শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ব্রজের যুবতীরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনুচরকে দর্শন করে বিস্মিত হলেন, যাঁর দুটি বাহু দীর্ঘ, যাঁর নয়নদুটি প্রস্ফুটিত নবীন পদ্মের মতো, যিনি পীত বসন এবং এটি পদ্মফুলের মালা পরিধান করেছেন এবং যাঁর পদ্মের মতো মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মার্জিত দুই কুণ্ডলের দ্বারা। ‘কে এই সুদর্শন পুরুষ?’ গোপীরা প্রশ্ন করলেন। ‘সে কোথা থেকে এসেছে এবং সে কার সেবা করে? সে কৃষ্ণের বস্ত্র ও অলঙ্কারগুলি ধারণ করেছে!’ এই কথা বলতে বলতে গোপীরা আগ্রহভরে ভগবান উত্তমশ্লোক, শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম যাঁর আশ্রয়, সেই উদ্ধবের চতুর্দিকে ভিড় করলেন। সবিনয়ে তাঁদের মস্তক অবনত করে, তাঁদের লজ্জা, সহাস্য দৃষ্টিপাত এবং মধুর বচনে গোপীরা উদ্ধবকে সম্মান জানালেন। তাঁকে লক্ষ্ণীপতি কৃষ্ণের বার্তাবহরূপে চিনতে পেরে তাঁকে একটি নির্জন স্থানে তাঁরা নিয়ে গেলেন, তাঁকে সুখাসনে উপবেশন করালেন এবং জিজ্ঞাসা করতে শুরু করলেন- আমরা জানি, আপনি যদুপতি কৃষ্ণের একান্ত সেবক এবং আপনার প্রভুর নির্দেশে আপনি এখানে এসেছেন, যিনি তাঁর পিতা-মাতাকে সন্তোষ প্রদান করতে ইচ্ছুক। এ ছাড়া ব্রজের এই সমস্ত গোচারণভূমির কোনকিছুই তিনি স্মরণযোগ্য বিবেচনা করেন বলে আমরা মনে করি না। বাস্তবিকই, কোনও মুনিঋষিরও পক্ষেও পরিবারের সদস্যদের স্নেহের বন্ধন ছিন্ন করা খুবই কঠিন। পরিবার-পরিজন ছাড়া অন্যদের প্রতি বন্ধুত্ব প্রদর্শন ব্যক্তিগত স্বার্থে চালিত হয়, এবং স্বার্থ সিদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত তা স্থায়ী হয়। এ রকম বন্ধুত্ব নারীর প্রতি পুরুষের বা ফুলের প্রতি ভ্রমরের আসক্তির মতো। নির্ধন মানুষকে গণিকারা পরিত্যাগ করে, অযোগ্য রাজাকে প্রজারা পরিত্যাগ করে, শিক্ষা সমাপ্তির পর শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষককে পরিত্যাগ করে এবং যজ্ঞের জন্য দক্ষিণা প্রদানকারীকে পুরোহিতেরা পরিত্যাগ করে থাকে। একটি গাছের ফল শেষ হয়ে গেলে পাখিরা সেটি পরিত্যাগ করে, ভোজন করার পর অতিথিরা গৃহ পরিত্যাগ করে, দগ্ধ অরণ্যকে প্রাণীরা পরিত্যাগ করে এবং প্রেমিকের প্রতি আসক্ত থাকা সত্ত্বেও তার উপভোগ্যা রমণীকে প্রেমিক পরিত্যাগ করে।’ এইভাবে বলতে বলতে, ভগবান শ্রীগোবিন্দের প্রতি কায়মনোবাক্যে সম্পূর্ণ নিবেদিতপ্রাণা গোপীরা তাঁদের সমস্ত দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্ম সরিয়ে রাখলেন, যেহেতু এখন সেই কৃষ্ণেরই দূত শ্রীউদ্ধব তাঁদের মাঝে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁদের প্রিয়তম কৃষ্ণ তাঁর শৈশবে ও কৈশোরে যেসব ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন করেছিলেন, সেইগুলি তাঁরা অনবরত স্মরণ করে লজ্জাশরম ছেড়ে তাই নিয়ে গান গেয়ে গেয়ে কাঁদতে থাকলেন। গোপীদের মধ্যে একজন যখন কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর পূর্বে-কৃত সঙ্গ ধ্যান করছিলেন, তখন তার সামনে একটি ভ্রমরকে দেখতে পেলেন এবং সেই ভ্রমরটিকে তাঁর প্রিয়তমের পাঠানো দূত বলে মনে করলেন। তাই তিনি তাকে বলতে লাগলেন- “হে ভ্রমর, হে ধূর্তোবন্ধু, তোমার সেই কুঙ্কুম বিলেপিত শ্মশ্রু দ্বারা আমার পাদদ্বয় স্পর্শ কোর না, যা এক বিপক্ষ প্রেমিকার কুচযুগল দ্বারা কৃষ্ণের মালায় ঘর্ষিত হয়েছিল। কৃষ্ণ মথুরার রমণীগণের সন্তোষ বিধান করুন। যিনি তোমার মতো এক দূতকে প্রেরণ করেন, তিনি নিশ্চয়ই যাদব সভায় উপহাসাস্পদ হবেন। একবার মাত্র তাঁর মোহিনী অধর সুধা আমাদের পান করাবার পর, কৃষ্ণ সহসা আমাদের পরিত্যাগ করেছেন, ঠিক যেমন তুমি কিছু ফুলেদের পরিত্যাগ কর। তা হলে, কিভাবে সেই দেবী পদ্মা স্বেচ্ছায় তাঁর পাদপদ্মের সেবা করছে? হায়! উত্তরটি নিশ্চয়ই এই হবে যে, তার মন তাঁর প্রবঞ্চনাপূর্ণ বচন দ্বারা অপহৃত হয়েছে। হে ভ্রমর, কেন তুমি এখানে গৃহহীন মানুষদের সামনে যদুপতি সম্বন্ধে এত গান করছ? এই সকল প্রসঙ্গ আমাদের কাছে পুরাতন সংবাদ। ভাল হয়, তুমি তার নতুন সখীগণের সামনে সেই অর্জুন-বান্ধব বিষয়ে গান কর, যাদের স্তনদ্বয়ের উত্তপ্ত বাসনার এখন তিনি উপশম করছেন। সেই সমস্ত রমণীগণ নিশ্চয়ই তোমার অভীষ্ট তোমাকে প্রদান করবে। স্বর্গ, মর্ত্য, কিম্বা পাতালের কোন্ রমণী তাঁর কাছে দুষ্প্রাপ্য? তিনি কেবলমাত্র তাঁর ভ্রূ বাঁকান এবং কপট মধুরতায় হাস্য করেন, আর তারা সকলে তার হয়ে যায়। পরমেশ্বরী স্বয়ং তাঁর চরণদ্বয়ের ধুলির উপাসনা করেন, সেই তুলনায় আমাদের স্থানটি কোথায়? কিন্তু যারা দীনজন, তারা অন্তত তাঁর উত্তমশ্লোক নাম কীর্তন করতে পারে। আমার পাদদ্বয় থেকে তোমার মস্তক সরাও। আমি জানি তুমি কি করছ। তুমি দক্ষতার সঙ্গে মুকুন্দের কাছ থেকে কূটনীতি শিখেছ এবং এখন তুমি তোষামুদে বাক্যসহ তাঁর দূর রূপে এসেছ। কিন্তু তাঁর জন্য যারা তাদের পতি, পুত্র ও অন্যান্য সকল সম্বন্ধ ত্যাগ করেছ, তিনি তাদের পরিত্যাগ করেছেন। তিনি একজন অকৃতজ্ঞ মাত্র। আমি কেন এখন তাঁর সঙ্গে সন্ধি করব? একজন ব্যাধের মতো তিনি নিষ্ঠুরভাবে তীর দ্বারা কপিরাজকে হত্যা করেছিলেন। যেহেতু তিনি এক নারীর দ্বারা বিজিত ছিলেন, তিনি তাঁর কাছে কাম আকাঙ্ক্ষা করে আগত আরেকজন নারীকে বিরূপ করেছিলেন। আর বলি মহারাজের নৈবেদ্য ভক্ষণের পরেও তিনি তাঁকে একটি রজ্জু দ্বারা বন্ধন করেছিলেন, যেন তিনি একটি কাক। তাই এই কৃষ্ণ বর্ণের বালকের সঙ্গে আমাদের সকল সখ্যই পরিত্যাজ্য হোক, যদিও তাঁর বিষয়ে কথা আমরা পরিত্যাগ করতে পারছি না। কৃষ্ণ নিয়মিত যে লীলা সম্পাদন করতেন, তা শ্রবণ করা কর্ণদ্বয়ের জন্য অমৃত-স্বরূপ। যে একবারের জন্যও সেই অৃমতের এক বিন্দু মাত্রও আস্বাদন করেছে, তার জাগতিক দ্বন্দ্বের প্রতি আসক্তি বিনষ্ট হয়। এরকম বহু ব্যক্তি সহসা তাদের দীন গৃহ ও পরিবার ত্যাগ করেছে এবং নিজেরো হীন হয়ে তাদের জীবন নির্বাহের জন্য ভিক্ষা করতে করতে এখানে বৃন্দাবনে পাখির মতো উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাঁর প্রতারণাপূর্ণ কথাগুলি সত্য বলে বিশ্বাস করে আমরা ঠিক যেন মূর্খ কৃষ্ণসার হরিণের পত্নীদের মতো হয়ে গিয়েছিলাম, যারা নিষ্ঠুর ব্যাধের গান বিশ্বাস করে থাকে। এইভাবে আমরা বারম্বার তাঁর নখ-স্পর্শ জনিত তীব্র কামনার পীড়া অনুভব করতাম। হে দূত, দয়া করে কৃষ্ণ ছাড়া অন্য কিছু বিষয়ে কথা বল। হে আমার প্রিয়তমের সখা, আমার প্রিয়তম কি তোমাকে আবার এখানে পাঠিয়েছেন। আমার তোমাকে সম্মান করা উচিত, সখা, দয়া করে, তুমি কি বর চাও তা তুমি পছন্দ কর। কিন্তু কেন তুমি তাঁর কাছে আমাদের নিয়ে যেতে ফিরে এসেছ, যাঁর দাম্পত্য প্রেম ত্যাগ করা অত্যন্ত কঠিন? হে সৌম্য ভ্রমর, শেস পর্যন্ত তাঁর বধু হচ্ছেন লক্ষ্ণীদেবী এবং তিনি সর্বদা তাঁর বক্ষোপরে বাস করেন। হে উদ্ধব! অত্যন্ত অনুশোচনার বিষয় যে, কৃষ্ণ এখন মথুরায় বাস করছেন। তিনি কি তাঁর পিতৃগৃহের কথা, তাঁর বন্ধুদের কথা, গোপবালকদের কথা স্মরণ করেন? হে মহাত্মন! তিনি কখনও আমাদের কথা, এই কিঙ্করীদের কথা বলেন? কবে তিনি অগুরু সুগন্ধযুক্ত তাঁর হস্ত আমাদের মস্তকে ধারণ করবেন?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এই সকল কথা শ্রবণ করে, উদ্ধব তখন, ভগবান কৃষ্ণকে দর্শনের জন্য অত্যন্ত ব্যগ্র গোপীগণকে সান্ত্বনা প্রদানের চেষ্টা করলেন। এইভাবে তিনি তাদের প্রিয়তমের বার্তা বর্ণনা করতে শুরু করলেন।”
শ্রীউদ্ধব বললেন- “নিশ্চিতরূপে আপনারা গোপীগণ সর্বার্থসাধিকা এবং লোকপূজিতা, কারণ আপনারা এইভাবে আপনাদের মন পরমেশ্বর বাসুদেবের প্রতি সমর্পণ করেছেন। দান, ব্রত, তপস্যা, হোম, জপ, বেদ অধ্যয়ন, সংযম পালন এবং অবশ্যই অন্যান্য অনেক শুদ্ধসাত্ত্বি বিধিবদ্ধ সাধনার মাধ্যমে ভগবান কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি লাভ হয়ে থাকে। আপনাদের মহাভাগ্যের দ্বারা আপনারা অতি শ্রেষ্ঠ মানের শুদ্ধভক্তি ভগবান উত্তমশ্লোকের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছেন- মুনিগণের পক্ষেও যে মান অর্জন করা কঠিন। আপনারা মহাভাগ্যক্রমে আপনাদের পতি, পুত্র, দৈহিক স্বাচ্ছন্দ্য, আত্মীয়স্বজন ও গৃহ সংসার, সবই কৃষ্ণ নামক পরম পুরুষের জন্য ত্যাগ করেছেন। হে পরম মহিমান্বিত গোপীবৃন্দ, আপনারা যথার্থই অধোক্ষজ ভগবানের প্রতি একান্তিক প্রেমের অধিকার দাবি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণবিরহে, তাঁর প্রতি আপনাদের প্রেম উদ্ঘাটনের মাধ্যমে আপনারা আমাকে পরম কৃপা করলেন। হে ভদ্রাগণ, এখন আপনাদের প্রিয়তমের বার্তা শ্রবণ করুন, যা আমি, আমার প্রভুর একান্ত সেবকরূপে, আপনাদের কাছে উপস্থিত করার জন্য এখানে এসেছি।”
ভগবান বললেন- “প্রকৃতপক্ষে তোমরা কখনই আমার থেকে বিচ্ছিন্ন নও, কারণ আমিই সকল সৃষ্টির আত্মা। ঠিক যেমন আকাশ, বায়ু, আগুন, জল ও মাটি- প্রকৃতির এই উপাদানগুলি সৃষ্টিজাত প্রতিটি বিষয়ের মধ্যে বর্তমান, তেমনই আমি প্রত্যেকের মন, প্রাণ এবং ইন্দ্রিয়াদির মধ্যে এবং ভৌত উপাদানগুলি ও জড়া প্রকৃতির গুণাবলীর মধ্যেও বিদ্যমান রয়েছি। ভৌত উপাদান, ইন্দ্রিয়াদি ও প্রকৃতির গুণাদি যার অন্তর্ভুক্ত, আমার সেই আত্ম শক্তি-বলে নিজের দ্বরা, নিজের মধ্যেই আমি নিজেকে সৃষ্টি করি, পালন করি এবং প্রত্যাহার করি। শুদ্ধ চেতনাময় তথা জ্ঞানময় হওয়ার ফলে, আত্মা জাগতিক সমস্ত কিছু থেকে পৃথক এবং প্রকৃতির গুণসমূহের বন্ধনে অসম্পৃক্ত। আমরা জাগ্রতভাব, স্বপ্ন ও সুযুপ্তি নামে জড়া প্রকৃতির ত্রিবিধ কার্যাবলীর মাধ্যমে আত্মাকে উপলব্ধি করতে পারি। ঘুম থেকে উঠে মানুষ যেমন অনবরত কোনও স্বপ্নের চিন্তা করতে থাকে, সেই স্বপ্ন মায়াময় হতেও পারে- ঠিক তেমনই মনের ক্রিয়াকলাপর ফলে মানুষ ইন্দ্রিয়ের উপভোগ্য বিষয়াদি নিয়েই ধ্যান করে, যাতে ইন্দ্রিয়গুলি তা ভোগ করতে পারে। তাই, এবিষয়ে আমাদের সম্পূর্ণ সজাগ থাকা এবং মনকে নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত। সমস্ত নদীর পরম গন্তব্য যেমন সমুদ্র, তেমনই মনীষীদের মতে, সমস্ত বেদশাস্ত্রাদি এবং সর্বপ্রকার যোগাভ্যাগ, সাংখ্য চর্চা, সন্ন্যাস জীবন, তপস্যা, ইন্দ্রিয় দমন ও সততা অনুশীলনের এটাই চরম নিষ্পত্তি। কেন আমি তোমাদের দৃষ্টিপথের পরম প্রিয় বিষয় হয়ে তোমাদের কাছ থেকে বহু দূরে রয়েছে, তার প্রকৃত কারণ আমার প্রতি তোমাদের মনঃসংযোগ আরও তীব্র করতে চাই এবং এইভাবে তোমাদের মন আমার আমার আরও কাছে আকর্ষণ করতে চাই। যখন প্রিয়তম অনেক দূরে থাকে, তখন নারী তাকে সামনে উপস্থিত থাকার চেয়েও বেশি চিন্তা করে। যেহেতু তোমাদের মন সম্পূর্ণভাবে আমাতে মগ্ন এবং অন্য সকল বিষয় হতে মুক্ত হয়ে তোমরা সর্বদা আমাকে স্মরণ করছ, তাই অতি শ্রীঘ্রই তোমাদের মাঝে আবার আমাকে লাভ করবে। যদিও কয়েকজন গোপীকে ব্রজে থাকতে হয়েছিল আর তাই রাত্রিতে অরণ্যে আমার সঙ্গে রাসনৃত্য ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি, তা সত্ত্বেও তারা ছিল ভাগ্যবতী। প্রকৃতপক্ষে, তারা আমার শৌর্যশালী লীলাগুলি স্মরণের মাধ্যমেই আমাকে লাভ করেছিল।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ব্রজের রমণীরা তাঁদের প্রিয়তম কৃষ্ণের কাছ থেকে এই বার্তা শ্রবণ করে প্রীত হলেন। তাঁর কথাগুলি তাঁদের স্মৃতি জাগরূক করলে, তাঁরা উদ্ধবকে উদ্দেশ্য করে বললেন- এটা অত্যন্ত শুভ যে, যদুগণের নির্যাতনকারী এবং শত্রু কংস, তার অনুগামী সহ এখন নিহত হয়েছে। আর এটিও অত্যন্ত শুভ যে, ভগবান অচ্যুত তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী আপ্তকাম বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কুশলে বাস করছেন। হে সৌম্য উদ্ধব, গদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কি এখন পুর রমণীদের আনন্দ প্রদান করছেন, যে-আনন্দ প্রকৃতপক্ষে আমাদেরই প্রাপ্য? আমাদের মনে হয় যে সেই রমণীরা তাঁদের উদার দৃষ্টি দিয়ে স্নিগ্ধ সলজ্জ হাস্যে তাঁকে অর্চনা করেন। শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত প্রকার দাম্পত্য বিষয়ে দক্ষ এবং পুর রমণীদের প্রিয়তম। এখন যেহেতু তিনি তাঁদের মোহিত বাক্য ও ইঙ্গিতের দ্বারা অবিরত বন্দিত হচ্ছেন, তাই কিভাবে তিনি আবদ্ধ না হয়ে পারেন?”
“হে ধর্মপ্রাণ, পুর রমণীদের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তার সময় গোবিন্দ কখনও আমাদের স্মরণ করেন কি? তিনি যখন তাদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে কথা বলেন, তিনি কখনও আমাদের, গ্রাম্য কন্যাদের উল্লেখ করেন কি? কুমুদ, কুন্দ ও উজ্জ্বল চন্দ্রে শোভিত বৃন্দাবন অরণ্যের সেই রাত্রিগুলি তিনি মনে করেন কি? তাঁর প্রিয়তমা সখীগণ, আমরা যখন তাঁর মধুর মহিমা স্তব করেছিলাম, চরণের নূপুরের সঙ্গীতে নিনাদিত রাসনৃত্যের মণ্ডলীর মধ্যে তিনি আমাদের সঙ্গ উপভোগ করেছিলেন। তাঁরই জন্য যারা এখন সন্তপ্ত, তাঁরই অঙ্গের স্পর্শ দিয়ে তাদের সঞ্জীবিত করতে দশার্হ বংশের সেই পুরুষ এখানে ফিরে আসবেন কি? যেভাবে দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর সজল মেঘরাশি দিয়ে অরণ্যকে সঞ্জীবিত করেন, তিনি কি আমাদের সেইভাবে রক্ষা করবেন? কিন্তু তাঁর শত্রুদের নিহত করে রাজ্য জয় করার পর এব রাজকন্যাদের বিবাহ করার পর কৃষ্ণ কেন এখানে আসবেন? তিনি সেখানে তাঁর সকল বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে তুষ্ট রয়েছেন। মহাত্মা কৃষ্ণ লক্ষ্ণীদেবীর অধীশ্বর এবং তিনি যা আকাঙ্ক্ষা করেন, আপনা থেকেই তা অর্জন করেন। তিনি যখন ইতিমধ্যেই স্বয়ংসম্পূর্ণ, তখন কিভাবে আমরা বনবাসীরা বা অন্য রমণীরা তাঁর উদ্দেশ্যগুলি পূর্ণ করতে পারি? বারনারী পিঙ্গলাও ঘোষণা করেছে যে প্রকৃতপক্ষে সকল আশা ত্যাগ করাই পরম সুখের। আমরা তা জানা সত্ত্বেও, কৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য আমাদের আশা ত্যাগ করতে পারছি না। ভগবান উত্তমশ্লোকের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বাক্যালাপ পরিত্যাগ কে সইতে পারে? তিনি লক্ষ্ণীদেবীর প্রতি কোন আগ্রহ প্রদর্শন না করলেও, লক্ষ্ণীদেবী কখনও ভগবানের বক্ষের উপরে তাঁর স্থান থেকে বিচ্যুত হন না।”
“প্রিয় উদ্ধব, কৃষ্ণ যখন এখানে সঙ্কর্ষণের সাহচর্যে ছিলেন, তখন তিনি এই সমস্ত নদী, পর্বত, বন, গবাদী এবং বংশী ধ্বনি উপভোগ করতেন। এই সমস্ত কিছুই নিরন্তর আমাদের নন্দের পুত্রের কথা মনে করায়। বাস্তবিকই, আমরা যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের দিব্য লক্ষণাদিসহ পদচিহ্ন দর্শন করি, তাই তাঁকে কখনও ভুলতে পারি না। হে উদ্ধব, তাঁর মধুর গমনভঙ্গি, তাঁর উদার হাস্য ও লীলাময় দৃষ্টিপাত এবং তাঁর মধুময় বাক্যের দ্বারা যখন আমাদের হৃদয় অপহৃত হয়ে রয়েছে, তখন আমরা কিভাবে তাঁকে ভুলতে পারি? হে প্রভু, হে রমানাথ, হে ব্রজনাথ! হে সকল দুঃখ বিনাশন, গোবিন্দ, দয়া করে দুঃখের সাগরে নিমগ্ন আপনাদের গোকুলকে উদ্ধার করুন!”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বলতে থাকলেন- “শ্রীকৃষ্ণের বার্তা তাঁদের বিরহের জ্বর দূরীভূত করার পরে, গোপীরা অতঃপর উদ্ধবকে তাঁদের ভগবান, কৃষ্ণের থেকে অভিন্ন হৃদয়ঙ্গম করে, তাঁর পূজা করলেন। শ্রীকৃষ্ণলীলাবিষয়ক কীর্তন করার মাধ্যমে গোপীদের দুঃখ নিরসন করে উদ্ধব সেখানে কয়েকমাস থাকলেন। এইভাবে তিনি গোকুলের সমস্ত মানুষের মধ্যে আনন্দ বিধান করেছিলেন? নন্দের ব্রজে উদ্ধব যতদিন বাস করেছিলেন, ব্রজবাসীগণের কাছে তা ক্ষণকাল বলে মনে হয়েছিল, কারণ উদ্ধব সকল সময়ে কৃষ্ণকে নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ভগবান শ্রীহরির সেই দাস ব্রজের নদী, বন, পর্বত, উপত্যকা এবং পুষ্পশোভিত বৃক্ষরাজি দর্শন করে, বৃন্দাবনবাসীদের শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করে আনন্দ লাভ করতেন। এইভাবে গোপীদের সর্বক্ষণ কৃষ্ণ নিমগ্নতার ফলে অস্থিরতা দর্শন করে উদ্ধব বিশেষ প্রীত হলেন। তাঁদের প্রতি সকল শ্রদ্ধা নিবেদনের আকাঙ্ক্ষায় তিনি এইভাবে গান করলেন। পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মধ্যে এই গোপীরা বাস্তবিকই তাঁদের দেহরূপী জীবন সার্থক করেছেন, কারণ তাঁরা ভগবান গোবিন্দের জন্য অবিমিশ্র প্রেমের পূর্ণতা অর্জন করেছেন। যারা জড় অস্তিত্বে ভীত সন্ত্রস্ত, তারা ছাড়াও মহান মুনিগণ এবং সেই সঙ্গে আমাদেরও মধ্যে গোপীদের মতো শুদ্ধ প্রেম আকাঙ্ক্ষা করা হয়ে থাকে। যাঁরা অনন্ত সত্তাময় ভগবানের লীলাবর্ণনার স্বাদ গ্রহণ করেছেন, তাঁদের কাছে উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণরূপে জন্ম কিংবা স্বয়ং ব্রহ্মারূপে জন্মেরই বা কি প্রয়োজন থাকে? কতখানি বিস্ময়ের বিষয় যে, এই সমস্ত বনচারী, ব্যভিচার দোষে দুষ্ট মনে হওয়া, সাধারণ রমণীরা পরমাত্মা কৃষ্ণের জন্য অবিমিশ্র প্রেমের পূর্ণতা অর্জন করেছেন! তা হলে, এ কথা সত্যি যে, ভগবান স্বয়ং তাঁর অজ্ঞ পূজারীকেও আশীর্বাদ করেন, যেমন উত্তম ঔষধের উপাদানগুলি সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষ না জেনে গ্রহণ করলেও, তা ফলপ্রসু হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন রাসলীলায় গোপীদের সঙ্গে নৃত্য করছিলেন, তখন গোপীরা ভগবানের দুই বাহুতে আলিঙ্গিত্য হয়েছিলেন। লক্ষ্ণীদেবী বা চিন্ময় জগতের অন্যান্য স্ত্রীগণকেও এই অপ্রাকৃত অনুগ্রহ কখনও প্রদান করা হয়নি। এমনকি পদ্মসদৃশ দেহসৌরভ ও কান্তি বিশিষ্ট স্বর্গের অপ্সরাগণও এমন ঘটনা কখনও কল্পনাও করেন নি। জড় জাগতিক বিচারে অতি সুন্দরী রমণীদের কথা আর কি বলার আছে? মুকুন্দ বা কৃষ্ণ যাঁকে বৈদিক জ্ঞানের দ্বারা অন্বেষণ করা হয়, তাঁর পাদপদ্মে আশ্রয় গ্রহণ করার জন্য, ব্রজের গোপিকারা তাঁদের পতি, পুত্র ও পরিবার পরিজনকে- যাঁদের ত্যাগ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, তাঁদের পরিত্যাগ করেছেন। এমনকি তাঁরা তাঁদের চারিত্রিক জীবনধারাও পরিত্যাগ করেছেন। আহা! কবে আমার সেই ভাগ্য হবে, যেদিন আমি বৃন্দাবনে গুল্ম, লতা ও ঔষধি বৃক্ষ হয়ে জন্মগ্রহণ করব এবং গোপিকারা তাদের পদদলিত করে তাদের পদধূলির কৃপা লাভে ধন্য করবে। ব্রহ্মা ও সকল যোগেশ্বর দেবতাগণসহ স্বয়ং লক্ষ্ণীদেবীও তাঁর হৃদয়ে কেবল কৃষ্ণের পাদপদ্ম অর্চনা করতে পারেন। কিন্তু রাস নৃত্যের সময়ে ভগবান কৃষ্ণ ঐসকল গোপীদের স্তনে তাঁর চরণ স্থাপন করেছিলেন এবং সেই পাদদ্বয় আলিঙ্গন করে গোপীরা সকল সন্তাপ পরিত্যাগ করেছিলেন। আমি নন্দ মহারাজের ব্রজের রমণীদের পদধুলির নিরন্তর বন্দনা করি। এই গোপীরা যখন উচ্চৈঃস্বরে শ্রীকৃষ্ণের মহিমা কীর্তন করেন, তখন তার ধ্বনি ত্রিভুবনকে পবিত্র করে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “দশার্হর বংশধর উদ্ধব তারপর নন্দ মহারাজ, মা যশোদা এবং গোপীদের কাছ থেকে বিদায়ের অনুমতি গ্রহণ করলেন। তিনি সকল গোপদের বিদায় জানালেন এবং যাত্রার জন্য তার রথে আরোহণ করলেন। উদ্ধব যখন যাত্রা উন্মুখ, তখন নন্দ এবং অন্যান্য সকলে বিভিন্ন পূজার সামগ্রী ধারণ করে তাঁর দিকে অগ্রসর হলেন। তাঁদের অশ্রুপূর্ণ নয়নে তাঁকে উদ্দেশ করে তাঁরা বললেন- আমাদের সমস্ত মানসিক ক্রিয়াকলাপ যেন সর্বদা কৃষ্ণের পাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করে, আমাদের বাক্য সর্বদা যেন তাঁর নাম কীর্তন করে এবং আমাদের দেহ যেন সর্বদা তাঁর প্রতি প্রণত থাকে এবং তাঁর সেবা করে। আমাদের কর্মফল অনুযায়ী, ভগবানের ইচ্ছায় এই জগতের যেখানেই আমরা ভ্রমণ করি, আমাদের শুভ কর্ম ও দান যেন সর্বদা আমাদের কৃষ্ণের জন্য প্রেম প্রদান করে।”
“হে নরাধিপ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্য ভক্তির প্রকাশ সহ গোপগণ দ্বারা এইভাবে সম্মানিত হয়ে উদ্ধব তখন কৃষ্ণের সুরক্ষাধীন মথুরা নগরীতে প্রত্যাবর্তন করলেন। ভূমিষ্ট হয়ে প্রণতি নিবেদনের পর উদ্ধব ব্রজবাসীদের গভীর ভক্তির কথা শ্রীকৃষ্ণের কাছে বর্ণনা করলেন। উদ্ধব বসুদেব, শ্রীবলরাম এবং রাজা উগ্রসেনকেও তা বর্ণনা করলেন ও তাঁর সঙ্গে নিয়ে আসা শ্রদ্ধার্ঘগুলি তাঁদের প্রদান করলেন।”
সপ্তচত্বারিংশ অধ্যায়- ভ্রমর সঙ্গীত
14 Oct 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়