শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে সম্বোধিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গ্রহণ করার জন্য মন স্থির করলেন। তিনি চাণুরকে এবং শ্রীবলরাম মুষ্ঠিককে আহ্বান করলেন। পরস্পর পরস্পরের হস্ত ও পদদ্বয় দৃঢ়রূপে আবদ্ধ করে বিজয়াভিলাষে সবলে এক অপরকে আকর্ষণ করতে লাগলেন। তাঁরা সকলেই নিজ মুষ্টি দ্বারা অপরের মুষ্টিকে, নিজ জানু দ্বারা প্রতিপক্ষের জানুকে, মস্তুকের বিরুদ্ধে মস্তক এবং বক্ষস্থলের দ্বারা বক্ষস্থলকে আঘাত করছিলেন। প্রত্যেক যোদ্ধাই তাঁর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরিভ্রামণ, বিক্ষেপ, পরিরম্ভণ, অধঃক্ষেপ, উৎসর্পণ ও অপসর্পণ ক্রিয়া দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। জয়ী হওয়ার অত্যন্ত আগ্রহে তাঁরা, যোদ্ধারা বলপূর্বক উত্থাপন, উন্নয়ন, চালন এবং স্থাপন দ্বারা তাঁদের নিজ নিজ দেহেরও ক্ষতি করছিলেন।”
“হে রাজন, উপস্থিত সকল রমণীগণ, ঐ মল্লযুদ্ধকে সবল ও দুর্বলের অনৈতিক যুদ্ধ বিবেচনা করে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন অনুভব করলেন। তাঁরা মল্লস্থলের চারদিকে দলবদ্ধভাবে সমবেত ছিলেন এবং একে অপরকে বলতে লাগলেন- আহা! কী মহা অধর্মের কর্ম এই রাজ সভাসদেরা করছ! যেহেতু রাজা এই দুর্বল ও সবলের মধ্যে লড়াই দর্শন করছে, তাই তারাও তা দেখতে চাইছে। দুই পেশাদার মল্লযোদ্ধা, যাদের বজ্রসম কঠিন অঙ্গ এবং প্রকাণ্ড পর্বততুল্য দেহ, তাদের সঙ্গে এই দুই অপরিণত অত্যন্ত সুকোমল অঙ্গের বালকের কি তুলনা করা যেতে পারে? এই সমাবেশে ধর্ম নীতি নিশ্চয়ই ভঙ্গ করা হয়েছে। যেখানে অধর্ম বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে, তেমন স্থানে কারও এক মুহূর্তও থাকা উচিত নয়। বিজ্ঞ ব্যক্তি যদি জানতে পারেন যে, সদস্যগণ সেখানে অনৈতিক কর্ম করছে, তবে তেমন সমাবেশে তিনি প্রবেশ করবেন না। আর যদি প্রবেশও করেন, যদি তিনি সত্য-ভাষণে ব্যর্থ হন, মিথ্যা কথা অথবা সেই সম্বন্ধে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তবে তিনি অবশ্যই পাপ-ভাগী হন। চারদিকে তাঁর শত্রুধাবিত কৃষ্ণের মুখপদ্মখানি দেখ! শ্রমসাধ্য যুদ্ধের দ্বারা সেই মুখমণ্ডল স্বেদ বিন্দুতে আচ্ছন্ন হয়েছে, যেন শিশিরে আচ্ছাদিত একটি পদ্ম। তোমরা কি মুষ্টিকের প্রতি ক্রোধবশত তাম্রভাবাপন্ন নয়নযুগল সমন্বিত শোভাবর্ধনকারী বলরামের হাস্যময় মুখমণ্ডল ও তার তাঁর যুদ্ধমগ্নতা দর্শন করছ না? ব্রজভূমি কত না ধন্য, কারণ সেখানে মানব দেহের ছদ্মবেশে আদিপুরুষ পরমেশ্বর ভগবান বিচরণ করেন, তাঁর বহু লীলাদির প্রকাশ করেন! সেখানে তিনি অপূর্ব বনমালায় শোভিত হন এবং তাঁর পদদ্বয় দেবাদিদেব শিব ও দেবী রমাদ্বারা পূজিত হয়। সেখানে তিনি বলরাম সহযোগে গো-চারণ করতে করতে তাঁর বেণু-বাদন করেন।”
“আহা! ব্রজগোপিকারা কী তপস্যা করেছেন! শ্রী, ঐশ্বর্য ও যশসমূহের একান্ত আশ্রয়; দুর্লভ, স্বতঃসিদ্ধ, অসমোর্ধ্ব সমস্ত সৌন্দর্যের সারস্বরূপ, এই শ্রীকৃষ্ণের মুখকমলের অমৃত তাঁরা তাদের নয়ন দ্বারা নিরন্তর পান করেন। নারীগণের মধ্যে ব্রজনারীগণ অত্যন্ত সৌভাগ্যসম্পন্না, কারণ তাঁরা সকল সময়েই কৃষ্ণানুরক্তচিত্তা রূপে দুগ্ধ-দোহন, শস্য মাড়াই, মাখন মন্থন, জ্বালানির জন্য গোবর সংগ্রহ, দোলান্দোলন, ক্রন্দনরত শিশুর যত্ন, মাঠে জলসেচন, গৃহমার্জন ইত্যাদি সর্বকর্মে অশ্রুসিক্ত কন্ঠে অনবরত শ্রীকৃষ্ণের গান করে থাকেন। তাঁদের এই পরম কৃষ্ণভাবনা হেতু তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই সকল কাঙ্ক্ষিত বস্তু প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। প্রভাতে তাঁর গাভীসহ ব্রজ হতে নির্গমন কালে এবং সূর্যাস্তে ব্রজে প্রত্যাবর্তন সময়ে কৃষ্ণ যখন বেণুবাদন করেন, গোপীগণ তা শ্রবণ করে সত্বর তাঁকে দর্শন করার জন্য তাঁদের গৃহ হতে বের হয়ে আসেন। পথে বিচরণকালে তাঁদের প্রতি কৃষ্ণের সহাস্য কৃপাময় দৃষ্টিপাতযুক্ত মুখমণ্ডল দর্শন করতে সমর্থ এই গোপীগণ নিশ্চয়ই অনেক পুন্যকর্ম সম্পাদন করেছিলেন।”
“হে ভরতকুলোত্তম, রমণীগণ এইভাবে বলতে থাকলে যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শত্রুকে বধ করতে মনস্থির করলেন। তাঁদের পিতা-মাতা (দেবকী ও বসুদেব) রমণীগণের সভয় বাক্য শ্রবণ করে পুত্র স্নেহে শোকাতুর হয়ে উঠলেন। তাঁরা শোকার্ত হয়েছিলেন, কারণ তাঁদের পুত্রদ্বয়ের শক্তি সম্বন্ধে তাঁরা অবগত ছিলেন না। শ্রীবলরাম ও মুষ্টিকও সুনিপুণভাবে শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর প্রতিপক্ষের মতোই একইভাবে অসংখ্য মল্লযুদ্ধের কৌশল প্রদর্শন করে পরস্পর যুদ্ধ করেছিলেন। ভগবানের অঙ্গ দ্বারা বজ্রপাতের ন্যায় কঠোর প্রহারে চাণুরের শরীরের প্রতিটি অংশ যেন চূর্ণ হতে লাগল এবং ক্রমশ অধিকতর যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। অতঃপর চাণূর ভগবান বাসুদেবকে শ্যেন পক্ষীর ন্যায় সবেগে আক্রমণ করে তার দুই মুষ্টি দিয়ে ভগবানের বক্ষঃস্থলে আঘাত করল। দানবের শক্তিশালী আঘাতেও ভগবান মাল্য দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হস্তীর ন্যায় অবিচলিত ভাবে চাণুরের বাহুদ্বয় ধারণ করে বেশ কয়েকবার চতুর্দিকে ঘুরপাক খাইয়ে সবলে ভূতলে আছাড় দিয়ে ফেললেন। স্খলিত বস্তু, কেশ ও মাল্য সমন্বিত মল্লযোদ্ধা চাণুর ইন্দ্র-ধ্বজের ন্যায় ভূপতিত হয়ে প্রাণত্যাগ করল। তেমনই মুষ্টিকও শ্রীবলভদ্রকে তার মুষ্টি দ্বারা আঘাত করার পর বধ হয়েছিল। শক্তিশালী ভগবানের করতল দ্বারা প্রচণ্ড আঘাত প্রাপ্ত হয়ে সেই দানব সর্ব শরীরে যন্ত্রণায় কম্পিত হয়ে রক্ত বমন করতে করতে প্রাণহীন হয়ে ঝঞ্ঝাহত বৃক্ষের ন্যায় ভূতলে পতিত হল।”
“হে রাজন, এরপর যোদ্ধাশ্রেষ্ঠ বলরাম যুদ্ধার্থে সমাগত কূট নামক মল্লযোদ্ধাকে অবলীলাক্রমে অবজ্ঞার সঙ্গে তাঁর বাম মুষ্টির দ্বারা বধ করেছিলেন। অতঃপর কৃষ্ণ যোদ্ধা শলকে তার মস্তকে তাঁর পদাগ্রভাগ দ্বারা আঘাত করে দ্বিখণ্ডিত করলেন। ভগবান একইভাবে তোষলকেও আঘাত করলে উভয় মল্লযোদ্ধাই প্রাণহীন হয়ে পতিত হল। চাণুর, মুষ্টিক, কূট, শল এবং তোশল নিহত হলে অবশিষ্ট মল্লযোদ্ধারা সকলেই তাদের জীবন রক্ষার্থে পলায়ন করল। অতঃপর কৃষ্ণ ও বলরাম সমবয়স্ক গোপবালক সখাদের আহ্বান করে তাঁদের সঙ্গে মিলিত হয়ে নৃত্য ও ক্রীড়া করলেন, আর তখন তাঁদের নূপুর বাদিত বাদ্যযন্ত্রের মতো ধ্বনিত হচ্ছিল। কংস ব্যতীত আর সকলেই কৃষ্ণ ও বলরামের এই অপূর্ব কর্ম দর্শন করে আনন্দিত হয়েছিলেন। সর্বোত্তম ব্রাহ্মণ ও সাধু মহাত্মাগণ ‘সাধু! সাধু’ বলে চিৎকার করেছিলেন।”
“ভোজরাজ তার সকল শ্রেষ্ঠ মল্লযোদ্ধারা হত অথবা পলাতক হয়েছে দর্শন করে, তার আনন্দের জন্য বাদ্যরত সঙ্গিতাদি বন্ধ করার নির্দেশ প্রদান করে এই কথাগুলি বলতে লাগল। বসুদেবের এই দুর্বৃত্ত পুত্রকে নগরী থেকে বহিষ্কার কর। গোপগণের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত কর এবং দুর্মতি নন্দকে গ্রেফতার কর। ঐ দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন দুর্জন বসুদেবকে হত্যা কর। আর শত্রুর পক্ষাবলম্বী আমার পিতা উগ্রসেনকেও তার অনুগামীসহ হত্যা কর। কংস এইভাবে শ্লাঘা প্রকাশ করতে থাকলে অচ্যুত ভগবান কৃষ্ণ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে দ্রুত এবং সহজেই উচ্চ রাজমঞ্চোপরে লাফ দিয়ে আরোহণ করলেন। মূর্তিমান মৃত্যুরূপে শ্রীকৃষ্ণকে আগমন করতে দেখে, বুদ্ধিমান কংস তার আসন থেকে উঠে তার তরবারি ও ঢাল গ্রহণ করল। তরবারি হাতে কংস আকাশে উড়ন্ত শ্যেন পক্ষীর ন্যায় দ্রুত একদিক থেকে অন্যদিকে ভ্রমণ করতে থাকলে দুঃসহ উগ্র তেজঃশালী ভগবান কৃষ্ণ তার্র্ক্ষ্যপুত্র (গরুড়) যেভাবে সর্পকে ধারণ করে সেইভাবে বলপূর্বক সেই অসুরকে ধারণ করলেন। তার মুকুট ফেলে দিয়ে কেশ আকর্ষণ করে ভগবান পদ্মনাভ তাকে উচ্চ মঞ্চ থেকে মল্লক্রীড়া মঞ্চে নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর স্বতন্ত্রপুরুষ, নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের ধারক স্বয়ং তার উপরে পতিত হলেন। যেভাবে এক সিংহ মৃত-হস্তীকে আকর্ষণ করে, উপস্থিত প্রত্যেক দর্শকের সমক্ষে ভগবানও কংসের মৃতদেহকে সেইভাবে ভূতলে আকর্ষণ করলেন। হে রাজন, মল্লস্থলের সকল মানুষেরা তখন তুমুল উচ্চৈঃস্বরে হা হা রব করে উঠল। ভগবান তাকে বধ করবেন এই ভাবনায় কংস সর্বদা বিব্রত থাকত। তাই পান, ভোজন, ভ্রমণ, স্বপ্ন বা কেবলমাত্র শ্বাসগ্রহণ সময়েও রাজা নিয়ত চক্রধারী ভগবানকে তার সম্মুখে দর্শন করত। আর এইভাবে কংস ভগবানের রূপবৎ রূপ লাভের দুর্লভ আশীর্বাদ অর্জন করেছিল। কঙ্ক ও ন্যগ্রোধকের নেতৃত্বে কংসের আট কনিষ্ঠ ভ্রাতা তখন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাদের ভ্রাতার মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ভগবানদ্বয়কে আক্রমণ করল। ভগবানদ্বয়ের প্রতি অতিবেগে সমাগত, আঘাতোদ্যত তাদের, রোহিণীনন্দন তাঁর গদা দ্বারা, ঠিক যেমন কোন সিংহ সহজেই অন্যান্য প্রাণীকে হত্যা করে, সেইভাবে বধ করলেন। তখন আকাশে দুন্দুভি ধ্বনিত হল, ভগবানের অংশপ্রকাশ ব্রহ্মা, শিব ও অন্যান্য দেবতাগণ আনন্দে তাঁর উপর পুষ্প বর্ষণ করতে করতে তাঁর স্তুতি কীর্তন করছিলেন এবং তাঁদের পত্নীগণ নৃত্য করছিলেন।”
“হে রাজন, তখন কংস ও তার ভাতৃবর্গের পত্নীগণ তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী স্বামীদের মৃত্যুতে অত্যন্ত শোকার্ত হয়ে অশ্রুপূর্ণ নয়নে তাদের মস্তকে আঘাত করতে করতে সেখানে আগমন করল। বীরের অন্তিম শয্যায় শায়িত তাদের স্বামীদের আলিঙ্গন করে স্ত্রীগণ অনবরত অশ্রু বিসর্জন সহকারে উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করতে লাগল- হায়, হে প্রভু, হে প্রিয়, হে ধর্মজ্ঞ, হে করুণানাথ, তুমি নিহত হওয়ায়, আমরাও গৃহ ও সন্তানাদি সহ একত্রে নিহত হলাম। হে পুরুষপ্রবর, আমাদের মতো এই নগরীও তার পতির বিরহে উৎসব-মঙ্গল-শূণ্যরূপে শোভাহীন হয়েছে। হে প্রিয়, তুমি নিরপরাধ প্রাণীদের উপর ভয়ঙ্কর অত্যাচার করেছ বলেই আজ তোমার এই দশা হল। অপরের অনিষ্টকারীর কিভাবে সুখ লাভ হতে পারে? শ্রীকৃষ্ণই এই জগতের সকল জীবের উৎপত্তি ও লয়ের কারণ এবং তিনিই সকলের পালক। যে তাঁকে অবজ্ঞা করে, সে কখনই মঙ্গল লাভ করতে পারে না।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “রাজপত্নীগণকে সান্ত্বনা প্রদান করে নিখিল লোকপালক ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শাস্ত্রোক্ত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের আয়োজন করালেন। অতঃপর কৃষ্ণ ও বলরাম তাঁদের মাতা ও পিতাকে বন্ধনমুক্ত করে তাঁদের চরণে মস্তক স্পর্শ করে প্রণাম নিবেদন করলেন। তাঁদের প্রণতি নিবেদনকারী দুই পুত্র কৃষ্ণ ও বলরামকে এখন জগদীশ্বর রূপে অবগত হয়ে দেবকী ও বসুদেব করজোড়ে দণ্ডায়মান রইলেন। শঙ্কিত হয়ে আলিঙ্গন করতে পারলেন না।”
চতুশ্চত্বারিংশ অধ্যায়- কংস বধ
21 Sep 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়