শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “গোপবালকেরা যখন সম্পূর্ণরূপে তাঁদের ক্রীড়ায় নিমগ্ন ছিলেন, তাঁদের গাভীরা অনেক দূরে বিচরণ করছিল। তারা আরও তৃণের জন্য ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠে এবং তাদের নজরে রাখার কেউ না থাকায় তারা এক গভীর বনে প্রবেশ করল। গভীর বনের এক অংশ থেকে আর এক অংশে বিচরণ করতে করতে ছাগল, গাভী ও মহিষেরা তীক্ষ্ণ বেতের দ্বারা অধিক বেড়ে ওঠা একটি অঞ্চলে প্রবেশ করল। নিকটবর্তী দাবানলের তাপ তাদের তৃষ্ণার্ত করে তুলল এবং তারা কাতর হয়ে ক্রন্দন করতে লাগল। কৃষ্ণ, রাম ও তাঁদের গোপসখারা সহসা তাঁদের সম্মুখে গাভীদের দেখতে না পেয়ে, তাদের উপেক্ষা করার জন্য অনুতপ্ত বোধ করলেন। বালকেরা চারদিকে অন্বেষণ করলেন, কিন্তু তারা কোথায় গিয়েছে তার সন্ধান তাঁরা পেলেন না। তখন বালকেরা গাভীদের পায়ের খুরের ছাপ এবং তাদের খুর ও দন্ত দ্বারা ছিন্ন তৃণ লক্ষ্য করে গাভীদের পথ খুঁজে বের করতে শুরু করলেন। সমস্ত গোপবালকেরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন কারণ তাঁদের জীবিকার উৎস তাঁরা হারিয়ে ফেলেছেন। মুঞ্জা অরণ্যের মধ্যে অবশেষে গোপবালকেরা তাঁদের মূল্যবান গাভীদের খুঁজে পেলেন, যারা তাদের পথ হারিয়ে ক্রন্দন করছিল। তারপর তৃষ্ণার্ত ও পরিশ্রান্ত বালকেরা গৃহে ফেরার পথের দিকে গাভীদের চারণা করলেন। পরমেশ্বর ভগবান জলদগম্ভীর স্বরে পশুদের আহ্বান করলেন। তাদের নিজ নিজ নামের শব্দ শ্রবণ করে, গাভীরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে উত্তর করে ভগবানকে সাড়া দিয়েছিল। বনের সকল প্রাণীদের বিনাশের ইঙ্গিত দিয়ে সহসা এক প্রবল দাবানল চতুর্দিক থেকে প্রাদুর্ভূত হল। সারথির ন্যায় বায়ু অগ্নিকে বেগে চালিত করছিল এবং ভয়াল অগ্নিকণা চতুর্দিকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। বাস্তবিকপক্ষে, সকল স্থাবর ও জঙ্গম জীবের দিকে প্রচণ্ড অগ্নি তার লেলিহান জিহ্বা বিস্তার করেছিল। যেই মাত্র গাভী ও গোপবালকেরা চতুর্দিক থেকে আক্রমণে উদ্যত দাবানল স্থির দৃষ্টিতে দর্শন করলেন, তৎক্ষণাৎ তাঁরা ভীতগ্রস্ত হলেন। মৃত্যুর ভয়ে কাতর মানুষেরা যেমন পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হয়, তেমনই বালকেরা তখন আশ্রয়ের জন্য কৃষ্ণ ও বলরামের সমীপবর্তী হলেন। তখন বালকেরা তাঁদের সম্বোধন করে বললেন- হে কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! মহাবীর! হে রাম! অমোঘ বিক্রম! যারা এই দাবানলে দগ্ধ হতে চলেছে এবং তোমাদের আশ্রয় গ্রহণ করতে এসেছে, দয়া করে তোমরা সেই সমস্ত ভক্তদের রক্ষা কর। কৃষ্ণ! তোমার নিজের সখাদের অবশ্যই বিনাশ প্রাপ্ত হওয়া উচিত নয়। হে সর্ব ধর্মজ্ঞ, আমরা তোমাকে আমাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করেছি এবং আমরা তোমার প্রতি আত্ম-সমর্পিত!”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তাঁর সখাদের কাছ থেকে এরূপ করুণ বাক্য শ্রবণ করে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের বললেন, “কেবল তোমাদের চোখ দুটি বন্ধ কর এবং ভয় পেয়ো না।’ ‘তাই হোক’ উত্তর দিকে বালকেরা তৎক্ষণাৎ তাঁদের নেত্রদ্বয় মুদিত করলেন। তখন সমস্ত যোগশক্তির অধীশ্বর পরমেশ্বর ভগবান তাঁর মুখ দিয়ে ভয়ঙ্কর অগ্নিকে পান করে সঙ্কট থেকে তাঁর সখাদের রক্ষা করলেন। গোপবালকেরা তাঁদের চক্ষু উন্মীলিত করে এবং বিস্মিত হয়ে দেখলেন, তাঁরা ও গাভীরা যে শুধু ভয়ঙ্কর দাবানল থেকেই রক্ষা পেয়েছেন তাই নয়, তাঁদের সকলকেই পুনরায় সেই ভাণ্ডীর বৃক্ষের নিকট নিয়ে আসা হয়েছে। গোপবালকেরা যখন দেখলেন যে, ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা প্রকাশিত তাঁর যোগশক্তির দ্বারা তাঁরা দাবানল থেকে রক্ষা পেয়েছেন, তাঁরা মনে করতে লাগলেন যে, কৃষ্ণ অবশ্যই একজন দেবতা। সায়াহ্নে বলরামের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ গাভীদের নিয়ে গৃহের দিকে ফিরে চললেন। তাঁর বাঁশিটি বিশেষভাবে বাজাতে বাজাতে, কৃষ্ণ তাঁর মহিমা কীর্তনকারী গোপসখাদের সঙ্গে গোষ্ঠে ফিরে এলেন। যেহেতু গোপীদের নিকট গোবিন্দের সঙ্গ ব্যতীত ক্ষণকালও শত যুগের মতো মনে হত, তাই তাঁকে গৃহে আসতে দেখে যুবতী গোপীগণ পরম আনন্দ লাভ করেছিলেন।”
ঊনবিংশতি অধ্যায়- দাবানল গ্রাস
19 Jul 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়