শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন, এইভাবে নানা মধুর উপায়ে তাঁদের হৃদয় হতে উৎসারিত গান ও প্রলাপ করতে করতে গোপীরা উচ্চৈঃস্বরে রোদন শুরু করলেন। তাঁরা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শনের জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল ছিলেন। অতঃপর ভগবান কৃষ্ণ সহাস্যবদনে গোপীদের সম্মুখে আবির্ভূত হলেন। মালা ও পীতবসন পরিহিত, সাধারণ মানবের মন-হরণকারী স্বয়ং কামদেবেরও মনোমোহন রূপে তিনি আবির্ভূত হলেন। গোপীগণ যখন দেখলেন যে, তাঁদের প্রিয়তম কৃষ্ণ তাঁদের কাছে ফিরে এসেছেন, তখন তাঁরা তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন আর তাঁর প্রতি প্রীতিবশত তাঁদের নেত্রদ্বয় উৎফুল্লিত হয়ে উঠল। যেন তাঁদের জীবনে প্রাণবায়ু ফিরে এল। একজন গোপী আনন্দে কৃষ্ণের হাত তাঁর অঞ্জলিবদ্ধ হাতে গ্রহণ করলেন এবং আরেকজন কৃষ্ণের চন্দনচর্চিত বাহু তাঁর স্কন্ধে ধারণ করলেন। এক তন্বী গোপী অঞ্জলিবদ্ধ হাতে শ্রদ্ধাপূর্ণভাবে কৃষ্ণচর্বিত তাম্বূল গ্রহণ করলেন আর অন্য একজন বিরহ সন্তপ্ত গোপী তাঁর পাদপদ্মদ্বয় তাঁর স্তনযুগলে স্থাপন করলেন। প্রেমময় ক্রোধে বিহ্বল একজন গোপী ওষ্ঠ দংশন করে ভ্রুকুটিযুক্ত কটাক্ষপাত দ্বারা কৃষ্ণকে যেন তাড়িত করতে লাগলেন। ঠিক যেমন যোগীগণ তাঁর চরণে মনোনিবেশ করেও কখনও তৃপ্ত হন না, তেনমই অন্য একজন গোপী কৃষ্ণের বদন-কমল অপলক নয়নে অবলোকন করে তাঁর মাধুর্য গভীরভাবে আস্বাদন করেও যেন তৃপ্ত হতে পারলেন না। একজন গোপী স্বীয় নেত্র-রন্ধ্রের মাধ্যমে ভগবানকে তাঁর হৃদয়ে স্থাপন করলেন। তারপর চক্ষু মুদিত করে পুলকিত শরীরে তাঁকে অনবরত আলিঙ্গনে তিনি ভগবানের ধ্যানরত এক যোগীর মতো হয়ে উঠলেন।”
“তাঁদের প্রিয় কৃষ্ণকে পুনরায় দর্শন করে সকল গোপীগণ পরমানন্দে মত্ত হয়ে উঠলেন। সংসারতপ্ত ব্যক্তিগণ কোনও পরম ভাগবতকে প্রাপ্ত হলে যেমন তাঁদের দুর্দশা বিস্মৃত হয়, ঠিক তেমনই তাঁরা বিরহ-যন্ত্রনা পরিত্যাগ করেছিলেন। সর্বসন্তাপমুক্ত গোপীগণ দ্বারা পরিবৃত হয়ে পরমেশ্বর ভগবান অচ্যুত দীপ্তিমানরূপে বিরাজ করছিলেন। হে রাজন, ঐশ্বর্যাদিময়ী স্বরূপশক্তি দ্বারা পরিবৃত হয়ে পরমাত্মা যেভাবে শোভা পান, শ্রীকৃষ্ণও এইভাবে দীপ্যমান হয়ে ছিলেন। সর্বশক্তিমান ভগবান অতঃপর গোপীদের তাঁর সঙ্গে কালিন্দীর হস্তরূপ তরঙ্গ দ্বারা ব্যাপ্ত, কোমল বালুকাময় তটে নিয়ে গেলেন। সেই পবিত্র স্থানের প্রস্ফুটিত কন্দ ও মন্দার ফুলের সৌরভ বাহিত বাতাস ভ্রমরদের অvকর্ষিত করেছিল আর শরৎকালীন চন্দ্রের কিরণ-প্রাচুর্য রাত্রির অন্ধকার দূর করেছিল। কৃষ্ণ দর্শনে মূর্তিমান বেদগণ যেমন পূর্ণ মনস্কাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তেমনি কৃষ্ণ-দর্শনের আনন্দে গোপীগণের হৃদয়ের ব্যথাও দূরীভূত হল। তাঁদের স্তনের কুঙ্কুম-রঞ্জিত উত্তরীয় দ্বারা, তাঁদের প্রিয়তম কৃষ্ণের জন্য তাঁরা আসন রচনা করলেন। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, যাঁর জন্য যোগেশ্বরগণও তাঁদের হৃদয় মধ্যে আসন কল্পনা করেন, তিনি গোপীগণের সভামধ্যে তাঁর আসন গ্রহণ করলেন। গোপীগণ তাঁর অর্চনা করলে, ত্রি-লোকে লক্ষ্ণীর একমাত্র আবাসস্থল রূপ তাঁর চিন্ময় শরীর দীপ্যমান শোভায় প্রকাশিত হয়েছিল। গোপীগণ তাঁদের কোলে অনঙ্গবর্ধক কৃষ্ণের হস্ত ও পদদ্বয় স্থাপনা করে, কটাক্ষ, হাস্যলীলা ও ভ্রুবিলাসবিভ্রম মাধ্যমে তাঁকে সম্মানিত করলেন। এমন কি যখন তাঁরা অর্চনা করছিলেন, কিঞ্চিত ক্রোধ অনুভবের মাধ্যমে, তাঁরা তাঁর উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন- “কিছু মানুষ কেবল তাদেরই ভালবাসে, যারা তাদের ভালবাসে, যখন অন্যান্যরা সেই সব জনদেরও ভালবাসে যারা তাদের ভালবাসে না বা বিরোধীভাবাপন্ন। এরপরেও আরো কিছু মানুষ রয়েছে, যারা কারও প্রতিই ভালবাসা প্রদর্শন করে না। প্রিয় কৃষ্ণ দয়া করে এই ব্যাপারটি আমাদের যথাযথভাবে বর্ণনা কর।”
পরমেশ্বর ভগবান বললেন- “তথাকথিত সুহৃদগণ যারা নিজেদের লাভের আশায় পরস্পরকে ভালবাসা প্রদর্শন করে, তারা প্রকৃতপক্ষে স্বার্থপর। তাদের মধ্যে সত্যিকারের সৌহার্দ্য নেই, ধর্মও নেই। প্রকৃতপক্ষে, তারা যদি নিজেদের লাভের প্রত্যাশা না করত, তবে তারা পারস্পরিক ভালবাসাও বিনিময় করত না। হে সুমধ্যমাগণ, কিছু মানুষ রয়েছেন যারা প্রকৃত অর্থেই কারুণিক, যেমন পিতা মাতা স্বাভাবিকভাবেই স্নেহপ্রবণ। এই ধরনের মানুষেরা যারা প্রতিদানে ব্যর্থ মানুষদেরও একনিষ্ঠভাবে সেবা করে, তারাই ধর্মের প্রকৃত নির্ভুল পথ অনুসরণ করছে, আর তারাই সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী। এরপর সেই ধরণের মানুষেরাও রয়েছে যারা আত্মাসুখী, আপ্তকাম, অকৃতজ্ঞ ও গুরুদ্রোহী। এই ধরনের মানুষেরা তাদের ভালবাসা প্রদানকারীকেও ভালবাসে না, শত্রুভাবাপন্নদের কথা আর কী বলার আছে। জীব যখন আমাকে ভালবাসে, এমন কি তারা যখন আমার পূজাও করে, আমি তৎক্ষণাৎ সাড়া দিই না, তার কারণ হে গোপীগণ, আমি তাদের প্রেমময় ভক্তিকে তীব্রতর করতে চাই। লব্ধ ধন নষ্ট হওয়া নির্ধন ব্যক্তি যেমন সেই ধনের চিন্তাতেই উদ্বিগ্ন থাকে, অন্য কোন কিছুরই চিন্তা করতে পারে না, তখন তারা তেমনি হয়ে ওঠে। হে গোপীগণ, আমার জন্য তোমরা লোকাচার, বৈদিক নির্দেশ এবং আত্মীয়স্বজনদের পরিত্যাগ করেছ, তা সত্ত্বেও আমার প্রতি তোমাদের অনুরাগ বর্ধিত হবে বলে আমি তোমাদের দৃষ্টির অগোচর হয়েছিলাম। হে প্রিয়াগণ, আমি তোমাদের প্রিয় সাধনে প্রবৃত্ত, আমার প্রতি তোমরা অসন্তুষ্ট হয়ো না। হে গোপীগণ, আমার প্রতি তোমাদের নির্মল সেবার ঋণ আমি ব্রহ্মার আয়ুষ্কালের মধ্যেও পরিশোধ করতে পারব না। আমার সঙ্গে তোমাদের যে সম্পর্ক তা সম্পূর্ণভাবে নিষ্কলুষ। তোমরা দুশ্ছেদ্য সংসার বন্ধন ছিন্ন করে আমার আরাধনা করেছ। তাই তোমাদের মহিমান্বিত কার্যই তোমাদের প্রতিদান হোক।”
দ্বাত্রিংশতি অধ্যায়- পুনর্মিলন
17 Aug 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়