শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এভাবেই বৃন্দাবনের অরণ্য শরৎকালীন স্বচ্ছ জলে পরিপূর্ণ ছিল এবং নির্মল সরোবরে উৎপন্ন পদ্ম ফুলের সুগন্ধযুক্ত বায়ুর দ্বারা সুশীতল হয়েছিল। অচ্যুৎ ভগবান তাঁর গাভী ও গোপবালক সখাদের সঙ্গে সেই বৃন্দাবনের অরণ্যে প্রবেশ করলেন। বৃন্দাবনের সরোবর, নদী ও পর্বতসকল মত্ত ভ্রমর এবং পুষ্পিত বৃক্ষে বিচরণশীল পক্ষিকুলের ধ্বনিতে নিনাদিত ছিল। গোপবালকগণ ও শ্রীবলরামের সঙ্গে মধুপতি (শ্রীকৃষ্ণ) সেই বনে প্রবেশ করলেন এবং গোচারণকালে তাঁর বংশী বাজাতে শুরু করলেন। অল্পবয়স্কা ব্রজনারীগণ যখন কৃষ্ণের বংশীর গীত শ্রবণ করলেন, যা কামদেবের প্রভাব উদয় করে, তখন তাদের কেউ কেউ গোপনে তাঁদের অন্তরঙ্গ সখীদের কাছে কৃষ্ণের গুণসমূহ বর্ণনা করতে আরম্ভ করলেন। গোপীগণ কৃষ্ণ সম্বন্ধে বলতে শুরু করলেন, কিন্তু যখন তাঁর কার্যাবলী তাঁরা স্মরণ করছিলেন, হে রাজন্, তখন কামদেবের বেগে তাঁদের চিত্ত বিক্ষিপ্ত হওয়ায় তাঁরা আর বলতে পারলেন না। মস্তকে ময়ূরপুচ্ছ-ভূষণ, কর্ণদ্বয়ে নীল কর্ণিকার পুষ্প, স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল পীত বসন এবং বৈজয়ন্তীমালা পরিধান করে, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর চিন্ময় নটবর রূপ প্রদর্শন করে তাঁরই পদচিহ্নের দ্বারা শোভিত বৃন্দাবনের অরণ্যে প্রবেশ করলেন। তিনি তাঁর বেণু-রন্ধ্রসমূহ তাঁর অধরামৃত দ্বারা পূর্ণ করেছিলেন, আর গোপবালকেরা তখন তাঁর মহিমা কীর্তন করছিল। হে রাজন্, ব্রজের অল্পবয়স্ক নারীগণ যখন সমস্ত প্রাণীর হরণকারী কৃষ্ণের বংশীধ্বনি শ্রবণ করলেন, তখন তাঁরা পরস্পরকে আলিঙ্গন করলেন।”
গোপিকারা বললেন- “হে সখিগণ, যে সমস্ত চক্ষু নন্দ মহারাজের দুই পুত্রের সুন্দর মুখমণ্ডল দর্শন করে, তারা নিঃসন্দেহে ধন্য। কারণ এই দুই পুত্র তাঁদের সখাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে এবং তাঁদের সম্মুখে গাভীদের চালনা করে বনে প্রবেশ করেন এবং তাঁরা তাঁদের মুখে বংশী ধারণ করেন ও ব্রজবাসীদের প্রতি অনুরাগযুক্ত হয়ে কটাক্ষপাত করেন। তাই যাঁদের চক্ষু আছে, আমরা মনে করি তাঁদের কাছে এর থেকে শ্রেষ্ঠতর দর্শনীয় বস্তু আর কিছু নেই। যার উপর তাঁদের পুষ্পমালা সংলগ্ন ছিল, সেই মনোরম বিচিত্র বসন পরিধান করে এবং ময়ূরপুচ্ছ, উৎপল, পদ্ম, নবীর আম্রপল্লব ও পুষ্প-মুকুলগুচ্ছের দ্বারা নিজেদের ভূষিত করে কৃষ্ণ ও বলরাম গোপাবালকদের সভার মধ্যে অত্যুৎকৃষ্টরূপে শোভা পাচ্ছিলেন। তাঁদের দেখতে ঠিক রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত দুই শ্রেষ্ঠ নর্তকের মতো মনে হচ্ছিল, আর মাঝে মাঝে তাঁরা গান করছিলেন। হে গোপীগণ, স্বতন্ত্রভাবে কৃষ্ণের অধরামৃত উপভোগ করার জন্য এই বংশী এমন কী মঙ্গলজনক কার্যের অনুষ্ঠান করেছে এবং প্রকৃতপক্ষে ঐ অমৃত যাঁদের উপভোগ্য, সেই আমাদের গোপিকাদের জন্য কেবলমাত্র রস অবশিষ্ট রেখেছে! এই বংশীর পূর্বপুরুষ বাঁশ গাছগুলি আনন্দে অশ্রুধারা বর্ষণ করছে। যার তীরে বাঁশ জন্মগ্রহণ করেছে, তার মাতা সেই নদী আনন্দোচ্ছ্বাস অনুভব করে এবং তাই সে বিকশিত পদ্ম ফুলের দ্বারা রোমাঞ্চিত হচ্ছে। হে সখি, দেবকীনন্দন কৃষ্ণের পাদপদ্ম সম্পদ লাভ করে, বৃন্দাবন পৃথিবীর মহিমা বিস্তার করছে। গোবিন্দের বেণু শ্রবণ করে ময়ূরেরা যখন মত্ত হয়ে নৃত্য করে, তখন পাহাড়ের চূড়া থেকে অন্য প্রাণীরা তাদের দর্শন করে অভিভূত হয়ে পড়ে। এই নির্বোধ হরিণীরাই ধন্য কারণ তারা নন্দ মহারাজের পুত্রের সমীপবর্তী হয়েছে, যিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বেশে সজ্জিত হয়ে তাঁর বাঁশি বাজাচ্ছেন। বাস্তাবিকই, কৃষ্ণসার মৃগ ও মৃগীগণ উভয়েই প্রণয়পূর্ণ দৃষ্টির দ্বারা ভগবানের পূজা করছিল। কৃষ্ণের সৌন্দর্য ও স্বভাগ রমণীগণের নিকট উৎসব-স্বরূপ। বাস্তবিকই, দেবপত্নীগণ তাঁদের পতিগণের সঙ্গে বিমানে পরিভ্রমণকালে যখন তাঁকে এক পলক দর্শন করেন এবং তাঁর নিনাদিত বংশীগীত শ্রবণ করেন, তখন কামদেবের দ্বারা তাঁদের হৃদয় কম্পিত হয়, আর তাঁরা এতই মোহাচ্ছন্ন হন যে, তাঁদের বেণীবন্ধন থেকে ফুলগুলি খসে পড়ে এবং তাঁদের কটিবস্ত্র শিথিল হয়ে যায়। তাদের উত্তোলিত কানগুলিকে পাত্রের মতো ব্যবহার করে, গাভীরা কৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বংশীগীতের সুধামৃত পান করছে। গোবৎসরা তাদের মায়ের স্তন থেকে ক্ষরিত দুগ্ধ মুখে পূর্ণ করে স্থিরভাবে অবস্থান করছে যেন অশ্রুপূর্ণ নয়নে তারা গোবিন্দকে তাদের অন্তরে গ্রহণ করে তাঁকে আলিঙ্গন করছে।”
“হে মাতা, এই বনে সকল পক্ষী কৃষ্ণকে দর্শনের জন্য অপূর্ব বৃক্ষশাখায় আরূঢ় হয়েছে। চোখ বন্ধ করে তারা কেবলমাত্র নিঃশব্দে তাঁর মধুর বংশীধ্বনি শ্রবণ করছে এবং অন্য কোনও শব্দেই তারা আকৃষ্ট হচ্ছে না। এই সমস্ত পক্ষী নিশ্চিতরূপে মহান মুনিগণের সমান স্তরে রয়েছে। নদীগুলি যখন কৃষ্ণের বংশীগীত শ্রবণ করে, তখন তাদের হৃদয় তাঁকে আকাঙ্ক্ষা করতে শুরু করে এবং এভাবেই তাদের স্রোতের বেগ ভঙ্গ হয়ে ঘূর্ণাবর্তরূপে জল বিক্ষোভিত হয়ে ওঠে। তখন তাদের তরঙ্গরূপ বাহুর দ্বারা নদীগুলি মুরারির চরণকমল আলিঙ্গন করে এবং তা ধারণ করে পদ্ম ফুলের উপহার নিবেদন করে। প্রখর রৌদ্রের উত্তাপের মধ্যেও, বলরাম ও গোপবালকদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ ব্রজের পশুগুলিকে চরাতে চরাতে অনবরত তাঁর বংশীধ্বনি করছেন। তা দর্শন করে, আকাশের মেঘ প্রেমবশত নিজেকে বিস্তার করেছে। সে উঁচুতে উঠে গিয়ে নিজ দেহের অসংখ্য পুষ্পসদৃশ জলবিন্দু দ্বারা তার সখার জন্য একটি ছত্র নির্মাণ করছে। বৃন্দাবন অঞ্চলের শবর রমণীরা যখন ঈষৎ লাল বর্ণের কুমকুমের দ্বারা চিহ্নিত তৃণ দর্শন করে, তখন তারা কামে পীড়িত হয়ে বিচলিত হয়। শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মের বর্ণে গুণান্বিত এই কুমকুম প্রথমে তাঁর প্রিয়াগণের স্তনে অনুলিপ্ত ছিল, আর শবর রমণীরা যখন তাদের মুখে ও স্তনে তা লেপন করে, তখন তাদের সমস্ত দুশ্চিন্তা তারা পরিত্যাগ করে।”
“ভক্তগণের মধ্যে এই গোবর্ধন পর্বত শ্রেষ্ঠ! হে সখীগণ, এই পর্বত গোবৎস, গাভী ও গোপগণের সঙ্গে কৃষ্ণ ও বলরামকে পানীয় জল, অত্যন্ত কোমল ঘাস, গুহা, ফল, ফুল ও শাক-সবজি- সমস্ত রকমের প্রয়োজনীয় দ্রব্যই সরবরাহ করে। এভাবেই এই পর্বত ভগবানকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। কৃষ্ণ ও বলরামের চরণস্পর্শ লাভ করার ফলে গোবর্ধন পর্বতকে অত্যন্ত উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। প্রিয় সখীগণ, গাভীদের অগ্রে চারণা করে, কৃষ্ণ ও বলরাম যখন তাঁদের গোবালক সখাদের সঙ্গে বনের ভিতর দিয়ে গমন করেন, তখন তাঁরা দুগ্ধ দোহনের সময় গাভীদের পিছনের পা বন্ধনকারী রজ্জু বহন করেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর বংশী বাজান, তখন সেই মধুর ধ্বনিতে গতিশীল প্রাণীসকল মূর্ছিত হয়ে পড়ে এবং গতিহীন বৃক্ষসকল ভাবোচ্ছ্বাসে কম্পিত হতে থাকে। এই বিষয়গুলি নিঃসন্দেহে অতি বিচিত্র। এভাবেই বৃন্দাবনের বনে বিচরণকারী পরমেশ্বর ভগবানের ক্রীড়াময় লীলাসমূহ পরস্পরের প্রতি বর্ণণা করতে করতে গোপীগণ তাঁর চিন্তায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়েছিলেন।”
একবিংশতি অধ্যায়- গোপীগণের কৃষ্ণের বংশীধ্বনির মহিমা কীর্তন
23 Jul 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়