পঞ্চবিংশতি অধ্যায়- শ্রীকৃষ্ণের গিরি-গোবর্ধন উত্তোলন

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, ইন্দ্র যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর যজ্ঞ বিনষ্ট হয়েছে, তখন তিনি কৃষ্ণকে তাঁদের ভগবানরূপে গ্রহণকারী নন্দ মহারাজ ও অন্য গোপগণের উপর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হলেন। ক্রুদ্ধ ইন্দ্র সাংবর্তক নামক বিশ্ব ধ্বংসকারী মেঘরাশিকে প্রেরণ করলেন। নিজেকে পরম নিয়ন্তা কল্পনা করে, তিনি বলতে লাগলেন- দেখ, এই গোপগণ বনে বাস করে কিভাবে তাদের ঐশ্বর্যের দ্বারা অত্যন্ত প্রমত্ত হয়ে উঠেছে! তারা একটি সাধারণ মানুষ কৃষ্ণের শরণাগত হয়েছে এবং এভাবেই তারা দেবতাদের প্রতি অপরাধ করেছে। তাদের কৃষ্ণের আশ্রয় গ্রহণ ঠিক যেন মানুষদের মূর্খ প্রচেষ্টার মতো যারা আত্মা সম্বন্ধীয় দিব্য জ্ঞান পরিত্যাগ করে এবং তার পরিবর্তে নৌকা সদৃশ সকাম, ধর্মীয় আচারপূর্ণ যজ্ঞের মাধ্যমে ভবসমুদ্র পার হবার চেষ্টা করে। যে নিজেকে অত্যন্ত জ্ঞানী মনে করে, কিন্তু যে কেবলমাত্র একটি মূর্খ, উদ্ধত ও বাচাল শিশু, সেই সাধারণ মানুষ কৃষ্ণের আশ্রয় গ্রহণ করে এই গোপগণ আমার প্রতি প্রতিকূলভাবে আচরণ করেছে।”
“[ধ্বংসকারী মেঘরাশিকে রাজা ইন্দ্র বললেন-] এই মানুষদের ঐশ্বর্য গর্বের দ্বারা তাদের মত্ত করে তুলেছে এবং তাদের এই ঔদ্ধত্য কৃষ্ণের দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। এখন যাও, তাদের অহঙ্কার দূর কর এবং তাদের পশুগুলিকে বিনাশ কর। নন্দ মহারাজের গোষ্ঠ ধ্বংস করবার জন্য আমিও আমার ঐরাবত হস্তীতে আরোহণ করে মহা বেগশালী মরুদ্‌গণের সঙ্গে তোমাদের অনুগমন করব।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ইন্দ্রের আদেশে জগৎ ধ্বংসকারী মেঘরাশি অসময়ে তাদের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে নন্দ মহারাজের গোষ্ঠে গমন করল। সেখানে তারা শক্তিশালী প্রচণ্ড বারিবর্ষণ দ্বারা অধিবাসীদের উপর উৎপীড়ন করতে শুরু করল। বিদ্যুৎ দ্বারা আলোকিত ও বজ্রের দ্বারা গর্জনশীল মেঘরাশি ভয়ঙ্কর মরুদ্‌গণের দ্বারা সম্মুখে চালিত হয়ে, সজোরে শিলাবৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগল। বৃহদায়তন স্তম্ভের ন্যায় স্থূলরূপে মেঘরাশি বারিধারা বর্ষণ করতে থাকলে, পৃথিবী প্লাবনে জলমগ্ন হল এবং নিম্নস্থান থেকে উচ্চস্থানকে আর পৃথক করা গেল না। অত্যধিক বর্ষণ ও বায়ুর দ্বারা কম্পিত হয়ে গাভী ও অন্যান্য পশুগল এবং শীতের দ্বারা পীড়িত হয়ে গোপ ও গোপীগণ সকলে আশ্রয়ের জন্য শ্রীগোবিন্দের নিকটে গমন করলেন। অত্যধিক বারিবর্ষণের দ্বারা পীড়িত ও কম্পিত হয়ে এবং তাদের নিজের দেহ দ্বারা তাদের মস্তক ও বৎসদের আচ্ছাদিত করে, গাভীগণ পরমেশ্বর ভগবানের পাদপদ্মে উপনীত হল।”
গোপ ও গোপীগণ ভগবানকে উদ্দেশ করে বললেন- “কৃষ্ণ, কৃষ্ণ, হে মহা সৌভাগ্যশালী, অনুগ্রহ করে ইন্দ্রের ক্রোধ থেকে গাভীদের রক্ষা করুন! হে প্রভু, আপনি ভক্তবৎসল। দয়া করে আমাদেরও রক্ষা করুন।”
“তার গোকুলের অধিবাসীবৃন্দকে শিলাবৃষ্টি ও প্রবল বায়ুর প্রচণ্ড আক্রমণে বাস্তবিকই অচেতন দর্শন করে, পরমেশ্বর ভগবান হরি হৃদয়ঙ্গম করলেন যে, এটি ক্রুদ্ধ ইন্দ্রের কাজ। যেহেতু আমরা তাঁর যজ্ঞ বন্ধ করেছি, প্রবল বায়ু ও শিলা সহযোগে ইন্দ্র অস্বাভাবিকভাবে ভয়ঙ্কর এই অকাল বারিবর্ষণ করছেন। আমার যোগশক্তির দ্বারা আমি সম্পূর্ণরূপে ইন্দ্র কর্তৃক সৃষ্ট এই উপদ্রবের প্রতিকার করব। ইন্দ্রের মতো দেবতারা তাঁদের ঐশ্বর্যের জন্য গর্বিত এবং মূঢ়তাবশত তাঁরা মিথ্যাভাবে নিজেদের জগদীশ্বর বিবেচনা করছে। আমি এখন এই প্রকার অজ্ঞতা বিনাশ করব। যেহেতু দেবতারা সত্ত্বগুণযুক্ত, নিজেকে ঈশ্বররূপে অভিমান করা তাঁদের অবশ্যই সঙ্গত নয়। আমি যখন সত্ত্বগুণবিহীন তাঁদের মিথ্যা সম্মান ভঙ্গ করি, তখন আমার উদ্দেশ্যটি হচ্ছে তাঁদের শান্তি প্রদান করা। যেহেতু আমি তাদের আশ্রয়, আমি তাদের নাথ এবং বস্তুত তারা আমার নিজের পরিবার-স্বরূপ, সুতরাং আমি অবশ্যই আমার অপ্রাকৃত শক্তির দ্বারা গোপ-সম্প্রদায়কে রক্ষা করব। যাই হোক, আমি আমার ভক্তকে রক্ষা করার ব্রত গ্রহণ করেছি। এই কথা বলে, স্বয়ং বিষ্ণুস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ এক হাতে গোবর্ধন পর্বতকে উত্তোলন করে, একটি বালক যেভাবে অনায়াসে ছাতার মতো গাছ ধারণ করে, ঠিক সেভাবেই তাকে ঊর্ধ্বে ধারণ করলেন।”
ভগবান তখন গোপসমাজকে বললেন- “হে মাতা, হে পিতা, হে ব্রজবাসীগণ, তোমরা যদি ইচ্ছা কর তবে এখন তোমাদের গাভীগুলি নিয়ে এই পর্বতের নীচে আসতে পার। এই পর্বত আমার হাত থেকে পতিত হবে তোমাদের এই রকম ভয় করা উচিত নয়। আর বায়ু ও বর্ষণের জন্যও ভীত হয়ো না, কারণ ইতিমধ্যেই এই সমস্ত উৎপীড়ন থেকে তোমাদের পরিত্রাণের আয়োজন করা হয়েছে। কৃষ্ণের দ্বারা তাঁদের মন এভাবেই আশ্বস্ত হয়ে, তাঁরা সকলে পাহাড়ের নীচে প্রবেশ করলেন, যেখানে তাঁরা নিজেদের জন্য এবং তাঁদের গাভীসকল, শকটসমূহ, ভৃত্য ও পুরোহিতগণ এবং সেই সঙ্গে গোপ-সম্প্রদায়ের অন্যান্য সকলের জন্য যথেষ্ট জায়গা পেলেন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বিস্মৃত হয়ে এবং সমস্ত ব্যক্তিগত সুখস্বাচ্ছন্দ্য সরিয়ে রেখে, শ্রীকৃষ্ণ সাতদিন ধরে পর্বতকে ধারণ করে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন আর ব্রজবাসীরা তাঁকে নিরীক্ষণ করছিলেন।”
“ইন্দ্র যখন শ্রীকৃষ্ণের এই যোগশক্তির প্রদর্শন পর্যবেক্ষণ করলেন, তখন তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। তাঁর মিথ্যা গর্বের স্তর থেকে চ্যুত হয়ে এবং তাঁর সংকল্প থেকে ভ্রষ্ট হয়ে, তিনি তার মেঘরাশিকে বিরত হতে নির্দেশ দিলেন। প্রচণ্ড বায়ু ও বৃষ্টি এখন বিরত হয়েছে, আকাশ মেঘশূণ্য হয়েছে এবং সূর্য উদিত হয়েছে দর্শন করে, গিরি-গোবর্ধন উত্তোলনকারী শ্রীকৃষ্ণ গোপ-সম্প্রদায়কে বললেন- হে গোপগণ, তোমাদের স্ত্রী, সন্তান ও সম্পত্তি নিয়ে বহির্গত হও। ভয় ত্যাগ কর। বায়ু ও বৃষ্টি থেমে গেছে এবং নদীর জলের উচ্চতাও কমে গেছে। তাঁদের নিজ নিজ গাভীসকল সংগ্রহ এবং উপকারণাদি তাঁদের শকটে বোঝাই করার পর, গোপগণ নির্গত হলেন। স্ত্রী, শিশু এবং বৃদ্ধরাও ধীরে ধীরে তাঁদের অনুসরণ করলেন। যখন সমস্ত প্রাণীগণ নিরীক্ষণ করছিলেন, তখন পরমেশ্বর ভগবান পর্বতকে তার স্বস্থানে স্থাপন করলেন, ঠিক যেন সেটি আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে।”
“সমগ্র বৃন্দাবনবাসীরা প্রেমে ভাবাবিষ্ট হয়ে অভিভূত হলেন এবং তাঁর সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনুযায়ী – কেউ তাঁকে আলিঙ্গন করে, অন্যরা অবনত হয়ে প্রণাম আদির দ্বারা শ্রীকৃষ্ণকে অভিনন্দিত করতে তাঁর কাছে এগিয়ে এলেন। গোপীগণ সম্মানের নিদর্শন-স্বরূপ দধিমিশ্রিত জল ও যব উপস্থাপন করলেন এবং তাঁরা তাঁর উপর শুভ আশীর্বাদ বর্ষণ করলেন। মাতা যশোদা, মাতা রোহিণী, নন্দ মহারাজ ও মহা বলশালী বলরাম সকলে কৃষ্ণকে আলিঙ্গন কররেন। স্নেহে অভিভূত হয়ে, তাঁরা তাঁকে তাঁদের আশীর্বাদ প্রদান করলেন। হে রাজন্, সিদ্ধ, সাধ্য, গন্ধর্ব ও চারণগণ সহ স্বর্গের দেবতাগণ সকলে শ্রীকৃষ্ণের স্তব গান করলেন এবং পরম সন্তোষ সহকারে পুষ্প বর্ষন করলেন। হে পরীক্ষিৎ, স্বর্গের দেবতাগন তাঁদের শঙ্খ ও দুন্দুভি ধ্বনি সহকারে বাদিত করেছিলেন এবং তুম্বুরু প্রমুখ শ্রেষ্ঠ গন্ধর্বগণ গান করতে শুরু করেছিলেন। তাঁর প্রিয় গোপসখাগণ ও শ্রীবলরামের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে, কৃষ্ণ তখন যেখানে তাঁর গাভীদের পরিচর্যা করতেন সেই স্থানে গমন করলেন। গোপিকাগণ অত্যন্ত গভীরভাবে তাঁদের হৃদয় স্পর্শকারী শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা অনুষ্ঠিত গিরি-গোবর্ধন উত্তোলন ও অন্যান্য মহিমাময় কার্যসকল আনন্দ সহকারে গান করতে করতে তাঁদের গৃহে ফিরে গেলেন।”

Leave a Reply

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,959 hits