[শ্রীকৃষ্ণ কিভাবে কালিয় দমন করেছিলেন তা শ্রবণ করে,] মহারাজ পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করলেন- “কালিয় কেন নাগালয় রমণক দ্বীপ পরিত্যাগ করেছিল এবং গরুড় ই বা কেন তার প্রতি এত শত্রু ভাবাপন্ন হয়েছিলেন?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “গরুড়ের দ্বারা ভক্ষণ থেকে নিষ্কৃতির জন্য সর্পগণ পূর্বেই তাঁর সঙ্গে একটি বন্দোবস্ত করেছিল যে, তারা প্রত্যেক মাসে মাসে এক বৃক্ষমূলে উপহার নিবেদন করবে। সেই অনুযায়ী প্রত্যেক মাসে নির্দিষ্ট দিনে, হে মহাভুজ রাজ পরীক্ষিৎ, প্রতিটি সর্প আত্মরক্ষার বিনিময়ে সেই শক্তিশালী বিষ্ণুবাহন গরুড়ের উদ্দেশ্যে যথাসময়ে তার উপহার প্রদান করত। যদিও অন্য সকল সর্প কর্তব্যবোধে গরুড়কে নৈবেদ্য নিবেদন করছিল, কিন্তু- গরুড় তা দাবি করার আগেই একটি সর্প- কদ্রুপুত্র উদ্ধত কালিয় সমস্ত নৈবেদ্য ভক্ষণ করে ফেলত। এভাবেই ভগবান শ্রীবিষ্ণুর বাহন গরুড়কে কালিয় প্রত্যক্ষভাবে অগ্রাহ্য করেছিল। হে রাজন্, এই কথা শ্রবণ করে, পরমেশ্বর ভগবানের অত্যন্ত প্রিয় মহা শক্তিধর গরুড় ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। কালিয়কে বধের কামনা করে, মহাবেগে তিনি সেই সর্পের দিকে ধাবিত হলেন। যেই মাত্র গরুড় দ্রুতবেগে তার উপর পতিত হল, তখনই বিষের অস্ত্রধারী কালিয় প্রতি-আক্রমণের জন্য তার অসংখ্য মস্তক উত্থিত করল। তার ভয়ঙ্কর জিহ্বাগুলি প্রদর্শন করে এবং তার উগ্র চক্ষুগুলি বিস্তার করে, কালিয় তৎক্ষণাৎ তার বিষদাঁতরূপ অস্ত্রের দ্বারা গরুড়কে দংশন করতে লাগল। কালিয়ের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ক্রুদ্ধ তার্ক্ষ্যপুত্র প্রচণ্ডবেগে ধাবিত হলেন। ভগবান মধুসুদনের সেই ভীষণ শক্তিশালী বাহন সুবর্ণের মতো উজ্জ্বল তাঁর বাম ডানার দ্বারা কদ্রুপুত্রকে আঘাত করলেন। গরুড়ের পক্ষাঘাতে কালিয় অত্যন্ত বিহ্বল হয়ে যমুনা নদীর সংলগ্ন একটি হৃদে আশ্রয় গ্রহণ করল। গরুড় সেই হৃদে প্রবেশ করতে পারত না। বস্তুত, সেই দিকে অগ্রসর হতেও সে পারত না।”
“একবার সেই হৃদের গরুড় তাঁর স্বাভাবিক খাদ্য মৎস্য ভক্ষণের আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। সেখানে জলের অভ্যন্তরে ধ্যানস্থ সৌভরি মুনি দ্বারা নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও, সাহস করে গরুড় ক্ষুধার্ত হয়ে বলপূর্বক মৎস্যটি হরণ করেছিলেন। তাদের নেতার মৃত্যুতে সেই হৃদের হতভাগ্য মৎস্যগণ কি রকম দুঃখিত হয়েছিল তা দর্শন করে, কৃপাপরবশ হয়ে সেই হৃদের অধিবাসীদের কল্যাণের জন্য আচরণ করছেন এই মনোভাব নিয়ে, সৌভরি নিম্নোক্ত অভিশাপ উচ্চারণ করলেন। গরুড় যদি আর কখনও এই হৃদে প্রবেশ করে এখানে মৎস ভক্ষণ করে, সে তৎক্ষণাৎ তার প্রাণ হারাবে। এই আমি সত্যই বলছি। সকল সর্পের মধ্যে কেবলমাত্র কালিয় এই ঘটনা জানত এবং গরুড়ের ভয়ে সেই যমুনা হ্রদে তার নিবাস সে নিয়ে এসেছিল। পরে শ্রীকৃষ্ণ তাকে বিতাড়িত করেন।”
[“কৃষ্ণের কালিয় দমনের বর্ণনা পুনরায় আরম্ভ করে শুকদেব গোস্বামী বলতে লাগলেন-] দিব্য মাল্য, গন্ধ ও বস্ত্র ধারণ করে, অনেক সুন্দর রত্নের দ্বারা আচ্ছাদিত এবং স্বর্ণের দ্বারা সুশোভিত হয়ে কৃষ্ণ হ্রদের ভিতর থেকে নির্গত হলেন। গোপগণ যখন তাঁকে দেখলেন, তখন অচেতন ব্যক্তির ইন্দ্রিয়গুলি যেমন জীবন ফিরে পায়, ঠিক তেমনভাবেই তাঁরা সকলে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন। মহানন্দে পূর্ণ হয়ে তাঁরা তাঁকে প্রীতিপূর্ণভাবে আলিঙ্গন করলেন। তাঁদের প্রাণশক্তিকে পুনরায় প্রাপ্ত হয়ে, যশোদা, রোহিণী, নন্দ ও অন্যান্য সকল গোপরমণী ও গোপেরা কৃষ্ণের কাছে গেলেন। হে কৌরব, এমন কি শুষ্ক বৃক্ষগুলিও জীবন ফিরে পেয়েছিল। কৃষ্ণের শক্তির প্রভাব ভালভাবে অবগত হয়ে, শ্রীবলরাম তাঁর অচ্যুত ভ্রাতাকে আলিঙ্গন করে হাসলেন। গভীর স্নেহবশত বলরাম কৃষ্ণকে কোলে তুলে নিয়ে বারংবার তাঁর দিকে নিরীক্ষণ করছিলেন। গাভী, বৃষ ও স্ত্রী- বৎসরাও পরম আনন্দ লাভ করেছিল। পত্নীগণ সহ সকল শ্রদ্ধেয় ব্রাহ্মণেরা নন্দ মহারাজকে অভিনন্দন জানাতে তাঁর কাছে এগিয়ে এলেন। তাঁরা তাঁকে বললেন, ‘তোমার পুত্র কালিয় দ্বারা কবলিত হয়েছিল, কিন্তু ভাগ্যবশত সে এখন মুক্ত।’ তার পর ব্রাহ্মণগণ নন্দ মহারাজকে উপদেশ দান করলেন, ‘তোমার সন্তান কৃষ্ণের সকল সময়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ব্রাহ্মণদের তোমার দান করা উচিত।’ হে রাজন্্, নন্দ মহারাজ তখন অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে তাঁদেরকে গাভী ও স্বর্ণ উপহার দিলেন। মহা ভাগ্যবতী মা যশোদা তখন তাঁর হারানো সন্তানকে ফিরে পেয়ে তাঁকে তাঁর কোলে বসালেন। সেই সতী নারী তাঁকে বারংবার আলিঙ্গন করে নিরন্তর অশ্রুধারা মোচন করতে করতে ক্রন্দন করেছিলেন।”
“হে রাজেন্দ্র [পরীক্ষিৎ], বৃন্দাবনবাসীরা যেহেতু ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন, তাই তাঁরা ও গাভীরা যেখানে ছিলেন, সেই কালিন্দীর তীরেই রাত্রি অতিবাহিত করলেন। রাত্রিতে যখন সকল বৃন্দাবনবাসী ঘুমিয়ে ছিল, তখন গ্রীষ্মকালীন শুষ্ক বনে দাবানল জ্বলে উঠল। সেই আগুন ব্রজবাসীদের চতুর্দিকে পরিবেষ্টিত করে তাঁদের দগ্ধ করতে শুরু করল। বৃন্দাবনবাসীগণ তখন উত্থিত হয়ে দাবানলে তাঁদের দগ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। তাই তাঁরা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয় গ্রহণ করলেন, যিনি তাঁর চিন্ময় শক্তির দ্বারা সাধারণ এক মনুষ্যরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। [বৃন্দাবনবাসীরা বললেন-] কৃষ্ণ, কৃষ্ণ, হে সকল ঐশ্বর্যের অধিপতি! হে অনন্ত বিক্রমশালী রাম! এই অত্যন্ত ভয়ঙ্কর অগ্নি আপনার ভক্ত আমাদের প্রায় গ্রাস করতে চলেছে। হে প্রভো, আমরা তোমার সুহৃদ ও ভক্ত। দয়া করে এই দুর্লঙ্ঘনীয় কালাগ্নি থেকে আমাদের রক্ষা কর। আমরা কখনই তোমার পাদপদ্ম পরিত্যাগ করতে পারব না, যা সমস্ত ভয় দূর করে। তাঁর ভক্তদের অত্যন্ত সন্ত্রস্ত দর্শন করে, অনন্ত জগদীশ্বর ও অনন্ত শক্তিধর শ্রীকৃষ্ণ তখন সেই ভয়ঙ্কর দাবানল পান করলেন।”
সপ্তদশ অধ্যায়- কালিয়ের ইতিহাস
14 Jul 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়