ত্রিংশ অধ্যায়- গোপীগণের কৃষ্ণ অন্বেষণ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “সহসা ভগবান কৃষ্ণ অন্তর্হিত হলে যূথপতির অদর্শনে হস্তিনীদের মতো গোপীরাও তাঁর অদর্শনে অত্যন্ত সন্তাপগ্রস্ত হলেন। গোপীরা বিভোর হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণের গমনভঙ্গী, অনুরাগ হাস্য, সবিলাস দৃষ্টিপাত, মনোরম আলাপ ও তাঁদের সঙ্গে আরও অন্যান্য লীলাবিলাসের কথা স্মরণ করছিলেন। এইভাবে রমাপতি কৃষ্ণের ভাবনায় মগ্ন হয়ে গোপীরা তাঁর বিভিন্ন অপ্রাকৃত লীলার অনুকরণ করতে লাগলেন। যেহেতৃ কৃষ্ণপ্রিয়া গোপীগণ তাঁদের প্রিয়তম কৃষ্ণের ভাবনায় মগ্ন ছিলেন, তাঁদের দেহ তাঁর গমন, হাস্য, অবলোকন, আলাপ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সমূহের অনুকরণ করছিল। কৃষ্ণাত্মিকা রূপে লীলবিলাসশালিনী তাঁরা একে অপরকে ‘আমি কৃষ্ণ’ বলে জ্ঞাপন করছিলেন। উচ্চৈঃস্বরে কৃষ্ণের গান করতে করতে সমগ্র বৃন্দাবনের অরণ্য জুড়ে দলবদ্ধ উন্মত্ত নারীদের মতো তাঁরা তাঁকে অন্বেষণ করতে লাগলেন। এমন কি তাঁরা বৃক্ষগুলির কাছেও সকল জীবের পরমাত্মাসম অন্তরে ও বাহিরে আকাশবৎ উপস্থিত তাঁর (শ্রীকৃষ্ণ) সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করছিলেন।”
গোপীরা বললেন- “হে অশ্বত্থ, হে প্লক্ষ, হে ন্যগ্রোধ, তোমরা কি কৃষ্ণকে দেখেছ? নন্দ মহারাজের ঐ পুত্র তাঁর প্রেমময় দৃষ্টি ও হাস্য দ্বারা আমাদের মন হরণ করে প্রস্থান করেছেন। হে কুরুবক বৃক্ষ, হে অশোক, হে নাগ, পুন্নাগ ও চম্পক, যাঁর হাস্য সকল মানিনীগণের দর্প হরণ করে, বলরামের সেই কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে এই পথ দিয়ে যেতে দেখেছ কি? হে পরম কল্যাণপ্রদ, গোবিন্দের চরণকমলের অত্যন্ত প্রিয় তুলসী, তোমাকে গলায় ধারণ করে ভ্রমরের দলের সঙ্গে তুমি কি অচ্যুতকে যেতে দেখেছ? হে মালতী, হে মল্লিকা, হে জাতি আর যূথিকা, তাঁর কর-স্পর্শ দিয়ে তোমাদের আনন্দ দিতে দিতে মাধব কি এই পথ দিয়ে গিয়েছে? হে চূত, হে প্রিয়াল, হে পনস, আসন ও কোবিদার, হে জম্বু, হে অর্ক, হে বিল্ব, বকুল ও আম্র, হে কদম্ব ও নীপ এবং যমুনার উপকূলবাসী পরার্থে জীবন ধারণকারী অন্যান্য বৃক্ষগণ, আমরা গোপীরা আমাদের হৃদয় হারিয়েছি, তাই দয়া করে আমাদের বল, কৃষ্ণ কোথায় গিয়েছেন। হে পৃথ্বী মাতা, ভগবান কেশবের পাদপদ্মের স্পর্শ লাভ করার জন্য তুমি কোন তপশ্চর্যা করেছিলে যা পরমানন্দ আনয়ন করে তোমার রোমরাজি দ্বারা শরীরকে পুলকিত করে শোভা প্রাপ্ত করেছ? তুমি কি ভগবানের বর্তমান আবির্ভাবেই এই আনন্দ ভাব লব্ধ হয়েছ না কি আরো পূর্বে যখন তিনি বামনদেবরূপে তোমাদের পাদস্পর্শ করেছিলেন, কিম্বা তারও পূর্বে, যখন তিনি বরাহ অবতাররূপে তোমাকে আলিঙ্গন করেছিলেন, তখন? হে সখী, হরিণী, তোমাদের নয়নের পরমানন্দ আনয়নকারী শ্রীঅচ্যুত কি তাঁর প্রিয়ার সঙ্গে এখানে রয়েছেন? কারণ, তাঁর সখীকে আলিঙ্গনের সময়ে তাঁর সখীর বক্ষের কুঙ্কুমে রঞ্জিত তার কুন্দফুলের মালার সৌরভ এই পথে প্রবাহিত হচ্ছে। হে তরুগণ, আমরা দেখছি তোমরা প্রণত হয়ে রয়েছ। তুলসী মঞ্জরীর মালায় সুশোভিত এবং চারধারে গুঞ্জরিত মত্ত ভ্রমরেরা যাঁর পশ্চাদানুগামী, সেই রামানুজ যখন এখান দিয়ে গমন করলেন, তিনি কি তাঁর প্রীতিময় দৃষ্টিপাতে তোমাদের প্রণাম গ্রহণ করেছেন? তিনি নিশ্চয়ই তাঁর বাহু তাঁর প্রিয়তমার স্কন্ধে স্থাপন করে অন্য হাতে পদ্মফুল ধারণ করে রয়েছেন। কৃষ্ণের বিষয়ে এই লতাগুলিকে জিজ্ঞাসা করা যাক। তারা নিজপতি এই বৃক্ষটির বাহু আলিঙ্গন করে থাকলেও, নিশ্চয়ই তারা কৃষ্ণের নখস্পর্শিতা হয়েছে, কারণ আনন্দে তাদের গায়ে রোমাঞ্চ ভাব প্রকাশ করছে।”
“এই সকল কথা বলার পর কৃষ্ণ অন্বেষণে কাতর গোপীগণ পূর্ণরূপে কৃষ্ণভাবনায় মগ্ন হয়ে তাঁর বিভিন্ন লীলাসমূহের অনুকরণ করতে শুরু করলেন। পূতনার অনুকরণে একজন গোপী, শিশু কৃষ্ণের মতো অভিনয়কারী অন্য এক গোপীকে তাঁর স্তন পান করানোর ভান করলেন। আরেকজন গোপী ক্রন্দনরত শিশু কৃষ্ণের অনুকরণে শকটাসুরের অভিনয়কারী এক গোপীকে পদাঘাত করলেন। তৃণাবর্তের ভূমিকা গ্রহণ করে একজন গোপী শিশুকৃষ্ণের অভিনয়কারী অন্য একজনকে অপহরণ করলেন, তখন আর একজন গোপী হামাগুড়ি দিতে লাগলেন আর তাঁর পাদু’খানি আকর্ষণ করার সময় তাঁর কিঙ্কিণী ধ্বনিত হতে লাগল। গোপবালকদের ভূমিকা পালনকারী কয়েকজনের মধ্যে দু’জন গোপী রাম ও কৃষ্ণের অভিনয় করলেন। কৃষ্ণ রূপে এক গোপী বৎসাসুররূপী আরেক গোপীকে হত্যার অভিনয় করলেন এবং দু’জন গোপী বকাসুর বধের অভিনয় করলেন। দূরে বিচরণকারী গাভীদের কৃষ্ণ যেভাবে আহ্বান করেন, যেভাবে তিনি বংশীধ্বনি করেন এবং যেভাবে তিনি বিভিন্ন ক্রীড়া করেন, একজন গোপী অবিকলভাবে তা অনুকরণ করলে, অন্য গোপীগণ ‘সাধু! সাধু!’ শব্দে তাঁকে অভিনন্দিত করলেন। আরেকজন গোপী কৃষ্ণগতচিত্তা হয়ে অন্য এক সখীর কাঁধে হাত রেখে ভ্রমণ করতে করতে ঘোষণা করলেন, ‘আমিই কৃষ্ণ! কত মনোহরভাবে আমি চলছি তা দেখ।’ একজন গোপী বললেন ‘ঝড়বৃষ্টিতে তোমরা কেউ ভয় পেয়ো না, আমি তোমাদের রক্ষা করব।’ এই বলে সেই গোপী তাঁর উত্তরীয়খানি তাঁর মাথার উপরে তুলে ধরলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বলে চললেন- “হে রাজন, একজন গোপী অন্য একজন গোপীর কাঁধে উঠে তাঁর চরণ অপর গোপীর মাথায় রেখে বললেন, ‘রে দুষ্ট নাগ, এখান থেকে চলে যাও! তোমার জানা উচিত যে, খলেদের দণ্ড দানের জন্য আমি এই জগতে জন্ম গ্রহণ করেছি।’ তখন অন্য একজন গোপী বলে উঠলেন- হে গোপবালকেরা, এই ভয়ঙ্কর দাবানলের দিকে লক্ষ্য কর! শিগ্রী তোমাদের চোখ বন্ধ কর, আমি অনায়াসে তোমাদের রক্ষা করব। একজন গোপী তাঁর এক তন্বী সঙ্গীকে ফুলমালা দিয়ে বন্ধন করে বললেন- “এখন আমি এই ভাণ্ডভঙ্গকারী মাখন-চোর বালকটিকে বাঁধব।’ দ্বিতীয় গোপী তখন ভীত হবার ভান করে তাঁর সুন্দর নয়নদুটি ও মুখ আচ্ছাদিত করলেন।”
“এইভাবে গোপীরা যখন কৃষ্ণলীলা অনুকরণ করছিলেন এবং পরমাত্মা কৃষ্ণ কোথায় থাকতে পারেন বলে বৃন্দাবনের বৃক্ষলতাদের প্রশ্ন করছিলেন, তখন দৈবাৎ তাঁরা বনের একটি কোণে তাঁর পদচিহ্ন লক্ষ করলেন। এই সকল পদচিহ্নে ধ্বজ, পদ্ম, বজ্র, অঙ্কুশ, যব প্রভৃতি চিহ্নগুলি পরিষ্কারভাবে নির্ণয় করছে যে, সেগুলি সেই মহাত্মা, নন্দ-মহারাজের পুত্রেরই পদচিহ্ন। তাঁর পদচিহ্নের প্রদর্শিত পথে গোপীরা কৃষ্ণের পথ অনুসরণ করতে লাগলেন, কিন্তু যখন দেখলেন সেই পদচিহ্ন তাঁর অন্যতম প্রিয়তমার পদচিহ্নের সঙ্গে সংমিশ্রিত হয়েছে, তখন তাঁরা আকুল হয়ে এইভাবে বলতে লাগলেন। এখানে আমরা কোন গোপীর পদচিহ্ন দেখছি, যে নিশ্চয়ই নন্দ-মহারাজের পুত্রের সঙ্গে গমন করেছে। ঠিক যেমন কোন হস্তী তার সঙ্গী হস্তিনীর কাঁধের উপরে তার শুঁড় স্থাপন করে, কৃষ্ণও নিশ্চয়ই তাঁর বাহু তাঁর স্কন্ধে স্থাপন করেছিলেন। এই বিশেষ গোপী নিশ্চয়ই যথার্থভাবে সর্বশক্তিমান ভগবান গোবিন্দের আরাধনা করেছিলেন, তাই তাঁর প্রতি অত্যন্ত প্রীত হয়ে তিনি অবশিষ্ট আমাদের পরিত্যাগ করে তাঁকে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়েছেন।”
“হে গোপীগণ! গোবিন্দের পাদপদ্মরেণু এতই পবিত্র যে, ব্রহ্মা, শিব ও রমা দেবীও পাপনাশের জন্য সেই রেণু তাঁদের মস্তকে ধারণ করেন। সেই বিশেষ গোপীর পদচিহ্নগুলি আমাদের অতিশয় ক্ষুব্ধ করছে। সমস্ত গোপীদের মধ্যে সে একা নির্জনে অপহৃত হয়ে শ্রীকৃষ্ণের অধর সুধা পান করছে। দেখ, এখানে আমরা আর তার পদচিহ্ন দেখতে পাচ্ছি না! নিশ্চয়ই তৃণাঙ্কুর তার সুকোমল পদতল ব্যথিত করছিল, তাই তার প্রিয়জন তাঁর প্রেয়সীকে স্কন্ধে ধারণ করেন। হে গোপীগণ, লক্ষ্য কর, তাঁর প্রিয়তমার ভার বহন নিশ্চয়ই তাঁর কাছে কষ্টকর হয়েছিল আর তাই এই স্থানে কামপীড়িত কৃষ্ণের পদচিহ্নগুলি ভূমিতে কতখানি গভীর হয়েছে। আর এখানে, পুষ্পচয়নের জন্য সেই মহাত্মা চতুর বালকটি নিশ্চয়ই তার প্রেয়সীকে নামিয়ে ছিলেন। দেখ, প্রিয়তম কৃষ্ণ এই স্থানে কিভাবে তাঁর প্রিয়তমার জন্য পুষ্পচয়ন করেছেন। এখানে তিনি কেবলমাত্র তাঁর পদদ্বয়ের সম্মুখভাগের চিহ্ন রেখে গেছেন, কারণ ফুলের নাগাল পাবার জন্য তিনি তাঁর পায়ের আঙ্গুলের উপরে দাঁড়িয়েছিলেন। কৃষ্ণ নিশ্চয়ই এইখানে তাঁর প্রেয়সীর কেশ প্রসাধনের জন্য উপবেশন করেছিলেন। তাঁর চয়ন করা পুষ্পে সেই কামী বালক নিশ্চয়ই সেই কামিনীকে চূড়া নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।”
“ভগবান কৃষ্ণ স্ব-ক্রীড়, আত্মারাম ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ কামুক মানুষের দুর্দশা ও নারীদের দুরাত্মতা প্রদর্শনের জন্য সেই গোপীর সঙ্গে বিহার করেছিলেন। সম্পূর্ণরূপে বিভ্রান্তমনা গোপীরা বিচরণ করতে করতে কৃষ্ণের বিবিধ লীলাসমূহের চিহ্ন দেখাচ্ছিলেন। অন্য সকল গোপীদের পরিত্যাগ করে যে বিশেষ গোপীকে কৃষ্ণ নির্জন বনে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি নিজেকে অন্যান্য নারীর মধ্যে শ্রেষ্ঠা বিবেচনা করে ভাবলেন লাগলেন, “অন্যান্য গোপীরা কামবেগে সমাগতা হলেও আমরা প্রিয়তম অন্য গোপীদের পরিত্যাগ করে কেবলমাত্র আমাকেই গ্রহণ করেছেন।’ বৃন্দাবন অরণ্যের এক অংশ দিয়ে প্রণয়ীযুগল যখন গমন করছিলেন, তখন সেই বিশেষ গোপী নিজের জন্য গর্ব অনুভব করে ভগবান কেশবকে বললেন, “আমি আর হাঁটতে পারব না। যেখানে তুমি যেতে চাও, আমাকে বহন করে নিয়ে চল।’ এইভাবে শুনে শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দিলেন, ‘আমার কাঁধে আরোহন কর’। কিন্তু এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি অন্তর্হিত হলেন। তাঁর প্রিয়তমা তখনই অনুতাপ করতে লাগলেন। তিনি ক্রন্দন করলেন- হে নাথ! হে রমণ! হে প্রিয়তম! তুমি কোথায়? তুমি কোথায়? হে মহাবাহো! হে সখা, তোমার দীন দাসীকে দয়া করে তোমার দর্শন দান কর।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “শ্রীকৃষ্ণের গমন পথ অন্বেষণ করতে করতে অদূরে তাঁদের প্রিয়-বিরহ-মোহিত-দুঃখিতা সখীকে তাঁরা দেখতে পেলেন। মাধব কিভাবে তাঁকে সম্মান প্রদান করেছিলেন কিন্তু তাঁর দৌরাত্ম্যবশত কিভাবে তখন তিনি অবমাননা ভোগ করলেন, তিনি তাঁদের সেই কথা বললেন। এই সমস্ত কথা শ্রবণ করে গোপীরা অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন। অতঃপর চন্দ্রালোকে যতদূর দেখা যায়, ততদূর পর্যন্ত গোপীগণ কৃষ্ণের অন্বেষণে বনের গভীর প্রবেশ করলেন। কিন্তু তাঁরা যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত হলেন, তখন তাঁরা নিবৃত্ত হলেন। তখন শ্রীকৃষ্ণগতচিত্ত তদালাপরতা এবং তাঁর লীলা অনুকরণে তদাত্মিক গোপীগণ উচ্চৈঃস্বরে কৃষ্ণ গুণ-গান করতে করতে তাঁদের নিজ নিজ গৃহের কথা সম্পূর্ণ বিস্তৃত হলেন। গোপীগণ পুনরায় কালিন্দী-তটে আগমন করে কৃষ্ণকে ভাবতে ভাবতে তাঁর আগমন আকাঙ্ক্ষায় একত্রে উপবেশন করে তাঁর গান করতে লাগলেন।”

Leave a Reply

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,959 hits