দ্বিচত্বারিংশ অধ্যায়- যজ্ঞস্থলে ধনুর্ভঙ্গ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে তিনি দেখলেন যে, সুশ্রীমুখ এক কুব্জা যুবতী রমণী সুগন্ধি অঙ্গবিলেপন দ্রব্যের পাত্র বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। প্রেমানন্দ প্রদাতা শ্রীকৃষ্ণ সহাস্যে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন কে তুমি, হে সুন্দরী ঊরুময়ী? আহা, বিলেপন! এটা কার জন্য, হে সুন্দরী? আমাদের সত্য করে বল। আমাদের দুজনকে তোমার উত্তম বিলেপন প্রদান কর, তা হলে শ্রীঘ্রই তোমার পরম মঙ্গল লাভ হবে।”
দাসীটি উত্তরে বলল- “হে সুন্দর, আমি ভোজরাজ কংসের আদরের দাসী, আমার প্রস্তুত অনুলেপন তাঁর অতি প্রিয়। আমার নাম ত্রিবক্রা। ভোজপতির অতি প্রিয় আমার এই অনুলেপনের যোগ্য তোমরা দু’জন ছাড়া আর কে আছে? কৃষ্ণের রূপ, ব্যক্তিত্ব, সৌকুমার্য, হাস্যালাপ ও দৃষ্টিপাতে মোহিতচিত্তা ত্রিবক্রা কৃষ্ণ ও বলরাম দুজনকেই স্নিগ্ধঘন অনুলেপন প্রদান করেছিল। এই পরম সুন্দর অনুলেপন দ্রব্যে অনুলিপ্ত হয়ে, যা তাঁদের নিজবর্ণভেদে ভূষিত করেছিল, কৃষ্ণ ও বলরাম পরম শোভা প্রাপ্ত হলেন। ত্রিবক্রার প্রতি প্রসন্ন ভগবান কৃষ্ণ তাঁকে দর্শনের ফল প্রদর্শনের জন্য সেই সুমুখশ্রী কুব্জা কন্যাকে সরল ঋজুদেহা করতে মনস্থ করলেন। স্বীয় পদযুগল দ্বারা তার পদাগ্রভাগে চাপ দিয়ে স্বীয় হস্তদ্বয়ের উন্নত আঙ্গুল দ্বারা তার চিবুক ধারণ করে ভগবান অচ্যুত তার দেহটিকে সরল করলেন। কেবলমাত্র ভগবান মুকুন্দের স্পর্শে ত্রিবক্রা তৎক্ষণাৎ সরল, সমান, সুগঠিত অঙ্গী, বৃহৎ নিতম্ব ও স্তনশালিনী সর্বোত্তম সুন্দরী রমণীতে পরিণত হল। এখন রূপ গুণ ঔদার্য সমন্বিতা ত্রিবক্রা ভগবান কেশবের প্রতি কাম আকঙ্ক্ষা অনুভব করতে শুরু করলে তাঁর উত্তরীয়ের প্রান্তভাগ আকর্ষণ করে হাসতে হাসতে তাঁকে বলল- ‘এসো, হে বীর, চল আমার গৃহে যাই। আমি তোমাকে এখানে ত্যাগ করতে পারব না। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন হও, কারণ তুমি আমার হৃদয় উন্মথিত করেছ।’ এইভাবে রমণী দ্বারা যাচিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে এই ঘটনা অবলোকনকারী বলরামের মুখের দিকে ও পরে গোপবালকগণের মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করে হাসতে হাসতে তাকে বলতে লাগলেন- ‘হে সুভ্রু, যত শীঘ্র পারি আমার উদ্দেশ্যে সাধন করার পর আমি অবশ্যই পুরুষের উদ্বেগ দূরকারী তোমার গৃহে গমন করব। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের মতো গৃহহীন পথিকের জন্য তুমিই শ্রেষ্ঠ আশ্রয়।’ তাকে মধুর বাক্যে বিদায় প্রদান করে শ্রীকৃষ্ণ পথ ধরে হাঁটতে লাগলেন। পথিমধ্যে বণিকেরা তাঁকে ও তাঁর অগ্রজকে পান-সুপারি, মালা ও গন্ধদ্রব্যসহ নানা শ্রদ্ধার্ঘ দান করে পূজা করেছিলেন। কৃষ্ণ দর্শনে নগরীর রমণীগণের হৃদয়ে কাম উদ্রেক হল। আর এইভাবে ক্ষোভিত হয়ে তাঁরা আত্মবিস্মৃত হলে তাঁদের বস্ত্র, চুলের বাঁধন ও বালাসমূহ স্খলিত হল এবং তাঁরা চিত্রার্পিত অবয়বের ন্যায় দণ্ডায়মান রইলেন।”
“ভগবান কৃষ্ণ অতঃপর যেখানে ধনুর্যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে, সেই স্থানটি সম্বন্ধে স্থানীয় মানুষদের জিজ্ঞাসা করলেন। সেখানে গমন করে তিনি ইন্দ্রধনুকসদৃশ সেই অদ্ভুত ধনুকটি দেখতে পেলেন। ধনুকটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে অর্চনাকারী পুরুষদের একটি বিরাট বাহিনী সেই পরমৈশ্বর্যযুক্ত ধনুকটিকে পাহারা দিচ্ছিল। রক্ষীরা তাঁকে প্রতিহত করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কৃষ্ণ বলপূর্বক অগ্রসর হয়ে সেটিকে তুলে নিলেন। ভগবান উরুক্রম তাঁর বাম হাতে সহজেই ধনুকটিকে উত্তোলিত করে অবলোকনকারী রাজরক্ষীদের সমক্ষে নিমেষের মধ্যে জ্যা রচনা করে শক্তিমত্তার সঙ্গে তা আকর্ষণ করে, ঠিক যেমন মত্ত হস্তী ইক্ষুদণ্ড ভঙ্গ করে, তেমনিভাবে ধনুকটিকে দ্বিখণ্ডিত করলেন। ধনুর্ভঙ্গের শব্দে পৃথিবী ও আকাশের সমস্ত দিক পূর্ণ হল। তা শ্রবণ করে কংস ত্রাস প্রাপ্ত হয়েছিল। ক্রুদ্ধ প্রহরীরা তখন তাদের অস্ত্র ধারণ করে কৃষ্ণ ও তাঁর সহচরগণকে ধরবার জন্য ‘ধর ওকে, মার ওকে’, বলে চিৎকার করতে করতে তাঁদের বেষ্টন করেছিল। রক্ষীদের অশুভ উদ্দেশ্যে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে ধনুকের ভগ্ন দুটি খণ্ড তুলে নিয়ে বলরাম ও কেশব তাদের প্রহার করে সংহার করতে লাগলেন। কংস প্রেরিত সেনাবাহিনীকে বধ করার পর কৃষ্ণ ও বলরাম প্রধান ফটক দিয়ে যজ্ঞস্থল ত্যাগ করে হৃষ্টচিত্তে নগরীর ঐশ্বর্য দর্শনে বিচরণ করতে লাগলেন।”
“কৃষ্ণ ও বলরাম সম্পাদিত অদ্ভুত কর্মের সাক্ষী রূপে এবং তাঁদের শক্তি, দৃঢ়তা, ও সৌন্দর্য দর্শন করে নগরবাসীগণ ভাবলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই দুই প্রধান দেবতা হবেন। তাঁদের স্বেচ্ছাক্রমে তাঁরা বিচরণ করতে করতে সূর্য অস্তগত হলে, গোপবালকগণ পরিবৃত হয়ে নগরী ত্যাগ করে গোপগণের শকটসমূহের সমাবেশ স্থানে ফিরে এলেন। বৃন্দাবন থেকে মুকুন্দের (কৃষ্ণ) বিদায় গ্রহণ কালে গোপীগণ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, মথুরাবাসীগণ অসংখ্য মঙ্গল প্রাপ্ত হবেন, আর এখন সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হচ্ছে, কারণ মথুরাবাসীগণ পুরুষভূষণ শ্রীকৃষ্ণের সৌন্দর্য দর্শন করছেন। প্রকৃতপক্ষে, যে সৌন্দর্যের আশ্রয় কামনা করে লক্ষ্ণীদেবীও তাঁকে পূজনকারী অন্যান্য বহু পুরুষকে পরিত্যাগ করেন। কৃষ্ণ ও বলরাম তাঁদের পাদপ্রক্ষালন করে নিয়ে ক্ষীর মিশ্রিত অন্ন ভোজন করলেন। অতঃপর, কংসের অভিপ্রায় অবগত হয়েও সেই রাত্রিটি সেখানে তাঁরা সুখে অতিবাহিত করলেন।”
“অপরপক্ষে, দুর্মতি রাজা কংস, কৃষ্ণ ও বলরামের ক্রীড়াচ্ছলে ধনুর্ভঙ্গ এবং তার রক্ষী ও সৈন্যদের বধ করার কথা শ্রবণ করে ভীত হয়েছিল। সে দীর্ঘ সময় জাগরিত থাকল এবং স্বপ্নে ও জাগরণে মৃত্যুদূতসম বহু অশুভ লক্ষণসমূহ দর্শন করল। সে তার প্রতিবিম্বের দিকে অবলোকন করে নিজের মস্তকটি দেখতে পেত না; অকারণে চন্দ্র ও অন্যান্য নক্ষত্রাদিকে সে দুটি করে দেখত; সে তার ছায়ার মধ্যে ছিদ্র দর্শন করত; সে তার প্রাণবায়ুর শব্দ শুনতে পারত না; বৃক্ষগুলিকে সোনার রঙে আচ্ছাদিত দর্শন করত এবং সে তার নিজের পদচিহ্ন দেখতে পেত না। সে স্বপ্ন দেখত যেন প্রেত এসে তাকে আলিঙ্গন করছে, গর্দভের পিঠে আরোহণ করে গমন করছে, বিষ ভক্ষণ করছে, এবং এক নগ্ন তৈলাক্ত শরীরের মানুষ জবা ফুলের মালা পরিধান করে গমন করছে। স্বপ্নে ও জাগরণে এইসব ও এমন আরও অনেক লক্ষণসমূহ দর্শন করে কংস মৃত্যুভয়ে ভীত হয়েছিল এবং উদ্বেগবশত নিদ্রালাভ করতে পারল না। অবশেষে রাত্রি অতিবাহিত হয়ে পুনরায় সলির মধ্য হতে সূর্য উদিত হলে কংস মল্লক্রীড়ার আয়োজন শুরু করলেন। ভেরী ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রাদি নিনাদিত করে রাজকর্মচারীরা মল্লস্থানটিকে ধর্মীয় আচারগতভাবে অর্চনা করেছিল এবং রঙ্গমঞ্চটি মালা, পতাকা, চেলী ও তোরণ দ্বারা সুসজ্জিত করেছিল। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়গণের নেতৃত্বে নগরবাসীগণ ও জনপদবাসীরা এসে দর্শক মঞ্চে যথাসুখে আসন গ্রহণ করল। রাজ-অতিথিবৃন্দ বিশেষ আসন গ্রহণ করেছিলেন। তার অমাত্যবর্গে পরিবৃত হয়ে কংস রাজমঞ্চে আসন গ্রহণ করল। কিন্তু তার বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসকবর্গের মধ্যে উপবেশন করেও তার হৃদয় কম্পিত হচ্ছিল। মল্লক্রীড়ার উপযুক্ত তালে বাদ্যযন্ত্রাদি উচ্চৈঃস্বরে নিনাদিত হতে থাকলে সু-অলঙ্কৃত মল্লগণ তাদের মল্লাচার্যগণের সঙ্গে গর্বভরে রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করে উপবেশন করল। মনোরম বাদ্যে প্রহৃষ্ট হয়ে চাণূর, মুষ্টিক, কূট, শল এবং তোশন মল্ল-মঞ্চের মাদুরে উপবেশন করল। নন্দ মহারাজ ও অন্যান্য গোপগণ ভোজরাজ দ্বারা আহূত হয়ে তাকে তাঁদের উপহারসমূহ নিবেদন করার পর, একটি মঞ্চে তাঁদের আসন গ্রহণ করলেন।”

Leave a Reply

September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

Blog Stats

  • 140,942 hits