শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “গোপীগণ ভগবানের এরূপ মনোহর বাক্য শ্রবণ করে কৃষ্ণ বিরহজনিত দুঃখ পরিত্যাগ করলেন। তাঁর চিন্ময় অঙ্গসমূহ স্পর্শ করে তাঁদের মনস্কামনা পূর্ণ হল। অতঃপর যমুনার তীরে নারীগণের মধ্যে রত্নসদৃশা, আনন্দে পরস্পর বাহুপাশে আবদ্ধা, বিশ্বস্ত গোপীগণের সঙ্গে ভগবান গোবিন্দ রাসনৃত্য আরম্ভ করলেন। গোপীমণ্ডলে মণ্ডিত হয়ে রাসনৃত্য উৎসব শুরু হল। যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে বিস্তার করে প্রত্যেক দু’জন গোপীর মাঝখানে প্রবেশ করে তাঁদের কন্ঠে তাঁর হস্ত স্থাপন করলে, প্রত্যেক গোপীই ভাবলেন যে, তিনি একমাত্র তাঁর কাছেই অবস্থান করছেন। সস্ত্রীক অভিভূত দেবতাগণ সেই রাসনৃত্য দর্শনের আগ্রহে শ্রীঘ্রই তাঁদের শত শত বিমানে আকাশ পরিব্যাপ্ত করেছিলেন। তখন আকাশ হতে পুষ্পবৃষ্টি সহকারে দুন্দুভি বেজে উঠল এবং সস্ত্রীক গন্ধর্বপতিগণ শ্রীকৃষ্ণের নির্মল মহিমা গান করতে লাগলেন। রাসমণ্ডলে প্রিয়তম শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে ক্রীড়ারত গোপীগণের নূপূর, বলয় ও কিঙ্কিণীর তুমুল শব্দ হতে লাগল। নৃত্যরত গোপীগণের মাঝে শ্রীকৃষ্ণ যেন স্বর্ণালঙ্কারের মধ্যে উজ্জ্বল নীলমণির ন্যায় অত্যন্ত দীপ্যমান ছিলেন। গোপীগণ যখন কৃষ্ণের গুণগান করছিলেন, তখন তাঁদের নৃত্যরত পদদ্বয়, কর সঞ্চালন, সুমধুর হাস্যের সঙ্গে ভ্রূবিলাস ও কোমরের ভগ্নতা দ্বারা তাঁদের মুখমণ্ডল ঘর্মে সিক্ত হয়ে উঠেছিল। চঞ্চল স্তন-বসন, গণ্ডস্থলে দোদুল্যমান কুণ্ডল, শিথিল কবরী ও কাঞ্চী সমন্বিত কৃষ্ণ-গোপীগণ মেঘচক্রে বিদ্যুন্মালার ন্যায় শোভা পাচ্ছিলেন।”
“কৃষ্ণপ্রেম উপভোগে আগ্রহী নানা রাগে রঞ্জিত-কন্ঠী গোপীগণ কৃষ্ণ-স্পর্শে অতীব আনন্দিত হয়ে উচ্চৈঃস্বরে সঙ্গীত ও নৃত্য করেছিলেন আর তাঁদের সেই গানে সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। কোন এক গোপী ভগবান মুকুন্দের গানের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চেয়েও উন্নীত স্বরালাপে অমিশ্রিত ষড়জাতি স্বরে গান গেয়েছিলেন। কৃষ্ণ অত্যন্ত প্রীত হয়ে ‘সাধু’ ‘সাধু’ বলে তাঁর গানের প্রশংসা করলেন। তখন অন্য একজন গোপী ঐ স্বরালাপকেই ধ্রুবতালে পরিণত করে গান করেছিলেন। কৃষ্ণ তাঁরও প্রশংসা করলেন। কোন এক গোপী রাসনৃত্যে পরিশ্রান্ত হয়ে পার্শ্বস্থিত গদাধারী কৃষ্ণের স্কন্ধে তাঁর বাহু দ্বারা আঁকড়ে ধরলেন। নৃত্যের ফলে তাঁর হাতের বলয় ও চুলের ফুলগুলি শ্লথ হয়ে গিয়েছিল। একজন গোপী তাঁর কাঁধের উপরে কৃষ্ণের চন্দনচর্চিত নীলপদ্মগন্ধযুক্ত বাহু আঘ্রাণ করে রোমাঞ্চিতা হয়ে তা চুম্বন করতে লাগলেন। কোন এক গোপী নৃত্যবশত দোদুল্যমান কুণ্ডল যুগলের কান্তিতে দীপ্যমান নিজ গণ্ডস্থল শ্রীকৃষ্ণের গণ্ডস্থলে সংযোজিত করলে কৃষ্ণ তাঁকে সযত্নে তাঁর চর্বিত তাম্বুল প্রদান করলেন। নৃত্যপরায়ণা, গীতরতা হয়ে নূপূর ও মেখলায় শব্দায়মান কোন গোপী ক্লান্ত হয়ে পড়লে পার্শ্বস্থিত ভগবান অচ্যুতের সুখকর কমকমল নিজ স্তনযুগলের উপরে ধারণ করলেন। লক্ষ্ণীদেবীর একান্ত বল্লভ কমনীয় কৃষ্ণকে গোপীগণ তাঁদের অন্তরঙ্গ প্রেমিক রূপে লাভ করে পরমানন্দ উপভোগ করছিলেন। তাঁর গুণগান করে গোপীরা আনন্দে বিহার করার সময়ে, তিনি তাঁদের গলা জড়িয়ে ধরেছিলেন। গোপীদের কানের পিছনে পদ্মফুল, গালের উপরে কেশগুচ্ছের শোভা, এবং স্বেদবিন্দু তাঁদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছিল। তাঁদের বলয় ও নূপূরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে সঙ্গীত সৃষ্টি হচ্ছিল এবং কটিবন্ধনীর কিঙ্কিণী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এইভাবে রাসমণ্ডলীতে পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে গোপীরা নৃত্য করেছিলেন, এবং সেই সঙ্গে ভ্রমরকুল গুঞ্জন করে সঙ্গৎ-সহযোগিতা করছিল। এইভাবে ভগবান কৃষ্ণ, লক্ষ্ণীপতি স্বয়ং শ্রীনারায়ণ, ব্রজাঙ্গনাগণের সাহচর্যে আলিঙ্গন, করমর্দন, স্নিগ্ধাবলোকন, উদ্দাম-বিলাস ও হাস্য সহকারে, বালক যেমন নিজ প্রতিবিম্বের সঙ্গে খেলা করে, সেইভাবে ক্রীড়া করে আনন্দ গ্রহণ করেছিলেন।”
“হে কুরুবংশাবতংস মহারাজ পরীক্ষিৎ, শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গ সঙ্গ আনন্দে অভিভূত গোপীগণের ইন্দ্রিয়সমূহ বিবশ হওয়ায় তাঁদের কেশদাম, তাঁদের পরিধেয় বসন, কাঁচুলি, মালা ও অলঙ্কারাদি স্খলিত হয়ে পড়লে আর আগের মতো তাঁরা তা অনায়াসে ধারণ করতে পারলেন না। দেবপত্নীগণও তাঁদের বিমান থেকে শ্রীকৃষ্ণের এরূপ ক্রীড়া দর্শন করে মোহিত হয়ে কামপীড়িত হয়ে উঠেছিলেন। এমন কি চন্দ্রের পার্ষদবর্গ নক্ষত্রেরাও বিস্মিত হয়েছিলেন। পরমেশ্বর ভগবান আত্মরাম হয়েও সেখানে যতসংখ্যক গোপী ছিলেন ততসংখ্যকরূপে নিজেকে প্রকাশ করে তাঁদের সঙ্গ উপভোগ করে ক্রীড়া করেছিলেন।”
“হে রাজন, প্রণয় উপভোগে গোপীদের ক্লান্ত দর্শন করে, কৃপাময় কৃষ্ণ তাঁর পরম সুখপ্রদ হাত দিয়ে প্রীতির সঙ্গে তাঁদের মুখমণ্ডল মার্জন করে দিলেন। গোপীগণ তাঁদের উজ্জ্বল স্বর্ণকুণ্ডল ও কুন্তলরাজির দ্যুতিতে দীপ্যমান গণ্ডস্থলের শোভা দ্বারা, সুধাময় হাস্য ও অবলোকন দ্বারা তাঁদের পুরুষশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণের পূজা করেছিলেন। তাঁর নখস্পর্শে অতীব আনন্দিত হয়ে তাঁর মঙ্গলময় দিব্য লীলার মহিমা তাঁরা কীর্তন করেছিলেন। গোপীদের সঙ্গে রাসলীলায় শ্রীকৃষ্ণ পরিশ্রান্ত হলেন এবং তাঁদের বক্ষের কুঙ্কুমরাগে মর্দিত হয়ে তাঁর মালা রঞ্জিত হয়ে উঠল। তখন গোপীদের ক্লান্তি দূর করার জন্য তিনি গজরাজের মতো যেন হস্তিনীদের নিয়ে যমুনার জলে নামলেন এবং গন্ধর্বদের মতো সঙ্গীত সহকারে মৌমাছিরা তাঁকে দ্রুত অনুসরণ করল। শক্তিমান গজরাজ যেভাবে জমির সব বাঁধ ভেঙ্গে ফেলতে পারে, তেমনই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেন সমস্ত জাগতিক সামাজিক নীতিবোধ এইভাবে ভঙ্গ করেন।”
“হে রাজন, জলমধ্যে কৃষ্ণ দেখলেন যে, হাস্যপরায়ণা গোপীবৃন্দ চারদিক থেকে তাঁকে ঘিরে জল প্রক্ষেপণ করতে করতে তাঁর প্রতি প্রেমময়ী দৃষ্টিপাত করছে। আত্মারাম ভগবান যখন গজেন্দ্রতুল্য বিহারে আনন্দ লাভ করছিলেন, দেবতাগণ তাঁদের বিমান থেকে তখন পুষ্পবৃষ্টি করতে করতে তাঁর অর্চনা করেছিলেন। অতঃপর মদস্রাবী মাতঙ্গ যেমন হস্তিনীগণ সহ বনে বিচরণ করে, শ্রীকৃষ্ণও তেমনি জল ও স্থলজাত কুসুমের সৌরভ বাহিত পবনাপ্লুত যমুনা তীরবর্তী উপবনে অনুগামী ভ্রমর ও প্রমদাগণে বৃত হয়ে ভ্রমণ করেছিলেন। সৎ-চিদানন্দময় কামনার আদর্শ পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট অবলা নারীদের নিয়ে স্বয়ং এইভাবে শরৎকালীন চন্দ্রকিরণশোভিত রাত্রিগুলিতে সংযত মধুররসাশ্রিত সব রকমের কাব্যকথা বর্ণনা করেন।”
পরীক্ষিৎ মহারাজ বললেন- “হে ব্রাহ্মণ, যিনি পরমেশ্বর ভগবান, জগদীশ্বর, ধর্ম সংস্থাপন ও অধর্মের বিনাশের জন্য যাঁর অংশপ্রকাশ সহ এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে যিনি সমাজধর্মের মূল বক্তা, কর্তা ও সংরক্ষক, তিনি তা হলে কিভাবে পরস্ত্রীদের স্পর্শ করে প্রতিকূল আচরণ করলেন? হে নিষ্ঠাবান ব্রহ্মচারী, আত্মতৃপ্ত যদুপতি কি উদ্দেশ্যে এই ধরনের নিন্দিত আচরণ করেন, দয়া করে তা বর্ণনা করে আমাদের সন্দেহ ভঞ্জন করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ঐশ্বরিক শক্তিমান নিয়ন্তাদের কার্যকলাপের মধ্যে আমরা আপাতদৃষ্টিতে সমাজনীতির দুঃসাহসিক ব্যতিক্রম লক্ষ্য করলেও, তাতে তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় না, কারণ তাঁরা আগুনের মতোই সর্বভুক হলেও নির্দোষ হয়ে থাকেন। যে ঈশ্বর নয়, তার কখনই মনে মনেও ঈশ্বরের আচরণের অনুকরণ করা উচিত নয়। যদি মূঢ়তাবশত কোনও সাধারণ মানুষ এই ধরনের আচরণের অনুকরণ করে, তা হলে সে নিজেকেই কেবল ধ্বংস করবে, যেমন রুদ্রদেব না হয়েই রুদ্রের মতো সমুদ্রপরিমাণ বিষ পান করার চেষ্টার ফলে মানুষ নিজেকেই ধ্বংস করে। পরমেশ্বর ভগবানের শক্তিপ্রদত্ত সেবকদের কথা সকল সময়েই সত্য আর সেই কথা সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তাঁদের আচরণ অনুকরণযোগ্য। অতএব তাঁদের নির্দেশ পালন করা বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণের উচিত। হে প্রভু, এই সকল নিরহঙ্কারী বিরাট পুরুষেরা যখন এই জগতে পুণ্য কর্ম করেন, তাঁদের কোন স্বার্থ পূরণের উদ্দেশ্য থাকে না এবং এমন কি যখন তাঁরা ধর্মাচরণের বিপরীত কোন অসৎ আচরণ করেন, তাঁদের কোন অনর্থ হয় না। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন জীবসমূহকে প্রভাবিতকারী ধর্মাচরণ ও অধর্মাচরণের সঙ্গে তা হলে কিভাবে প্রাণী, মানুষ দেবতা ও নিখিল জীবের অধীশ্বরের কোন সম্পর্ক থাকতে পারে? পরমেশ্বর ভগবানের পাপদ্ম রেণুর সেবা দ্বারা পূর্ণ-তৃপ্ত ভক্তগণ কখনও জড় কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হন না। এমন কি যোগপ্রভাবে সকল কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত মুনিগণও জড়কর্ম বন্ধনে আবদ্ধ নন। তা হলে যিনি স্বেচ্ছাপূর্বক অপ্রাকৃত শরীর ধারণ করেছেন স্বয়ং সেই ভগবানের বন্ধনের প্রশ্ন কিভাবে হতে পারে? যিনি সর্বসাক্ষীরূপে গোপীগণ, তাঁদের পতিগণ এবং প্রকৃতপক্ষে সকল প্রাণীর অন্তরে বাস করেন, তিনিই অপ্রাকৃত লীলাবিলাসের জন্য এই জগতে দেহ ধারণ করেছেন। তাঁর ভক্তকে কৃপা করবার জন্য ভগবান যখন মনুষ্য দেহ ধারণ করেন, তখন তিনি এরূপ লীলাবিলাসে যুক্ত হন যা সেই লীলাবিলাস শ্রবণকারীক আকর্ষিত করে তাঁর প্রতি সেবাপরায়ণ করে তোলে। কৃষ্ণের মায়াশক্তির দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে গোপগণ ভেবেছিলেন তাঁদের পত্নীরা গৃহে, তাঁদের কাছেই রয়েছে। তাই তাঁরা তাঁদের প্রতি কোনরূপ অসূয়া প্রকাশ করেনি। ব্রহ্মার একটি রাত্রি অতিবাহিত হলে, শ্রীকৃষ্ণ গোপীগণকে গৃহে ফিরে যেতে উপদেশ দিলেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভগবৎপ্রিয়াগণ তাঁর আদেশ মেনে নিলেন। যিনি অপ্রাকৃত শ্রদ্ধান্বিত হয়ে এই রাস পঞ্চাধ্যায়ে ব্রজবধূদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত ক্রীড়া বর্ণনা শ্রবণ করেন বা বর্ণনা করেন সেই ধীর পুরুষ ভগবানের যথেষ্ট পরাভক্তি লাভ করে হৃদরোগ রূপ জড় কামকে শ্রীঘ্রই দূর করেন।”
ত্রয়ত্রিংশতি অধ্যায়- রাসনৃত্য
19 Aug 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়