ষোড়শ অধ্যায়- শ্রীকৃষ্ণের কালিয় দমন

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কালো সর্প কালিয় দ্বারা যমুনা নদী দূষিত হয়েছে দর্শন করে, নদীর শুদ্ধিকরনের কামনায় কালিয়কে সেখান থেকে নির্বাসিত করলেন।”
রাজা পরীক্ষিৎ বললেন- “হে ব্রাহ্মণ, পরমেশ্বর ভগবান কালিয় নাগকে কিভাবে অতল যমুনার জলের মধ্যে নিগৃহীত করেছিলেন, আর কিভাবেই বা কালিয় সেখানে বহু যুগ ধরে বসবাস করছিল, দয়া করে তা বর্ণনা করুন। হে ব্রাহ্মণ, পরমেশ্বর ভগবান অনন্ত ও স্বেচ্ছানুবর্তী। বৃন্দাবনে গোপবালক রূপে অমৃততুল্য তাঁর উদার লীলা শ্রবণে কেউ বা তৃপ্ত হতে পারে?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “কালিন্দী [যমুনা] নদীর মধ্যে একটি হ্রদে কালিয় নাগ বাস করত, যার বিষাগ্নিতে তার জল নিরন্তর উত্তপ্ত হয়ে ফুটতে থাকত। বস্তুত, এর ফলে উৎপন্ন বাষ্প এত বিষাক্ত ছিল যে, সেই দূষিত হৃদের উপর দিয়ে উড়ন্ত পাখিরা সেখানে পতিত হত। সেই মারাত্মক হৃদের জলকণাবাহী বায়ু তীরে প্রবাহিত হত। কেবলমাত্র সেই বিষাক্ত বায়ুর সংস্পর্শেই তীরবর্তী উদ্ভিদ ও প্রাণীসমূহের মৃত্যু হত। কালিয়নাগ তার ভয়ঙ্কর শক্তিসম্পন্ন বিষে কিভাবে যমুনা নদীকে দূষিত করেছিল শ্রীকৃষ্ণ তা অবলোকন করেছিলেন। যেহেতু বিশেষত খল অসুরগণকে দমন করার জন্য চিন্ময় জগৎ থেকে কৃষ্ণ অবতরণ করেছিলেন, তাই ভগবান অবিলম্বে একটি সুউচ্চ কদম্ব বৃক্ষের শীর্যে আরোহণ করে নিজেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করলেন। তিনি তাঁর কোমর বন্ধনীকে দৃঢ় করলেন, তাঁর বাহুকে চাপড় মারলেন এবং তারপর সেই বিষাক্ত জলে নিপতিত হলেন। পরমেশ্বর ভগবান যখন সেই সর্প-হৃদে নিপতিত হলেন, সেখানকার সর্পেরা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে সজোরে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করলে, প্রবল বিষে তা আরও দূষিত হয়ে উঠল। হ্রদে ভগবানের প্রবেশ-বেগে তা চতুর্দিকে স্ফীত হয়ে উঠেছিল এবং বিষাক্ত, ভয়ঙ্কর তরঙ্গরাশি চারদিকের শতধনু পরিমিত ভূমি প্লাবিত করেছিল। অনন্ত শক্তিধর পরমেশ্বর ভগাবানের পক্ষে তা মোটেই বিস্ময়কর নয়। তাঁর বাহুদণ্ডকে ঘুরিয়ে এবং আরও নানাভাবে জলে শব্দ করে কৃষ্ণ রাজকীয় হস্তীর মতো কালিয় হ্রদে ক্রীড়া শুরু করলেন। কালিয় সেই শব্দ শ্রবণ করে বুঝতে পারল কেউ তার হ্রদে অনধিকার প্রবেশ করেছে। নাগ তা সহ্য করতে না পেরে তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এল।”
“পীতবসন পরিহিত, মনোহর, জলদতুল্য উজ্জ্বলকান্তি আকর্ষণীয় দেহ সমন্বিত বক্ষে শ্রীবৎস চিহ্নিত, সহাস ও কমল-তুল্য সুকোমল চরণবিশিষ্ট শ্রীকৃষ্ণকে কালিয় নির্ভয়ে জলের মধ্যে ক্রীড়া করতে দেখেলেন। তাঁর এই অপূর্ব সুন্দর রূপ সত্ত্বেও, কালিয় তার হৃদয়ে প্রচণ্ডভাবে দংশন করল এবং তৎক্ষণাৎ তার কুণ্ডলীল মধ্যে কৃষ্ণকে সম্পূর্ণ্যভাবে বেষ্টন করল। কৃষ্ণের প্রিয় সখা গোপগণ শ্রীকৃষ্ণকে কালিয় স্বর্পের কুণ্ডলীতে বেষ্টিত অথচ নিশ্চেষ্ট দর্শন করে অত্যন্ত পীড়িত হয়েছিলেন। তারা শ্রীকৃষ্ণকে তাঁদের আত্মা, তাঁদের পরিবার, তাঁদের অর্থ, স্ত্রীগণ ও সকল কামনা- সবই অর্পণ করেছিলেন। তাই ভগবানকে কালিয় সর্পের কবলে বেষ্টিত দেখে তাঁরা দুঃখ শোক ও ভয় দ্বারা হতবুদ্ধি হয়ে ভূতলে পতিত হলেন। গাভী, বৃষ ও স্ত্রী গোবৎসগণ অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে কৃষ্ণের জন্য ক্রন্দন করতে লাগল। তাঁর উপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে, ভীত হয়ে তারা রোদনপরায়ণের মতো দাঁড়িয়ে থাকল। সেই সময় বৃন্দাবনে আসন্ন বিপদের সূচনা করে ভূমি, আকাশ ও জীব-শরীরে ত্রিবিধ অমঙ্গলজনক লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সব অশুভ লক্ষণ দর্শনে, নন্দ মহারাজ ও অন্যান্য গোপবৃন্দ ভীত হয়েছিলেন, কারণ তাঁরা জানতে পেরেছিলেন যে, বলরামকে সঙ্গে না নিয়েই কৃষ্ণ গোচারণে গমন করেছে। যেহেতু তাঁরা ছিলেন কৃষ্ণগত-প্রাণ, কৃষ্ণগত-চিত্ত, তাই তাঁরা পরম শক্তি ও ঐশ্বর্য বিষয়ে তাঁরা অবগত ছিলেন না। ফলে অশুভ লক্ষণসমূহ তাঁর নিধনসূচক মনে করে তাঁরা দুঃখ, শোক ও ভয়ে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন। অসহায় বৎসের জন্য একটি গাভীর যেমন ব্যবহার তেমনই কৃষ্ণের প্রতি বাৎসল্য ভাববিশিষ্ট শিশু, বৃদ্ধ ও বনিতা সকল অধিবাসীই তাঁকে খুঁজে পাওয়ার উদ্দেশ্যে দীনভাবে গ্রাম হতে নির্গত হলেন।”
“সমস্ত অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের অধীশ্বর ভগবান বলরাম তাঁর অনুজের প্রভাব অবগত ছিলেন বলে, বৃন্দাবনবাসীগণের এরূপ কাতরতা দর্শন করে ঈষৎ হাসলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। পরমেশ্বর ভগবানের লক্ষণযুক্ত পদচিহ্নিত পথ অনুসরণ করে তাঁদের প্রিয়তম কৃষ্ণের অন্বেষণে অধিবাসীগণ অতি দ্রুত যমুনার তীরে গমন করলেন। সমস্ত গোপ-সম্প্রদায়ের অধীশ্বর শ্রীকৃষ্ণের পদচিহ্ন পদ্ম, যব, অঙ্কুশ, বজ্র ও ধ্বজ চিহ্নিত ছিল। হে প্রিয় রাজন্ পরীক্ষিৎ, পথে গাভীদের ক্ষুরের চিহ্নের মধ্যে তাঁর পদচিহ্ন দেখতে পেয়ে, বৃন্দাবনের অধিবাসীগণ অতি দ্রুত গমন করতে লাগলেন। যমুনা নদীরে তীরের পথে দ্রুত যেতে যেতে বৃন্দাবনের অধিবাসীগণ দূর থেকে হ্রদের সর্পশরীর বেষ্টিত নিশ্চেষ্ট কৃষ্ণকে লক্ষ্য করে এবং জলাশয়ের নিকটে অচেতন গোপবালক আর চতুর্দিকে ক্রন্দনরত পশুগণকে দেখে অত্যন্ত পীড়িত ও মুহ্যমান হলেন। কৃষ্ণানুরক্তচিত্তা গোপীগণ যখন ভগবান অনন্তদেবকে সর্পগ্রস্ত দর্শন করলেন, তাঁরা তাঁর প্রেমময়ী সখ্যতা, তাঁর হাস্যময় অবলোকন এবং তাঁদের সঙ্গে তাঁর বাক্যালাপ স্মরণ করতে করতে অত্যন্ত দুঃখে পীড়িত হয়ে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডকে শূণ্যরূপে দর্শন করলেন। যদিও জ্যেষ্ঠা গোপীগণ কৃষ্ণ-জননীর সমদুঃখিতা ছিলেন এবং শোকাশ্রু ত্যাগ করছিলেন, তবুও পুত্রের প্রতি পূর্ণ চেতনামগ্ন কৃষ্ণ-জননীকে তাঁরা সবলে ধরে রেখেছিলেন। মৃতবৎ দাঁড়িয়ে, তাঁর মুখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে, এই সকল গোপীরা প্রত্যেক ব্রজের প্রিয়তমের লীলাসমূহ স্মরণ করতে লাগলেন।”
“তারপর বলরাম দেখলেন যে, নন্দ মহারাজ এবং অন্যান্য কৃষ্ণগত-প্রাণ গোপগণ সেই সর্প-হ্রদে প্রবেশে উদ্যত। পরমেশ্বর ভগবান রূপে শ্রীবলরাম শ্রীকৃষ্ণের প্রকৃত শক্তি পূর্ণরূপে জ্ঞাত ছিলেন, আর তাই তিনি তাঁদের নিবারিত করলেন। একজন সাধারণ মানুষের ব্যবহার অনুকরণে ভগবান মাত্র কিছু সময় সেই সর্প-কুণ্ডলীর মধ্যে ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, তাঁর প্রতি প্রেমবশত তাঁর গ্রাম গোকুলের স্ত্রী, শিশু ও অন্যান্য অধিবাসীগণ অতীব দুঃখের মধ্যে আছে, এবং তিনিই তাঁদের জীবনের উদ্দেশ্য ও একমাত্র আশ্রয়স্বরূপ, তাই তখন তিনি তৎক্ষণাৎ কালিয় নাগের বন্ধন থেকে উত্থিত হলেন। ভগবানের বর্ধিত শরীর দ্বারা তার দেহ পীড়িত হলে, কালিয় তাঁকে পরিত্যাগ করল। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে সেই সর্প তখন তার ফণা উন্নত করে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল। তার দুই নাসারন্ধ্র বিষ পাকের জন্য দুটি পাত্রের মতো মনে হচ্ছিল এবং তার মুখের স্থির চক্ষু দুটি ছিল অঙ্গারসদৃশ। এভাবেই সেই সর্প ভগবানকে দেখছিল। বারবার তার দ্বখণ্ডিত জিহ্বা দ্বারা ওষ্ঠ লেহনকারী কালিয় ভয়ঙ্কর বিষানলযুক্ত স্থির-দৃষ্টিতে কৃষ্ণকে দেখছিল। কিন্তু কৃষ্ণ ঠিক যেভাবে গরুড় একটি সর্পের সঙ্গে খেলা করে, সেভাবেই ক্রীড়াচ্ছলে তার চতুর্দিকে ভ্রমণ করছিলেন। প্রত্যুত্তরে, কালিয়ও ভগবানকে দংশন করার সুযোগের অপেক্ষায় ভ্রমণ করছিল। তাঁর অবিশ্রান্ত পরিভ্রমণের দ্বারা সর্পের শক্তিকে দুঃসহভাবে নিঃশেষিত করে, সব কিছুর আদিকারণ শ্রীকৃষ্ণ কালিয়ের উন্নত স্কন্ধকে অবনত করে তার বৃহৎ মস্তকের উপরে আরোহণ করলেন। এভাবেই সমস্ত শিল্পকলার আদিগুরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নৃত্য করতে শুরু করলেন এবং সর্পের শিরোপরি অসংখ্য রত্নের স্পর্শে তাঁর চরণ-কমল রঞ্জিত হয়ে উঠল। ভগবানকে নৃত্যরত দেখে- গন্ধর্ব, সিদ্ধ, মুনি, চারণ ও দেবস্ত্রী- তাঁর স্বর্গের ভৃত্যগণ তৎক্ষণাৎ সেখানে উপস্থিত হলেন। মহানন্দে তাঁরা ভগবানের নৃত্যের তালে মৃদঙ্গ, পণব, আনক, প্রভৃতি বাদ্য বাজাতে শুরু করলেন। তাঁরা সঙ্গীত, পুষ্প, উপহার এবং স্তব নিবেদনও করেছিলেন।”
“হে রাজন্, কালিয়ের এক শত একটি প্রধান মস্তক ছিল এবং যখন তাদের কোন একটি অবনত হচ্ছিল না, তখন খলদণ্ড-বিধাতা শ্রীকৃষ্ণ তাঁর চরণের আঘাত দ্বারা সেই উদ্ধত মস্তককে দলিত করছিলেন। তারপর কালিয় যেমাত্র তার মৃত্যুযন্ত্রণায় প্রবেশ করল, সে তখন তার মস্তকগুলি চতুর্দিকে ঘোরাতে লাগল এবং মুখ ও নাসারন্ধ্র দিয়ে ভয়নাক রক্ত বমন করতে করতে তীব্র যন্ত্রণা ও দুর্দশায় পড়ল। কালিয় ক্রোধে উদ্ধত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখ দিয়ে বিষ উদ্‌গীরণ করছিল। ভগবান তখন তার ক্রোধোন্মত্ত মাথায় নৃত্য করে, পদাঘাতে অবনত করে দমন করছিলেন। দেবতাগণ এই শৌর্য প্রদর্শনে আদিপুরুষ ভগবানকে পুষ্পবর্ষণের দ্বারা আরাধনা করার সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন। হে প্রিয় রাজন্ পরীক্ষিৎ, শ্রীকৃষ্ণের অদ্ভুত তাণ্ডব নৃত্যে কালিয়ের সহস্র ফণার সকলই দলিল ও চূর্ণ হয়েছিল। তখন সেই সর্প মুখ দিয়ে প্রচুর রক্ত বমন করত করতে অবশেষে শ্রীকৃষ্ণকে নিত্য পুরুষোত্তম ভগবান, চরাচরগুরু শ্রীনারায়ণ রূপে অবগত হয়ে মনে মনে তাঁর শরণাগত হয়েছিল। কালিয়ের পত্নীগণ যখন দেখল যে উদরে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড ধারণকারী শ্রীকৃষ্ণের অতিভারে কিভাবে সে অবসন্ন হয়ে পড়েছে এবং কৃষ্ণের পাদ-প্রহারে তার ছত্রের ন্যায় ফণাগুলি চূর্ণ হয়েছে, তখন তারা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে স্খলিত বসন, ভূষণ, কেশবন্ধন সহ আদিপুরুষ ভগবানের কাছে উপস্থিত হল। সেই সকল উদ্বিগ্নচিত্তা সাধ্বী রমণীরা তাদের শিশুদের সামনে রেখে ভূতলে দণ্ডবৎ প্রণত হয়ে ভূত-পতিকে প্রণাম নিবেদন করল। তাদের পাপী স্বামীর মুক্তি এবং পরম আশ্রয়দাতা পরমেশ্বর ভগবানের আশ্রয় কামনায় বিনীতভাবে হাত জোড় করে তাঁর নিকটে তাঁরা গমন করেছিল।”
কালিয়ের পত্নীগণ বলল- “এই কৃতাপরাধীকে যে দণ্ড দিয়েছেন তা অবশ্যই ন্যায্য হয়েছে। কারণ, খল ও নিষ্ঠুর ব্যক্তিদের দমনের জন্য আপনি এই পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন। আপনি এতই নিরপেক্ষ যে, যখন জীবকে তার পরম মঙ্গলের জন্য দণ্ডদান করেন, তখন শত্রু ও পুত্রের প্রতি সমদৃষ্টি প্রদান করেন। যেহেতু আপনার প্রদত্ত দন্ড নিশ্চিতভাবে অসৎ জনের পাপ নাশ করে, তাই আসলে আপনি এখানে আমাদের কৃপাই করেছেন। বাস্তবিকই, এই বদ্ধ জীব আমাদের স্বামী এতই পাপী যে, তার ফলে সে এই সর্পদেহ প্রাপ্ত হয়েছে এবং তার প্রতি আপনার ক্রোধ স্পষ্টতই আপনার কৃপারূপে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। আমাদের স্বামী পূর্বজন্মে নিজ মান রহিত হয়ে এবং অপরকে সম্মান প্রদান করে যত্ন সহকারে কোনও তপস্যা করেছেন কি? এই জন্যই কি আপনি তার প্রতি সন্তুষ্ট? অথবা পূর্বজন্মে সর্বজীবের প্রতি অনুকম্পা সহকারে কোনও ধমীয় কর্তব্য পালন করেছিল কি? আর তাই কি সর্বজীবের জীবনস্বরূপ আপনি তার প্রতি এখন সন্তুষ্ট? হে প্রভু, আমরা জানি না যাঁর জন্য ভাগ্যদেবী অন্য সকল কামনা পরিত্যাগ করে ব্রতপরায়ণা হয়ে শত শত বৎসর তপস্যা করেছিলেন, আপনার সেই পাদপদ্মরেণু দ্বারা স্পর্শ লাভ করার যোগ্যতা কালিয় নাগের কিভাবে অর্জত হল। যাঁরা আপনার পাদপদ্মধুলি প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁরা কখনও স্বর্গলোক, সার্বভৌমত্ব, ব্রহ্মপদ ও পৃথিবীর আধিপত্য আকাঙ্ক্ষা করেন না। তাঁরা এমন কি যোগসিদ্ধি বা মোক্ষও বাঞ্ছা করেন না। হে প্রভু, এই নাগরাজ কালিয় যদিও তমোগুণে জন্মগ্রহণ করেছে এবং ক্রোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তবুও অন্যদের পক্ষে যা লাভ করা কঠিন সে তাই লাভ করেছে। কেবলমাত্র আপনার পাদপদ্মরজ লাভ করা মাত্র জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত এবং বাসনায় পরিপূর্ণ দেহধারী জীবগণের চক্ষুর সম্মুখে সকল মঙ্গল প্রকাশিত হয়। অন্তর্যামীরূপে সমস্ত জীবের হৃদয়ে বিরাজমান, সর্বব্যাপক, পরমেশ্বর ভগবান আপনাকে আমরা আমাদের প্রণাম নিবেদন করি। আকাশাদি সর্বভূতের মূল আশ্রয় হওয়া সত্ত্বেও আপনি সৃষ্টির পূর্বে বর্তমান ছিলেন। আর যদিও আপনি সব কিছুর কারণ, তবুও পরমাত্মারূপে আপনি সমস্ত জড় কার্য ও কারণের অতীত। আপনি জ্ঞান-বিজ্ঞান নিধিস্বরূপ এবং অনন্ত শক্তিযুক্ত পরমতত্ত্ব, আপনাকে প্রণাম করি। যদিও আপনি নির্গুণ, নির্বিকার, তবুও আপনিই জড়া প্রকৃতির মূখ্য প্রবর্তক। আপনি কালস্বরূপ, কালশক্তির আশ্রয় এবং সর্বকালের সাক্ষী আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি। আপনি বিশ্বরূপ এবং ভিন্নভাবে বিশ্বদ্রষ্টাও। আপনি স্রষ্টা এবং নিখিল কারণস্বরূপ। সমস্ত মহাভূত, তন্মাত্র, ইন্দ্রিয়, প্রাণবায়ু, মন, বুদ্ধি ও চেতনার পরমাত্মা-স্বরূপ আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি। আপনারই আয়োজনে জড়া প্রকৃতির ত্রিগুণের প্রভাবে মিথ্যা পরিচিতির দ্বারা সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ চিন্ময় আত্মাসমূহের প্রকৃত স্বরূপে অনুভূতি আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে। আপনি অনন্ত পরমেশ্বর, সূক্ষ্ণ, সর্বজ্ঞ, কূটস্থ, নানাবিধ বিরুদ্ধ মতানুসারী দর্শনের অনুমোদনকারী এবং শব্দ ও ভাবের প্রকাশ শক্তির মূলস্বরূপ পরম পুরুষোত্তম ভগবান- আপনাকে আমাদের প্রণাম নিবেদন করি। যিনি সকল নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মূলস্বরূপ, যিনি দিব্যশাস্ত্রাদির উৎস ও রচয়িতা-স্বরূপ এবং যিনি ইন্দ্রিয়প্রবৃত্তি ও ভোগনিবৃত্তিমূলক উভয় বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমেই স্বপ্রকাশিত, তাঁকে আমরা বারংবার প্রণতি নিবেদন করি। আমরা বসুদেবের পুত্র শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরামের প্রতি এবং শ্রীপ্রদ্যুম্ন ও শ্রীঅনিরুদ্ধের প্রতি আমাদের প্রণাম নিবেদন করি। সকল বিষ্ণুভক্তের পরম প্রভুকে আমরা সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। বিভিন্ন জড় ও চিন্ময় গুণাবলীর প্রকাশকারী ভগবানকে আমরা প্রণাম নিবেদন করি। জড় গুণাবলীর মধ্যে আপনি নিজেকে আচ্ছাদিত করেন এবং তবুও সেই একই জড় গুণাবলীর ক্রিয়াকলাপ শেষ পর্যন্ত আপনার অস্তিত্ব প্রকাশ করে। আপনি গুণসাক্ষী এবং আপনার ভক্তদের দ্বারাই কেবল আপনাকে অবগত হওয়া যায়।”
“হে অচিন্ত্য মহিমাময় লীলা সমন্বিত ভগবান হৃষীকেশ, আপনাকে আমাদের প্রণাম নিবেদন করি। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি ও প্রকাশের হেতুস্বরূপ আপনার অস্তিত্ব অনুমিত হয়। কিন্তু আপনার ভক্তগণ আপনাকে এভাবেই অবগত হলেও, অভক্তগণের প্রতি আপনি মৌন ও নির্বিকার আত্মারাম হয়ে থাকেন। উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট সকল বস্তুর গন্তব্যস্থল সম্পর্কে অবগত এবং সেই সকল বস্তুর তত্তাবধায়ক নিয়ন্ত্রণকারী আপনাকে আমাদের প্রণাম নিবেদন করি। আপনি এই বিশ্ব থেকে স্বতন্ত্র হয়েও এই মায়িক জগৎ সৃষ্টির ভিত্তি ও তার সাক্ষীস্বরূপ। বাস্তবিকই, আপনি সমগ্র জগতের মূল কারণ।”
“হে সর্বশক্তিমান ভগবান, যদিও জড় কার্যকলাপে লিপ্ত হবার আপনার কোন হেতু নেই, তবুও এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের আয়োজনের নিমিত্ত আপনার নিত্য কালশক্তির মাধ্যমে আপনি কার্য করেন। সৃষ্টির পূর্বে সুপ্ত থাকা প্রকৃতির প্রতিটি গুণসমূহের বৈশিষ্ট্যমূলক ক্রিয়াকলাপকে জাগ্রত করে আপনি এই কার্য করেন। কেবলমাত্র আপনার ঈক্ষণের দ্বারা ক্রীড়াচ্ছলে এই সমস্ত জগৎ-নিয়ন্ত্রণের কার্যকলাপ আপনি নিখুঁতভাবে সম্পাদন করে থাকেন। সুতরাং ত্রিভুবনব্যাপী সকল জড় দেহগুলি- সত্ত্বগুণে যারা শান্ত, রজোগুণে যারা অশান্ত এবং তমোগুণে যারা মূঢ়- সবই আপনারই সৃষ্টি। তবুও, যাদের দেহ সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত, সেই সমস্ত জীবেরা আপনার বিশেষ প্রিয় এবং তাঁদের প্রতিপালন ও তাঁদের ধর্মীয় নীতিসমূহের রক্ষার জন্যই আপনি এখন পৃথিবীতে উপস্থিত হয়েছেন। পুত্র বা প্রজার দ্বারা কৃত অপরাধ পালকের অন্ততপক্ষে একবার সহ্য করা উচিত। হে শান্তাত্মন্, তাই আমাদের মূঢ় স্বামীকে আপনার ক্ষমা করা উচিত, কারণ সে জানত না আপনি কে। হে ভগবান, দয়া করে কৃপা প্রদর্শন করুন। আমাদের মতো স্ত্রীগণের জন্য অনুকম্পা অনুভব করা সাধুগণের পক্ষে উপযুক্ত। এই নাগ তার প্রাণ ত্যাগ করতে চলেছে। দয়া করে আমাদের জীবন ও আত্মাস্বরূপ আমাদের পতিকে ফিরিয়ে দিন। এখন আপনার দাসীস্বরূপ আমাদের দয়া করে বলুন আমাদের কি কর্তব্য। বিশ্বস্তভাবে যিনি আপনার আজ্ঞা পালন করেন, তিনি অবশ্যই আপনা থেকেই সকল ভয় হতে মুক্ত হন।”
“শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এভাবেই নাগপত্নীদের দ্বারা স্তুত হয়ে, পরমেশ্বর ভগবান তাঁর পাদপদ্মের আঘাত চূর্ণমস্তক ও মূর্ছিত কালিয়নাগকে পরিত্যাগ করলেন। কালিয় ধীরে ধীরে ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া ও জীবনীশক্তি পুনঃপ্রাপ্ত হল। তারপর জোরে জোর কষ্টকরভাবে শ্বাস ত্যাগ করতে করতে সেই দীন সর্প পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে করজোড়ে বিনীতভাবে বলল- সর্পরূপে আমাদের জন্মই আমাদের খল, তামসিক প্রকৃতি ও ক্রোধশীল করেছে। হে ভগবান, যে অসৎ স্বভাবের দ্বারা মানুষি পরিচিত হয়, সেই পরিচয়বদ্ধ স্বভাব ত্যাগ করার তার পক্ষে অতীব দুরূহ। হে পরম স্রষ্টা, আপনিই জড় গুণসমূহের বৈচিত্রময় আয়োজনে এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং তা করতে গিয়ে আপনি বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তি ও যোনি, বিভিন্ন ধরনের ইন্দ্রিয়জাত ও শারীরিক শক্তি, বিভিন্ন ধরনের মানসিকতা ও রূপ সমন্বিত বহু রকমের মাতা ও পিতা প্রকাশ করেছেন। হে পরমেশ্বর ভগবান, আপনার জড় সৃষ্টির অন্তর্গত সমগ্র প্রজাতির মধ্যে আমরা সর্পেরা স্বভাবতই সর্বদা ক্রুদ্ধ। এভাবেই দুস্ত্যজ আপনার মায়িক শক্তি দ্বারা মোহিত আমরা কিভাবে নিজেরাই তা ত্যাগ করতে পারি? হে ভগবান, যেহেতু আপনি সর্বজ্ঞ জগদীশ্বর, তাই আপনিই মায়া থেকে মুক্তির প্রকৃত কারণ। দয়া করে অনুগ্রহ অথবা নিগ্রহ যা আপনি সঠিক বিবেচনা করেন, আমাদের জন্য তা বিধান করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “কালিয়ের কথাসমূহ শ্রবণের পর মনুষ্যরূপে লীলা বিলাসকারী পরমেশ্বর ভগবান উত্তর করলেন- হে নাগ, তুমি আর কখনও এখানে থেকো না। এখনই তোমার সন্তান, স্ত্রী, অন্যান্য আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব আদি অনুচরবর্গদের নিয়ে সমুদ্রে ফিরে যাও। এই নদী গাভী ও মনুষ্যদের উপভোগ্য হোক। বৃন্দাবন ত্যাগ করে সমুদ্রে যাওয়ার জন্য তোমার প্রতি আমার আদেশটি মানুষ যদি মনোযোগ সহকারে স্মরণ করে এবং সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় এই ঘটনা বর্ণনা করে, তবে কখনই তোমার ভয়ে ভীত হবে না। কেউ যদি আমার এই ক্রীড়াস্থলীতে স্নান করে এবং এই হৃদের জলের দ্বারা দেবতা ও অন্যান্য পূজনীয় ব্যক্তিদের তর্পণ করে অথবা উপবাসসহকারে আমার স্মরণ ও পূজা করে সে নিশ্চিতভাবে সর্বপাপ হতে মুক্ত হবে। গরুড়ের ভয়ে রমণক দ্বীপ ত্যাগ করে তুমি এই হৃদে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলে। কিন্তু যেহেতু তুমি এখন আমার পদচিহ্নে চিহ্নিত, তাই গরুড় আর কখনও তোমাকে ভক্ষণ করার চেষ্টা করবে না।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বলে চললেন- “হে প্রিয় রাজন্, যাঁর কার্যাবলী অদ্ভুত, সেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক মুক্ত হয়ে, কালিয় তার পত্নীদের সঙ্গে অত্যন্ত আনন্দ ও শ্রদ্ধা সহকারে তাঁর পূজা করেছিল। উৎকৃষ্ট বস্ত্র, কন্ঠহার, রত্নরাজি ও অন্যান্য বহুমূল্য অলঙ্কার, দিব্য গন্ধ, অনুলেপন ও একটি সুন্দর পদ্ম ফুলের মালা সহযোগে কালিয় জগতের নাথকে পূজা করেছিল। এভাবেই গরুড়ধ্বজ ভগবানকে প্রসন্ন করে কালিয় সন্তোষ অনুভব করেছিল। স্থান ত্যাগের জন্য ভগবানের অনুমতি লাভ করার পর কালিয় তাঁকে প্রদক্ষিণ করে প্রণাম নিবেদন করেছিল। তারপর তাঁর স্ত্রী, বন্ধবর্গ ও পুত্রগণকে নিয়ে সে সমুদ্রের মধ্যবর্তী তার দ্বীপে গমন করল। কালিয় যে মুহূর্তে পরিত্যাগ করল, যমুনা তৎক্ষণাৎ বিষমুক্ত অমৃততুল্য জলের তাঁর পূর্বাবস্থা ফিরে পেলেন। মনুষ্যতুল্য রূপ ধারণ করে তাঁর লীলা উপভোগকারী পরম পুরুষোত্তম ভগবানের কৃপার দ্বারাই তা সংঘটিত হয়েছিল।”

Leave a Reply

July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits