শ্রীবাদরায়ণি বললেন- “একাদশীর দিন উপবাস ও শ্রীজনার্দনের পূজা করে দ্বাদশীর দিন স্নান করবার জন্য নন্দ মহারাজ কালিন্দীর জলে নামলেন। যেহেতু অশুভ সময় অবজ্ঞা করে রাত্রিকালে নন্দ মহারাজ জলে নেমেছিলেন, তাই বরুণের এক আসুরিক সেবক তাঁকে ধরে তার প্রভুর কাছে নিয়ে গেল।”
“হে রাজন্, নন্দ মহারাজকে দেখতে না পেয়ে গোপগণ, “হে কৃষ্ণ! হে রাম।” বলে উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করেছিলেন। তাঁদের চিৎকার শুনে শ্রীকৃষ্ণ বুঝলেন যে, তাঁর পিতাকে বরুণ অপহরণ করেছেন। অতঃপর ভক্তকে অভয়দানকারী সর্বশক্তিমান ভগবান বরুণদেবের সভায় গমন করলেন।”
ভগবান হৃষীকেশকে সমাগত দেখে বরুণ দেবতা বিস্তৃত উপাচারে তাঁর পূজা করলেন। ভগবানকে দর্শন করে বরুণদেব পরমানন্দিত স্তরে ছিলেন এবং তিনি বললেন- এখন আমার দেহধারণ সার্থক হল। প্রকৃতপক্ষে, হে প্রভু, এখন আমার জীবনের উদ্দেশ্য আমি বুঝলাম। হে ভগবান, যাঁরা আপনার পাদপদ্মদ্বয় গ্রহণ করেন, তাঁরা জড় অস্তিত্বের পথ অতিক্রম করতে পারেন। হে পরম পুরুষোত্তম ভগবান, পরমব্রহ্ম, পরমাত্মা, জগৎ সৃষ্টি সমন্বয় সাধনকারী মায়া-শক্তির চিহ্ন মাত্র যাঁর মধ্যে পাওয়া যায় না, সেই আপনাকে আমি প্রণাম নিবেদন করি। আপনার পিতা যিনি এখানে বসে আছেন, তাঁকে আমার এক মূর্খ অনভিজ্ঞ সেবক যথাকর্তব্য না বুঝে নিয়ে এসেছে। তাই কৃপা করে আমাদের ক্ষমা করুন। হে কৃষ্ণ, হে সর্বদর্শী, দয়া করে আপনি আমাকেও কৃপা করুন। হে গোবিন্দ, আপনি অত্যন্ত পিতৃবৎসল। তাঁকে গৃহে নিয়ে যান।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “সমস্ত ঈশ্বরগণেরও ঈশ্বর, পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বরুণদেবের উপর সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর পিতাকে নিয়ে গৃহে ফিরে গেলেন। সেখানে তাঁদের দর্শন করে তাঁদের আত্মীয়গণ আনন্দিত হয়েছিলেন। সাগর-রাজ বরুণের অদৃষ্টপূর্ব মহাঐশ্বর্য এবং বরুণ ও তাঁর সেবকরা কিভাবে কৃষ্ণের প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন, তা দর্শন করে নন্দ মহারাজ বিস্মিত হয়েছিলেন। নন্দ তাঁর সঙ্গী গোপগণকে এই সমস্ত কিছু বর্ণনা করেছিলেন।”
“(বরুণের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের লীলা শ্রবণ করে) হে রাজন্, গোপগণ অত্যন্ত আগ্রহপূর্ণ চিত্তে বিবেচনা করলেন যে, কৃষ্ণ অবশ্যই পরমেশ্বর ভগবান। তাঁরা ভাবলেন, ‘পরমেশ্বর ভগবান কি তাঁর চিন্ময় ধাম আমাদের প্রদান করবেন?’ সর্বদর্শী পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং গোপগণের অনুমান অবগত হয়ে তাঁদের অভীষ্ট পূরণের জন্য তাঁদের প্রতি কৃপা প্রদর্শন করতে চেয়ে এরূপ ভাবলেন- এই জগতে মানুষ অবশ্যই অবিদ্যা এবং কাম কর্ম দ্বারা উচ্চ এবং নীচ গতি প্রাপ্ত হয়ে ভ্রমণ করে। তাই লোকে তাদের প্রকৃত গন্তব্য-লক্ষ্য জানে না।”
“গভীরভাবে পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরম কৃপাময় পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীহরি, জাগতিক অন্ধকারের অতীত তাঁর ধামকে গোপগণের নিকট প্রকাশিত করলেন। শ্রীকৃষ্ণ অবিনাশী চিন্ময় জ্যোতি প্রকাশিত করলেন যা অসীম, জ্ঞানময় ও নিত্য। ঋষিগণ, তাঁদের চেতনা জড়া-প্রকৃতির গুণ মুক্ত হলে সমাধিমগ্ন অবস্থায় এই চিন্ময় সত্তা দর্শন করেন। শ্রীকৃষ্ণ গোপদের ব্রহ্ম-হৃদে এনে তাঁদের জলমগ্ন করলেন এবং তারপর তাঁদের সেখান থেকে উদ্ধার করলেন। সেই একই স্থান থেকে যেখানে অক্রূর চিজ্জগৎ দর্শন করেছিলেন, গোপগণও ব্রহ্মলোক দর্শন করলেন। সেই চিন্ময় ধাম দর্শন করে নন্দ মহারাজ ও অন্যান্য গোপগণ পরম আনন্দ অনুভব করলেন। তাঁর স্তব-রত মূর্তিমান বেদগণ দ্বারা পরিবেষ্টিত স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণকে সেখানে উপস্থিত দেখে তাঁরা অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন।”
অষ্টবিংশতি অধ্যায়- বরুণালয় থেকে নন্দ মহারাজকে উদ্ধার
06 Aug 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়