শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “গোপগণ গিরি গোবর্ধন উত্তোলনরূপ কৃষ্ণের কার্যাবলী প্রত্যক্ষ করে বিস্মিত হয়েছিলেন। তাঁর দিব্য শক্তি হৃদয়ঙ্গম করতে অসমর্থ হয়ে তাঁরা নন্দ মহারাজের সমীপবর্তী হয়ে বললেন- যেহেতু এই বালক অসাধারণ কর্মসমূহের অনুষ্ঠান করেন, কিভাবে তিনি আমাদের মতো জাগতিক মনুষ্যগণের মাঝে স্বীয় নিন্দাস্পদ জন্ম গ্রহণ করতে পারেন? এই সপ্ত বর্ষীয় বালক কিভাবে মহাগজের পদ্মফুল ধারণ করার মতো অবলীলাক্রমে একহাতে গিরি গোবর্ধনকে ধারণ করলেন? কাল যেমন শরীরের আয়ু শোষণ করেন নিতান্ত এক প্রায়-মুদিত-চক্ষু শিশুরূপে তিনি মহাবল পূতনা রাক্ষসীর স্তন পান করে তার প্রাণ-বায়ু শোষণ করেছিলেন। একবার তিনমাস বয়সের সময় এক বিশাল শকটের নীচে ক্রন্দনরত অবস্থায় শায়িত থাকার সময় ঊর্ধ্বে পদ নিক্ষেপ করেছিলেন। তখন তাঁর পদাগ্র দ্বারা অঘাতপ্রাপ্ত হবার সামান্য কারণে শকটি উল্টোভাবে পতিত হয়েছিল। এক বৎসর বয়সের সময় তিনি যখন শান্তভাবে বসেছিলেন, তৃণাবর্ত দৈত্য এসে তাঁকে অপহরণ করে আকাশে নিয়ে যায়। কিন্তু শিশু কৃষ্ণ দৈত্যের গলা টিপে তাকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিয়ে বধ করেন। একবার তাঁর মা তাঁকে মাখন চুরি করতে দেখে উদুখলে বেঁধে রাখেন। অতঃপর তাঁর বাহুদ্বয় দ্বারা হামাগুড়ি দিয়ে সে উদুখলটিকে অর্জুন বৃক্ষদ্বয়ের মধ্যে টেনে নিয়ে গিয়ে তাদের ভূপাতিত করেন। আরেকবার, কৃষ্ণ যখন বলরাম ও গোপবালকদের সঙ্গে বনে গোবৎস-চারণ করছিলেন, কৃষ্ণকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে বকাসুরের আগমন হয়েছিল। কিন্তু কৃষ্ণ সেই শত্রুর মুখ থেকে শুরু করে সমস্ত শরীর বিদীর্ণ করেছিলেন। কৃষ্ণকে হত্যার কামনায় বৎসাসুর গোবৎসদের ছদ্মবেশে কৃষ্ণের গোবৎসদের মধ্যে প্রবেশ করলেন। কিন্তু কৃষ্ণ সেই অসুরকে হত্যা করে, তার দেহকে ব্যবহার করে, বৃক্ষ হতে কপিত্থ ফল ভূপাতিত করার ক্রীড়া উপভোগ করলেন।”
“শ্রীবলরামের সঙ্গে একত্রে কৃষ্ণ ধেনুকাসুর ও তার সমস্ত মিত্রদের হত্যা করে, প্রচুর সুপক্ক তাল ফলে পূর্ণ তালবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছিলেন। বলশালী শ্রীবলরামের দ্বারা ভয়ঙ্কর প্রলম্বাসুরকে বধ করানোর পর কৃষ্ণ, ব্রজের গোপবালক ও তাদের পশুদের দাবানল থেকে রক্ষা করেছিলেন। অত্যন্ত বিষধর সর্প কালিয়কে দমন করার পর কৃষ্ণ তার গর্বনাশ করে বলপূর্বক তাকে যমুনার হৃদ থেকে নির্বাসিত করেন। এইভাবে ভগবান নদীর জলকে সর্পের তীব্র বিষ থেকে মুক্ত করেছিলেন।”
“হে নন্দ, আমরা এবং অন্যান্য সমস্ত ব্রজবাসীরা তোমার পুত্রের প্রতি আমাদের অবিরত অনুরাগ পরিত্যাগ করতে পারছি না, এটা কিভাবে হচ্ছে? কিভাবে সেও স্বতস্ফূর্তভাবে আমাদের আকর্ষণ করছে? কোথায় এই সাত বৎসর বয়সের বালক আর কোথায় তাঁর গিরি গোবর্ধন উত্তোলন, যা আমরা দর্শন করলাম। অতএব, হে ব্রজ-নাথ, তোমার এই পুত্র সম্বন্ধে আমাদের মধ্যে সন্দেহের উদয় হচ্ছে।”
নন্দ মহারাজ উত্তর করলেন- “হে গোপগণ, আমার কথা শ্রবণ করে আমার পুত্র সম্বন্ধে তোমাদের সকল শঙ্কা দূর হোক।”
“তোমার পুত্র কৃষ্ণ প্রতি যুগে তাঁর শ্রীমূর্তি প্রকাশ করেন। পূর্বে ইনি শুক্ল, রক্ত ও পীতবর্ণ ধারণ করে প্রকাশিত হয়েছিলেন, সম্প্রতি কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে প্রকট হয়েছেন। কোন কারণে, তোমার এই পরম সুন্দর পুত্রটি পূর্বে বসুদেবের পুত্ররূপে প্রকটিত হয়েছিলেন, তাই অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা একে বাসুদেব বলে থাকেন। তোমার এই পুত্রের গুণ এবং কর্ম অনুসারে বহু নাম এবং রূপ আছে, তা আমি জানি। সাধারণ লোকেরা তা জানে না। গোপ এবং গোকুলের আনন্দবর্ধক এই শিশুটি তোমাদের মঙ্গল সাধন করবে, এবং এঁর কৃপায় তোমরা অনায়াসে সমস্ত বিঘ্ন অতিক্রম করতে পারবে। হে নন্দ মহারাজ! ইতিহাসে বর্ণনা করা হয়েছে যে, পুরাকালে অরাজকতার সময়, ইন্দ্র যখন সিংহাসন চ্যুত হয়েছিলেন, এবং মানুষেরা দস্যু-তস্করদের দ্বারা উৎপীড়িত হয়েছিল, তখন এই শিশুটি আবির্ভূত হয়ে দস্যু-তস্করদের পরাজিত করে সকলকে রক্ষা করেছিলেন এবং সমৃদ্ধি সাধন করেছিলেন। অসুরেরা ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পক্ষ অবলম্বনকারী দেবতাদের কখনও পরাভূত করতে পারে না। তেমনই যে ব্যক্তি বা সম্প্রদায় শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অনুরক্ত, তাঁরা অত্যন্ত ভাগ্যবান, কারণ শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অত্যন্ত প্রীতি যুক্ত হওয়ার ফলে, তাঁরা কখনও কংসের অনুচরসদৃশ অসুরদের দ্বারা (অথবা অন্তরের শত্রু ইন্দ্রিয়ের দ্বারা) পরাভূত হন না। অতএব, হে নন্দ মহারাজ, তোমার এই শিশুটি গুণ, ঐশ্বর্য, কীর্তি এবং প্রভাবে নারায়ণেরই সমতুল্য। অতএব তাঁর কার্যকলাপে তোমার বিস্মিত হওয়া উচিত নয়।”
“[নন্দমহারাজ বলে চললেন-] আমাকে এই সমস্ত কথা বলার পর গর্গমুনি গৃহে ফিরে গেলে আমাদের সুখকারী কৃষ্ণকে আমি প্রকৃতপক্ষে ভগবান নারায়ণের অংশ প্রকাশরূপে বিবেচনা করেছিলাম।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “নন্দ মহারাজের মুখে গর্গমুনির বাক্যসমূহ শ্রবণ করে ব্রজবাসীগণ আনন্দিত হলেন। তাঁরা বিস্ময়শূণ্য হয়ে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে নন্দ মহারাজ ও শ্রীকৃষ্ণের পূজা করেছিলেন। তাঁর যজ্ঞ ভঙ্গ হওয়াতে ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, তাই তিনি বজ্র ও প্রবল বায়ু সহযোগে গোকুলে বারি ও শিলা বর্ষণ করতে লাগলেন। পরে সেখানকার গোপ, পশু ও স্ত্রীগণ অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত হয়েছিলেন। পরম করুণাময় শ্রীকৃষ্ণ যখন নিজ আশ্রিতজনদের এই অবস্থায় দর্শন করলেন, তিনি স্মিত হেসে এক হাতে গোবর্ধন পর্বতকে তুলে ধরলেন, ঠিক যেন কোন বালক ক্রীড়াছলে একটি ছত্রাককে তুলে ধরল। এইভাবে গোপ সম্প্রদায়কে তিনি রক্ষা করেছিলেন। ইন্দ্রের গর্ব চূর্ণকারী শ্রীগোবিন্দ আমাদের প্রতি প্রীত হোন।”
ষড়বিংশতি অধ্যায়- অপূর্ব শ্রীকৃষ্ণ
04 Aug 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়