শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে ভরতকুলশ্রেষ্ঠ, কংস যখন নিহত হল, তার দুই রাণী অস্তি ও প্রাপ্তি শোকার্ত হয়ে তাদের পিতৃগৃহে গমন করেছিল। শোকগ্রস্তা দুই রাত্রি তাদের পিতা মগধরাজ জরাসন্ধের কাছে গিয়ে তারা কীভাবে বিধবা হয়ে গেল, সেই সম্বন্ধে সমস্তই বর্ণনা করল। হে রাজন, সেই অপ্রিয় সংবাদ শ্রবণ করে, জরাসন্ধ শোক ও ক্রোধে পূর্ণ পৃথিবীকে যাদব শূন্য করার সব রকম সম্ভাব্য চূড়ান্ত উদ্যোগ শুরু করল। ত্রয়োবিংশতি অক্ষৌহিণী বাহিনী নিয়ে সে চতুর্দিক থেকে যদু-রাজধানী মথুরা অবরোধ করল।”
“শ্রীকৃষ্ণ, পরমেশ্বর ভগবান, এই জগতের আদি কারণ হলেও তিনি যখন এই পৃথিবীতে অবতরণ করেন, তখন মানুষের ভূমিকায় লীলা করেন। তাই যখন তিনি জরাসন্ধকে তাঁর নগরীর চারদিকে যেন এক উচ্ছ্বসিত মহাসমুদ্রের মতোই সৈন্য সমাবেশ করতে দেখলেন এবং দেখলেন কীভাবে এই সৈন্য বাহিনী তাঁর প্রজাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করছে, তখন স্থান, কাল ও তাঁর বর্তমান অবতারত্বের যথার্থ উদ্দেশ্য অনুসারে তিনি তাঁর উপযুক্ত কর্তব্য নির্ধারণ করলেন। যেহেতু জরাসন্ধের পদাতিক সৈন্য, অশ্ব, রথ ও হস্তীদল সমন্বিত অক্ষৌহিণী সমূহের সৈন্যবাহিনী হয়ে উঠেছে পৃথিবীর ভারস্বরূপ, যা মগধরাজ সমস্ত অনুগত রাজাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে এখানে সমবেত করেছে, তা আমি বিনষ্টই করব। কিন্তু একমাত্র জরাসন্ধকেই হত্যা করা উচিত হবে না, কারণ ভবিষ্যতে সে নিশ্চয়ই আরও এক সৈন্য সমাবেশ ঘটাবে। ভূ-ভার হরণ, সাধুগণের সংরক্ষণ এবং অসাধুগণের বিনাশ- এই আমার বর্তমান অবতারের উদ্দেশ্য। যখন কোনও সময়ে অধর্ম বিস্তার লাভ করে, তা নিবারণের জন্য এবং ধর্মের রক্ষার জন্য আমি অন্যান্য শরীরও ধারণ করি।”
“এইভাবে যখন ভগবান গোবিন্দ চিন্তা করছিলেন, তখন সূর্যের মতো দীপ্তিসম্পন্ন দুটি রথ সহসা আকাশ থেকে নেমে এল। সেগুলি সারথি ও উপকরণে পরিপূর্ণ ছিল। ভগবানের নিত্য দিব্য অস্ত্রশস্ত্রাদিও আপনা থেকে তাঁর সামনে আবির্ভূত হল। সেইসব লক্ষ্য করে, ইন্দ্রিয়াদির অধীশ্বর, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীসঙ্কর্ষণকে বললেন- আমার শ্রদ্ধেয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, আপনার মুখাপেক্ষী যদুগণকে অবরুদ্ধ করেছে যে বিপদ, তা লক্ষ্য করুন। হে প্রভু, আপনার নিজস্ব রথ ও প্রিয় অস্ত্রশস্ত্র আপনার সামনে উপস্থিত হয়েছে। আমাদের ভক্তবৃন্দের কল্যাণ সুনিশ্চিত করার জন্যই আমড়া জন্মগ্রহণ করেছি। কৃপা করে এখন এই ত্রয়োবিংশতি অক্ষৌহিণীর ভার পৃথিবী থেকে দূর করুন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভ্রাতাকে এইভাবে আমন্ত্রণ করার পর, সেই দুই দাশার্হ, কৃষ্ণ ও বলরাম, বর্ম পরিধান করে এবং তাঁদের সুশোভিত অস্ত্রশস্ত্র প্রদর্শন করতে করতে তাঁদের রথ চালনা করে নগরী হতে নির্গত হলেন। অতি অল্পসংখ্যক সৈন্য তাঁদের সঙ্গে ছিল। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর রথের সারথি দারুকের সঙ্গে নগরী থেকে নির্গত হয়ে শঙ্খধ্বনি করলেন এবং শত্রু সৈন্যগণের হৃদয় ভয়ে কম্পিত হতে লাগল।”
জরাসন্ধ তাঁদের দুজনকে দেখে বলল- “হে কৃষ্ণ, নরাধম! একজন বালকের সঙ্গে যুদ্ধ করা যেহেতু লজ্জাজনক, আমি তাই এইভাবে একাকী তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে ইচ্ছা করি না। তুমি মূর্খ, তাই লুকিয়ে থাকো- ওহে স্বজন হত্যাকারী, চলে যাও“ আমি তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করব না। তুমি, বলরাম, যদি মনে কর যে, তুমি লড়তে পারবে, তা হলে সাহস এবং ধৈর্য ধারণ কর এবং আমার সঙ্গে যুদ্ধ কর। আমার বাণ দ্বারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন তোমার দেহ ত্যাগ করে তুমি স্বর্গে যেতে পার, নতুবা আমাকে বধ কর।”
শ্রীভগবান বললেন- “প্রকৃত বীরগণ কেবল দম্ভ প্রকাশ করে না, বরং কার্যক্ষেত্রে তাদের বিক্রম প্রদর্শন করে। আমড়া কোনও আতঙ্কগ্রস্ত মুমূর্ষজনের কথা গুরুত্ব দিয়ে মেনে নিতে পারি না।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বায়ু যেমন মেঘরাশি দ্বারা সূর্যকে অথবা ধূলিকনা দ্বারা অগ্নিকে আবৃত করে, জরাপুত্রও সেই মধুবংশজ দুজনের দিকে অগ্রসর হল এবং তাঁর বিশাল সৈন্যরাশি দিয়ে তাঁদের সৈন্য, রথ, ধ্বজ, অশ্ব ও সারথিদের সকলকেই বেষ্টন করেছিল। রমণীগণ সুউচ্চ গৃহ, প্রাসাদ ও নগরীর সিংহদ্বারগুলিতে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁরা যখন গরুড় ও তাল বৃক্ষের প্রতীক সমন্বিত ধ্বজা দ্বারা চিহ্নিত কৃষ্ণ ও বলরামের রথ দুটি আর দেখতে পেলেন না, তখন তাঁরা শোকাহত হয়ে মূর্ছিত হয়ে পড়েন। তাঁকে ঘিরে সমবেত মেঘসদৃশ বিপুল শত্রু সৈন্যের দ্বারা অবিশ্রান্ত ও ভয়ংকর বাণ বর্ষণে তাঁর সৈন্যদের পীড়িত হতে দর্শন করে, শ্রীহরি তাঁর শার্ঙ্গনামক সর্বোত্তম ধনুকে টংকার ধ্বনি করলেন, যে-ধনুকটিকে দেবতা ও অসুরেরা উভয়েই পূজা করে থাকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর তূণ থেকে তীরগুলি গ্রহণ করলেন, সেগুলি ধনুর্গুণে সংযোজিত করলেন, আকর্ষণ করলেন এবং অগণিত শাণিত বাণরাশি নিক্ষেপ করলেন, যা শত্রুর রথ, হস্তী, অশ্ব ও পদাতিক সৈন্যদের আঘাত করল। ভগবান তাঁর বাণরাশিকে জ্বলন্ত অগ্নিবলয়ের মতো নিক্ষেপ করেছিলেন। হাতিগুলির কপাল দ্বিখণ্ডিত হয়ে ভূমিতে পতিত হল, সৈন্যবাহিনীর অশ্বগুলি ছিন্ন গ্রীবা হয়ে পতিত হল, রথগুলির অশ্ব, ধ্বজা, সারথি ও রথীগণ সহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পতিত হল এবং পদাতিক সৈন্যদের বাহু, ঊরু ও স্কন্ধ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে বিধ্বস্ত হল। যুদ্ধক্ষেত্রে মনুষ্য, হস্তী ও অশ্বের অঙ্গসমূহ, যা খণ্ড খণ্ড হয়েছিল, তা থেকে রক্তের শত শত নদী প্রবাহিত হয়েছিল। এই সমস্ত নদীগুলিতে হাতগুলি সাপের মতো, মানুষের মাথাগুলি কচ্ছপের মতো; মৃত হাতিগুলিকে দ্বীপের মতো এবং মৃত অশ্বগুলিকে কুমিরের মতো মনে হচ্ছিল। হাত এবং ঊরুগুলি মাছের মতো, মানুষের চুলের রাশিকে শৈবালের মতো, ধনুকগুলিকে ঢেউয়ের মতো এবং বিভিন্ন অস্ত্রগুলিকে গুল্মের মতো মনে হচ্ছিল। রক্তের নদীগুলি এই সমস্ত কিছুতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। রথের চাকাকে ভয়ংকর ঘূর্ণির মতো দেখাচ্ছিল এবং মূল্যবান রত্ন ও অলঙ্কারগুলিকে তীব্র বেগে প্রবাহিত রক্তের নদীতে পাথর ও কাঁকরের মতো মনে হচ্ছিল যা ভীরুদের মনে ভয় আর মনস্বিদের আনন্দ উদ্রেক করেছিল। অপরিমেয় শক্তিধর শ্রীবলরাম তাঁর মুষল অস্ত্রের আঘাতের দ্বারা মগধেন্দ্রর সৈন্য বাহিনীকে বিনাশ করেছিলেন এবং যদিও এই বাহিনী ছিল অগাধ ও দুষ্পার সমুদ্রের মতো ভয়ংকর, কিন্তু জগতের ঈশ্বরদ্বয়, বসুদেবের দুই পুত্রের কাছে এই যুদ্ধ ছিল কেবল খেলা মাত্র। যিনি ত্রিভুবনের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় রচনা করেন এবং যিনি অনন্ত চিন্ময় গুণাবলীসম্পন্ন, তাঁর কাছে মোটেই আশ্চর্যজনক নয় যে, তিনি একটি বিপক্ষ দলকে বিনাশ করছেন। তবুও, ভগবান যখন মনুষ্যের আচরণ অনুকরণ করে সেটি করেন, তখন ঋষিগণ তাঁর সেই আচরণের বন্দনা করেন। রথহীন ও হতসৈন্য জরাসন্ধের কেবল নিঃশ্বাসটুকু অবশিষ্ট ছিল। সেই সময়ে শ্রীবলরাম বলপূর্বক সেই শক্তিশালী যোদ্ধাকে বন্দি করলেন, ঠিক যেমন কোনও সিংহ আরেকটি সিংহকে বলপূর্বক ধরাশায়ী করে। বরুণের দিব্য পাশবন্ধন ও অন্যান্য জাগতির রজ্জু দ্বারা, বলরাম সেই বহু শত্রু হন্তা জরাসন্ধকে বন্ধন করতে শুরু করলেন। কিন্তু ভগবান গোবিন্দের তখনও জরাসন্ধের মাধ্যমে একটি উদ্দেশ্য পূর্ণ করা বাকি ছিল এবং তাই তিনি বলরামকে থামতে বললেন। যোদ্ধাদের কাছে উচ্চসম্মানিত জরাসন্ধ দুই জগদীশ্বরের কাছ থেকে মুক্তি লাভ করে লজ্জা পেয়েছিল এবং তাই সে তপশ্চর্যার জন্য সঙ্কল্প করল। পথে, বিভিন্ন রাজারা তাকে নানাভাবে পারমার্থিক জ্ঞান ও লৌকিক যুক্তিদ্বারা বুঝিয়েছিল যে, তার পক্ষে আত্মনিগ্রহের ধারণা ত্যাগ করা উচিত। তারা তাকে বলেছিল, ‘তোমার অতীত কর্মের অনিবার্য ফলস্বরূপ যদুদের কাছে তোমার পরাজয় হয়েছে মাত্র।’ তার সকল সৈন্য নিহত হলে এবং নিজেও পরমেশ্বর ভগবানের কাছে উপেক্ষিত হয়ে, বৃহদ্রথপুত্র রাজা জরাসন্ধ তখন মনের দুঃখে মগধ রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করল।”
“ভগবান মুকুন্দ তাঁর নিজ সৈন্যবাহিনী নিয়ে সম্পূর্ণ অক্ষতভাবে তাঁর শত্রুর সৈন্যর সমুদ্র উত্তীর্ণ হলেন। তিনি স্বর্গের অধিবাসীদের অভিনন্দন গ্রহণ করলেন এবং তাঁর ওপরে তাঁরা পুষ্পবর্ষণ করলেন। মথুরাবাসী তাদের প্রচণ্ড আশঙ্কার উত্তপ থেকে মুক্ত হয়ে আনন্দে পরিপূর্ণ হলেন, আর চারণকবি, ঘোষক এবং স্তাবকেরা তাঁর বিজয়ের স্তৃতি গান করে তাঁর সঙ্গে মিলিত হবার জন্য বেরিয়ে এলেন। ভগবান তাঁর নগরীতে প্রবেশ করলে, শঙ্খ ও দুন্দুভি ধ্বনিত হল এবং অনেক ঢোল, শিঙা, বীণা, বেণু ও মৃদঙ্গের ঐকতান বেজে উঠল। রাজপথগুলি জরে সিক্ত করা হয়েছিল, সর্বত্র পতাকা উড়ছিল এবং তোরণগুলি উৎসবের জন্য অলংকৃত করা হয়েছিল। নগরবাসীরা উল্লসিত হয়ে উঠেছিল এবং বৈদিক মন্ত্রের কীর্তনে নগরী নিনাদিত হচ্ছিল। পুর রমণীরা যখন সস্নেহে ভগবানকে দর্শন করছিলেন তখন প্রীতিবশতঃ তাঁদের নয়ন ব্যাকুলিত হয়েছিল এবং তাঁরা তাঁর উপর পুষ্প, মাল্য, দধি, অক্ষত তণ্ডূল ও অঙ্কুর ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তখন যুদ্ধক্ষেত্রে পতিত সকল সম্পদ- প্রধানত, মৃত যোদ্ধাদের অসংখ্য ভূষণসমূহ, যদুরাজকে উপহার প্রদান করলেন। এই একইভাবে সতেরবার মগধরাজকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু তবুও এতবার পরাজয় সত্ত্বেও শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা সুরক্ষিত, যুদরাজের বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর অক্ষৌহিণী বাহিনী নিয়ে সে যুদ্ধ করেছিল। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শক্তি দ্বারা, বৃষ্ণিগণ নিশ্চিতরূপে জরাসন্ধের সকল বাহিনীকে ধ্বংস করেছিলেন এবং যখন তার সকল সৈন্য নিহত হল, তখন রাজা তার শত্রুর দ্বারা মুক্ত হয়ে আবার ফিরে গিয়েছিল।”
“ঠিক যখন অষ্টাদশবারের যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছিল, তখন নারদ মুনির প্রেরিত কালযবন নামে এক বর্বর যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হল। মথুরায় এসে এই যবন তিন কোটি বর্বর সৈন্য দিয়ে নগরী অবরোধ করেছিল। সে কখনই যুদ্ধ করার উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মানুষ খুঁজে পায়নি, কিন্তু সে শুনেছিল যে, বৃষ্ণিরা ছিল তার সমকক্ষ। শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীসঙ্কর্ষণ যখন কালযবনকে দেখলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ পরিস্থিতি সম্বন্ধে ভাবলেন এবং বললেন, “আহা, দুদিক থেকেই মহাবিপদ এখন যদুদের ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। “এই যবন ইতিমধ্যে আমাদের অবরুদ্ধ করেছে, এবং মগধের পরাক্রমী রাজাও শ্রীঘ্রই এখানে আজ না হলেও কাল অথবা পরশু এসে উপস্থিত হবে। আমরা যখন কালযবনের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকব, তখন যদি বলবান জরাসন্ধ আসে, তা হলে জরাসন্ধ আমাদের আত্মীয়স্বজনদের হত্যা করতে পারে অথবা তার রাজধানীতে তাদের নিয়ে চলে যেতে পারে। “সুতরাং আমড়া এখনই এমন একটি দুর্গ নির্মাণ করব, যাতে কোন মানবশক্তিই বলপ্রয়োগ করে প্রবেশ করতে পারবে না। আমরা আমাদের পরিবারের সকলকে সেখানে রেখে আসি এবং তারপর সেই বর্বর রাজাকে বধ করি।” এইভাবে বলরামের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনার পর পরমেশ্বর ভগবান সমুদ্রের মধ্যে দ্বাদশ যোজন বিস্তৃত একটি দুর্গ প্রস্তুত করলেন। সেই দুর্গের ভিতর সকল রকম অদ্ভুত বস্তু সমন্বিত একটি নগর নির্মাণ করলেন। সেই নগর নির্মানে বিশ্বকর্মার বিজ্ঞানসম্মত পূর্ণ জ্ঞান ও স্থাপত্য দক্ষতা পরিলক্ষিত হত। সেখানে বিস্তীর্ণ বীথি পথ, বাণিজ্য পথ ও প্রশস্ত ভূখণ্ডের উপরে নির্মিত চত্বর থাকত আর ছিল বিচিত্র উপবন এবং স্বর্গীয় তরুলতা দিয়ে সাজানো বাগান। সুউচ্চ তোরণদ্বারগুলিতে থাকত স্বর্ণশৃঙ্গ এবং সেগুলির উপরিভাগে স্ফটিক দিয়ে সুসজ্জিত হত। সুবর্ণমণ্ডিত বাড়িগুলির সামনে সোনার কলস এবং শিখরে রত্নখচিত ছাদ থাকত এবং সেগুলির মেঝেতে মূল্যবান মরকতমণি গাঁথা থাকত। বাড়িগুলি ছাড়াও কোষাগার, গুদাম ও সুন্দর অশ্বদের জন্য অশ্বশালা সমস্ত কিছুই রুপা ও পিতলে নির্মিত হয়েছিল। প্রত্যেক আবাসনেই একটি শীর্ষকক্ষ থাকত এবং সেখানকার গৃহদেবতার জন্য একটি মন্দিরও থাকত। সমাজের সকল প্রকার চারি বর্ণের মানুষে পরিপূর্ণ সেই নগরী যদুগণের নাথ শ্রীকৃষ্ণের প্রসাদটিকে নিয়ে বিশেষভাবে শোভা পেত। দেবরাজ ইন্দ্র শ্রীকৃষ্ণের জন্য সুধর্মা সভাগৃহ নিয়ে এসেছিলেন, যার ভেতরে দাঁড়ালে মানুষ মর্ত্যলোকের কোনও বিধানের অধীন থাকত না। ইন্দ্র পারিজাত বৃক্ষও এনে দিয়েছিলেন। বরুণদেব মনের গতিসম্পন্ন অশ্বগুলি অর্পণ করেছিলেন, সেই অশ্বগুলির কয়েকটি ছিল শুদ্ধ শ্যাম বর্ণের, অন্যগুলি শ্বেতশুভ্র। দেবতাদের কোষাধ্যক্ষ কুবের তাঁর আটটি গূঢ় সম্পদ প্রদান করেছিলেন এবং বিভিন্ন গ্রহের অধিপতিরা প্রত্যেকে তাঁদের আপন ঐশ্বর্যগুলি অর্পণ করেন। পরমেশ্বর ভগবান পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলে, হে রাজন, ইতিপূর্বে দেবতাদের নির্দিষ্ট কর্তৃত্ব প্রয়োগের জন্য তিনি যে সকল আধিপত্য তাঁদের প্রদান করেছিলেন, এখন তাঁরা সবই তাঁকে প্রত্যর্পণ করলেন। তাঁর যোগমায়াবলে তাঁর সকল আত্মীয়দের নতুন নগরীতে স্থানান্তরিত করে, মথুরাকে রক্ষা করার জন্য সেখানে অবস্থানরত শ্রীবলরামের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ পরামর্শ করলেন। তারপর একটি পদ্মমাল্য ধারণ করে, কোন অস্ত্র না নিয়ে, মথুরার প্রধান তোরণ দিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মথুরা থেকে বেরুলেন।”
পঞ্চাশ অধ্যায়- শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকাপুরী প্রতিষ্ঠা করলেন
04 Nov 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়