গোপীরা বললেন- “হে দয়িত, তোমার জন্ম ব্রজভূমিকে অত্যন্ত মহিমাময় করে তুলেছে, আর তাই ভাগ্যদেবী ইন্দিরা এখানে সর্বদা বিরাজ করেন। কেবলমাত্র তোমারই জন্য, আমরা, তোমার অনুগত দাসীরা আমাদের জীবন ধারণ করছি। আমরা তোমাকে সর্বত্র অন্বেষণ করছি, দয়া করে আমাদের তুমি দর্শন দাও। হে সুরতনাথ, তোমার দৃষ্টির সৌন্দর্য শরৎকালীন সরোবরে সুজাত বিকশিত কমলগর্ভের সৌন্দর্যকেও অতিক্রম করে। হে অভীষ্টপ্রদ, নিজেদের দ্বারা বিনামূল্যে তোমার কাছে সমর্পণ করেছে সেই দাসীদের তুমি বধ করছ। এটা কি বধ নয়? হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, আপনি বারবার আমাদের সর্বপ্রকার বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন- বিষাক্ত জল থেকে, ভয়ঙ্কর নরখাদক অঘ থেকে, প্রচণ্ড বর্ষণ থেকে, তৃণাবর্তাসুর থেকে, ইন্দ্রের ভয়ঙ্কর বজ্র থেকে, বৃষাসুর থেকে এবং ময় দানবের পুত্রের থেকে। হে সখে, তুমি কেবল গোপী যশোদারই পুত্র নও, পরন্তু সকল প্রাণীর অন্তর্যামী সাক্ষী স্বরূপ। যেহেতু ব্রহ্মা তোমাকে ব্রহ্মাণ্ড রক্ষার্থে অবতীর্ণ হতে প্রার্থনা করেছিলেন, তুমি তাই এখন সাত্বত বংশে অবতীর্ণ হয়েছ। হে বৃষ্ণিশ্রেষ্ঠ, তোমার পদ্মসদৃশ হস্ত যা লক্ষ্ণীদেবীর করদ্বয় গ্রহণ করেছে, যা সংসার ভয়ে ভীত তোমার পাপপদ্মের শরণাগতদের অভয় দান করে থাকে, হে কান্ত, সেই আকঙ্ক্ষা-পূরণকারী করপদ্ম আমাদের মস্তকে স্থাপন কর। হে ব্রজজনের দুঃখ-বিনাশক, হে নারীজাতির বীরপুরুষ, তোমার হাস্য ভক্তগণের গর্ব নাশ করে। হে সখে, দয়া করে তোমার দাসীরূপে আমাদের গ্রহণ করে তোমার সুন্দর বদন কমল দর্শন করাও। তোমার পাদপদ্মদ্বয় শরণাগত সকল প্রাণীর পাপ বিনাশ করে। সেই পদদ্বয় তৃণচর গাভীর অনুগমন করে এবং তা লক্ষ্ণীদেবীর নিত্য আবাস। তুমি একবার কালিয় নাগের ফণায় সেই পদদ্বয় স্থাপন করেছিলে, দয়া করে সেই পদদ্বয় আমাদের স্তনদেশে অর্পণ করে আমাদের হৃদয়ের কাম ছেদন কর। হে পদ্মলোচন, তোমার সমধুর কন্ঠস্বর ও মনোহর পদাবলী যা বিদগ্ধজনের মন আকর্ষন করে, তা আমাদের ক্রমশ বিমোহিত করছে। হে আমাদের প্রিয় বীর, দয়া করে তোমার দাসীগণকে তোমার অধরামৃতে সঞ্জীবিত কর।”
“হে প্রভু, বহু জন্মের বহু সুকৃতিকারী মানুষেরা জগতে এসে, তোমার প্রেমতপ্ত ব্যক্তিদের জীবনস্বরূপ, কবিদের সঙ্গীত, কলুষনাশী, শ্রবণমঙ্গল, সর্বতাপক্লিষ্ট, সর্ব-ব্যাপক তোমার কথামৃত সারা জগৎ জুড়ে প্রচার করেন। তাঁরাই সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। তোমার হাস্য, তোমার মধুর প্রীতিময় দৃষ্টি, অন্তরঙ্গ লীলাসমূহ, তোমার সঙ্গে উপভোগ করা ব্যক্তিগত কথাগুলি- এই সমস্ত কিছুই নিবিষ্ট চিত্তে স্মরণ করা মঙ্গলজনক আর তা আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে। কিন্তু একই সঙ্গে হে কপট, তা আমাদের মন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করে। হে নাথ, হে ক্লান্ত, তুমি যখন গোষ্ঠ ত্যাগ করে গোচারণে গমন কর, তখন কমলের চেয়েও মনোহর তোমার পাদদ্বয় তীক্ষ্ণ শস্যের শিষ ও রুক্ষ তৃণ, অঙ্কুরে ক্লিষ্ট হতে পারে, এই ভাবনায় আমাদের মন বিচলিত থাকে। দিনের শেষে ধূলিধূসরিত ঘন-নীল কুন্তলাবৃত তোমার বদন-কমলখানি পুনঃ পুনঃ আমাদের প্রদর্শন করে, হে বীর, তুমি আমাদের মনে স্মৃতির বেদনা উৎপন্ন কর। ব্রহ্মার আরাধিত তোমার পাদপদ্ম সকল প্রণতজনের আকাঙ্ক্ষা পূরণকারী। পৃথিবীর ভূষণস্বরূপ পরম সুখদায়ক তাঁরা আপৎকালে ধ্যানের যথার্থ বিষয়। হে রমণ, হে দুঃখহারী, দয়া করে সেই পাদপদ্ম আমাদের স্তনে অর্পণ কর। হে বীর, দয়া করে তোমার মাধুর্য সুখবর্ধক ও শোকবিনাশক অধরামৃত আমাদের বিতরণ কর। সেই অমৃত মানুষের অন্য আসক্তির বিস্মরণ ঘটায় এবং তোমার ধ্বনি বেণুর দ্বারা সুষ্ঠভাবে তা আস্বাদন করা যায়। দিবাভাগে তুমি যখন বনে গমন কর, তোমাকে দেখতে না পেয়ে ক্ষণকালও আমাদের জন্য এক যুগ হয়ে ওঠে। এমন কি যখন তোমার সুন্দর কুঞ্চিত কুন্তলযুক্ত মুখমণ্ডল আগ্রহভরে নিরীক্ষণ করি, মন্দ বিধাতার সৃষ্ট আমাদের চোখের পাতার দ্বারা, আমাদের আনন্দ বিঘ্নিত হয়।”
“হে অচ্যুত, তুমি ভাল করেই জান- কেন আমরা এখানে এসেছি। তোমার মতো শঠ ছাড়া আর কেউ বা তাঁর বাঁশির উচ্চ-গীতে মোহিত হয়ে মধ্যরাত্রিতে আগত যুবতী নারীদের পরিত্যাগ করবে? কেবল তোমাকে দর্শন করার জন্যই আমাদের পতি, পুত্র, গুরুজন, ভ্রাতা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনকে সম্পূর্ণরূপে আমরা আগ্রহ করেছি। আমরা যখন তোমার সঙ্গে একান্তে অন্তরঙ্গ কথোপকথনের কথাগুলি মনে করি, তখন আমাদের মন বার বার মোহিত হতে থাকে, আমাদের হৃদয়ে কামের উদয় অনুভব করি আর তোমার হাস্য মুখ, তোমার প্রেমময় দৃষ্টি, ও লক্ষ্ণীদেবীর বিশ্রামস্থল তোমার বিশাল বক্ষকে মনে করি। এইভাবে তোমার প্রতি আমাদের অতিশয় স্পৃহা জন্মায়। হে প্রিয়, তোমার সর্ব মঙ্গলময় আবির্ভাব ব্রজবাসীদের দুঃখবিনাশক। আমাদের মন তোমার সঙ্গ সাগ্রহে আকাঙ্ক্ষা করে। দয়া করে আমাদের কিঞ্চিত সেই ঔষধ প্রদান কর যা তোমার ভক্তের হৃদয়ের ব্যাধির প্রতিকার করে। হে প্রিয়, তোমার সুকোমল চরণকমল আহত হবে, এই আশঙ্কায় তা আমরা আমাদের কঠিন স্তনে অত্যন্ত সন্তর্পণে ধারণ করি। তুমি আমাদের জীবন স্বরূপ, তাই বনচারণের সময় পাথরকুচির আঘাতে তোমার সুকোমল চরণযুগল আহত হতে পারে, এই আশঙ্কায় আমাদের চিত্ত উৎকন্ঠিত হচ্ছে।”
একত্রিংশতি অধ্যায়- গোপীগণের বিরহ গীতি
16 Aug 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়