পঞ্চত্রিংশতি অধ্যায়- কৃষ্ণের বনগমনে গোপীদের বিরহগীতি

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “কৃষ্ণ যখন বনে গমন করতেন, তখন কৃষ্ণানুগতচিত্তা গোপীগণ তাঁর লীলা গান করে দুঃখের সঙ্গে তাঁদের দিন অতিবাহিত করতেন।”
গোপীগণ বললেন- “মুকুন্দ যখন তাঁর বাম কপোল বাম বাহুমূলে বিন্যস্ত করে ওষ্ঠে বংশী স্থাপন ও কোমল অঙ্গুলি দ্বারা ছিদ্রসকল ধারণ করে, ভ্রুযুগল সঞ্চালিত করে তা ধ্বনিত করেন, তখন নিজ নিজ পতিদের সঙ্গে গগনবিহারিণী সিদ্ধ বনিতাগণও বিস্মিত হয়ে যান। তাঁরা তা শ্রবণ করে কামপরবশচিত্ত হয়ে নিজেদের কটিবস্ত্র স্খলিত হলেও তা অবগত না হওয়াতে লজ্জিতা হলেন। হে অবলাগণ, আরও আশ্চর্যের বিষয় শ্রবণ কর। এই নন্দনন্দন যিনি আর্তজনের আনন্দদাতা, তাঁর বক্ষস্থলে স্থির-বিদ্যুৎকে বহন করেন আর তাঁর হাস্য রত্নহার তুল্য। তিনি যখন বেণু বাদন করেন ব্রজের বৃষ, হরিণ ও ধেনুগণের বিভিন্ন দল বহু দূর হতে সেই বংশী ধ্বনি শ্রবণে মোহিত হয়ে, কর্ণ উত্তোলিত করে, তাদের মুখের খাদ্য চর্বন বন্ধ করে যেন নিদ্রিত কিম্বা চিত্রবৎ অবস্থান করতে থাকে। হে সখি, কখনও মুকুন্দ ময়ূরপুচ্ছ, গৈরিকাদি ধাতু ও পল্লব দ্বারা শোভিত হয়ে মল্লগণের অনুকরণ করে বলরাম ও অন্যান্য গোপবালকের সঙ্গে বেণুবাদন করে ধেনুগণকে আহ্বান করেন, তখন নদীগুলিও অভিভূত হয়ে পবনবাহিত তাঁর চরণকমল রেণু লাভের আকাঙ্ক্ষায় সাগ্রহে নিবৃত্তগতি হয়ে অবস্থান করে। কিন্তু আমাদের মতো তারাও অল্পপুণ্যা আর তাই কম্পিতকরে অপেক্ষা করে। নিরন্তর তাঁর বীর্যবত্তার মহিমা কীর্তনকারী সখাদের সঙ্গে কৃষ্ণ বনে ভ্রমণ করেন। আর এইভাবে তিনি পরমেশ্বর ভগবানের মতো আবির্ভূত হয়ে তাঁর অনন্ত ঐশ্বর্যসমূহ প্রকাশ করেন। ধেনুগণ যখন গিরিতটে বিচরণ করে, তাঁর বংশী-ধ্বনির মাধ্যমে তিনি তাদের আহ্বান করেন, তখন পুষ্পফলপূর্ণ ভারাবনত শাখা যুক্ত বনলতা ও তরুসকল নিজেদের মধ্যে যেন প্রকাশমান শ্রীবিষ্ণুকে ব্যক্ত করে প্রেমপুলকিত গাত্রে মধুধারা বর্ষণ করে। সুদর্শন পুরুষগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এই কৃষ্ণ যখন বনমালাস্থিত দিব্যগন্ধ তুলসীর মধুমত্ত ভ্রমরসমূহের অনুকূল উচ্চগীত সাদরে গ্রহণ করে স্বীয় অধরে বংশী সংযুক্ত করে তা বাদন করেন, তখন ঐ সুমধুর বংশীগীত শ্রবণে হৃতচিত্ত হয়ে সরোবরস্থিত সারস, হংস প্রভৃতি বিহঙ্গগণ সেখানে আগমন করে একাগ্রচিত্ত, নিমীলিত নয়ন ও মৌনভাব অবলম্বন করে তাঁর নিকটে উপবেশন করে।”
“হে ব্রজদেবীগণ, কৃষ্ণ যখন ক্রীড়াচ্ছলে তাঁর চূড়ায় একটি ফুলশালা পরিধান করে বলদেবের সঙ্গে পর্বতের তটভাগে লীলাবিলাস করেন, তখন তাঁর বংশীর সকল নাদ ধ্বনিত করতে করতে সমগ্র জগতকে তিনি আনন্দময় করে তোলেন। সেই সময় নিকটস্থ মেঘরাশি মহান- ব্যক্তিত্বকে অতিক্রমণ শঙ্কায় অতি মৃদুভাবে গর্জন করে সঙ্গত করতে থাকে। মেঘরাশি তাদের প্রিয় সুহৃদ কৃষ্ণের উপর পুষ্পবর্ষণ করতে থাকে আর ছত্রের মতো ছায়া দান করে। হে পুণ্যবতী মা যশোদা, বিভিন্ন গোপক্রীড়ায় নিপুণ তোমার তনয় বেণুবাদনের অনেক নতুন স্বরালাপের উদ্ভাবন করেছে। সে যখন অধরবিম্বে বংশী সংযোগ করে বৈচিত্রময় সুরলহরীর ঐকতান প্রকাশ করে, তখন ব্রহ্মা, শিব, ইন্দ্র প্রমুখ দেবশ্রেষ্ঠগণও সেই ধ্বনি শ্রবণ করে বিহ্বল হয়ে পড়েন। যদিও তাঁরা বিদ্বজ্জন কিন্তু তাঁরা সেই স্বরালাপের তত্ত্ব নির্ণয় করতে পারেন না আর তাই তাঁরা তাদের মস্তক ও হৃদয় অবনত করেন। কৃষ্ণ যখন বজ্র, অঙ্কুশ ও পদ্মচিহ্নযুক্ত নিজ পাদপদ্ম দ্বারা গাভীদের খুরাক্রমণ জনিত ব্রজভূমির বেদনার উপশম করে, বেণুবাদন সহকারে গজেন্দ্র মন্থরভাবে গমন করেন, তখন তাঁর স-বিলাস দৃষ্টিপাতে আমরা সখীরা কাম দ্বারা তাড়িত হওয়ায় বৃক্ষের মতো জড় দশা প্রাপ্ত হয়ে জানতেও পারি না যে, আমাদের কেশ ও বসন স্খলিত হয়েছে। কৃষ্ণ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে গ্রথিত মণিমালায় তাঁর গাভীদের গণণা করছেন। তিনি তাঁর অতিশয় প্রিয় গন্ধযুক্ত তুলসী মঞ্জরীর মালা পরিধান করে তাঁর কোন প্রিয় গোপবালকের স্কন্ধে ভুজভার অর্পণ করে বেণুবাদন করলে তা কৃষ্ণসার হরিণ-পত্নীদের আকর্ষণ করে, আর তারা গোপীদের মতোই গৃহাভিলাষ পরিত্যাগ করে গুণসাগর শ্রীকৃষ্ণ সমীপে উপস্থিত হয়ে উপবেশন করে।”
“হে শুদ্ধশীলে, যশোদা, তোমার প্রিয় বৎস, নন্দনন্দন কুন্দ-কুসুম-মাল্যে তাঁর আনন্দময় শোভাবর্ধন করে গোপ ও গোধনসমূহ সঙ্গে প্রণয়ীগণের হর্ষ উৎপাদন করতে করতে যমুনা তটে বিহার করছে। মৃদুমন্দ বায়ু চন্দন সৌরভ দ্বারা তাঁকে সম্মান জ্ঞাপন করছে আর বিভিন্ন উপদেবতাগণ চতুর্দিকে দণ্ডায়মান হয়ে তাদের গীত বাদ্য ও শ্রদ্ধার্ঘে তাঁর স্তুতি নিবেদন করছে। ব্রজের গোসমূহের প্রতি পরম প্রীতিবশত কৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বত উত্তোলন করেছিলেন। দিনের শেষে তাঁর গোসমূহকে একত্রিত করে তিনি বেণুবাদন করেন আর যখন পথের ধারে দণ্ডায়মান উন্নত দেবগণ তাঁর পাদপদ্মদ্বয়ের আরাধনা করেন, তাঁর সহচর গোপবালকগণ তাঁর মহিমা কীর্তন করে থাকেন। গোখুর উত্থিত ধূলিকণায় তাঁর মালা ধূসরিত হয় আর তাঁর পরিশ্রান্তজনিত বর্ধিত সৌন্দর্য সকলের কাছেই হয় নয়নের উৎসব স্বরূপ। মা যশোদার জঠর হতে উদিত কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর সুহৃদগণের বাসনা পূরণে বিশেষ আগ্রহী। সুহৃদগণের সম্মান প্রদাতা ঈষৎ মদ বিঘূর্ণিত নয়ন যাঁর, তিনি ফুলমালা পরিহিত এবং তাঁর সুবর্ণ কুণ্ডল শোভায় সুকোমল গণ্ডদেশ বিভূষিত করে বদর-ফল-তুল্য পাণ্ডুবর্ণ মুখমণ্ডলে, রাত্রির অধীশ্বর চন্দ্রের মতো প্রসন্ন বদনে ও গজেন্দ্র গতিতে দিনের তাপ হতে ব্রজের গাভীদের উদ্ধার করে তিনি, কৃষ্ণ স্বায়ংকালে প্রত্যাবর্তন করেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন, এইভাবে বৃন্দাবনের রমণীগণ দিবসকালে অবিরাম কৃষ্ণ-লীলা গান করে আনন্দ লাভ করতেন আর তাঁদের চেতনা ও মন তাঁর প্রতি মগ্ন হয়ে মহোৎসবে পূর্ণ থাকত।”

Leave a Reply

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,959 hits