শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তাঁর ভ্রাতা বলদেবের সঙ্গে সেই স্থানে অবস্থানকালে শ্রীকৃষ্ণ দেখলেন যে, গোপগণ ব্যস্তভাবে ইন্দ্রযজ্ঞের আয়োজন করছেন। সর্বজ্ঞ পরমাত্মা হয়ে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ইতিপূর্বেই পরিস্থিতি বিষয়ে অবগত ছিলেন, কিন্তু তবুও তিনি তাঁর পিতা নন্দ মহারাজ প্রমুখ বৃদ্ধ গোপদের কাছে বিনম্রভাবে প্রশ্ন করলেন। হে পিতা, এই যে আপনাদের বিশাল উদ্যোগ কিসের জন্য তা দয়া করে আমার নিকট বর্ণনা করুন। কি উদ্দেশ্যে তা সাধিত হচ্ছে? এটি যদি একটি ধর্মীয় যজ্ঞ হয়, তা হলে কার সন্তুষ্টি বিধানের লক্ষ্যে এবং কি উপায়ে তা সম্পন্ন হতে চলেছে? হে পিতা, দয়া করে আমাকে এই বিষয়ে বলুন। তা জানার জন্য আমার অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষা রয়েছে এবং অত্যন্ত আন্তরিকভাবে তা শুনতে প্রস্তুত। সাধুগণ যাঁরা অন্য সকলকে নিজেদের সমকক্ষ দর্শন করেন, যাঁদের ‘আমার’ বা ‘অন্যের’ এরূপ ধারণা নেই এবং যাঁরা কে মিত্র, কে শত্রু আর কে উদাসীন তা বিবেচনা করেন না, তাঁরা নিঃসন্দেহে কোনও কিছুই গোপন রাখেন না। যে নিরপেক্ষ, তাকে শত্রুর মতো বর্জন করা যেতে পারে। কিন্তু নিজমতাবলম্বীকে মিত্ররূপে বিবেচনা করা উচিত। এই জগতের মানুষেরা যখন কর্মানুষ্ঠান করে, তখন কখনও কখনও তারা জানে যে, তারা কি করছে এবং কখনও-বা তা জানে না। যারা জানে যে, তারা কি করছে, তারা কর্মের সাফল্য লাভ করে, কিন্তু অজ্ঞ মানুষেরা তা পায় না। আপনাদের এই ধর্মীয় আচারগত উদ্যোগ সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে আমার কাছে বর্ণনা করা উচিত। এই অনুষ্ঠানটি কি শাস্ত্রীয় নির্দেশের উপর প্রতিষ্ঠিত অথবা সাধারণ সমাজের একটি প্রথা মাত্র?”
নন্দ মহারাজ বললেন- “ভগবান ইন্দ্র বৃষ্টির নিয়ন্তা। মেঘসমূহ তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিনিধি এবং তারা প্রত্যক্ষভাবে বৃষ্টির জল সরবরাহ করে, যা সমস্ত প্রাণীর প্রতি তৃপ্তি ও জীবনদায়ী শক্তি প্রদান করে থাকে। হে বৎস, কেবল আমরাই নই, অন্যান্য বহু মানুষও বৃষ্টি প্রদানকারী মেঘেদের প্রতি ও ঈশ্বরস্বরূপ তাঁকে পূজা করে থাকে। আমরা তাঁরই বৃষ্টি বর্ষণ দ্বারা উৎপন্ন শস্য ও অন্যান্য পূজার দ্রব্য তাঁকে নিবেদন করে থাকি। ইন্দ্রের জন্য অনুষ্ঠিত যজ্ঞের অবশিষ্টাংশ গ্রহণের দ্বারা মানুষ তাদের জীবন ধারণ করে এবং ধর্ম, অর্থ ও কাম- এই ত্রিবর্গ সম্পাদন করে। এভাবেই ভগবান ইন্দ্রই উদ্যমী মানুষের সকাম কর্মফলের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি। এই ধর্মীয় নীতি নির্ভরযোগ্য পরম্পরার উপর প্রতিষ্ঠিত। যারা কাম, দ্বেষ, ভয় অথবা লোভবশত তা পরিত্যাগ করে, তারা নিশ্চিতভাবে সৌভাগ্য লাভে ব্যর্থ হবে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ভগবান কেশব (কৃষ্ণ) যখন তাঁর পিতা নন্দ ও অন্যান্য বয়স্ক ব্রজবাসীগণের কথা শ্রবণ করলেন, তখন ইন্দ্রের ক্রোধ উৎপন্ন করার জন্য তিনি তাঁর পিতার উদ্দেশ্যে নিম্নোক্তভাবে বললেন।”
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “জীব কর্ম প্রভাবেই জন্মগ্রহণ করে, এবং কর্মের দ্বারাই কেবল সে তার বিনাশের সম্মুখীন হয়। তার সুখ, দুঃখ, ভয় এবং নিরাপত্তা-বোধ সব কিছুই কর্মের ফলরূপে উৎপন্ন হয়। অপরের কর্মফল প্রদাতা কোনও পরম নিয়ন্তা যদি থাকেন (অনুমান হয়), তা হলে তাঁকেও অবশ্যই অনুষ্ঠানকারীর কর্মের উপর নির্ভর করতে হয়। যাই হোক, কর্ম অনুষ্ঠিত না হলে কর্মফল প্রদান করার কোনও প্রশ্নই থাকে না। এই জগতে জীবেরা তাদের নিজ নিজ নির্দিষ্ট প্রারব্ধ কর্মফল ভোগ করতে বাধ্য হয়। যেহেতু মানুষদের স্বভাবজাত ভাগ্য ইন্দ্র কোনভাবেই পরিবর্তন করতে পারেন না, তা হলে মানুষ কেন তাঁকে পূজা করবে? প্রত্যেকেই তার নিজ স্বভাবের নিয়ন্ত্রণের অধীন। সমস্ত দেবতা, দানব ও মানুষ সহ এই নিখিল ব্রহ্মাণ্ড স্বভাবেই অবস্থিত। যেহেতু কর্মই বদ্ধ জীবের বিভিন্ন উচ্চ ও নীচ শ্রেণীর জড় দেহসমূহ গ্রহণ ও ত্যাগের কারণ, তাই এই কর্মই তার শত্রু, মিত্র, উদাসীন সাক্ষী, তা গুরু ও নিয়ন্ত্রণকারী ঈশ্বর। সুতরাং আন্তরিকভাবে কর্মেরই পূজা করা উচিত। মানুষের উচিত তার স্বভাবগত অবস্থায় অবস্থান করে তার নিজের কর্তব্য অনুষ্ঠান করা। বাস্তবিকই, যার দ্বারা আমরা ভালভাবে জীবন ধারণ করতে পারি, সেটিই আমাদের আরাধ্য বিগ্রহ। যদি কোনও বস্তুত বাস্তবিকই আমাদের জীবন প্রতিপালন করে, কিন্তু আমরা যদি অন্য বস্তুর আশ্রয় গ্রহণ করি, তা হলে আমরা কিভাবে প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারব? আমরা তখন এক অসতী স্ত্রীলোকের মতো হয়ে যাব, যে তার উপপতির সঙ্গে থেকে কখনও কোনও প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারে না। ব্রাহ্মণ তাঁর জীবন বেদ অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার দ্বারা, ক্ষত্রিয় পৃথিবীর সুরক্ষার দ্বারা, বৈশ্য ব্যবসার দ্বারা এবং শূদ্র উচ্চ, দ্বিজ শ্রেণীবর্গের সেবার দ্বারা জীবন ধারণ করেন। কৃষি, বানিজ্য, গোরক্ষা এবং সুদের কারবার- এই চারটি বৈশ্যদের উপজীবিকা। তার মধ্যে একটি সম্প্রদায়রূপে আমরা সর্বদাই গোরক্ষাতেই নিয়োজিত থাকি।” “সত্ত্ব, রজ ও তম- প্রকৃতির এই তিনটি গুণই সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের কারণ। বিশেষত, রজোগুণ এই জগৎ সৃষ্টি করে এবং স্ত্রী ও পুরুষের সংযোগের মাধ্যমে তা বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়। রজোগুণের দ্বারা চালিত হয়ে মেঘরাশি সর্বত্র তাদের বারি বর্ষণ করে এবং এই বৃষ্টির দ্বারা সমস্ত জীব তাদের জীবন ধারণ করে। এই ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী ইন্দ্রের আর কিই বা করার আছে?”
“হে পিতা, আমাদের বাসস্থান নগরে, জনপদে বা গ্রামে নয়। বনবাসী হবার ফলে, আমরা সর্বদাই বনে বা পাহাড়েই বাস করি। সুতরাং গো, ব্রাহ্মণ ও গিরি-গোবর্ধনের সন্তুষ্টির জন্য একটি যজ্ঞ শুরু করা যেতে পারে! ইন্দ্রের পূজার জন্য সংগৃহীত উপকরণসমূহের দ্বারাই এই যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হোক। পায়সান্ন থেকে শুরু করে সবজির সূপ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের ভক্ষ্য সামগ্রীসকল পাক করা হোক! নানা রকমের ভাজা ও সেঁকা উভয়বিধ শৌখিন পিঠা তৈরি করা উচিত। আর প্রাপ্য দুগ্ধজাত সমস্ত দ্রব্যাদি এই যজ্ঞের জন্য গ্রহণ করা উচিত। বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ যথাযথভাবে যজ্ঞাগ্নিতে আবাহন করুন। তার পর সেই ব্রাহ্মণগণকে আপনি উত্তমরূপে পাক করা ভক্ষ্য সামগ্রী ভোজন করান এবং গাভী ও অন্যান্য উপহারসামগ্রী তাঁদের দক্ষিণাস্বরূপ দান করুন। কুকুর ও চণ্ডালের মতো পতিত জনসহ প্রত্যেককে যথাযথ ভক্ষ্য সামগ্রী প্রদান করার পর, আপনি গাভীদের তৃণ দান করুন এবং তার পর গিরি-গোবর্ধনকে আপনার শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করুন। প্রত্যেকে তৃপ্তি সহকারে ভোজন করার পর, আপনারা সকলে সুন্দরভাবে অলঙ্কার ও বসনে সজ্জিত হয়ে, দেহকে চন্দন দিয়ে অনুলিপ্ত করুন এবং তার পর গাভী, ব্রাহ্মণ, যজ্ঞাগ্নি ও গিরি-গোবর্ধনকে প্রদক্ষিণ করুন। হে পিতা, এটিই আমার মত এবং যদি তা আপনার রুচিকর হয়, তা হলে আপনি এর অনুষ্ঠান করতে পারেন। এই প্রকার যজ্ঞ গাভী, ব্রাহ্মণ, গিরি-গোবর্ধন এবং আমারও অতি প্রিয়।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “স্বয়ং শক্তিশালী কালস্বরূপ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ইন্দ্রের মিথ্যা গর্ব চূর্ণ করার ইচ্ছা করেছিলেন। যখন নন্দ ও বৃন্দাবনের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ গোপগণ শ্রীকৃষ্ণের কথা শ্রবণ করলেন, তখন তাঁরা তা যথাযথরূপে গ্রহণ করলেন। গোপ-সম্প্রদায় তখন মধুসূদনের প্রস্তাব অনুযায়ী সমস্ত কিছুই করলেন। তাঁরা ব্রাহ্মণদের দিয়ে মঙ্গলময় বৈদিক মন্ত্র পাঠ করালেন এবং ইন্দ্রের যজ্ঞের জন্য নির্দিষ্ট দ্রব্যাদি ব্যবহার করে, তাঁরা গিরি-গোবর্ধন ও ব্রাহ্মণগণকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করলেন। তাঁরা গাভীগুলিকেও তৃণ দান করেছিলেন। তার পর গাভী, বলদ ও গোবৎসদের তাঁদের সম্মুখে স্থাপন করে, তাঁরা গিরি-গোবর্ধন প্রদক্ষিণ করলেন। সুন্দর অলঙ্কারে শোভিত গোপীগণ যখন বৃষবাহিত শকটে আরোহণ করে অনুগমন করেছিলেন, তখন তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের গুণমহিমা গান করছিলেন এবং তাঁদের গান ব্রাহ্মণগণের আশীর্বাদ কীর্তনের সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছিল। গোপগণের বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য কৃষ্ণ তখন এক অভূতপূর্ব বিশাল রূপ ধারণ করলেন। ‘আমিই গিরি-গোবর্ধন’ ঘোষণা করে, তিনি প্রচুর পূজার্ঘ্য ভক্ষণ করলেন। ব্রজবাসীগণের সঙ্গে একত্রে ভগবান গিরি-গোবর্ধনের এই রূপের প্রতি প্রণত হলেন, এভাবেই বস্তুত নিজেকেই প্রণাম নিবেদন করলেন। তার পর তিনি বললেন, ‘দেখ, কিভাবে এই পর্বত মূর্তিরূপে আবির্ভূত হয়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদান করছেন!’ এই গোবর্ধন পর্বত ইচ্ছা অনুসারে যে কোনও রূপ ধারণ করে তাঁকে অবজ্ঞাকারী যে কোনও বনবাসীগণকে হত্যা করবে। অতএব আমাদের ও আমাদের গাভীদের সুরক্ষার জন্য তাঁকে আমরা প্রণাম নিবেদন করি।” ভগবান বাসুদেবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, এভাবেই গিরি-গোবর্ধন, গাভী ও ব্রাহ্মণদের যজ্ঞ যথাযথভাবে সম্পাদন করে, গোপগণ শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁদের গ্রাম ব্রজে ফিরে গেলেন।”
চতুর্বিংশতি অধ্যায়- গিরি- গোবর্ধন পূজা
30 Jul 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়