শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- সেই রাত্রিটি মথুরা নগরীতে অবস্থান করার পর মহা-মতি অক্রূর তাঁর রথে আরোহণ করে নন্দ মহারাজের গোকুলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। পথে যেতে যেতে মহাত্মা অক্রূর কমলনয়ন পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি পরম ভক্তি অনুভব করে এইভাবে ভাবতে লাগলেন। আমি কোন্ পুণ্যকর্ম করেছি, কি এমন কঠিন তপস্যা করেছি, এমন কি আরাধনা বা দান করেছি যে, আজ আমি শ্রীকেশবকে দর্শন করব? যেহেতু আমি একজন বিষয়মগ্ন জড়বাদী ব্যক্তি, তাই শূদ্র-কুল-জাত কারও পক্ষে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করার মতোই, ভগবান উত্তমশ্লোককে দর্শন করার এই সুযোগকে আমার দুর্লভ বলে মনে হচ্ছে। এরকম ভাবনা অনেক হয়েছে! শেষ পর্যন্ত আমার মতো একজন পতিত আত্মাও অচ্যুত পরমেশ্বর ভগবানকে দর্শন করার সুযোগ পেতে পারে, কারণ কখনও কোন বদ্ধজীবও কালনদীতে বাহিত হয়ে তীরে পৌছে যায়। আজ আমার সকল অমঙ্গল নষ্ট হল এবং আমার জন্মও সার্থক হল, কারণ যোগিগণেরও ধ্যেয় পরমেশ্বর ভগবানের পাদপদ্মদ্বয়ে আমি আমার প্রণাম নিবেদন করব। অবশ্যই রাজা কংস আজ আমাকে, এখন এই জগতে অবতীর্ণ ভগবান হরির চরণকমল দর্শন করতে প্রেরণ করে, অত্যন্ত অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছে। কেবলমাত্র তাঁর পদনখের কিরণ প্রভাবেই অতীতে অনেক আত্মা দুস্তর সংসারান্ধকার উত্তীর্ণ হয়ে মুক্তি লাভ করেছেন। সেই পাদপদ্ম ব্রহ্মা, শিব ও অন্যান্য সকল দেবতা দ্বারা, লক্ষ্ণীদেবী দ্বারা, এবং মহান মুনি ও বৈষ্ণবগণ দ্বারা অর্চিত হয় এবং ভগবান তাঁর সহচরগণসহ গোচারণকালে সেই চরণকমল দ্বারা বনে বিচরণ করেন, আর সেই চরণদ্বয় গোপীগণের কুচ-কুঙ্কুমে রঞ্জিত হয়ে থাকে। আমি নিশ্চয়ই ভগবান মুকুন্দের মুখমণ্ডল দর্শন করব কারণ হরিণেরা এখন আমার দক্ষিণ দিকে বিচরণ করছে। তাঁর কুঞ্চিত কেশ দ্বারা আবৃত সেই মুখমণ্ডল, তাঁর সুন্দর কপোল ও নাসিকা, তাঁর স্মিতহাস্যময় দুষ্টিপাত ও তাঁর রক্তকমলতুল্য নয়নদ্বয়ে বিভূষিত। যিনি তাঁর আপন মাধুর্যে এখন পৃথিবীর ভার লাঘবের জন্য মনুষ্যরূপ ধারণ করেছেন, সকল সৌন্দর্যের আধার সেই পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণুকে আমি দর্শন করতে চলেছি। তাই এটা অনস্বীকার্য যে, আমার নয়নদুটি তাদের অস্তিত্বের সার্থকতা লাভ করবে। তিনি জাগতিক কার্য ও কারণের সাক্ষী হয়েও সর্বদা অহঙ্কারশূণ্য। তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা তিনি ভেদ ও ভ্রমের অন্ধকার দূরীভূত করেন। তাঁর মায়া শক্তির উপর দৃষ্টিপাত করে তিনি এই জগতে যখন জীবের প্রকাশ ঘটান, তখন তাদের প্রাণ, ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধিতে অপ্রত্যক্ষভাবে তিনিও অনুভূত হন। পরমেশ্বর ভগবানের গুণ, কর্ম ও আবির্ভাব সকল পাপ বিনাশ করে সকল সৌভাগ্য সৃষ্টি করে এবং ঐ তিনটি বিষয় বর্ণনাকারী বাক্যসকল পৃথিবীকে প্রাণবন্ত, শোভিত ও পবিত্র করে। অন্যদিকে তাঁর মহিমাশূণ্য বাক্যরাশি শবদেহের অলঙ্কারতুল্য। নিজ সৃষ্ট ধর্মমর্যাদার পলনকারী সেই একই পরমেশ্বর ভগবান উন্নত দেবগণের আনন্দ বিধানের জন্য সাত্বত বংশে অবতীর্ণ হয়েছেন। বৃন্দাবনে বাস করে তিনি তাঁর যশ বিস্তার করছেন, সর্বমঙ্গপ্রদ সেই যশ দেবতারা গান করে থাকেন। মহাত্মাগণের গতি ও গুরু, ভুবনমধ্যে অদ্বিতীয় কমনীয়, চক্ষুষ্মানগণের মহানন্দদায়ক, প্রকৃতপক্ষে লক্ষ্ণীদেবীরও অভিলষিত আশ্রয়স্থল তাঁর সেই নিজ রূপ আজ আমি নিশ্চয়ই দর্শন করব। এখন আমার জীবনের সকল প্রভাতই হয়ে উঠছে মঙ্গলময়। অতঃপর আমি তৎক্ষণাৎ রথ থেকে অবতরণ করে পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ ও বলরামের চরণকমলে প্রণাম নিবেদন করব। আত্মোপলব্ধি লাভের কঠোর চেষ্টায় মহা-যোগিগণ তাঁদের সেই চরণই চিত্তে ধারণ করে থাকেন। আমি ভগবানের গোপবালক সখাবৃন্দ ও সকল বৃন্দাবনবাসীদেরও প্রণাম নিবেদন করব। আমি যখন তাঁর চরণে পতিত হব, তখন সর্বশক্তিমান ভগবান আমার মস্তকে তাঁর করকমল স্থাপন করবেন। বলশালী সর্পের মতো মহাকাল দ্বারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে যাঁরা তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করেন, এই হাত তাঁদের সকল ভয় দূর করে। সেই করকমলে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করে পুরন্দর ও বলি স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের মর্যাদা লাভ করেছিলেন এবং রাসনৃত্যের আনন্দময় লীলায় ভগবান যখন গোপীগণের স্বেদবিন্দু মুছে দিয়ে তাঁদের ক্লান্তি দূর করলেন, তাঁদের মুখমণ্ডলের স্পর্শজনিত সেই হাত সুগন্ধি ফুলের মতোই সুবাসিত হয়েছিল। যদিও কংস তাঁর দূত রূপে আমাকে এখানে প্রেরণ করেছে, তথাপি ভগবান অচ্যুত আমাকে শ্রত্রুরূপে বিবেচনা করবেন না। কারণ শেষ পর্যন্ত সর্বজ্ঞ ভগবানই এই দেহ রূপ ক্ষেত্রের প্রকৃত জ্ঞাতা এবং তাঁর নির্মল দৃষ্টিতে জীবের হৃদয়ের ভিতর ও বাহির সকল প্রয়াসেরই তিনি সাক্ষী। আমি যখন সংযতভাবে করজোড়ে তাঁর চরণে প্রণাম নিবেদনের জন্য পতিত হব, তখন তিনি আমার প্রতি কৃপাসিক্ত নয়নে দৃষ্টিপাত করবেন। তখন আমার সকল পাপ তৎক্ষণাৎ দূরীভূত হবে আর আমি তখন শঙ্কামুক্ত হয়ে পরম গভীর আনন্দ অনুভব করব। আমাকে অন্তরঙ্গ বন্ধু ও আত্মীয়রূপে হৃদয়ঙ্গম করে কৃষ্ণ তাঁর বলশালী বাহুদুখানি দিয়ে আমাকে আলিঙ্গন করবেন আর তৎক্ষণাৎ আমার দেহ পবিত্র হয়ে কর্ম জনিত সকল জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্ত হব। মহাযশা ভগবান কৃষ্ণের আলিঙ্গনবদ্ধ হয়ে আমি তাঁর সামনে করজোড়ে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকব আর তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলবেন, “হে প্রিয় অক্রুর।” সেই মুহূর্তে আমার জীবনের উদ্দেশ্যে পূর্ণ হবে। প্রকৃতপক্ষে, পরমেশ্বর ভগবানের কাছে যার জীবন আদৃত না হয়, তার জীবন নিষ্ফল। পরমেশ্বর ভগবানের কোন প্রিয় ও পরম সুহৃৎ নেই, এমন কি তিনি কাউকে অবাঞ্ছিত, দ্বেষযোগ্য বা উপেক্ষণীয়ও মনে করেন না। তাঁর ভক্তগণ যে যেভাবে তাঁর ভজনা করে, প্রেমময় তিনি সেইভাবেই ফল প্রদান করেন, ঠিক যেমন স্বর্গের কল্পবৃক্ষের কাছে প্রার্থিত সকল আকাঙ্ক্ষাই পূর্ণ হয়। অতঃপর আমি যখন আমার মস্তক অবনত করে দণ্ডায়মান থাকব, শ্রীকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, যদুশ্রেষ্ঠ আমাকে আলিঙ্গন করার পর আমার অঞ্জলিবদ্ধ হাত ধারণ করে তাঁর গৃহে নিয়ে যাবেন। সেখানে তিনি আমাকে সকল উপচারে স্বাগত সম্মান জানাবেন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি কংস কিরকম আচরণ করছে, আমার কাছে তা জানতে চাইবেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী আরও বললেন- “হে রাজন, শ্বফল্কপুত্র যখন পথে যাত্রা করছিলেন, তখন এইভাবে গভীরভাবে শ্রীকৃষ্ণ-চিন্তায় মগ্ন হয়ে, সূর্য অস্তাচল প্রারম্ভে তিনি গোকুলে উপনীত হলেন। নিখিল লোকপালগণ তাঁদের কিরীটে যাঁর পবিত্র চরণরেণু ধারণ করেন, তাঁর সেই পদচিহ্ন অক্রুর গোষ্ঠে দর্শন করলেন। পদ্ম, যব ও অঙ্কুশ চিহ্নিত ভগবানের স্বতন্ত্র সেই পদচিহ্ন ভূমিতলকে অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছিল। ভগবানের পদচিহ্ন দর্শনের আনন্দে চঞ্চল হয়ে শুদ্ধপ্রেমবশত তিনি রোমাঞ্চিত হলেন এবং তাঁর নয়নদুটি অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠল। অক্রুর তাঁর রথ থেকে লাফ দিয়ে নেমে ‘আহা, এই আমার প্রভুর পদদ্বয়ের ধূলিকণা’ বলে চিৎকার করে ঐ পদচিহ্নের মধ্যে গড়াতে শুরু করলেন। সকল জীবের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই আনন্দ, যা কংসের নির্দেশ পওয়ার পর, সকল দম্ভ, ভয়, অনুতাপ পরিত্যাগ করে শ্রীকৃষ্ণের দর্শন, শ্রবণ ও স্মৃতি বর্ণনায় মগ্ন হয়ে অক্রূর অর্জন করেছিলেন। অক্রূর কৃষ্ণ ও বলরামকে ব্রজের গোদোহন স্থানে দর্শন করলেন। কৃষ্ণ পীত ও বলরাম নীল বসন পরিধান করেছিলেন আর তাঁদের নয়নদুটি ছিল শরৎকালীন কমলের মতো। বলশালী বাহু সেই দুই বালকের শ্যামবর্ণের একজন ছিলেন লক্ষ্ণীদেবীর আশ্রয়স্বরূপ আর অন্য জন ছিলেন শ্বেতবর্ণের। তাঁদের সুন্দর মুখমণ্ডলের জন্য তাঁরা ছিলেন পরম সুন্দর পুরুষ। তাঁরা যখন সদয় হাস্যযুক্ত দৃষ্টিপাতে হস্তী শিশুর মতো বিচরণ করেন, তখন সেই দুটি প্রধান পুরুষের ধ্বজা, বজ্র, অঙ্কুশ ও পদ্ম চিহ্নিত চরণচিহ্নে, ব্রজভূমি সুশোভিত হয়ে ওঠে। সেই দুই উদার ও মনোরম লীলাপুরুষ রত্নহার ও বনমালায় অলঙ্কৃত, পবিত্র, গন্ধ-দ্রব্যে অনুলিপ্ত, সদ্যস্নাত, এবং নিষ্কলঙ্ক বেশভূষায় সজ্জিত ছিলেন। জগৎ পতি স্বরূপ এই দুই আদিপুরুষ জগতের কল্যাণের জন্য, কেশব ও বলরাম, তাঁদের দুই পৃথক রূপে এখন অবতীর্ণ হয়েছেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, তাঁরা যেন দুটি সুবর্ণ পর্বতের মতো, একজন মরকতমণ্ডিত এবং অন্যজন রজতশুভ্র রূপচ্ছটায় সকল দিকে আকাশের তমসা দূর করছে। স্নেহবিহ্বল অক্রূর তাঁর রথ থেকে সত্বর লাফ দিয়ে অবতরণ করে কৃষ্ণ ও বলরামের চরণপ্রান্তে দণ্ডবৎ পতিত হলেন। পরমেশ্বর ভগবানকে দর্শনের আনন্দে অক্রূরের নয়নদ্বয় অশ্রু-প্লাবিত হয়েছিল এবং তাঁর অঙ্গ পুলকে শোভিত হয়েছিল। হে রাজন, উৎকন্ঠাবশত তিনি নিজের পরিচয় দিতেও সমর্থ হলেন না। অক্রূরকে চিনতে পেরে, ভগবান কৃষ্ণ তাঁর রথচক্র চিহ্নিত হস্ত দ্বারা তাঁকে কাছে টেনে নিয়ে আলিঙ্গন করলেন। কৃষ্ণ সন্তোষ অনুভব করেছিলেন, কারণ তিনি সর্বদাই তাঁর শরণাগত ভক্তবৃন্দের প্রতি প্রসন্ন মনোভাবাপন্ন। শ্রীসঙ্কর্ষণ (বলরাম) প্রণতরূপে দণ্ডায়মান অক্রূরের যুক্তকর ধারণ করে শ্রীকৃষ্ণের সাথে তাঁকে তাঁর গৃহে নিয়ে এলেন। অক্রূরের যাত্রার কুশল জিজ্ঞাসা করার পর বলরাম তাঁকে উৎকৃষ্ট আসন প্রদান করে শাস্ত্রবিধি অনুসারে তাঁর পাদপ্রক্ষালন করিয়ে সম্মান সহকারে মধুপর্ক প্রদান করলেন। সর্বশক্তিমান ভগবান বলরাম অক্রূরকে গাভী দান করলেন, তাঁর শ্রান্তি দূর করার জন্য পাদসম্বাহন করলেন আর তারপর অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সঙ্গে উপযুক্তভাবে প্রস্তুত বিভিন্ন সুস্বাদু অন্ন পরিবেশন করলেন। অক্রূর তাঁর তৃপ্তি সহকারে ভোজন করার পর ধর্মজ্ঞ শ্রীবলরাম তাঁকে মুখবাস, গন্ধ ও মাল্য প্রদান করলেন। এইভাবে অক্রূর পুনরায় পরম আনন্দ লাভ করলেন।”
নন্দ মহারাজ অক্রূরকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে দাশার্হ, ক্রূর কংস জীবিত থাকতে তোমরা কিভাবে জীবন ধারণ করছ? তোমরা ঠিক যেন পশুঘাতকের যত্নাধীন মেষের মতো। ক্রূর, আত্মতৃপ্তপরায়ণ কংস তার নিজের ভগিনীর উপস্থিতিতেই রোরুদ্যমান সেই ভগিনীর সন্তানদের হত্যা করেছে। তাই আমরা কেনই বা আর তার প্রজাদের কুশল জিজ্ঞাসা করব? এরূপ সত্য ও মধুর বচনের প্রশ্নের দ্বারা নন্দ মহারাজ কর্তৃক সম্ভাষিত হয়ে অক্রূর তাঁর পথশ্রম বিস্মৃত হয়েছিলেন।”
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়- অক্রূরের বৃন্দাবনে আগমন
01 Sep 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়