পঞ্চদশ অধ্যায়- ধেনুকাসুর বধ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বৃন্দাবনে বসবাসকালে শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণ যখন পৌগণ্ড বয়স (ছয় থেকে দশ) প্রাপ্ত হলেন, তখন বৃন্দাবনের গোপগণ তাঁদের গোপালনের কার্য গ্রহণ করতে অনুমতি দিলেন। তাঁদের সখাদের সঙ্গে এভাবেই নিয়োজিত হয়ে বালক দুটি বৃন্দাবনের ভূমিকে তাঁদের পাদপদ্ম চিহ্নের দ্বারা অতীব পবিত্র করে তুললেন। তার পর লীলা উপভোগের কামনা করে, শ্রীমাধব তাঁর মহিমা কীর্তনকারী গোপবালকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে বলদেব সহ বাঁশি বাজাতে বাজাতে গাভীগণকে সম্মুখে রেখে, পুষ্পশোভিত ও পশুগণের জন্য পুষ্টিকর বনে প্রবেশ করলেন। পরম পুরুষোত্তম ভগবান সেই বনটি নিরীক্ষণ করলেন। সেই বনটি ভ্রমর, পশু ও পাখির মনোমুগ্ধকর ধ্বনিতে নিনাদিত হচ্ছিল। সেখানে ছিল একটি সরোবর, যার জলরাশি ছিল মহাত্মাদের মনের মতো স্বচ্ছ এবং সেই বনে শত পাপড়িযুক্ত কমলের সৌরভ মৃদুমন্দ বায়ুতে প্রবাহিত হচ্ছিল। এই সমস্ত দর্শন করে, শ্রীকৃষ্ণ সেই পবিত্র পরিবেশে উপভোগ করতে অভিলাষ করলেন। আদিপুরুষ ভগবান দেখলেন যে, সৌন্দর্যমণ্ডিত রক্তবর্ণযুক্ত বনস্পতিগণ তাদের ফল ও পুষ্পের গুরুভারে অবনত হয়ে, তাদের শাখার অগ্রভাগ দ্বারা তাঁর চরণযুগল স্পর্শ করছে। তাই তিনি মৃদু হাস্য সহকারে তাঁর অগ্রজকে উদ্দেশ্য করে বললেন- হে দেবশ্রেষ্ঠ, দেখুন এই বৃক্ষগুলি কিভাবে অমর দেবগণের দ্বারা পূজিত আপনার পাদপদ্মে তাদের শির অবনত করছে। তাদের বৃক্ষজন্মের কারণস্বরূপ অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করার জন্য বৃক্ষসকল আপনাকে তাদের ফুল ও ফল নিবেদন করছে। হে আদিপুরুষ, এই ভ্রমরেরা অবশ্যই মহান ঋষি এবং আপনার অত্যন্ত উন্নত ভক্ত হবে, কারণ আপনার পথ অনুগমন করে এবং আপনার মহিমা কীর্তন করে, তারা আপনার উপাসনা করছে, যা নিখিল জগতের তীর্থস্বরূপ। যদিও এই বনে আপনি নিজেকে গুপ্ত রেখেছেন, হে অপাপবিদ্ধ, তবুও তাদের আরাধ্যদেবকে তারা পরিত্যাগ করছে না। হে আরাধ্য পুরুষশ্রেষ্ঠ, এই ময়ূরগুলি আপনার সম্মুখে আনন্দে নৃত্য করছে, এই হরিণীগণ গোপীদের মতো স্নেহময়ী দৃষ্টির দ্বারা আপনাকে আনন্দ দান করছে এবং এই কোকিলেরা বৈদিক প্রার্থনা দিয়ে আপনাকে সম্মানিত করছে। এই বনের সকল অধিবাসীরা অত্যন্ত ভাগ্যবান এবং আপনার প্রতি তাদের এই ব্যবহার অবশ্যই গৃহে আগত মহাত্মার প্রতি অন্য মহাত্মাদের অভ্যর্থনার মতোই যথাযথ। পৃথিবী এখন অতীব সৌভাগ্যবতী হয়েছে, কারণ আপনি তার তৃণ ও গুল্মাদিকে আপনার চরণ দ্বারা ও তার লতাগুলিকে আপনার হাতের নখের দ্বারা স্পর্শ করেছেন এবং আপনি তার নদী, পর্বত, পাখি ও পশুগুলিকে আপনার কৃপাপূর্ণ দৃষ্টিপাতের দ্বারা অনুগ্রহ করেছেন। কিন্তু সর্বোপরি, আপনি গোপীগণকে আপনার দুই বাহুর মধ্যে আলিঙ্গন করেছেন, যা স্বয়ং ভাগ্যদেবীরও কাম্য।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বৃন্দাবনের সৌন্দর্যমণ্ডিত বন ও তার অধিবাসীদের প্রতি পরিতৃপ্তি প্রকাশ করে, শ্রীকৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বতের নীচে যমুনা নদীর তীরে তাঁর সহচরদের সঙ্গে গাভী চরিয়ে আনন্দ অনুভব করেন। কখনও কখনও বৃন্দাবনের ভ্রমরেরা উচ্ছ্বাসে এতই মত্ত হত যে, তারা চোখ বন্ধ করে গান গাইতে শুরু করত। গোপবালকগণ ও বলদেব সহ বনপথে যেতে যেতে শ্রীকৃষ্ণ ভ্রমণের গান অনুকরণ করে গাইতেন আর তখন তাঁর সখারা তাঁর লীলাসমুহ কীর্তন করতেন। কখনও শ্রীকৃষ্ণ শুক পাখির ডাক, কখনও মধুর স্বরে কোকিলের ডাক এবং কখনও রাজহংসের ডাক অনুকরণ করতেন। কখনও তিনি গোপবালকদের হাস্য উৎপাদন করে উৎসাহের সঙ্গে ময়ূরের নৃত্য অনুকরণ করতেন। কখনও গাভী ও গোপবালকদের আনন্দ দান করে, মেঘগম্ভীর স্বরে, পশুপাল থেকে দূরে চলে যাওয়া পশুদের নাম ধরে তিনি প্রীতি সহকারে ডাকতেন। কখনও তিনি চকোর, ক্রৌঞ্চ, চক্রাহ্ব, ভারদ্বাজ ও ময়ূরের অনুকরণে চিৎকার করতেন এবং কখনও তিনি বাঘ ও সিংহের কৃত্রিম ভয়ে ছোট ছোট প্রাণীর সঙ্গে দৌড়ে পালাতেন। যখন তাঁর জৌষ্ঠ ভ্রাতা ক্রীড়া করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়ে, কোনও গোপবালকের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়তেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁর পাদসংবাহন ও অন্যান্য সেবার দ্বরা তাঁর ক্লান্তি লাঘবের জন্য তাঁকে সাহায্য করতেন। কখনও কখনও গোপবালকেরা যখন নৃত্য, গীত, উল্লম্ফন এবং খেলাচ্ছলে পরস্পর যুদ্ধ করতেন, তখন কৃষ্ণ ও বলরাম হাত ধরাধরি করে নিকটে দাঁড়িয়ে, তাঁদের সখাদের কার্যাবলীর মহিমা কীর্তন করতেন আর হাসতেন। শ্রীকৃষ্ণ কখনও মল্লক্রীড়ায় পরিশ্রান্ত হয়ে বৃক্ষমূলে আশ্রয় গ্রহণ করে, পল্লব রচিত শয্যায় কোন গোপবালকের কোলকে বালিশের মতো ব্যবহার করে শয়ন করতেন। যাঁরা ছিলেন মহাত্মাস্বরূপ, সেই রকম কতিপয় গোপবালকেরা তখন তাঁর পাদপদ্ম মর্দন করে দিতে এবং সর্বপাপ থেকে মুক্ত অন্যেরা দক্ষতার সঙ্গে পরমেশ্বর ভগবানকে বাতাস করতেন। হে মহারাজ, অন্যান্য বালকেরা সময়োপযোগী মনোরম সঙ্গীত গান করতেন এবং তাঁদের হৃদয় ভগবানের জন্য প্রেমবশত বিগলিত হত। যাঁর কোমল পাদপদ্মদ্বয় স্বয়ং সৌভাগ্যের দেবী কর্তৃক সেবিত হয়, সেই পরমেশ্বর ভগবান এভাবেই তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা তাঁর অপ্রাকৃত ঐশ্বর্য গোপন করে গোপের পুত্রসন্তানরূপে লীলাবিলাস করছিলেন। যদিও অন্যান্য গ্রাম অধিবাসীদের সাহচর্যে গ্রাম্যবালকের মতো যখন তিনি আনন্দ উপভোগ করছিলেন, তখনও তিনি মাঝে মধ্যে অসাধারণ কার্য প্রদর্শন করতেন, যা একমাত্র ভগবানের পক্ষেই সম্ভব।”
“একদিন শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সখা শ্রীদাম, সেই সঙ্গে সুবল, স্তোককৃষ্ণ এবং অন্যান্য কয়েকজন গোপবালকেরা প্রেম সহকারে এই কথাগুলি বললেন- হে মহাবাহো রাম! হে দুষ্ট দমনকারী কৃষ্ণ! এখান থেকে অনতিদূরে সারি সারি তাল বৃক্ষে পূর্ণ একটি বৃহৎ বন রয়েছে। সেই তালবনে গাছ থেকে অনেক ফল পতিত হয় এবং ইতিমধ্যেই অনেক ফল ভূমিতে পতিত হয়ে আছে। কিন্তু সমস্ত ফলই দুরাত্মা ধেনুক কর্তৃক রক্ষিত হচ্ছে। হে রাম, হে কৃষ্ণ! ধেনুক অত্যন্ত শক্তিশালী অসুর এবং সে একটি গর্দভের রূপ ধারণ করেছে। সে অনেক সঙ্গীর দ্বারা পরিবেষ্টিত, যারা তার মতোই একই আকার-বিশিষ্ট ও শক্তিশালী। ধেনুকারসুর জীবন্ত মানুষগুলিকে ভক্ষণ করছে এবং সেই জন্য সমস্ত মানুষ ও প্রাণীরা সেই তালবনে যেতে ভীতগ্রস্ত হয়। হে শত্রুহন্তা, পাখিরাও সেখানে উড়তে ভয় পায়। সেই তালবনে অত্যন্ত সুগন্ধি ফলগুলি রয়েছে, যা আগে কখনও কেউ আস্বাদন করেনি। বাস্তবিকই, সর্বত্র পরিব্যাপ্ত সেই তাল ফলের সুগন্ধ এখনও আমরা অনুভব করতে পারি। হে কৃষ্ণ! দয়া করে আমাদের ঐ সমস্ত ফল প্রদান কর। সেগুলির গন্ধে আমাদের মন অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়েছে! প্রিয় বলরাম, সেই ফলগুলি লাভের জন্য আমাদের খুবই আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে। যদি তুমি এই ব্যাপারটি ভাল বলে মনে কর, তা হলে সেই তালবনে চল।”
“তাঁদের সহচরদের কথা শ্রবণ করে, কৃষ্ণ ও বলরাম হাসলেন এবং তাঁদের আনন্দ প্রদানের ইচ্ছা করে, গোপবালক সখাগণ পরিবেষ্টিত হয়ে তাঁরা তাল বনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। শ্রীবলরাম প্রথমে সেই তালবনে প্রবেশ করলেন। তারপর মত্ত হস্তীর মতো বল নিয়ে নিজ বাহুযুগল দিয়ে গাছগুলিকে ঝাঁকাতে শুরু করে তাল ফলগুলি ভূপতিত করতে লাগলেন। ফল পতনের শব্দ শ্রবণ করে, সেই গর্দভরূপী ধেনুকাসুর ভূতল ও বৃক্ষসমূহ কম্পিত করে আক্রমণের জন্য ধাবিত হয়ে এল। সেই বলবান অসুরটি দ্রুতবেগে শ্রীবলদেবের কাছে এসে তার পেছনের পায়ের খুর দিয়ে ভগবানের পায়ে আঘাত করল। তার পর ধেনুক উচ্চস্বরে গর্দভের মতো কর্কশ শব্দ করে চতুর্দিকে ধাবিত হচ্ছিল। পুনরায় শ্রীবলরামের দিকে ধাবিত হযে, হে রাজন্, সেই ক্রোধোন্মত্ত গর্দভটি ভগবানের প্রতি পিছন দিক করে অবস্থান করল। তার পর, ক্রোধে চিৎকার করে, অসুরটি তাঁর দিকে তার পেছনের পা দুটি নিক্ষেপ করল। শ্রীবলরাম ধেনুকের খুরদ্বয় ধরে, এক হাতে তাকে সবেগে ঘুরিয়ে একটি তাল গাছের চূড়ায় নিক্ষেপ করল। সেই প্রচণ্ড ঘূর্ণিবেগে অসুরটির মৃত্যু হল। শ্রীবলরাম ধেনুকাসুরের মৃত দেহটিকে বনের সর্বোচ্চ তাল গাছে নিক্ষেপ করলেন এবং যখন মৃত অসুরটি গাছের মাথায় গিয়ে পড়ল, গাছটি কম্পিত হতে শুরু কর। সেই বিশাল তাল গাছটি পার্শ্ববর্তী তাল গাছটিকে কম্পিত করতে করতে অসুরের ভারে ভেঙ্গে পড়ল। পাশ্ববর্তী গাছটি অন্য একটি গাছকে কম্পিত করে আঘাত করল এবং সেটিও আর একটি গাছকে কম্পিত করল। এভাবেই বনের অনেক গাছই কম্পিত হয়ে ভগ্ন হল। সর্বোচ্চ তাল গাছের মাথায় গর্দভরূপী অসুরের দেহ নিক্ষেপ যেহেতু শ্রীবলরামের লীলাবিলাস তাই সমস্ত গাছগুলি কম্পিত হয়েছিল এবং পরস্পরকে আঘাত করেছিল, যেন প্রবল বায়প্রবাহের দ্বারা চালিত হয়েছিল।”
“প্রিয় পরীক্ষিৎ, সমগ্র জগতের নিয়ন্তা বলরাম অনন্ত পরমেশ্বর ভগবান, সেটি বিবেচনা করে তাঁর পক্ষে এই ধেনুকাসুর বধ তেমন একটা বিস্ময়ের নয়। বাস্তবিকই, একটি বোনা কাপড় যেন তার নিজের সুতার মধ্যে ওতপ্রোতভাবে বিদ্যমান থাকে, ঠিক তেমনই সমগ্র জগৎ তাঁর মধ্যেই বিরাজ করে। তার পর ধেনুকাসুরের মৃত্যু দর্শন করে, তার ঘনিষ্ঠ স্বজন অন্যান্য গর্দভরূপী অসুরেরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিল এবং তারা সকলে মিলে কৃষ্ণ ও বলরামকে আক্রমণ করার জন্য তৎক্ষণাৎ ধাবিত হল। হে রাজন্, অসুরেরা আক্রমণ করলে, কৃষ্ণ ও বলরাম অবলীলাক্রমে একের পর এক তাদের পিছনের পা দুটি ধরে তাদের সকলকে তালগাছগুলির মাথায় নিক্ষেপ করলেন। রাশি রাশি ফলের দ্বারা এবং তাল গাছগুলির ভগ্ন অগ্রভাগে আবদ্ধ অসুরদের প্রাণহীন দেহগুলির দ্বারা আচ্ছাদিত পৃথিবী তখন সুন্দর হয়ে উঠেছিল। বাস্তাবিকই, মেঘমালায় সুশোভিত আকাশের মতো পৃথিবী উজ্জ্বল হয়েছিল। দুই ভাইয়ের এই সুমহৎ কীর্তি শ্রবণ করে, দেবতা ও অন্যান্য উন্নত জীবসকল পুষ্পবৃষ্টি, বাদ্যধ্বনি ও স্তুতি নিবেদন করলেন। যে বনে ধেনুক বধ হয়েছিল মানুষেরা এখন সেখানে ফিরে যেতে স্বস্তি অনুভব করছে এবং নির্ভয়ে তারা তাল গাছগুলির ফলসমূহ ভক্ষণ করছে। গাভীরাও এখন সেখানে ঘাসের উপরে স্বাধীনভাবে চরতে পারে।”
“তার পর যাঁর মহিমাসকল শ্রবণ ও কীর্তন করা পরম পুণ্যকর্ম, সেই কমললোচন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অগ্রজ বলরামের সঙ্গে ব্রজে গৃহে ফিরে এলেন। সমগ্র পথে তাঁর বিশ্বস্ত অনুগামী গোপবালকেরা তাঁরা মহিমা কীর্তন করেছিলেন। গাভীদের পদবিক্ষিপ্ত ধুলিরাশিতে রঞ্জিত শ্রীকৃষ্ণের কেশদাম ময়ূরপুচ্ছ ও বন্য পুষ্পের দ্বারা সুশোভিত ছিল। যখন তাঁর সহচরেরা তাঁর মহিমা কীর্তন করছিলেন, তখন ভগবান তাঁর বাঁশি বাজিয়ে মনোহরভাবে দৃষ্টিপাত করেছিলেন এবং মনোরমভাবে মৃদুহাস্য করেছিলেন। গোপীরা একসঙ্গে সকলেই তাঁর সঙ্গে সাক্ষ্যৎ করতে চলে এসেছিলেন এবং তাঁদের চোখগুলি তাঁকে দর্শন করতে বিশেষ আকুল হয়ে উঠেছিল। ব্রজাঙ্গনাগণ তাঁদের ভ্রমররূপ নয়নের দ্বারা ভগবান মুকুন্দের সুন্দর মুখমণ্ডলের মধু পান করে সমস্ত দিনের বিরহজনিত দুঃখ পরিত্যাগ করলেন। গোপীগণ ভগবানের প্রতি সলজ্জ হাস্য ও বিনয়যুক্ত কটাক্ষ দৃষ্টিপাত করেছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণ তাদের সেই শ্রদ্ধার্পণ সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করে গোষ্ঠে প্রবেশ করলেন। পুত্রবৎসলা মা যশোদা ও মা রোহিণী তাঁদের দুই পুত্রের প্রতিটি ইচ্ছানুরূপ উৎকৃষ্ট দ্রব্যাদি যথাসময়ে নিবেদন করেছিলেন। স্নান ও মর্দনাদি দ্বারা সেই দুই যুবা ভগবান পথশ্রম থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। তার পর তাঁরা মনোরম বস্ত্রাদি পরিধান করে দিব্য মাল্য ও গন্ধাদিতে ভূষিত হলেন। তাঁদের মায়েদের প্রদত্ত সুস্বাদু অন্ন ভোজনের পর আরও নানাভাবে উপলালিত হয়ে, সেই দুই ভাই তাঁদের মনোরম শয্যায় শয়ন করে ব্রজে সুখে নিদ্রা গিয়েছিলেন।”
“হে রাজন্, এভাবেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে তাঁর লীলাবিলাস করে বিচরণ করেছিলেন। এক সময়ে, তাঁর সখাদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে বলরাম ব্যতীত তিনি যমুনায় গেলেন। সেই সময়ে গাভী ও গোপবালকেরা গ্রীষ্মের প্রখর তাপ থেকে তীব্র ক্লেশ অনুভব করছিলেন। তৃষ্ণার দ্বারা পীড়িত হয়ে, তাঁরা যমুনার জল পান করেছিলেন। কিন্তু সেই জল বিষের দ্বারা কলুষিত ছিল। সেই বিষাক্ত জল স্পর্শ করা মাত্র, সমস্ত গাভী ও বালকেরা ভগবানের দৈব শক্তির দ্বারা তাঁদের চেতনা হারালেন এবং প্রাণহীন হয়ে সেই জলের কিনারায় পতিত হলেন। হে কুরুবীর, তাঁদের এই অবস্থায় দর্শন করে, যিনি ছাড়া তাঁদের আর কোনও প্রভু নেই, সেই যোগেশ্বরগণেরও ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণ সেই সমস্ত ভক্তদের প্রতি অনুকম্পা অনুভব করেছিলেন। এভাবেই তিনি তাঁদের প্রতি অমৃতবৎ কৃপাদৃষ্টি বর্ষণের দ্বারা তৎক্ষণাৎ তাঁদের পুনর্জীবিত করেছিলেন। তাঁদের পূর্ণ চেতনা ফিরে পেয়ে, গাভী ও বালকেরা জল থেকে উত্থিত হলেন এবং অত্যন্ত বিষ্ময়ের সঙ্গে এরে অপরের দিকে তাকাতে লাগলেন। হে রাজন্, গোপবালকেরা তখন বিবেচনা করেছিলেন যে, যদিও তাঁরা বিষয় পান করেছিলেন এবং প্রকৃতপক্ষে তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল, কেবলমাত্র গোবিন্দের কৃপাদৃষ্টির দ্বারা জীবন ফিরে পেয়ে তাঁরা তাঁদের নিজেদের শক্তিতে উঠে দাঁড়িয়েছেন।”

Leave a Reply

July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits