করলেন। তারপর তাঁরা দধিকে মাখনে পরিণত করার জন্য তা মন্থন করতে শুরু করলেন। ব্রজরমণীরা তাঁদের কঙ্কণপূর্ণ দুই বাহু দিয়ে যখন মন্থনরজ্জু আকর্ষণ করছিলেন, তখন প্রদীপের আলোতে প্রতিফলিত তাঁদের রত্নরাজির উজ্জ্বলতায় তাঁরা শোভামণ্ডিত হয়েছিলেন। তাঁদের নিতম্ব, স্তন এবং কন্ঠহারগুলি চঞ্চল হয়ে উঠেছিল এবং অরুণ বর্ণের কুঙ্কুমে রঞ্জিত তাঁদের মুখমণ্ডল কপোলদেশের কুণ্ডল প্রভায় উদ্ভাসিত হয়েছিল। ব্রজের রমণীগণ যখন উচ্চৈঃস্বরে কমল-নয়ন কৃষ্ণের মহিমা গান করছিলেন, তখন তাঁদের গান তাঁদের মন্থনের শব্দের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে আকাশ স্পর্শ করেছিল এবং সমস্ত দিকের সর্ব-অমঙ্গল দূরীভূত করেছিল। যখন ভগবানতুল্য সূর্য উদিত হলেন, তখন ব্রজবাসীগণ নন্দ মহারাজের দ্বারের সম্মুখে স্বর্ণ রথটি লক্ষ্য করলেন। তাঁরা জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, ‘এই রথটি কার?’ কমলনয়ন কৃষ্ণকে মথুরায় নিয়ে গিয়ে কংসের আকাঙ্ক্ষা যে পূর্ণ করেছিল- সেই অক্রূর সম্ভবত ফিরে এসেছেন। ‘সে কি আমাদের মাংস দিয়ে তার সেবায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট তার প্রভুর পিণ্ডদান করবে?’ স্ত্রীগণ যখন এইভাবে বলাবলি করছিলেন, উদ্ধব তাঁর প্রাতঃকালীন কর্তব্য সমাপন করে উপস্থিত হলেন।”
ষট্চত্বারিংশ অধ্যায়- উদ্ধবের বৃন্দাবনে আগমন
07 Oct 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়