শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “সেই সময় অরিষ্টাসুর গোষ্ঠে আগমন করেছিল। বিশাল কুঁজ বিশিষ্ট বৃষাকৃতি ধারণ করে তার খুর দিয়ে সে ভূমিভাগ কম্পিত ও বিদীর্ণ করেছিল। অরিষ্টাসুর ভয়ঙ্কর বৃষ-গর্জন করতে করতে ভূমিতলকে বিদীর্ণ করছিল। ঊর্ধ্ব পুচ্ছ ও তার বিস্ফারিত চক্ষে, সে তার শৃঙ্গাগ্রভাগ দ্বারা তটদেশে উৎক্ষিপ্ত করছিল আর মধ্যে মধ্যে অল্প অল্প বিষ্ঠা ও মূত্র পরিত্যাগ করছিল। হে রাজন, তীক্ষ্ণ-শৃঙ্গ অরিষ্টাসুরের কুঁজকে পর্বতভ্রমে সেখানে মেঘরাশি বিচরণ করছিল, আর সেই অসুরকে দেখে গোপ ও গোপীগণ আতঙ্কগ্রস্ত হলেন। বাস্তবিকই, তার তীক্ষ্ণ প্রতিধ্বনিত গর্জন এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে, গর্ভবতী ধেনু ও নারীগণের গর্ভস্রাবে ভ্রূণ নষ্ট হয়েছিল। হে রাজন, গৃহপালিত পশুগণ ভীত হয়ে গোষ্ঠ পরিত্যাগ করেছিল আর সকল অধিবাসীগণ ‘হে কৃষ্ণ, হে কৃষ্ণ’ বলে চিৎকার করে শ্রীগোবিন্দের শরণাগত হয়েছিলেন।”
“পরমেশ্বর ভগবান গোকুলকে ভয়বিহ্বল দর্শন করে ‘তোমরা ভয় পেয়ো না’ এই বলে তাদের আশ্বস্ত করে বৃষাসুরকে আহ্বান করলেন। ওরে মূঢ়! অসত্তম! গোপ ও তাদের পশুদের ভীত করে তুই কি করছিস বলে ভেবেছিস, যেখানে তোর মতো অসৎ দুরাত্মাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য আমি উপস্থিত রয়েছি! এই কথা বলে ভগবান অচ্যুত করতল দ্বারা তাঁর বাহু আস্ফোটন করে উচ্চ শব্দ দ্বারা অরিষ্টাসুরকে আরো ক্রুদ্ধ করে তুললেন। অতঃপর ভগবান শ্রীহরি এক সখার স্কন্ধে তাঁর সর্পদেহরূপ স্বীয় ভুজ প্রসারিত করে অসুরটির দিকে মুখ করে দণ্ডায়মান হলেন। এইভাবে কুপিত হয়ে অরিষ্ট তার একটি খুর দিয়ে ভূমি বিদীর্ণ করে, উদ্যত পুচ্ছ দিয়ে মেঘরাশিকে ঘূর্ণিত করে ক্রুদ্ধভাবে কৃষ্ণের দিকে ধাবিত হল। অরিষ্ট তার শৃঙ্গ দুটির অগ্রভাগ সম্মুখে বিন্যস্ত করে, তার রক্তবর্ণ দুই চোখ দিয়ে বক্রভাবে শ্রীকৃষ্ণের দিকে ভীতি প্রদর্শনকারী দৃষ্টিপাত করে ইন্দ্র নিক্ষিপ্ত বজ্রের মতো পূর্ণগতিতে কৃষ্ণের দিকে দৌড়ে এল। পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ অরিষ্টাসুরের শৃঙ্গদুটি ধারণ করে তাকে অষ্টাদশ পদক্ষেপ পশ্চাতে নিক্ষেপ করলেন, ঠিক যেমন একটি হাতী প্রতিপক্ষ হাতীর সঙ্গে লড়াইয়ের সময় করে থাকে। এইভাবে পরমেশ্বর ভগবান দ্বারা প্রতিনিবৃত্ত হয়ে বৃষভাসুর উত্থিত হয়ে নিঃশ্বাস নিতে নিতে ঘর্মাক্ত কলেবরে পুনরায় তাঁকে ক্রোধে জ্ঞানশূণ্য হয়ে আক্রমণ করল। অরিষ্ট আক্রমণ করলে শ্রীকৃষ্ণ তার শৃঙ্গদ্বয় ধারণ করে তাকে ভূপাতিত করে পদাঘাত করলেন। সিক্ত বস্ত্র ভূমিতে নিক্ষেপ করার মতো ভগবান তাকে প্রহার করলেন এবং শেষপর্যন্ত তিনি দানবের একটি শৃঙ্গ উৎপাটন করে, যতক্ষণ না সে ভূমিতে শায়িত হয়, তা দিয়ে তাকে আঘাত করছিলেন। রক্তবমন ও প্রচুর মলমূত্র ত্যাগ করে, বিক্ষিপ্ত নেত্রে পাগুলি ইতস্তত বিক্ষেপ করতে করতে অরিষ্টাসুর অত্যন্ত কষ্টকরভাবে মৃত্যুলোকে গমন করল। দেবতাগণ ভগবান কৃষ্ণের উপর পুষ্পবর্ষণ করে তাঁর স্তব করলেন। এইভাবে বৃষভাসুর অরিষ্টকে বধ করে গোপীগণের নয়নের উৎসব স্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ, বলরামকে সঙ্গে নিয়ে গোষ্ঠে প্রবেশ করলেন।”
“অদ্ভুতকর্মা কৃষ্ণ দ্বারা অরিষ্টাসুর নিহত হলে নারদ মুনি রাজা কংসকে তা বলার জন্য গমন করলেন। দিব্যদর্শন সেই ভগবান নারদ রাজাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন- প্রকৃতপক্ষে যশোদার সন্তান ছিল একটি কন্যা আর কৃষ্ণ হচ্ছে দেবকীর পুত্র। রামও রোহিণীর পুত্র। বসুদেব ভীত হয়ে তাঁর মিত্র নন্দ মহারাজের কাছে কৃষ্ণ ও বলরামকে সমর্পণ করেছিলেন আর এই দুই বালকই তোমার লোকেদের বধ করেছে। এই কথা শ্রবণ করে ভোজপতি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে তার ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসুদেবকে হত্যার জন্য একটি শাণিত তরবারি হাতে তুলে নিল। কিন্তু বসুদেবের দুই পুত্রই তার মৃত্যুর কারণ, একথা তাকে স্মরণ করিয়ে নারদ কংসকে নিবারিত করলেন। অতঃপর কংস বসুদেবকে সপত্নীক লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছিল।”
“নারদ প্রস্থান করলে, রাজা কংস কেশীকে আহ্বান করে তাকে নির্দেশ দিয়েছিল, ‘যাও, বলরাম আর কৃষ্ণকে হত্যা কর।’ ভোজরাজ অতঃপর মুষ্টিক, চাণূর, শল, তোশল প্রমুখ তার মন্ত্রীগণ ও তার হস্তীপালকদের আহ্বান করল। রাজা তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিল- প্রিয় বীর চাণূর ও মুষ্টিক, আমার কথা শোনো। আনকদুন্দুভির (বসুদেব) পুত্র বলরাম ও কৃষ্ণ নন্দের ব্রজে বাস করছে। ভবিষ্যদ্বাণী হয়েছে যে, এই দুটি বালক আমার মৃত্যুর কারণ হবে। তাদের যখন এখানে নিয়ে আসা হবে, তখনই মল্লক্রীড়ার ছলে তোমরা তাদের হত্যা করবে। চতুর্দিকে বিধি দর্শক মঞ্চ বিশিষ্ট একটি মল্লক্ষেত্র নির্মাণ কর এবং সকল পুরবাসী ও জনপদবাসীকে এই মুক্ত প্রতিযোগিতা দর্শন করার জন্য নিয়ে এস। তুমি, হস্তীপালক, হে ভদ্রে, কুবলয়াপীড় হস্তীকে মল্লক্ষেত্রের প্রবেশ পথে রাখবে আর তার দ্বারা আমার দুই শত্রুকে হত্যা করাবে। যথাযথ বৈদিক নির্দেশ অনুসারে চতুর্দশী তিথিতে ধনুর্যজ্ঞ শুরু করা হোক। মহানুভব শিবের উদ্দেশ্যে উপযুক্ত পশু বলিদান করা হোক।”
“তার মন্ত্রীদের এরূপ নির্দেশ প্রদান করে কংস অতঃপর যদুশ্রেষ্ঠ অক্রূরকে আহ্বান করল। ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনে পারদর্শী কংস অক্রূরের হাত নিজ হাতে ধারণ করে তাকে বলতে লাগল- প্রিয় অক্রূর, দানপতি, মিত্রতাবশত আমার জন্য সাদরে কিছু কর। ভোজ ও বৃষ্ণিদের মধ্যে তোমার মতো আমাদের প্রতি দয়ালু আর কেউ নেই। সৌম্য অক্রূর, তুমি সর্বদা শান্তভাবে কর্তব্যপালন কর, আর তাই আমি তোমার উপর নির্ভর করছি, ঠিক যেভাবে শক্তিশালী ইন্দ্র তাঁর লক্ষ্য অর্জনের জন্য শ্রীবিষ্ণুর আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন। যেখানে আনকদুন্দুভির দুই পুত্র বাস করছে, সেই নন্দের গ্রামে তুমি গমন কার আর বিলম্ব না করে এই রথে করে তাদের নিয়ে এসো। বিষ্ণুর আশ্রিত দেবতাগণ এই দুই বালককে আমার মৃত্যুরূপে প্রেরণ করেছে। তাদের এখানে নিয়ে এস আর নন্দ ও অন্যান্য গোপগণও শ্রদ্ধার্ঘসহ এখানে আসুক। কৃষ্ণ ও বলরামকে এখানে আনবার পরে আমি স্বয়ং যমতুল্য আমার হস্তী দ্বারা তাদের হত্যা করব আর দৈবাৎ যদি তারা তা থেকে নিষ্কৃতি পায়, তখন আমি বজ্রতুল্য আমার মল্লযোদ্ধাদের দ্বারা তাদের বধ করাব। এই দুজন নিহত হলে আমি বসুদেবকে এবং বৃষ্ণি, ভোজ ও দশার্হ বংশজাত তাদের সকল শোকসন্তপ্ত বান্ধবদের বধ করব। আমার রাজ্যলোভী বৃদ্ধ পিতা উগ্রসেন, তার ভ্রাতা দেবক ও আমার অন্যান্য সকল শত্রুদেরও আমি হত্যা করব। হে মিত্র, অতঃপর এই পৃথিবী কন্টকশূণ্য হবে। আমার গুরুজন জরাসন্ধ ও প্রিয় সখা দ্বিবিদের মতোই শম্বর, নরক ও বাণ আমার দৃঢ় শুভাকাঙ্ক্ষী। দেবতাদের পক্ষ গ্রহণকারী রাজাদের হত্যা করতে আমি এদের ব্যবহার করব আর তারপর আমি পৃথিবী শাসন করব। এখন তুমি আমার উদ্দেশ্যে হৃদয়ঙ্গম করেছ, সত্বর যাও, ধনুর্যজ্ঞ ও যদুপুরীর ঐশ্বর্য দর্শন করার জন্য কৃষ্ণ ও বলরামকে নিয়ে এসে।”
শ্রীঅক্রূর বললেন- “হে রাজন, আপনার দুর্ভাগ্য থেকে মুক্ত হবার কুশলী পন্থা আপনি রচনা করেছেন। তবুও, সিদ্ধি ও অসিদ্ধি বিষয়ে সমান জ্ঞান করা উচিত, কারণ নিশ্চিতভাবে দৈবই মানুষের কার্যের ফল প্রদান করে থাকে। মানুষের আকাঙ্ক্ষাপূরণ দৈব প্রতিহত করা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ তার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কর্ম করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে। তাই সে হর্ষ ও শোক উভয়েরই সম্মুখীন হয়। যদিও এটাই বাস্তব সত্য, তবু আমি আপনার নির্দেশ পালন করব।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে অক্রূরকে নির্দেশ প্রদান করে রাজা কংস তার মন্ত্রীদের বিদায় দিয়ে গৃহে প্রবেশ করলে অক্রূরও গৃহে ফিরে গেলেন।”
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়- অরিষ্টাসুর বধ
27 Aug 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়