শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “গোবর্ধন পর্বত উত্তোলিত করে কৃষ্ণ ব্রজবাসীগণকে প্রচণ্ড বর্ষণ থেকে রক্ষা করার পরে, গোমাতা সুরভি তাঁর গোলোক থেকে ইন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণ সন্দর্শনে আগমন করলেন। ভগবানকে অবজ্ঞা করার জন্য ইন্দ্র অত্যন্ত লজ্জিত হন। নির্জনে কৃষ্ণ-সমীপে গিয়ে সূর্যের মতো উজ্জ্বল তাঁর কিরীটখানি কৃষ্ণের পদতলে স্থাপন করে ইন্দ্র নিজেও তাঁর পাদপদ্মে পতিত হয়ে পাদযুগল স্পর্শ করলেন। সর্বশক্তিমান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য তেজ সম্বন্ধে ইন্দ্র ইতিমধ্যে অবগত হয়েছেন এবং তিনি, তা দর্শন করার ফলে ত্রিজগতের ঈশ্বর হয়ে ওঠার মিথ্যা অহংকার তাঁর দমিত হয়েছিল। করজোড়ে বিনীতভাবে তিনি ভগবানের উদ্দেশ্যে বললেন- ‘আপনার দিব্য স্বরূপ শুদ্ধসত্ত্বে প্রকাশিত, অপরিবর্তনীয়, দীপ্তজ্ঞানে উদ্ভাসিত, এবং রজঃ ও তমোগুণশূণ্য। মায়া এবং অজ্ঞানতাজনিত প্রবল জাগতিক গুনপ্রবাহ আপনার মধ্যে নেই। তাহলে, জড়জাগতিক অস্তিত্বের মাঝে প্রারব্ধ সম্বন্ধের ফলে অজ্ঞ মানুষের মধ্যে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ এবং মাৎসর্যের যে সব লক্ষণগুলির সৃষ্টি হয়, এবং যেগুলি মানুষকে জড়জাগতিক অস্তিত্বের জটিলতার মাঝে আরও জড়িত করে রাখে, সেই লক্ষণগুলি কেমন করে আপনারই মধ্যে বিরাজ করতে পারল? আর তা সত্ত্বেও পরমেশ্বর ভগবান হয়ে আপনি ধর্মনীতি রক্ষার জন্য শাস্তিবিধান করেন এবং দুষ্টের দমন করেন। আপনিই এই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের পিতা গুরুদেব এবং পরম নিয়ন্তা। আপনিই অলঙ্ঘনীয় কালরূপে পাপীদের মঙ্গলার্থে দণ্ড বিধান করেন। বস্তুতঃ আপনার স্বতন্ত্র ইচ্ছা দ্বারা নির্ধারিত আপনার বিভিন্ন লীলাবতারে নিজেদের জগদীশ্বরাভিমানিদের মিথ্যা অহংকার আপনি নিশ্চিতভাবে দূরীভূত করেন। আমার মতো মূঢ়গণও, যাঁরা গর্বভরে নিজেদের জগদীশ্বর মনে করে, তারাও ভয়ের সময়েও আপনাকে নির্ভয় দেখে শ্রীঘ্রই তাদের মিথ্যা অহংকার ত্যাগ করে পারমার্থিক উন্নতির ভক্তি-মার্গ গ্রহণ করে। এইভাবে আপনি খলব্যক্তিদের শিক্ষা প্রদানের জন্য দন্ডদান করেন। আমার শাসন ক্ষমতার গর্বে নিমগ্ন হয়ে, আপনার প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞ আমি আপনার প্রতি অপরাধ করেছি। হে প্রভু, আপনি আমায় ক্ষমা করুন। আমার বুদ্ধি মোহাচ্ছন্ন ছিল, কিন্তু আর কখনও যেন আমার এরূপ অসৎ মতি না হয়।’ ”
“হে অধোক্ষজ, পৃথিবীর ভারস্বরূপ এবং বহু ভয়ঙ্কর দুর্ভোগসৃষ্টিকারী সেনাপতিদের বিনাশের জন্য আপনি এই জগতে অবতরণ করেন। হে ভগবান, একই সঙ্গে আপনার পাদপদ্মের বিশ্বস্ত সেবকদের মঙ্গলের জন্যও আপনি কাজ করে থাকেন। আপনি পরমেশ্বর ভগবান, অন্তর্যামী, মহাত্মা ও সর্বব্যাপক আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি। আপনি যদুকুলপতি কৃষ্ণ, আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি। যিনি নিজ ভক্তগণের ইচ্ছানুসারে তাঁর দিব্য দেহসমূহ ধারণ করেন, যিনি বিশুদ্ধ জ্ঞানময়, যিনি সর্ব-রূপ, সকলের বীজ ও সর্বভূতের আত্ম-স্বরূপ, তাঁকে আমি আমার প্রণাম নিবেদন করি।”
“হে ভগবান, আমার যজ্ঞ যখন নষ্ট হয়েছিল, তখন আমার গর্ব হেতু আমি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়েছিলাম। এইভাবে প্রবল বর্ষণ ও বায়ুর দ্বারা আমি আপনার গোষ্ঠ বিনাশের চেষ্টা করেছিলাম। হে ঈশ্বর, আমার গর্ব চূর্ণ করে এবং (বৃন্দাবনকে আমার শাস্তি প্রদানের প্রচেষ্টা) ব্যর্থ করে আপনি আমায় কৃপা প্রদর্শন করেছেন। পরমেশ্বর ভগবান, গুরুদেব ও পরমাত্মা স্বরূপ আপনার কাছে আমি এখন আশ্রয়ের জন্য এসেছি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- এইভাবে ইন্দ্রের দ্বারা বন্দিত হয়ে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্মিত হেসে মেঘগম্ভীর স্বরে তাঁকে বললেন- “হে ইন্দ্র, কৃপাবশত আমি তোমার যজ্ঞ বন্ধ করেছিলাম। স্বর্গের রাজারূপে তোমার ঐশ্বর্যের জন্য তুমি অত্যন্ত গর্বিত হয়ে উঠেছিলে। আর আমি চেয়েছিলাম তুমি সর্বদা আমায় স্মরণ কর। মানুষ তার শক্তি ও ঐশ্বর্যগর্বে অন্ধ হয়ে দণ্ডপাণি আমাকে নিকটে দর্শন করতে পারে না। আমি যদি তার প্রকৃত কল্যাণ কামনা করি, তবে তার জাগতিক সৌভাগ্যের অবস্থান থেকে তাকে আমি বিচ্যুত করি। হে ইন্দ্র, এখন তুমি যেতে পারো। স্বর্গের রাজারূপে তোমাদের নিয়োজিত মর্যাদায় স্থিত হয়ে সংযতভাবে, অহংকারশূণ্য হয়ে আমার নির্দেশ পালন করবে।”
অতঃপর, মাতা সুরভি তাঁর গো-সন্তান সমূহের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর প্রণতি নিবেদন করলেন। গোপবালকরূপে তাঁর সম্মুখে উপস্থিত পরমেশ্বর ভগবান সশ্রদ্ধাভাবে সম্বোধন করে প্রশান্তচিত্তা সুরনভি মাতা বললেন- “হে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ, মহাযোগী! হে বিশ্বের আত্মা ও উৎপত্তি! আপনি জগৎ-পতি এবং আপনার কৃপায়, হে অচ্যুত, আমার আমাদের প্রভুরূপে আপনাকে পেয়েছি। আপনি আমাদের আরাধ্য বিগ্রহ। সুতরাং হে জগৎপতি, গো, ব্রাহ্মণ, দেবতাগণ এবং সকল সাধুগণের মঙ্গলের জন্য, দয়া করে আমাদের ইন্দ্র হও। ব্রহ্মা কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে আমরা ইন্দ্ররূপে আপনার অভিষেক উৎসব অনুষ্ঠিত করব। হে বিশ্বাত্মা, আপনি এই জগতের ভূ-ভার মোচন করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে শ্রীকৃষ্ণকে সম্ভাষণ করে মাতা সুরভি তাঁর আপন দুগ্ধ দ্বারা, এবং অদিতি ও অন্যান্য দেবমাতৃগণের নির্দেশে, দেবতা ও মহান ঋষিগণের সঙ্গে ইন্দ্র, তার হস্তী বাহন ঐরাবতের শুঁড় দ্বারা বাহিত স্বর্গের গঙ্গা জল দ্বারা দশার্হ বংশজ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অভিষেক করলেন এবং তাঁকে গোবিন্দ নামে অভিহিত করলেন। তুম্বুরু, নারদ এবং অন্যান্য গন্ধর্বগণ, বিদ্যাধর, সিদ্ধ এবং চারণগণ সহযোগে শ্রীহরির জগৎ পবিত্রকারী মহিমা গান করবার জন্য সমাগত হয়েছিলেন। দেব-পত্নীগণ আনন্দে পূর্ণ হয়ে ভগবানের সম্মানে একত্রে নৃত্য করেছিলেন। শ্রেষ্ঠ দেবগণ ভগবানের স্তুতি কীর্তন করে তাঁর চতুর্দিকে অপূর্ব পুষ্প বর্ষণ করেছিলেন। ত্রিলোক পরম সন্তোষ লাভ করেছিল এবং গাভীরা তাদের দুগ্ধ দ্বারা পৃথ্বীতলকে সিক্ত করেছিল। নদীগুলিতে বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু রস প্রবাহিতা হয়েছিল, বৃক্ষগুলি থেকে মধুক্ষরণ হচ্ছিল, কর্ষণ ব্যতীতই ভোজ্য উদ্ভিদগুলি পরিণত হয়েছিল এবং পর্বতগুলি তাদের অভ্যন্তরের রত্নরাজি বাইরে বিচ্ছুরিত করেছিল। হে কুরুনন্দন পরীক্ষিৎ, শ্রীকৃষ্ণ অভিষিক্ত হলে সমস্ত জীব, এমন কি যারা স্বভাবে ক্রূর, তারাও সম্পূর্ণ বৈরিতামুক্ত হয়েছিল। গো ও গোপগণের পতি ভগবান গোবিন্দের অভিষেক উৎসব শেষ হবার পর, দেবরাজ ইন্দ্র ভগবানের অনুমতি গ্রহণ করে, দেবতা প্রভৃতি দ্বারা পরিবৃত হয়ে স্বর্গে ফিরে গেলেন।”
সপ্তবিংশতি অধ্যায়- দেবরাজ ইন্দ্র ও মাতা সুরভির প্রার্থনা
06 Aug 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়