বিংশতি অধ্যায়- বৃন্দাবনে বর্ষা ও শরৎ ঋতু

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তারপর গোপবালকেরা বৃন্দাবনের স্ত্রীদের নিকট দাবানল থেকে তাঁদের উদ্ধার এবং প্রলম্বাসুর বধরূপ কৃষ্ণ ও বলরামের অদ্ভুত কর্ম বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছিলেন। বৃদ্ধ গোপ ও বৃদ্ধা গোপীগণ এই বর্ণনা শ্রবণ করে বিস্মিত হয়েছিলেন এবং তাঁরা সিদ্ধান্ত করেছিলেন যে, কৃষ্ণ ও বলরাম অবশ্যই মহান কোন দেবতা হবেন যাঁরা বৃন্দাবনে আবির্ভূত হয়েছেন। তার পর সমস্ত প্রাণীর জীবন ও খাদ্য প্রদানকারী বর্ষা ঋতু শুরু হল। আকাশে গুড়গুড় মেঘগর্জন আর দিগন্তের বিদ্যুৎ চমকিত হতে লাগল। আকাশ তখন বিদ্যুৎ ও গর্জন সহ ঘন নীল মেঘের দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল। আত্মা যেমন জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা আচ্ছন্ন থাকে, সেভাবেই আকাশ ও তার স্বাভাবিক জ্যোতি আচ্ছাদিত ছিল। সূর্য তার রশ্মি দ্বারা আট মাস ধরে পৃথিবীর জলরূপ ধন শোষণ করেছিল। এখন উপযুক্ত সময় এসেছে, সূর্য তার সেই সঞ্চিত ধন মোচন করতে শুরু করল। বিদ্যুতের দ্বারা চমকিত হয়ে বিশাল মেঘরাশি কম্পিত এবং প্রচণ্ড বায়ু দ্বারা চালিত হচ্ছিল। ঠিক কৃপাময় ব্যক্তির মতো মেঘরাশি এই পৃথিবীর সুখের জন্য তাদের জীবন দান করেছিল। গ্রীষ্মের তাপে পৃথিবী শীর্ণ হয়ে যান, কিন্তু বৃষ্টির দেবতার দ্বারা যখন সিক্ত হন, তখন তিনি পূর্ণরূপে পুষ্ট হয়ে ওঠেন। এভাবেই পৃথিবী এক ব্যক্তির মতো যাঁর দেহ এক জাগতিক উদ্দেশ্যে তপস্যার দ্বারা কৃশ হয়েছে, কিন্তু যিনি তাঁর তপস্যার ফল লাভ করার পর পুনরায় পরিপূর্ণভাবে পুষ্ট হয়ে ওঠেন। এই কলিযুগে পাপকর্মের প্রাধান্য হেতু নাস্তিক মতবাদগুলি যেভাবে বেদের প্রকৃত জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে রাখে, ঠিক সেভাবেই বর্ষাকালে সন্ধ্যার সময়ে অন্ধকারে নক্ষত্র সকল দীপ্তি না পেয়ে জোনাকি পোকারা দীপ্তি পেতে থাকে। ব্যাঙেরা সর্বক্ষণ নীরবে শায়িত ছিল, কিন্তু বর্ষার মেঘধ্বনি শ্রবণ করে হঠাৎই তারা ডাকতে শুরু করল, ঠিক যেভাবে ব্রাহ্মণ ছাত্রগণ নিঃশব্দে তাঁদের প্রাতঃকালীন কর্তব্য সম্পাদন করার পর শিক্ষকের আহ্বান শোনা মাত্রই তাঁদের পাঠ আবৃত্তি করতে শুরু করেন। যে সমস্ত ক্ষুদ্র নদীগুলি শষ্ক হয়ে গিয়েছিল, বর্ষা ঋতুর আগমনের সঙ্গে সেগুলি স্ফীত হতে শুরু করল এবং তার পরে ঠিক যেমন ইন্দ্রিয়ের বশীভূত মানুষের দেহ, সম্পত্তি ও অর্থ বিপথগামী হয়ে থাকে, তেমনই তাদের নির্দিষ্ট গতিপথ থেকে বিপথগামী হয়েছিল। নবীন সতেজ ঘাস পৃথিবীকে পান্নার মতো সবুজ করে তুলেছিল, ইন্দ্রগোপ কীটেরা তাতে ঈষৎ লাল বর্ণ যোগ করেছিল এবং সাদা ব্যাঙের ছাতাগুলি আরও বর্ণ ও ছায়াচক্র সংযুক্ত করেছিল। এভাবেই পৃথিবীকে যেন হঠাৎ ধনী হয়ে ওঠা ব্যক্তির মতো মনে হচ্ছিল। শস্য সম্পদের দ্বারা মাঠগুলি কৃষকদের আনন্দ দান করেছিল। কিন্তু যারা কৃষিকার্যে নিযুক্ত হতে অত্যন্ত অভিমানী ছিল এবং কিভাবে সমস্ত কিছুই পরমেশ্বরের নিয়ন্ত্রণাধীন তা হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেই সমস্ত মাঠগুলি তাদের হৃদয়ে অনুতাপের সৃষ্টি করেছে। ভক্ত যেমন পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় নিযুক্ত হবার মাধ্যমে সুন্দর হয়ে ওঠে, তেমনই জল ও স্থলের সমস্ত প্রাণীরা বর্ষার নতুন পতিত জলের সুযোগ গ্রহণ করার ফলে তাদের রূপ আকর্ষণীয় ও মনোরম হয়ে ওঠে। কামনার দ্বারা কলুষিত এবং ইন্দ্রিয়-তর্পণের বিষয়ের প্রতি আসক্তচিত্ত অপরিণত যোগীর মন যেমন বিক্ষুব্ধ হয়, ঠিক তেমনই নদীগুলি যখন সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়ে ক্ষুব্ধ হয়, তখন তার তরঙ্গগুলি বায়ুবেগে প্রবাহিত হতে থাকে। ঠিক যেমন পরমেশ্বর ভগবানে মগ্নচিত্ত ভক্তগণ সমস্ত রকম বিপদের দ্বারা আক্রান্ত হলেও শান্ত থাকেন, তেমনই বর্ষাকালে পর্বতগুলি বারংবার বাদল মেঘের দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয়ে মোটেও বিচলিত হল না। বর্ষা ঋতুতে, পরিষ্কৃত না হবার ফলে পথগুলি ঘাস ও জঞ্জালে আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে এবং পথ খুঁজে বের করার কষ্টকর হয়ে পড়ে। এই পথগুলি ধর্মীয় শাস্ত্রগ্রন্থের মতো, যেগুলি ব্রাহ্মণেরা অধ্যয়ন না করার ফলে দূষিত হয়েছে এবং কালের প্রভাবে আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছে। মেঘেরা যদিও সমস্ত জীবের শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু, ঘনিষ্ট সম্পর্কের প্রতি অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ এক দল মেঘ থেকে আর এক দলে স্থানান্তরিত হত, ঠিক যেমন কামার্তা রমণীরা গুণবান পুরুষদের প্রতিও অবিশ্বাসী হয়। ইন্দ্রের বক্র ধনুক (রামধনু) যখন গর্জনধ্বনির গুণযুক্ত আকাশে প্রকাশিত হয়েছিল, তখন তা সাধারণ ধনুকগুলির মতো ছিল না কারণ তা জ্যার উপর স্থাপিত ছিল না। তেমনই, পরমেশ্বর ভগবান জড় গুণের পারস্পরিক ক্রিয়াজাত এই জগতে প্রকাশিত হলেও তিনি সাধারণ মানুষের মতো নন, কারণ তিনি সমস্ত জড় গুণ থেকে মুক্ত থাকেন এবং সমস্ত জড় অবস্থা থেকে স্বতন্ত্র থাকেন। বর্ষা ঋতুতে মেঘরাশির দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে পড়ার ফলে চন্দ্র সরাসরিভাবে প্রকাশিত হতে পারে না, অথচ মেঘেরা নিজেরাই চন্দ্রের জ্যোৎস্না দ্বারা আলোকিত হয়ে ওঠে। তেমনই, অহঙ্কারে আচ্ছাদিত থাকার ফলে জড় জগতে জীবাত্মা সরাসরিভাবে প্রকাশিত হতে পারে না, অথচ অহঙ্কার নিজেই শুদ্ধ আত্মার চেতনার দ্বারা আলোকিত হয়। মেঘসমাগম দর্শন করে ময়ূরেরা উৎসব-মুখরিত হয়ে আনন্দে অভিনন্দন করতে করতে চিৎকার করতে লাগল, ঠিক যেমন সংসার জীবনে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষেরা তাদের গৃহে অচ্যুত পরমেশ্বর ভগবানের শুদ্ধ ভক্তের আগমনে আনন্দ অনুভব করে। বৃক্ষসকল ক্ষীণ ও শুষ্ক হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তাদের পায়ের মাধ্যমে নতুনভাবে পতিত বর্ষার জল পান করার পর, তাদের নানা দেহগত রূপ প্রস্ফুটিত হল। তেমনই, তপশ্চর্যার ফলে যার দেহ ক্ষীণ ও দুর্বল হয়েছে, সেই তপশ্চর্যার মাধ্যমে প্রাপ্ত জড় বিষয়বস্তু উপভোগের পর সে পুনরায় তার স্বাস্থ্যকর দৈহিক বৈশিষ্ট্যাদি প্রদর্শন করে। কলুষচিত্ত জড়বাদী মানুষেরা যেমন অনেক অশান্তি সত্ত্বেও সর্বদাই গৃহে বাস করে, তেমনই বর্ষাকালে তীরগুলি অশান্ত থাকা সত্ত্বেও সারসেরা সরোবর তীরে নিরন্তর বাস করতে লাগল। কলিযুগে নাস্তিকদের ভ্রান্ত মতবাদগুলি যেমন বৈদিক বিধি-নিষেধের সীমা ভঙ্গ করে, তেমনই ইন্দ্র যখন বর্ষণ করেন, তখন বন্যার জল কৃষিক্ষেত্রের জলসেচনের বাঁধগুলি ভঙ্গ করে দেয়। নরপতিগণ যেমন তাঁদের ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের দ্বারা নির্দেশিত হয়ে নাগরিকদের জন্য দান প্রদান করেন, তেমনই বায়ুর দ্বারা চালিত হয়ে মেঘরাশি সমস্ত জীবের মঙ্গলের জন্য তাদের অমৃতময় জলধারা মুক্ত করতে লাগল।”
“বৃন্দাবনের বন যখন এভাবেই সুপক্ক খেজুর ও জম্বু ফলের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল, শ্রীকৃষ্ণ তখন গাভী ও গোপবালকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে শ্রীবলরামের সঙ্গে আনন্দ উপভোগ করবার জন্য সেই বনে প্রবেশ করলেন। গাভীগণ তাদের সমধিক স্তনভারে ধীরে গমন করেছিল, কিন্তু পরমেশ্বর ভগবানের আহ্বান মাত্রই তারা দ্রুতবেগে তাঁর দিকে ধাবিত হল এবং তাঁর প্রতি প্রীতির নিমিত্ত তাদের স্তনসমূহ ভিজে উঠেছিল। আনন্দপূর্ণ বনের আদিবাসী রমণীগণ, বৃক্ষসমূহ থেকে মধু ক্ষরণ এবং পর্বতের জলপ্রপাতগুলি ভগবান নিরীক্ষণ করলেন। এই জলপ্রপাতগুলির উচ্চধ্বনি ইঙ্গিত করছিল যে, নিকটেই গুহা রয়েছে। যখন বৃষ্টি নামত, তখন ভগবান ক্রীড়া করার জন্য এবং ফল-মূল ভোজন করার জন্য কখনও কখনও গুহা অথবা একটি বৃক্ষের কোটরে প্রবেশ করতেন।”
‘শ্রীসঙ্কর্ষণ এবং নিয়মিত ভোজনকারী গোপবালকদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ গৃহ থেকে প্রেরিত দধি মিশ্রিত অন্ন ভোজন করলেন। তাঁরা সকলে ভোজনের জন্য জলের সন্নিকটে একটি বড় শিলার উপর বসেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ পরিতৃপ্ত বৃষ, গোবৎস ও গাভীদের সবুজ ঘাসের উপর বসে চক্ষু মুদিত করে জাবর কাটতে দেখেলেন এবং তিনি দেখলেন, গাভীরা তাদের স্তনভাবে ক্লান্ত। এভাবেই সর্বকালের সুখজনক বৃন্দাবনের বর্ষাঋতুর সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য দর্শন করে, ভগবান সেই ঋতুকে অভিনন্দিত করলেন, যা তাঁর নিজের অন্তরঙ্গা শক্তি থেকে বিস্তার লাভ করেছিল।’
“শ্রীরাম ও শ্রীকেশব যখন এভাবেই বৃন্দাবনে বাস করছিলেন, তখন শরৎ ঋতু সমাগত হল, যখন আকাশ মেঘমুক্ত, জল স্বচ্ছ ও বায়ু মৃদুমন্দ ছিল। ভগবৎ-ভক্তির পন্থার দ্বারা যেমন প্রত্যাবর্তনকারী পতিত যোগীদের মন শুদ্ধতা প্রাপ্ত হয়, তেমনই শরৎকালে পদ্ম ফুল পুনরায় উৎপত্তি হেতু বিভিন্ন জলরাশিও তাদের মূল শুদ্ধতা ফিরে পায়। শরৎকাল যেমন মেঘাচ্ছন্ন আকাশ পরিষ্কার করে, প্রাণীগণের সঙ্কীর্ণ জীবনযাত্রার অবস্থা দূর করে, পৃথিবীর পঙ্কিলতা মুক্ত করে এবং জলের কলুষতা নির্মল করে, তেমনই শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সম্পাদিত প্রেমময়ী সেবা চতুরাশ্রমীদের ব্যক্তিগত সমস্ত অশুভ থেকে মুক্ত করে। মেঘরাশি তাদের সর্বস্ব পরিত্যাগ করে শুদ্ধ উজ্জ্বলতা নিয়ে দীপ্তি পাচ্ছিল, ঠিক যেন সমস্ত জাগতিক বাসনা ত্যাগী শান্ত মুনিগণ সমস্ত পাপময় প্রবণতা থেকে মুক্ত হয়েছেন। অপ্রাকৃত বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ যেমন কখনও অপ্রাকৃত জ্ঞানামৃত প্রদান করেন এবং কখনও করেন না, তেমনই এই ঋতুতে পর্বতসকল কখনও তাদের শুদ্ধ জলধারা মোচন করছিল এবং কখনও করছিল না। মূঢ় সংসারী মানুষেরা অতিক্রান্ত দিনগুলির সঙ্গে কিভাবে তাদের আয়ু ক্ষয় হচ্ছে তা যেমন দেখতে পারে না, তেমনই ক্রমশ ক্ষীয়মাণ জলে সন্তরণরত মৎস্যরা জলের ক্ষীয়মাণতার কথা একেবারেই জানতে পারে না। কৃপণ ও সংসার-জীবনে অতিশয় নিমগ্ন দারিদ্র্যপীড়িত ব্যক্তি যেমন তার ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযম করতে না পারার জন্য কষ্টভোগ করে, তেমনই অগভীর জলে সন্তরণশীল মৎস্যগুলিকেও শরৎকালীন সূর্যের তাপের দ্বারা কষ্টভোগ করতে হয়। ধীর মুণিগণ যেমন প্রকৃত আত্মা থেকে ভিন্ন জড় দেহ ও তার থেকে উপজাত অহং ও মমত্ববুদ্ধি পরিত্যাগ করেন, তেমনই বিভিন্ন স্থলভূমি ধীরে ধীরে তাদের পঙ্কিল অবস্থা পরিত্যাগ করেছিল এবং লতা-গুল্মসমূহ তাদের অপক্ক অবস্থা থেকে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সমস্ত জড় কার্যকলাপ থেকে বিরত এবং বৈদিক মন্ত্রের উচ্চরণ পরিত্যাগকারী কোনও মুনির মতোই শরতের আগমনে সমুদ্র ও সরোবরগুলি শব্দহীন এবং তাদের জল স্থির হয়ে যায়। যোগ অনুশীলনকারীরা যেভাবে বিক্ষুব্ধ ইন্দ্রিয়গুলির মাধ্যমে তাঁদের বহির্মুখী চেতনাকে দমন করার জন্য তাঁদের ইন্দ্রিয়গুলিকে দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণে আনেন, ঠিক সেভাবেই কৃষকেরা ধানক্ষেতের জল যাতে বেরিয়ে না যায় বা ধরে রাখার জন্য মাটি দিয়ে দৃঢ় আল নির্মাণ করেছিল। আত্মজ্ঞান যেমন কোন ব্যক্তির জড় দেহের সঙ্গে তার মিথ্যা পরিচিতির দ্বারা উৎপন্ন দুঃখকষ্ট উপশম করে এবং শ্রীমুকুন্দ যেমন বৃন্দাবনের নারীগণের বিরহ জনিত ক্লেশ দূর করেন, ঠিক তেমনই শরৎকালের চন্দ্রও সমস্ত প্রাণীর সূর্যকিরণজনিত দুঃখকষ্টের উপশম করে। প্রত্যক্ষভাবে বৈদিক শাস্ত্রের তাৎপর্য অনুভবকারী মানুষেরা চিন্ময় চেতনার দ্বারা মেঘমুক্ত ও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান তারকারাশির দ্বারা পরিপূর্ণ শরতের আকাশ উজ্জ্বলভাবে শোভা পাচ্ছিল।”
“যদুবংশের অধিপতি শ্রীকৃষ্ণ যেমন বৃষ্ণিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পৃথিবীতে উজ্জ্বলরূপে শোভিত হন, ঠিক তেমনই নক্ষত্ররাশির দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পূর্ণচন্দ্র আকাশে শোভিত হচ্ছিল। পুষ্পে পরিপূর্ণ বন থেকে আগত নাতিশীতোষ্ণ বায়ুর আলিঙ্গনের দ্বারা মানুষ তাদের দুঃখকষ্ট বিস্মৃত হতে পারে, কিন্তু কৃষ্ণের দ্বারা যাঁদের হৃদয় অপহৃত হয়েছে, সেই গোপীগণ তা পারেন না। শরৎকালের প্রভাবে গাভী, হরিণী, নারী ও স্ত্রীপক্ষীরা ঋতুমতী হয়ে উঠলে যৌনসঙ্গ লাভের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ পতিগামিনী হয়েছিল, ঠিক যেমন পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় অনুষ্ঠিত কার্যকলাপের দ্বারা আপনা হতেই সমস্ত মঙ্গলময় ফল লাভ হয়।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, সুদৃঢ় শাসকের উপস্থিতিতে দস্যু ব্যতীত আর সকলেই যেমন নির্ভয় হয়, ঠিক তেমনই শরৎকালীন সূর্যের উদয়ের ফলে রাত্রে প্রস্ফুটিত কুমুদ ব্যতীত আর সকল পদ্ম ফুলই সুখে প্রস্ফুটিত হয়েছিল। সমস্ত শহরে ও গ্রামে নতুন ফসলের প্রথম শস্যদানার সম্মান ও স্বাদ গ্রহণের জন্য বৈদিক যজ্ঞ এবং সেই সঙ্গে স্থানীয় রীতিনীতি ও ঐতিহ্য মেনে অনুরূপ উৎসব সম্পাদন করে জনসাধারণ মহোৎসবের অনুষ্ঠান করেছিলেন। এভাবেই নবীন শস্যের দ্বারা সমৃদ্ধিশালিনী হয়ে এবং বিশেষ করে কৃষ্ণ ও বলরামের উপস্থিতির দ্বারা শ্রীমণ্ডিত হয়ে পরমেশ্বর ভগবান অংশ-প্রকাশরূপে পৃথিবী শোভিতা হয়েছিলেন। বৃষ্টিতে আবদ্ধ বণিক, মুনি, নৃপতি ও ব্রহ্মচারী ছাত্রগণ অবশেষে বেরিয়ে এসে তাঁদের আকাঙ্ক্ষিত বিষয়াদি সংগ্রহ করেন, ঠিক যেমন এই জীবনে যাঁরা সিদ্ধি লাভ করেছেন, সঠিক সময় এলে জড় দেহ ত্যাগ করে তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ রূপ লাভ করেন।”

Leave a Reply

July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits