ত্রয়োবিংশতি অধ্যায়- ব্রাহ্মণপত্নীদের প্রতি অনুগ্রহ

গোপবালকেরা বললেন- “হে রাম, রাম, মহাবাহো! হে দুষ্ট দমনকারী কৃষ্ণ! আমরা ক্ষুধায় পীড়িত এবং এর জন্য তোমাদের কিছু করা উচিত।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “গোপবালকদের দ্বারা এভাবেই প্রার্থিত হয়ে, পরমেশ্বর ভগবান দেবকীসুত তাঁর কতিপয় ভক্ত ব্রাহ্মণপত্নীদের সন্তুষ্ট করতে ইচ্ছা করে এভাবে বললেন- ‘বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ স্বর্গে উন্নীত হবার কামনায় যেখানে এখন আঙ্গিরস যজ্ঞের অনুষ্ঠান করছেন, অনুগ্রহ করে তোমরা সেই যজ্ঞস্থলে যাও। হে প্রিয় গোপবালকগণ, তোমরা যখন সেখানে গমন করবে, তখন কিছু অন্ন প্রার্থনা করবে মাত্র। তাঁদের কাছে গিয়ে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পরমেশ্বর ভগবান বলরাম এবং আমারও নাম জ্ঞাপন করে বর্ণণা করবে যে, তোমরা আমাদের কাছ থেকেই গিয়েছ।’ পরমেশ্বর ভগবান দ্বারা এভাবেই নির্দেশত হয়ে, গোপবালকেরা সেখানে গমন করে তাঁদের প্রার্থনা নিবেদন করলেন। তাঁরা ব্রাহ্মণদের সামনে বিনীতভাবে করজোড়ে দণ্ডায়মান হলেন এবং তার পর ভূমিতে পতিত হয়ে সম্মান জানালেন।”
“হে ভূদেবগণ, আমাদের কথা শ্রবণ করুন। আমরা গোপবালকেরা কৃষ্ণের নির্দেশ পালন করছি এবং আমরা এখানে বলরামের দ্বারা প্রেরিত হয়েছি। আমরা আপনাদের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি। অনুগ্রহ করে আমাদের উপস্থিতি স্বীকার করুন। অদুরেই শ্রীরাম ও শ্রীঅচ্যুত তাঁদের গোচারণ করছেন। তাঁরা ক্ষুধার্ত এবং চাইছেন যে, আপনারা তাঁদের কিছু অন্ন দান করুন। অতএব, হে ব্রাহ্মণগণ, হে শ্রেষ্ঠ ধর্মজ্ঞগণ, আপনাদের যদি শ্রদ্ধা থাকে, তা হলে তাঁদের কিছু অন্ন দান করুন। যজ্ঞ অনুষ্ঠাতার দীক্ষাগ্রহণ ও প্রকৃত পশুবলির মধ্যবর্তী সময় ব্যতীত, হে শুদ্ধতম ব্রাহ্মণগণ, অন্তত সৌত্রামণি ছাড়া অন্যান্য যজ্ঞে দীক্ষা গ্রহণকারীর অন্নগ্রহণও দূষণীয় নয়।”
“ব্রাহ্মণেরা পরমেশ্বর ভগবানের থেকে এই বিনীত প্রার্থনা শ্রবণ করেন, তবু তাঁরা তাতে কর্ণপাত করলেন না। বস্তুত, তাঁরা ক্ষুদ্র বাসনাযুক্ত ছিলেন এবং শ্রমসাধ্য ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে আবদ্ধ ছিলেন। যদিও তাঁরা নিজেদের বৈদিক জ্ঞানে উন্নত মনে করতেন, প্রকৃতপক্ষে তাঁরা ছিলেন অনভিজ্ঞ মূর্খ। যদিও যজ্ঞানুষ্ঠানের সকল উপাদান- স্থান, কাল, চরু, ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্য, মন্ত্র, তন্ত্র, পুরোহিত, অগ্নি, দেবতা, যজমান, যজ্ঞ, নৈবেদ্য এবং অদৃশ্য লাভজনক ফল- সমস্ত কিছুই যাঁর ঐশ্বর্যের রূপ, সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ব্রাহ্মণগণ তাঁদের বিকৃত বুদ্ধির কারণে একজন সাধারণ মনুষ্যরূপেই দর্শন করলেন। তিনি যে পরমতত্ত্ব, প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশিত পরমেশ্বর ভগবান, যাঁকে জড় ইন্দ্রিয়ের দ্বারা সাধারণত উপলব্ধি করা যায় না, তা হৃদয়ঙ্গম করতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছিলেন। এইভাবে তাঁদের দেহাভিমান দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে তাঁরা তাঁকে যথাযথভাবে সম্মান প্রদর্শন করেননি। ব্রাহ্মণগণ যখন সহজ উত্তর হ্যাঁ বা না কিছুই বললেন না, হে শত্রুদমনকারী [পরীক্ষিৎ], তখন গোপবালকেরা নিরাশ হয়ে কৃষ্ণ ও রামের কাছে ফিরে এলেন এবং তাঁদের কাছে সমস্ত কিছু বর্ণনা করলেন। সমস্ত ঘটনা শ্রবণ করে পরমেশ্বর ভগবান, জগদীশ্বর কেবল হাসলেন। তার পর তিনি পুনরায় গোপবালকদের উদ্দেশ্য করে এই জগতে মানুষদের করণীয় পন্থা তাঁদের প্রদর্শন করে বললেন।”
শ্রীকৃষ্ণ বললেন- “ব্রাহ্মণ-পত্নীদের বলবে যে, শ্রীসঙ্কর্ষণের সঙ্গে আমি এখানে উপস্থিত হয়েছি। তাঁরা অবশ্যই তোমরা যত চাও তত অন্ন তোমাদের প্রদান করবেন, কারণ তাঁরা আমার প্রতি অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ এবং বাস্তবিকপক্ষে, তাঁদের বুদ্ধিমত্তার দ্বারা তাঁরা কেবল আমাতে অবস্থান করছে।” ব্রাহ্মণ-পত্নীগণ যেখানে অবস্থান করছিলেন, গোপবালকগণ তখন সেই গৃহে গমন করলেন। সেখানে বালকেরা সুন্দর অলঙ্কারে শোভিত হয়ে সেই সাধ্বী স্ত্রীগণকে বসে থাকতে দেখলেন। ব্রাহ্মণ-পত্নীগণের প্রতি প্রণতি নিবেদন করে, বালকেরা বিনীতভাবে তাঁদের বললেন- ‘হে জ্ঞানী ব্রাহ্মণ-পত্নীগণ, আপনাদের প্রতি প্রণতি নিবেদন করি। দয়া করে আমাদের কথা শ্রবণ করুন। অনতিদূরে বিচরণরত শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা আমরা এখানে প্রেরিত হয়েছি। গোচারণ করতে করতে তিনি গোপবালকগণ ও শ্রীবলরামের সঙ্গে অনেক দূর চলে এসেছেন। এখন তিনি ক্ষুধার্ত, তাই তাঁর ও তাঁর সঙ্গীদের জন্য কিছু অন্ন প্রদান করুন।’ ”
“ব্রাহ্মণ-পত্নীগণ কৃষ্ণকে দর্শন করতে সর্বদা আগ্রহী ছিলেন, কারণ তাঁর বিবরণের দ্বারা তাঁদের মন উল্লসিত হয়েছিল। এভাবেই তাঁর আগমনের কথা শ্রবণ করা মাত্রই তাঁরা অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। নদীগুলি যেমন সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়, সেভাবেই বৃহৎ ভোজন পাত্রগুলিতে সুস্বাদু ও সুগন্ধযুক্ত চতুর্বিধ খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে, সকল স্ত্রীগণ তাঁদের প্রিয়জনের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে গমন করলেন। দীর্ঘকাল শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত গুণাবলী শ্রবণের ফলে তাঁদের চিত্ত আসক্ত হওয়ায়, তাঁদের পতি, ভ্রাতা, পুত্র ও অন্যান্য স্বজনদের দ্বারা নিরুৎসাহিত হওয়া সত্ত্বেও, তাঁদের কৃষ্ণ-সন্দর্শনের আশা জয় হয়েছিল। যমুনা নদীর সংলগ্ন অশোক বৃক্ষের নবপল্লব সুশোভিত উপবনে গোপবালকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ও তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরাম সহ বিচরণশীল তাঁরা তাঁকে দর্শন করলেন। তাঁর গাত্রবর্ণ ছিল শ্যাম এবং বসন ছিল পীত। শিখিপুচ্ছ, বর্ণময় ধাতু, পল্লব এবং বনমালা ও পত্রসকল ধারণ করে তিনি নটবরের মতো সজ্জিত ছিলেন। তিনি এক হাতে তাঁর সখার স্কন্ধে স্থাপন করে, অন্য হাত দিয়ে একটি পদ্ম সঞ্চালন করছিলেন। তাঁর কর্ণদ্বয়ে উৎপল শোভা পাচ্ছিল, তাঁর কপোলে কেশদাম ঝুলছিল এবং তাঁর মুখপদ্ম মৃদু হাস্যযুক্ত ছিল। হে নরেন্দ্র, দীর্ঘকাল যাবৎ সেই ব্রাহ্মণ-পত্নীগণ তাঁদের প্রিয়তম শ্রীকৃষ্ণের কথা শ্রবণ করেছিলেন এবং তাঁর মহিমা তাঁদের কর্ণদ্বয়ের ভূষণস্বরূপ হয়েছিল। বাস্তবিকই, তাঁদের মন সর্বদাই তাঁর প্রতি নিমগ্ন থাকত। তাঁদের নয়নের রন্ধ্রপথে এখন তাঁরা তাঁদের হৃদয়ের অভ্যন্তরে তাঁকে প্রবেশ করিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলিঙ্গন করেছিলেন। অবশেষে এখাবেই তাঁদের বিরহের সন্তাপ তাঁরা পরিত্যাগ করেছিলেন, ঠিক যেমন মুনিগণ তাঁদের অন্তর্চেতনাকে আলিঙ্গনের দ্বারা মিথ্যা অহঙ্কারের উৎকন্ঠা পরিত্যাগ করেন।”
“কিভাবে সমস্ত জাগতিক আশা পরিত্যাগ করে কেবল তাঁকে দর্শনের জন্য সেই স্ত্রীগণ সেখানে এসেছিলেন, সমস্ত প্রাণীর চিন্তাধারার সাক্ষীস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ তা জানতে পেরেছিলেন। তাই তিনি সহাস্য বদনে তাঁদের এভাবে বললেন- হে সৌভাগ্যবতী স্ত্রীগণ, স্বাগত। উপবেশন করে তোমরা বিশ্রাম গ্রহণ কর। তোমাদের জন্য আমি কি করতে পারি? আমাকে দর্শন করতে তোমরা যে এখানে এসেছ তা উপযুক্তই হয়েছে। যাঁরা নিজেদের প্রকৃতই স্বার্থ দর্শন করতে পারেন, নিঃসন্দেহে সেই দক্ষ ব্যক্তিগণ প্রত্যক্ষভাবে আমার প্রতি অহৈতুকী ও অপ্রতিহতা ভক্তি সম্পাদন করে থাকেন, কারণ আমি আত্মার অত্যন্ত প্রিয়। কেবলমাত্র আত্মার সঙ্গে সম্পর্কের ফলেই কারও প্রাণ, বুদ্ধি, মন, স্বজন, দেহ, স্ত্রী, সন্তান, ধন ইত্যাদি প্রিয় হয়ে থাকে। অতএব কারও নিজের আত্মার চেয়ে অর কি বস্তু সম্ভবত অধিকতর প্রিয় হতে পারে? তাই তোমাদের যজ্ঞস্থলে ফিরে যাওয়া উচিত, কারণ তোমাদের জ্ঞানী ব্রাহ্মণ পতিগণ গৃহস্থ এবং তাঁদের নিজ নিজ যজ্ঞ সমাপ্তির জন্য তোমাদের সহায়তা প্রয়োজন।”
ব্রাহ্মণ-পত্নীগণ উত্তর করলেন- “হে সর্বশক্তিমান, অনুগ্রহ করে এরূপ নিষ্ঠুর বাক্য বলবেন না। বরং, আপনি যে সর্বদাই দয়া করে আপনার ভক্তবৃন্দের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে থাকেন, সেই প্রতিজ্ঞা আপনার পূরণ করা উচিত। এখন আমরা আপনার পাদপদ্মে উপস্থিত হয়েছি, আমরা কেবলমাত্র এখানে এই অরণ্যে অবস্থান করতে ইচ্ছা করি যাতে আমরা আমাদের মস্তকে আপনার পাদপদ্মে অবজ্ঞাভরে প্রদত্ত তুলসীমালাটি বহন করতে পারি। আমরা সমস্ত রকম জাগতিক সম্পর্কগুলি পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত। আমাদের পতি, পিতা, সন্তান, ভ্রাতা, অন্যান্য আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুগণ আমাদের আর ফিরিয়ে নেবে না, তা হলে অন্য কে আর আমাদের আশ্রয় দিতে ইচ্ছুক হবে? অতএব, হে অরিন্দম, যেহেতু আমরা আপনার চরণকমলে পতিত হয়েছি এবং আমাদের অন্য আর কোনও গতি নেই, দয়া করে আমাদের বাসনা অনুমোদন করুন।”
পরমেশ্বর ভগবান উত্তর দিলেন- “তোমাদের পতিগণ এমন কি তোমাদের পিতা, ভ্রাতা, পুত্র ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন বা সাধারণ মানুষজন তোমাদের প্রতি শত্রুতা ভাবাপন্ন হবে না, নিশ্চিত থেক। আমি নিজেই এই অবস্থাটি সম্বন্ধে তাদের উপদেশ প্রদান করব। অবশ্য, দেবতারাও তাঁদের অনুমোদন ব্যক্ত করবেন। আমার দৈহিক সাহচর্যে তোমাদের মর্যাদা অবশ্যই এই জগতের মানুষদের সন্তুষ্ট করবে না, আমার প্রতি প্রেম বিকশিত করার জন্য তোমাদের পক্ষে এই শ্রেষ্ঠ পন্থাও নয়। বরং, আমার প্রতি তোমাদের মন নিবিষ্ট কর, তা হলে অতি শ্রীঘ্রই তোমরা আমাকে লাভ করবে। আমার সম্বন্ধে শ্রবণ, আমার বিগ্রহরূপ দর্শন, আমাকে ধ্যান ও আমার নাম ও গুণমহিমা কীর্তনের ফলে আমার প্রতি যে প্রেম বিকশিত হয়, তা আমার সন্নিকটে অবস্থানের দ্বারা হয় না। অতএব তোমাদের গৃহে ফিরে যাও।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এভাবেই আদিষ্ট হয়ে, ব্রাহ্মণ-পত্নীগণ যজ্ঞস্থলে ফিরে গেলেন। ব্রাহ্মণগণ তাঁদের স্ত্রীদের কোনরূপ দোষ দেখতে পেলেন না এবং পত্নীদের সঙ্গে তাঁরা যজ্ঞ সম্পূর্ণ করলেন। সেখানে একজন স্ত্রী তাঁর পতির দ্বারা বলপূর্বক অবরুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি যখন অন্যদের মাধ্যমে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বর্ণনা শ্রবণ করলেন, তখন তিনি তাঁর হৃদয়ের অন্তস্তলে তাঁকে আলিঙ্গন করে জাগতিক কার্যকলাপের বন্ধনস্বরূপ তাঁর জড় দেহটি পরিত্যাগ করলেন। পরমেশ্বর ভগবান গোবিন্দ সেই চতুর্বিধ অন্নের দ্বারা গোপবালকদের ভোজন করালেন। তার পর সর্বশক্তিমান ভগবান স্বয়ং সেই অন্ন ভোজন করলেন। এভাবেই পরমেশ্বর ভগবান তাঁর লীলাবিলাস সম্পাদনের জন্য মানুষের মতো আবির্ভূত হয়ে মানব-সমাজের আচরণ অনুকরণ করেছিলেন। তিনি তাঁর সৌন্দর্য, বচন ও কার্যকলাপের দ্বারা তাঁর গাভী, গোপসখা ও গোপবালিকাদের সন্তুষ্ট করে আনন্দ উপভোগ করেছিলেন।”
“তার পর ব্রাহ্মণেরা তাঁদের চেতনা ফিরে পেয়ে অনুতপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, “আমরা পাপ করেছি, কারণ আমরা জগতের দুই ঈশ্বরের প্রার্থনা অগ্রাহ্য করেছি, যাঁরা ছলনা করে সাধারণ মানুষের মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁদের পত্নীদের শুদ্ধ, অপ্রাকৃত ভক্তি লক্ষ্য করে এবং নিজেদের ভক্তিহীন দর্শন করে, ব্রাহ্মণগণ অত্যন্ত অনুতাপ বোধ করে নিজেদের নিন্দা করতে লাগলেন। আমাদের ত্রিবিধ জন্ম, আমাদের ব্রহ্মচর্যের ব্রত ও আমাদের বিস্তৃত জ্ঞানে ধিক! ধিক আমাদের সম্ভ্রান্ত বংশ-পরিচয় এবং যজ্ঞের আচার-অনুষ্ঠানে দক্ষতায়! এই সমস্ত কিছুই ধিক কারণ আমরা অধোক্ষজ ভগবানের প্রতি বিমুখ ছিলাম। পরমেশ্বর ভগবানের মায়াশক্তি নিশ্চিতভাবে যোগীদেরও মোহিত করে, তা হলে আমাদের আর কি বলার আছে। ব্রাহ্মণরূপে আমাদের সকল শ্রেণীর মানুষের পারমার্থিক আচার্য বলে মনে করা হয়, তবুও আমাদের নিজেদের প্রকৃত স্বার্থ সম্বন্ধেই আমরা মোহিত হয়েছি। দেখ, এই রমণীগণ সমগ্র জগতের গুরু শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁদের অসীম প্রেম বিকশিত করেছেন! এই প্রেম তাঁদের সেই মৃত্যুবন্ধন- পারিবারিক জীবনের প্রতি তাঁদের আসক্তি ছিন্ন করেছে। এই নারীগণের কখনও উপনয়নাদি সংস্কার হয়নি, তারা ব্রহ্মচারীরূপে গুরুর আশ্রমে বাস করেনি, তারা কোনও তপশ্চর্যার অনুষ্ঠান করেনি, তারা আত্মর বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে বিচার-বিশ্লেষণ করেনি, শৌচাচার অথবা পুণ্য ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানেও যুক্ত নয়, তবুও উত্তমশ্লোক ও যোগেশ্বরেরও ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাদের দৃঢ় ভক্তি রয়েছে। পক্ষান্তরে, এই সমস্ত প্রক্রিয়ার অনুষ্ঠান করেও ভগবানের প্রতি আমাদের এরূপ ভক্তি নেই। বাস্তবিকই, আমরা গৃহ সংক্রান্ত বিষয়ে মোহিত থাকার ফলে, আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্যুত হয়েছি। কিন্তু এখন দেখুন এই সরল গোপবালকদের বাক্যের মাধ্যমে কিভাবে ভগবান প্রকৃত সজ্জনগণের পরম গতি আমাদের স্মরণ করিয়েছেন। অন্যথায়, যাঁর প্রতিটি বাসনা ইতিপূর্বেই পূর্ণ হয় এবং যিনি মুক্তি ও অন্য সমস্ত আশীর্বাদসমূহের বিধাতা সেই পরম নিয়ন্তা কেন তাঁর দ্বারা সকল সময়ে নিয়ন্ত্রিত আমাদের সঙ্গে ছলনা করবেন? তাঁর পাদপদ্ম স্পর্শের আশায়, অন্য সকলকে পরিত্যাগ করে এবং তাঁর গর্ব ও চাঞ্চল্য পরিহার করে লক্ষ্ণীদেবী নিরন্তর কেবল তাঁরই উপাসনা করেন। আর সেই তিনি প্রার্থনা করছেন তা প্রত্যেকের কাছে নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর।”
“পবিত্র স্থান, কাল, বিবিধ দ্রব্য, বৈদিক মন্ত্র, নির্দেশিত আচারসমূহ, পুরোহিত যজ্ঞাগ্নি, দেবতা, যজমান, যজ্ঞের নৈবেদ্য ও প্রাপ্ত পুণ্য-ফলসমূহ- যজ্ঞের সমস্ত কিছুই কেবল তাঁর ঐশ্বর্যের প্রকাশ মাত্র। যদিও আমরা শ্রবণ করেছি যে, সমস্ত যোগেশ্বরগণেরও ঈশ্বর পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু যদুকুলে জন্মগ্রহণ করেছেন, তবু আমরা এতই মূঢ় ছিলাম যে, শ্রীকৃষ্ণই যে স্বয়ং তিনি তা আমরা চিনতে পারিনি। ”
“আমরা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রণাম নিবেদন করি। তাঁর বুদ্ধিমত্তা কখনই মোহগ্রস্ত হয় না, বরং আমরাই তাঁর মায়াশক্তিতে বিভ্রান্ত হয়ে, কেবলমাত্র সকাল কর্মমার্গে ভ্রমণ করছি। আমরা শ্রীকৃষ্ণের মায়াশক্তির দ্বারা মোহিত ছিলাম, তাই আদিপুরুষ ভগবানরূপে তাঁর প্রভাব হৃদয়ঙ্গম করতে পারিনি। এখন আমরা আশা করি, কৃপা করে তিনি আমাদের অপরাধ মার্জনা করবেন। এভাবেই কৃষ্ণকে অবহেলার দ্বারা কৃত পাপ স্মরণ করে, তাঁকে দর্শনের জন্য তাঁরা অত্যন্ত আগ্রহী হলেন। কিন্তু রাজা কংসের ভয়ে তাঁরা ব্রজে গমন করতে সাহস করলেন না।”

Leave a Reply

July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits