শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হেমন্তকালের প্রথম মাসে গোকুলের কুমারী কন্যাগণ দেবী কাত্যায়নীর অর্চনাব্রত পালন করলেন। সারা মাস তাঁরা কেবলমাত্র হবিষ্যান্ন ভোজন করেছিলেন। হে রাজন্, সূর্যোদয় কালে যমুনার জলে স্নান করে, গোপীগণ নদীর তীরে দেবী দুর্গার একটি মৃত্তিকাময়ী প্রতিমা নির্মাণ করলেন। তার পর তাঁরা ঘসা চন্দনের মতো সুগন্ধযুক্ত দ্রব্য এবং সেই সঙ্গে দীপ, ফল, সুপারি, নব-পল্লব, সুগন্ধ-মাল্য ও ধূপসহ নানা প্রকার উপহারের দ্বারা তাঁরা পূজা করেছিলেন। ‘হে দেবী কাত্যায়নী, হে ভগবানের মহাশক্তি, হে মহা যেগাশক্তি ধারিণী এবং শক্তিশালিনী সর্বনিয়ন্তা, অনুগ্রহ করে নন্দ মহারাজের পুত্রকে আমার পতি করে দিন। আমি আপনাকে আমার প্রণাম নিবেদন করি।’ এই মন্ত্র জপ করতে করতে কুমারী কন্যাগণের প্রত্যেকে তাঁর পূজা করছিলেন। এভাবেই একমাসব্যাপী কন্যাগণ তাঁদের ব্রত পালন করেন এবং তাঁদের মন সম্পূর্ণরূপে কৃষ্ণে নিমগ্ন করে এবং ‘নন্দ মহারাজের পুত্র আমার পতি হোক’ এই ভাবনায় ধ্যানস্থ হয়ে যথাযথভাবে দেবী ভদ্রকালীর পূজা করেছিলেন। প্রতিদিন তাঁরা ভোরবেলায় উঠতেন। পরস্পরকে নাম ধরে ডেকে, তাঁরা হাত ধরাধরি করতেন এবং স্নান করার জন্য কালিন্দীতে গমনকালে উচ্চস্বরে কৃষ্ণের গুনগান করতেন।”
“একদিন তাঁরা নদীর তীরে এসে, পূর্বের মতোই তাঁদের বসন একপাশে রেখে দিয়ে, কৃষ্ণের মহিমা গান করতে করতে আনন্দে জলক্রীড়া করতে লাগলেন। যোগশ্বেরগণেরও ঈশ্বর পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোপীরা কি করছিলেন সেই সম্বন্ধে অবগত ছিলেন, আর তাই তাঁদের প্রচেষ্টার পূর্ণতার ফল দানের উদ্দেশ্যে তাঁর অল্পবয়স্ক সঙ্গীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি সেখানে আগমন করলেন। কুমারীগণের বসনসমূহ নিয়ে তিনি তাড়াতাড়ি একটি কদম্ব বৃক্ষের মাথায় আরোহণ করলেন। তার পর, তিনি উচ্চস্বরে হাসতে থাকলে, তাঁর সঙ্গীগণও উচ্চস্বরে হাসতে লাগলেন, তখন তিনি পরিহাসচ্ছলে কুমারীগণের উদ্দেশ্যে বললেন- হে কুমারীগণ, তোমরা প্রত্যেকে এখানে এসে ইচ্ছা অনুসারে তোমাদের বসন ফিরিয়ে নিয়ে যাও। যেহেতু আমি দেখতে পাচ্ছি কঠোর ব্রত অনুষ্ঠানের ফলে তোমরা ক্লান্ত, তাই আমি তোমাদের সত্যি বলছি, পরিহাস করছি না। আমি পূর্বে কখনও মিথ্যা কথা বলিনি এবং এই বালকেরা তা জানে। অতএব, হে সুমধ্যমা কুমারীগণ, অনুগ্রহ করে হয় একে একে অথবা সকলে একত্রে এগিয়ে এসে তোমাদের বস্ত্রগুলি তুলে নাও।”
“কৃষ্ণ তাঁদের সঙ্গে কিভাবে পরিহাস করছেন তা দর্শন করে, গোপীগণ পূর্ণরূপে তাঁর প্রেমে নিমগ্না হলেন এবং পরস্পরের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, তাঁরা সলজ্জভাবে হাসতে হাসতে নিজেদের মধ্যে পরিহাস করতে লাগলেন। কিন্তু তবুও তাঁরা জল থেকে নির্গত হলেন না। শ্রীগোবিন্দ এভাবেই গোপীদের বলতে থাকলে, তাঁর পরিহাস বচন সম্পূর্ণভাবে তাঁদের চিত্তকে মোহিত করেছিল। শীতল জলে আকন্ঠ নিমজ্জিতা হয়ে তাঁরা কাঁপতে শুরু করলেন। এভাবেই তাঁকে উদ্দেশ্য করে তাঁরা বললেন- হে কৃষ্ণ, অন্যায় করো না! আমরা জানি যে, তুমি নন্দের মাননীয় পুত্র এবং ব্রজের সকলেই তোমাকে সম্মান করে। তুমি আমাদেরও অত্যন্ত প্রিয়। অনুগ্রহ করে আমাদের বস্ত্রগুলি আমাদের ফিরিয়ে দাও। এই শীতল জলে আমরা কম্পিত হচ্ছি। হে শ্যামসুন্দর, আমরা তোমার দাসী এবং তুমি যা বলবে তা অবশ্যই করব। কিন্তু আমাদের বস্ত্রগুলি আমাদের ফিরিয়ে দাও। ধর্মীয় নীতিগুলি কি তা তুমি অবগত এবং যদি তুমি বস্ত্রগুলি আমাদের ফিরিয়ে না দাও, তা হলে আমরা রাজাকে বলে দেব। অনুগ্রহ কর!”
পরমেশ্বর ভগবান বললেন- “তোমরা কুমারীগণ যদি প্রকৃতই আমার দাসী হয়ে থাক এবং আমি যা বলব তা যদি তোমরা সত্যিই কর, তা হলে তোমাদের সরল হাসি নিয়ে এখানে এস আর প্রত্যেক কুমারী তার নিজের বস্ত্র নিয়ে যাও। আমি যা বলছি তা যদি তোমরা না কর, তা হলে তোমাদের আমি তা ফেরত দেব না। আর রাজা যদি ক্রুদ্ধও হন, তিনি কি করতে পারেন?”
“তারপর, ক্লেশদায়ক শীতে কাঁপতে কাঁপতে কুমারীগণ তাঁদের হাত দিয়ে তাঁদের গোপন-অঙ্গ আচ্ছাদিত করে জল থেকে উঠে এলেন। পরমেশ্বর ভগবান যখন লজ্জাহত গোপীগণকে দর্শন করলেন, তখন তিনি তাঁদের শুদ্ধ প্রেমভাবের দ্বারা সন্তুষ্ট হলেন। তাঁদের বস্ত্রসমূহ নিজের স্কন্ধে স্থাপন করে, ভগবান মৃদু হেসে প্রীতি সহকারে তাঁদের বললেন- তোমরা কুমারীগণ ব্রতপালন কালে নগ্ন হয়ে স্নান করেছ এবং সেটি নিঃসন্দেহে দেবতাদের প্রতি একটি অপরাধ। তোমাদের পাপের প্রতিকারের জন্য তোমাদের মস্তকের উপরে হাত জোড় করে তোমাদের প্রণাম নিবেদন করা উচিত। তারপর তোমরা তোমাদের অধোবসন ফিরিয়ে নাও।”
“এভাবেই বৃন্দাবনের অল্পবয়স্ক কুমারীগণ ভগবান অচ্যুত তাঁদের যা বলেছেন তা বিবেচনা করে স্বীকার করলেন যে, নদীতে নগ্ন হয়ে স্নান করার ফলে তাঁদের ব্রত ভঙ্গ হয়েছে। কিন্তু তবুও তাঁরা তাঁদের ব্রত সাফল্যজনক ভাবে শেষ করার জন্য আকাঙ্ক্ষা করছিলেন, আর যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং সমস্ত পুণ্যকর্মের চূড়ান্ত ফলস্বরূপ, তাই তাঁদের সমস্ত পাপ পরিমার্জনের জন্য তাঁকে প্রণাম নিবেদন করলেন। তাঁদের ঐভাবে প্রণত হতে দেখে, পরমেশ্বর ভগবান দেবকীনন্দন তাঁদের প্রতি করুণা অনুভব করে এবং তাঁদের আচরণের সন্তুষ্ট হয়ে, তাঁদের বস্ত্রগুলি ফিরিয়ে দিলেন।”
“যদিও গোপীরা সম্পূর্ণরূপে প্রবঞ্চিতা হয়েছিলেন, তাঁদের লজ্জা থেকে বঞ্চিতা হয়েছিলেন এবং খেলার পুতুলের মতো আচরণ করেছিলেন এবং যদিও তাঁদের বস্ত্রগুলি অপহৃত হয়েছিল, তবুও তাঁরা কৃষ্ণের প্রতি অসূয়াভাবাপন্ন হননি। বরং, তাঁদের প্রিয়তমের সঙ্গে মিলিত হবার এই সুযোগ লাভ করে তাঁরা কেবল আনন্দিত হয়েছিলেন। গোপীগণ তাঁদের প্রিয়তম কৃষ্ণের সঙ্গ করার ফলে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং এভাবেই তাঁর দ্বারা তাঁরা মোহিত হয়েছিলেন। তাই, তাঁদের বস্ত্রসমূহ পরিধান করার পরেও তাঁরা চলতে পারলেন না। তাঁর প্রতি সলজ্জ দৃষ্টিপাত করে, তাঁরা যেখানে ছিলেন সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন।”
“গোপীদের কঠোর ব্রত পালনের সঙ্কল্প পরমেশ্বর ভগবান অবগত ছিলেন। ভগবান আরও অবগত ছিলেন যে, কুমারীরা তাঁর পাদদ্বয় স্পর্শ করার জন্য কামনা করেন, আর তাই ভগবান দামোদর কৃষ্ণ তাঁদের বললেন- হে সাধ্বী কুমারীগণ, এই ব্রতের প্রকৃত উদ্দেশ্যে যে আমাকে অর্চনা করা, সেটি আমি জানি। তোমাদের সেই উদ্দেশ্যটি আমার দ্বারা অনুমোদিত এবং অবশ্যই সেটি সত্য হবে। যাঁদের চিত্ত আমাতে নিবিষ্ট তাঁদের বাসনা ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির জন্য জাগতিক কামের দিকে চালিত হয় না, ঠিক যেমন ভাজা ও রান্না করা যবের দানাগুলি থেকে আর নতুন অঙ্কুর উৎপন্ন হয় না। হে কুমারীগণ, এখন তোমরা ব্রজে ফিরে যাও। তোমাদের বাসনা পূর্ণ হয়েছে, কারণ আমার সঙ্গের মাধ্যমে তোমরা আগামী রজনীগুলি উপভোগ করবে। হে সতীগণ, মোটের উপর তোমাদের দেবী কাত্যায়নীর পূজাব্রত পালনের এই উদ্দেশ্য ছিল।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “পরমেশ্বর ভগবানের দ্বারা এভাবেই নির্দেশিত হয়ে, পূর্ণকামা কুমারীগণ সর্বক্ষণ তাঁর পাদপদ্মদ্বয় ধ্যান করতে করতে অতি কষ্টে নিজেরা ব্রজে ফিরে গেলেন। কিছুকাল পরে দেবকীর পুত্র শ্রীকৃষ্ণ তাঁর গোপসখাদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরামের সঙ্গে গোচারণ করতে করতে বৃন্দাবন থেকে বেশ দূরে গমন করলেন। সূর্যের উত্তাপ যখন তীব্র হল, তখন শ্রীকৃষ্ণ দেখলেন যে, বৃক্ষগুলি তাঁকে ছায়া প্রদান করে ছত্রের মতো আচরণ করছে এবং তাই তিনি তাঁর বালকসখাদের এভাবে বললেন- হে স্তোককৃষ্ণ ও অংশু, হে শ্রীদামা, সুবল ও অর্জুন, হে বৃষভ ওজস্বী, দেবপ্রস্থ ও বরূথপ, এই মহা সৌভাগ্যবান বৃক্ষসমূহ দর্শন কর, যাদের জীবন সম্পূর্ণরূপে অপরের মঙ্গলের জন্য উৎসর্গীকৃত। এমন কি বায়ু, বর্ষা, তাপ ও তুসার সহ্য করেও তারা এই সমস্ত উপাদান থেকে আমাদের রক্ষা করছে। দেখ, কিভাবে এই বৃক্ষগুলি প্রতিটি জীবকে পোষণ করছে! তাদের জন্ম সফল। তাদের আচরণ ঠিক মহাপুরুষের মতো, কারণ তাদের কাছে কোনও কিছু প্রার্থনা করে কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে যায় না। এই বৃক্ষগুলি তাদের পত্র, পুষ্প ও ফলের দ্বারা, তাদের ছায়া, মূল, বল্কল ও কাঠের দ্বারা এবং তা ছাড়া তাদের গন্ধ, নির্যাস, ভস্ম, মণ্ড ও অঙ্কুর দ্বারা সকলেরই কামনা পূর্ণ করে। জীবন, মন, অর্থ, বুদ্ধি ও বাক্যের দ্বারা অপরের উপকারের জন্য কল্যাণমূলক কার্যের অনুষ্ঠান করা প্রতিটি জীবের কর্তব্য। এভাবেই নবপল্লব, ফল, পুষ্প ও পত্রসমূহের প্রাচুর্যের দ্বারা অবনত শাখাবিশিষ্ট বৃক্ষরাজির মধ্য দিয়ে নির্গত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ যমুনায় উপস্থিত হলেন। গোপবালকেরা যমুনার স্বচ্ছ, শীতল ও স্বাস্থ্যকর জল গাভীদের পান করালেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ গোপবালকেরা নিজেরাও পূর্ণ তৃপ্তি সহকারে সেই সুস্বাদযুক্ত জল পান করলেন। তার পর হে রাজন্, যমুনার সমীপবর্তী উপবনে গোপবালকেরা যেমন ইচ্ছা পশুচারণ করতে শুরু করলেন। কিন্তু শ্রীঘ্রই তাঁরা ক্ষুধায় পীড়িত হলেন এবং কৃষ্ণ ও বলরামের কাছে এসে তাই বলেছিলেন।”
দ্বাবিংশতি অধ্যায়- কৃষ্ণের কুমারী গোপীদের বস্ত্রহরণ
26 Jul 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়