অষ্টাদশ অধ্যায়- শ্রীবলরামের প্রলম্বাসুর বধ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “নিরন্তর তাঁর মহিমা কীর্তনকারী তাঁর আনন্দমগ্ন সহচরবৃন্দ দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে, শ্রীকৃষ্ণ তখন গোচারণভূমির দ্বারা সুশোভিত ব্রজে প্রবেশ করলেন। কৃষ্ণ ও বলরাম যখন সাধারণ গোপবালকের ছদ্মবেশে বৃন্দাবনে এভাবেই জীবন উপভোগ করছিলেন, তখন ধীরে ধীরে গ্রীষ্ম ঋতুর আবির্ভাব হল। দেহীগণের পক্ষে এই ঋতুটি অত্যন্ত সুখদায়ক নয়। গ্রীষ্ম সত্ত্বেও, যেহেতু বলরামের সঙ্গে পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং বৃন্দাবনে বাস করছিলেন, তাই গ্রীষ্মও বসন্তের গুণাবলীতে প্রকাশিত ছিল। বৃন্দাবনের ভূমি এমনই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। বৃন্দাবনে ঝরণার উচ্চ ধ্বনিতে ঝিঁঝির শব্দ আচ্ছন্ন হয়ে যেত এবং সেই ঝরণা থেকে উত্থিত জলকণা দ্বারা নিরন্তর সিক্ত বৃক্ষরাজি সমগ্র অঞ্চলকে সুশোভিত করত। বিভিন্ন ধরণের পদ্ম ও জলজ ফুলের রেণু বহনকারী বাতাস সরোবর ও প্রবহমান নদীগুলির ঢেউয়ের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমগ্র বৃন্দাবনকে শীতল করে দিত। তার ফলে সেখানকার অধিবাসীরা গ্রীষ্মের প্রখর সূর্য ও ঋতুকালীন দাবানল থেকে উৎপন্ন উত্তাপ ভোগ করত না। বাস্তাবিকপক্ষে, বৃন্দাবনে সবুজ ঘাসের প্রাচুর্য ছিল। তাদের প্রবাহিত ঢেউয়ের দ্বারা গভীর নদীগুলি তাদের তীরভূমিগুলিকে সিক্ত করে তাদেরকে আর্দ্র ও কর্দমাক্ত করে তুলত। তাই বিষতুল্য প্রচণ্ড সূর্যকিরণ ভূমির প্রাণরসকে বাষ্পীভূত করতে এবং তার সবুজ ঘাসকে দগ্ধ করতে পারেনি। পুষ্পসমূহের দ্বারা বৃন্দাবনের বন সুন্দরভাবে সুশোভিত হয়েছিল এবং অনেক রকম পশু ও পক্ষীর শব্দে পূর্ণ ছিল। ময়ূর ও ভ্রমরেরা গান করছিল, আর কোকিল ও সারসেরা কূজন করছিল। লীলা করবেন বলে মনস্থ করে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোপবালক ও গাভীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে শ্রীবলরামের সঙ্গে বাঁশি বাজাতে বাজাতে বৃন্দাবনের বনে প্রবেশ করলেন। ময়ূরপুচ্ছ, মালা, ফুলের গুচ্ছ ও বর্ণময় খনিজদ্রব্য সহ কচি পাতার দ্বারা নিজেদের সুশোভিত করে বলরাম, কৃষ্ণ ও তাদের গোপসখারা পরস্পর নৃত্য, যুদ্ধ ও গান করেছিলেন। যখন কৃষ্ণ নৃত্য করছিলেন, তখন কোনও কোনও গোপবালক গান করে এবং কেউ কেউ বাঁশি, করতাল ও শিঙা বাজিয়ে তাঁর সঙ্গে সঙ্গত করছিলেন, আর অন্যেরা সকলে তাঁর নৃত্যের প্রশংসা করছিলেন।”
“হে রাজন্, নটগণ যেমন অন্য নটের স্তুতি করে, ঠিক তেমনই দেবতারা গোপ-সম্প্রদায়ভুক্ত রূপে ছদ্মবেশের দ্বারা নিজেদেরকে গোপন করেছিলেন এবং গোপবালক রূপে আবির্ভূত কৃষ্ণ ও বলরামের স্তুতি করছিলেন। কৃষ্ণ ও বলরাম তাঁদের গোপবালক সখাগণের সঙ্গে ঘুরপাক খাওয়া, লম্ফ প্রদান, নিক্ষেপ, চড় মারা, হেঁচড়ে টেনে নেওয়া ও যুদ্ধের দ্বারা খেলা করতেন। কখনও কখনও কৃষ্ণ ও বলরাম বালকদের মাথার চুল ধরে টানতেন। হে মহারাজ, অন্য বালকেরা যখন নৃত্য করছিলেন, তখন কৃষ্ণ ও বলরাম কখনও কখনও গান ও বাদ্যযন্ত্র দ্বারা তাঁদের সঙ্গে সঙ্গত করতেন এবং কখনও কখনও দুই প্রভু বালকদের ‘খুব ভাল! খুব ভাল!’ বলে প্রশংসা করতেন। কখনও কখনও গোপবালকেরা বিল্ব অথবা কুম্ভ ফলের দ্বারা এবং কখনও বা হাতভর্তি আমলিক ফলের দ্বারা খেলা করতেন। অন্য সময়ে তাঁরা পরস্পরকে ছোঁয়াছুঁয়ি অথবা কানামাছি আদি খেলা করতেন এবং কখনও তাঁরা পশু-পক্ষীর অনুকরণ করতেন। তঁরা কখনও ব্যাঙের মতো চতুর্দিকে লম্ফ প্রদান করতেন, কখনও নানাবিধ উপহাসের দ্বারা ক্রীড়া করতেন, কখনও দোলনায় চড়তেন এবং কখনও বা রাজার অনুকরণ করতেন। এভাবে কৃষ্ণ ও বলরাম বৃন্দাবনের নদী, পর্বত, উপত্যকা, উপবন, কুঞ্জবন ও সরোবরে ভ্রমণ করে সমস্ত রকমের লৌকিক ক্রীড়াসমূহ খেলা করতেন।”
“রাম, কৃষ্ণ ও তাঁদের গোপসখারা যখন এভাবেই বৃন্দাবনের সেই বনে গোচারণ করছিলেন, তখন তাঁদের মধ্যে প্রলম্বাসুর প্রবেশ করল। কৃষ্ণ ও বলরামকে অপহরণ করার উদ্দেশ্যে সে এক গোপবালকের রূপ ধারণ করল। যেহেতু দশার্হ বংশে আবির্ভূত পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সর্বদর্শী, তাই তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, অসুরটি কে ছিল। তবুও, তাকে কিভাবে হত্যা করা যায় সেই কথা গুরুত্ব সহকারে চিন্তা করে, ভগবান অসুরকে সখারূপে গ্রহণ করার ভান করলেন। ক্রীড়ারসজ্ঞ কৃষ্ণ তখন গোপবালকগণকে একত্রে আহ্বান করে বললেন- “হে গোপবালকগণ! চল, এখন আমরা নিজেদের দুটি সমান দলে ভাগ করে নিয়ে খেলা করি।’ গোপবালকগণ কৃষ্ণ ও বলরামকে দুটি দলের নেতা নির্বাচিত করলেন। বালকগণের কেউ কেউ কৃষ্ণের পক্ষে এবং অন্যরা বলরামের পক্ষে যোগদান করলেন। বালকগণ বহনকারী ও আরোহী সম্পর্কিত নানাবিধ ক্রীড়া করতেন। এই সমস্ত ক্রীড়ায় বিজয়ীরা পরাজিতদের পিঠে আরোহন করতেন এবং পরাজিতরা বিজয়ীদেরকে বহন করতেন। এভাবেই এক অপরকে বহন করে ও বাহিত হয়ে এবং সেই সঙ্গে গোচারণ করতে করতে বালকগণ কৃষ্ণকে অনুসরণ করে ভাণ্ডীরক নামক বট বৃক্ষের দিকে গমন করলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, যখন বলরামের পক্ষীয় শ্রীদাম, বৃষভ ও অন্যেরা এই সমস্ত খেলায় জয়ী হতেন, তখন কৃষ্ণ ও তাঁর পক্ষের বালকেরা তাঁদের বহন করতেন। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরাজিত হয়ে শ্রীদামকে বহন করেছিলেন, ভদ্রসেন বৃষভকে বহন করেছিলেন এবং প্রলম্ব রোহিনীনন্দন বলরামকে বহন করেছিল। শ্রীকৃষ্ণকে অপরাজেয় বিবেচনা করে, সেই দানবশ্রেষ্ঠ (প্রলম্ব) বলরামকে বহন করে অত্যন্ত দ্রুতবেগে যেখানে তার আরোহীকে অবতরণ করার কথা ছিল তার থেকে দূরে প্রস্থান করল। সেই মহা অসুর বলরামকে বহন করতে থাকলে, তিনি প্রকাণ্ড সুমেরু পর্বতের মতো ভারী হয়ে উঠলেন, আর প্রলম্ব গতিরুদ্ধ হতে বাধ্য হল। তার পর সে তার আসল মূর্তি ধারণ করল- স্বর্ণময় অলঙ্কার দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ায়, সেই উজ্জ্বল দেহটি চন্দ্র বহনকারী ও বিদ্যুৎ-চমকানো মেঘের মতো বলে মনে হচ্ছিল। হলধর শ্রীবলরাম যখন প্রদীপ্ত নয়ন, জ্বলন্ত কেশ, ভ্রূকুটিত সংলগ্ন উগ্র দন্তসকল এবং বলয়, কিরীট, কুণ্ডল প্রভায় বিচিত্র দ্রুত আকাশচারী সেই দানবের বিশাল দেহ দর্শন করলেন, তখন ভগবান ঈষৎ ভীত হয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছিল। প্রকৃত অবস্থা স্মরণ করে, নির্ভীক বলরাম হৃদয়ঙ্গম করলেন যে, সেই অসুরটি তাঁকে অপহরণ করার চেষ্টা করে তাঁকে তাঁর সঙ্গীদের থেকে দূরে নিয়ে এসেছে। ভগবান তখন ক্রোধান্বিত হয়ে দেবরাজ ইন্দ্র যেমন তাঁর বজ্র দ্বারা পর্বতকে আঘাত করেন, তেমনভাবে তাঁর দৃঢ় মুষ্টি দ্বারা অসুরের মস্তকে আঘাত করলেন। এভাবেই বলরামের মুষ্টির দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয়ে, প্রলম্বের মস্তক তৎক্ষণাৎ বিদীর্ণ হল। অসুরটি মুখ দিয়ে রক্ত বমন করে তার সকল চেতনা হারাল এবং তার পর ইন্দ্রের বজ্রের দ্বারা বিধ্বস্ত কোন পর্বতের মতো বিকট শব্দ করতে করতে সে প্রাণহীন হয়ে ভূমিতে পতিত হল। কিভাবে বলশালী বলরাম প্রলম্বাসুরকে বধ করেছিলেন তা দেখে গোপবালকগণ অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হয়ে ‘সাধু! সাধু!’ রব করলেন। সকল প্রশংসার যোগ্য সেই বলরামকে তাঁরা প্রচুর আশীর্বাদ প্রদান করে তাঁর প্রশংসা করলেন। প্রেমের দ্বারা তাঁদের চিত্ত অভিভূত, তাই তাঁরা তাঁকে আলিঙ্গন করলেন যেন তিনি মৃত্যু থেকে ফিরে এসেছেন। পাপী প্রলম্বাসুর নিহত হলে, দেবতাগণ অত্যন্ত সুখ অনুভব করে শ্রীবলরামের উপর পুষ্পমাল্য বর্ষণ করলেন এবং ‘সাধু, সাধু’ বলে তাঁর কার্যের প্রশংসা করলেন।”

Leave a Reply

July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits