চতুর্দশ অধ্যায়- ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ব্রহ্মার স্তব

শ্রীব্রহ্মা বললেন- “হে প্রভু, আপনিই পরম আরাধ্য পরমেশ্বর ভগবান, তাই আপনার সন্তুষ্টিবিধানের জন্য আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম ও স্তুতি নিবেদন করছি। হে নন্দনন্দন, আপনার দিব্য দেহ নব ঘনশ্যামবর্ণ মেঘের মতো, আপনার পরিধেয় বস্ত্র বিদ্যুতের মতো দীপ্যমান এবং কুঁচফল বিরচিত আপনার কর্ণভূষণ ও মস্তকের শিখিপুচ্ছের দ্বারা আপনার মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। বিবিধ বনফুলের মালা ধারণ করে এবং পাচনবাড়ি, বিষাণ ও বেণুর দ্বারা ভূষিত হয়ে, আপনার হাতে এক গ্রাস অন্ন নিয়ে আপনি সুন্দরভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। হে প্রভু, কৃপা করে আপনার যে দিব্য তনু আমায় প্রদর্শন করেছেন, যা কেবল আপনার শুদ্ধ ভক্তবৃন্দের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্যই প্রকটিত হয়ে থাকে, আপনার সেই দিব্য স্বরূপ-শক্তির পরিমাপ করতে আমি পারি না বা অন্য কেউ পারে না। যদিও আমার মন সম্পূর্ণভাবে জড় বিষয় থেকে নিবৃত্ত হয়েছে, তবুও আমি আপনার স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করতে অসমর্থ। তা হলে যে সুখ আপনি আপনার মধ্যে অনুভব করেন, তা আমি কিভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হব? মনোধর্মপ্রসূত জ্ঞানের প্রয়াস সর্বতোভাবে পরিত্যাগ করে যাঁরা তাঁদের নিজ নিজ সামাজিক পদে স্থিত হয়ে, কায়-মন-বাক্যে শ্রদ্ধা সহকারে আপনার লীলাকথা শ্রবণ করেন এবং আপনি ও আপনার শুদ্ধ ভক্তদের মুখনিঃসৃত হরিকথা শ্রবণ করে জীবন ধারণ করেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে আপনাকে জয় করেন, যদিও ত্রিলোকের মধ্যে কেউই আপনাকে জয় করতে পারে না। হে ভগবান, আপনার প্রতি ভক্তিই আত্ম-উপলব্ধির শ্রেষ্ঠ পথ। যদি কেউ সেই পন্থা পরিত্যাগ করে মনোধর্মপ্রসূত জ্ঞানের অনুশীলনে যুক্ত হয়, সে কেবল ক্লেশকর পন্থাই স্বীকার করে এবং তার আকাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করতে পারে না। শূণ্য তুষে প্রহার করে কেউ যেমন শস্য লাভ করতে পারে না, তেমনই জল্পনা-কল্পনার মাধ্যমে আত্ম-উপলব্ধি লাভ হয় না। সে একমাত্র ক্লেশই লাভ করে। হে সর্বশক্তিমান প্রভু, পুরাকালে ইহলোকে বহু যোগীপুরুষ তাঁদের সমস্ত প্রচেষ্টা আপনার প্রতি অর্পণ করে এবং বিশ্বস্তভাবে তাঁদের নিজ নিজ কর্ম পালন করে ভগবৎ-ভক্তির স্তর প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হে অচ্যুৎ, এই প্রকার ভগবৎ-ভক্তির মাধ্যমে আপনার সম্বন্ধে শ্রবণ ও কীর্তনের পদ্ধতির দ্বারা পূর্ণতা অর্জন করে তাঁরা আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন এবং অনায়াসে আপনার শরণাগত হয়ে আপনার পরম ধাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু অভক্তগণ আপনার পূর্ণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন স্বরূপে আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। তা সত্ত্বেও, হৃদয়ের অভ্যন্তরে পরমাত্মার প্রত্যক্ষ অনুভূতির অনুশীলনের দ্বারা নির্বিশেষ ব্রহ্মরূপে আপনার প্রকাশ তাদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু জড়জাগতিক বিভেদের সমস্ত রকম ধারণা এবং জড় ইন্দ্রিয়-বিষয়ের সমস্ত আসক্তি থেকে তাদের মন ও ইন্দ্রিয়গুলিকে শুদ্ধিকরণের দ্বারাই কেবল এটি সম্ভব। কেবলমাত্র এভাবেই আপনার নির্বিশেষ রূপ তাদের কাছে স্বয়ং প্রকাশিত হবে। কালক্রমে বিজ্ঞ দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিকগণ হয়ত পৃথিবীর সমস্ত পরমাণুকণা, হিমকণা, এমন কি সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতিটি রশ্মিকণা গণনা করতে সমর্থ হবেন। কিন্তু জীবের মঙ্গলের জন্য যিনি জগতে অবতীর্ণ হন, সেই পরমেশ্বর ভগবান আপনার অনন্ত অপ্রাকৃত গুণাবলী গণনা করা এই সব বিজ্ঞ লোকেদের মধ্যে কার পক্ষে সম্ভব? যিনি আপনার অনুকম্পা লাভের আশায় তাঁর পূর্বকৃত মন্দ কর্মের ফল ধৈর্য সহকারে ভোগ করতে করতে তাঁর হৃদয়, বাক্য ও শরীরের দ্বারা আপনাকে প্রণতি নিবেদন করে জীবন যাপন করেন, তিনি অবশ্যই মুক্তি লাভের যোগ্য, কারণ তিনি উপযুক্ত উত্তরাধিকারী।”
“হে প্রভু, আমার অসামাজিক ধৃষ্টতা দেখুন! কারণ আমি মায়াবীগণেরও মোহজনক অনন্ত এবং আদিপুরুষ পরমাত্মারূপী আপনার প্রতি নিজ মায়া বিস্তার করে আপনার ক্ষমতা দর্শনে অভিলাষী হয়েছিলেন। অগ্নি থেকে উদ্ভুত স্ফুলিঙ্গ যেমন অগ্নির উপর প্রভাব বিস্তারে অক্ষম, আপনার থেকে উদ্ভুত আমিও তেমন আপনার উপর প্রভাব বিস্তারে কিছুমাত্র সমর্থ নই। অতএব, হে অচ্যুত, দয়া করে আমার অপরাধ মার্জনা করুন। আমি রজোগুণে জন্মগ্রহণ করেছি, তাই স্বভাবতই আমি অজ্ঞ, কারণ আমি নিজেকে আপনার থেকে একজন স্বতন্ত্র নিযন্তা বলে অভিমান করেছি। আমার চক্ষু অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছাদিত, যা আমাকে জগতের অজাত স্রষ্টা বলে মনে করায়। কিন্তু দয়া করে বিবেচনা করুন যে, আমি আপনার ভৃত এবং তাই আপনার অনুকম্পার পাত্র। প্রকৃতি, মহৎ-তত্ত্ব, অহঙ্কার, আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও ভূমি দ্বারা পরিবেষ্টিত ব্রহ্মাণ্ডরূপ ঘটের মধ্যবর্তী আমার নিজ হাতের সাত বিঘত পরিমিত শরীরধারী আমিই বা কোথায়, আর যাঁর রোমকূপরূপ গবাক্ষপথে এমন অগণিত ব্রহ্মাণ্ড পরমাণুর ন্যায় বিচরণশীল, সেই আপনার মহিমাই বা কোথায়! হে অধোক্ষজ ভগবান, গর্ভস্থিত সন্তান যখন তার পা দুটি ঊর্ধ্বে নিক্ষেপ করে, জননী তা অপরাধরূপে গণ্য করেন কি? আর এমন কিছুর অস্তিত্ব আছে কি- যা বিভিন্ন দার্শনিকদের দ্বারা সত্য বা মিথ্যারূপে ভূষিত হলেও- যা প্রকৃতপক্ষে আপনার উদরের বাইরে রয়েছে? হে ভগবান, কথিত আছে যে, প্রলয়কালে যখন ত্রিলোক জলে নিমগ্ন হয়েছিল, তখন আপনার অংশ নারায়ণ সেই জলে শয়ন করেন, ধীরে ধীরে তাঁর নাভি থেকে একটি পদ্ম প্রকাশিত হয় এবং সেই পদ্মে ব্রহ্মার জন্ম হয়। এই কথাগুলি নিশ্চয় মিথ্যা নয়। তাই আপনার থেকেই আমি উদ্ভুত নই কি?”
“হে পরম নিয়ন্তা, যেহেতু আপনি সকল দেহধারী জীবের আত্মা এবং সকল সৃষ্ট গ্রহলোকের নিত্য সাক্ষী, তাই আপনি কি মূল নারায়ণ নন? বাস্তবিকপক্ষে, ভগবান নারায়ণ হচ্ছেন আপনার সম্প্রসারণ এবং তাই তাঁকে বলা হয় নারায়ণ, যেহেতু তিনি ব্রহ্মাণ্ডের আদি জলের মূল উৎস। তিনি পরম সত্য, আপনার মায়াশক্তি জাত নয়। হে ভগবান, সমগ্র জগতের আশ্রয়স্বরূপ আপনার অপ্রাকৃত শরীর প্রকৃতপক্ষে জলের উপর শায়িত থাকে, তা হলে আমি যখন অন্বেষণ করেছিলাম, তখন আপনাকে দর্শন করিনি কেন? আর যদিও-বা আমার হৃদয়ের মধ্যে আপনাকে সঠিকভাবে দর্শন করতে পারিনি, তখন কি আপনি নিজেকে হঠাৎ প্রকাশ করেছিলেন? হে ভগবান, এই অবতারে আপনি প্রমাণ করেছেন যে, আপনিই মায়ার অধীশ্বর। আপনি যদিও এখন এই জগতের মধ্যে রয়েছেন, তবুও সমগ্র বিশ্বব্যাপী সৃষ্টিই আপনার অপ্রাকৃত শরীরের মধ্যে বিরাজমান- আপনার জননী যশোদাকে আপনার উদরের মধ্যে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড প্রদর্শন করিয়ে এই সত্য আপনি প্রমাণ করেছেন। ঠিক যেমন আপনি সহ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আপনার উদরের মধ্যে প্রদর্শিত হয়েছে, তেমনই এখানে বাইরেও হুবহু সেই একই রূপ প্রকাশিত হয়েছে। আপনার অচিন্ত্য শক্তি ব্যতীত কিভাবে এরূপ ঘটনা সম্ভব হতে পারে? আপনি কি আজ আমাকে আপনার থেকে ভিন্ন এই সৃষ্টির অভ্যন্তরের সব কিছু যে আপনার অচিন্ত্য শক্তির প্রকাশ তা দর্শন করালেন না? প্রথমে আপনি একা আবির্ভূত হয়েছিলেন, তারপর আপনি বৃন্দাবনের সমস্ত গোবৎস ও আপনার সখা সমস্ত গোপবালক রূপে প্রকাশিত হলেন। তারপর আপনি আমার সঙ্গে নিখিল জীব দ্বারা আরাধিত সমসংখ্যক চতুর্ভূজ বিষ্ণুমূর্তিরূপে আবির্ভূত হন এবং তার পরে সমসংখ্যক পূর্ণাঙ্গ ব্রহ্মাণ্ডরূপে আবির্ভূত হন। সর্বশেষে, এখন আপনি আপনার অদ্বিতীয় পরমতত্ত্ব স্বরূপে ফিরে এলেন। আপনার যথার্থ অপ্রাকৃত পদ সম্বন্ধে অজ্ঞ ব্যক্তিদের প্রতি আপনার অচিন্ত্য শক্তির বিস্তাররূপে নিজেকে প্রকাশ করে জড় জগতের অংশরূপে আপনি আবির্ভূত হন। এভাবেই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির জন্য আপনি আমার (ব্রহ্মার) ন্যায় আবির্ভূত হন, ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিপালনের জন্য আপনি আপনার (বিষ্ণুর) ন্যায় আবির্ভূত হন এবং ব্রহ্মাণ্ডের প্রলয়ের জন্য আপনি ত্রিনেত্রের (শিবের) ন্যায় আবির্ভূত হন। হে ভগবান, হে পরম স্রষ্টা ও প্রভু, আপনার পার্থিব জন্ম নেই, তবুও অবিশ্বাসী অসুরগণের মিথ্যা গর্ব বিফল করতে এবং আপনার সাধু ভক্তগণের প্রতি কৃপা প্রদর্শন করতে আপনি দেবতা, ঋষি, নর, পশু, এমন কি জলচরেরও মধ্যেও জন্মগ্রহণ করেন।”
“হে পরম মহান! হে পরম পুরুষোত্তম ভগবান! হে যোগেশ্বর পরমাত্মা! ত্রিলোকে অনবরত আপনার লীলা সংঘটিত হয়ে চলেছে, কিন্তু আপনার যোগমায়া বিস্তার করে আপনি কোথায়, কিভাবে ও কখন এই অসংখ্য লীলাসমূহ সম্পাদন করছেন তা কে গণনা করতে পারে? আপনার যোগমায়া কিভাবে কার্য করে তার রহস্য কেউই জানতে পারে না। সুতরাং স্বপ্নবৎ এই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডটি স্বভাবতই অনিত্য, তা সত্ত্বেও সত্যের মতো প্রতীয়মান হয় এবং এভাবেই সেটি জীবের চেতনা আচ্ছাদন করে এবং বারংবার দুঃখকষ্টের দ্বারা তাকে জর্জরিত করে। এই ব্রহ্মাণ্ডটি সত্য বলে মনে হয়, কারণ যাঁর অপ্রাকৃত স্বরূপগুলি নিত্য আনন্দময় ও জ্ঞানময়, সেই আপনার থেকে উদ্ভুত মায়াশক্তির দ্বারা সেটি প্রকাশিত। আপনি একমাত্র পরমাত্মা, আদি পরম পুরুষ, পরমতত্ত্ব- স্বয়ং প্রকাশ, অনন্ত ও অনাদি। আপনি সনাতন ও অচ্যুত, শুদ্ধ ও পূর্ণ অদ্বিতীয় এবং সমস্ত জড় উপাধি থেকে মুক্ত। আপনার আনন্দ কখনও বিঘ্নিত হতে পারে না এবং জড় কলুষের সঙ্গেও আপনার কোনও সম্পর্ক নেই। বাস্তবিকপক্ষে, আপনি অক্ষয় অমৃতস্বরূপ। যাঁরা সূর্যসদৃশ সদ্‌গুরু থেকে শুদ্ধ জ্ঞানচক্ষু প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁরা আপনাকে সমস্ত আত্মাদের আত্মাস্বরূপ পরমাত্মারূপে দর্শন করতে পারেন। এভাবেই আপনার মূল ব্যক্তিত্ব হৃদয়ঙ্গম করে, তাঁরা মায়াময় ভবসমুদ্র অতিক্রম করতে সক্ষম হন। যে ব্যক্তি রজ্জুকে সর্প মনে করে ভীত হয়, কিন্তু সেই সর্পটির অস্তিত্ব নেই তা হৃদয়ঙ্গম হলে তার ভয় পরিত্যাগ করে। তেমনই, যারা সমস্ত আত্মার পরমাত্মারূপে আপনাকে চিনতে ব্যর্থ হয়, তাদের কাছে সম্প্রসারিত মায়াময় জড় অস্তিত্বের উদয় হয়ে থাকে, কিন্তু আপনার সম্পর্কে জ্ঞানোদয় হলে তৎক্ষণাৎ তা অন্তর্হিত হয়। ভববন্ধন ও মোক্ষ এই দুটি ধারণাই অজ্ঞানতার প্রকাশ, তাই সত্য জ্ঞান থেকে তা ভিন্ন। কেউ যখন সঠিকভাবে বিচার করেন যে, শুদ্ধ আত্মা জড় থেকে ভিন্ন এবং সর্বদা সম্পূর্ণ চৈতন্যময়, তখন তাদের আর কোনও অস্তিত্ব থাকে না। যেমন সূর্যের পরিপ্রেক্ষিতে দিন ও রাত্রির কোনও গুরুত্ব থাকে না, তেমনই এই বন্ধন ও মোক্ষ এখন উভয়ই তাৎপর্যহীন। অহো! অজ্ঞ ব্যক্তিদের মূর্খতা দর্শন করুন, যারা আপনাকে মায়ার ভিন্ন প্রকাশ এবং আপনার প্রকৃত স্বরূপ আত্মাকে অন্য কিছু অর্থাৎ জড় দেহ জ্ঞান করে। এরূপ মূর্খেরা সিদ্ধান্ত করে যে, পরমাত্মা আপনার পরম ব্যক্তিত্বের বাইরে অন্যত্র অন্বেষণীয়। হে অনন্ত, আপনার থেকে ভিন্ন সকল বিষয় প্রত্যাখ্যান করে সাধুভক্তগণ তাঁদের নিজেদের দেহাভ্যন্তরে আপনাকে অন্বেষণ করে থাকেন। বাস্তবিকই, পার্থক্য বিচার করতে সক্ষম ব্যক্তিগণ যতক্ষণ না সর্প ভ্রম খণ্ডন করছেন, ততক্ষণ তাঁরা পরিত্যক্ত রজ্জুর যথার্থ প্রকৃতি কিভাবে উপলব্ধি করতে পারেন? হে ভগবান, কেউ যদি আপনার শ্রীপাদপদ্ম যুগলের কৃপার লেশমাত্রও লাভ করে থাকেন, তা হলে তিনি আপনার মহিমা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। কিন্তু যারা আপনার মহিমা সম্বন্ধে জল্পনা-কল্পনা করে, তারা দীর্ঘকাল বেদ অধ্যয়ন করেও আপনাকে জানতে পারে না। হে নাথ, অতএব আমার এই প্রার্থনা যে, এই ব্রহ্মা-জন্মেই হোক অথবা অন্য কোনও জন্মেই হোক, যেখানেই আমি জন্মগ্রহণ করি, আমি যেন আপনার ভক্তবৃন্দের একজন হতে পারি। আমি প্রার্থনা করি, যেখানেই হোক, এমন কি পশুযোনির মধ্যে হলেও, আমি যেন আপনার শ্রীপাদপদ্মের সেবায় যুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করতে পারি। হে সর্বশক্তিমান প্রভু, বৃন্দাবনের গাভী ও গোপীগণ কত মহা সৌভাগ্যবতী যে, আপনি গোবৎস ও গোপবালক স্বরূপে আনন্দে তাঁদের স্তন-দুগ্ধ পান করেছেন! অনাদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত যত বৈদিক যজ্ঞাদি অনুষ্ঠিত হয়েছে তাও আপনাকে এত তৃপ্তিদান করতে সমর্থ হয়নি। অহো! নন্দ মহারাজ, গোপবৃন্দ ও ব্রজবাসীরা কী মহা ভাগ্যবান! তাঁদের সৌভাগ্যের সীমা নেই, যেহেতু পরমানন্দ-স্বরূপ সনাতন পূর্ণব্রহ্মা তাঁদের সখা হয়েছেন। হে অচ্যুত, যদিও এই ব্রজবাসীদের সৌভাগ্যের সীমা অচিন্তনীয়, শিবসহ আমরা একাদশ ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাতৃ দেবতাগণও মহা ভাগ্যবান, কারণ বৃন্দাবনের এই ভক্তগণের ইন্দ্রিয়রূপ পাত্রদ্বারা আমরা নিরন্তর আপনার পাদপদ্মের মধুস্বরূপ অমৃত সুধা পান করছি। যে কোনও গোকুলবাসী পাদপদ্মধুলি দ্বারা অভিষিক্ত হয়ে গোকুলবনে যে কোন জন্মলাভ আমার মহা সৌভাগ্যস্বরূপ হবে। বৈদিক মন্ত্রাবলী যাঁর পাদপদ্মের ধুলি এখনও অন্বেষণ করছে, সেই পরম পুরুষোত্তম ভগবান মুকুন্দ তাঁদের জীবনসর্বস্ব।”
“হে পরমেশ্বর ভগবান, স্বয়ং আপনি ছাড়া আর কি পারিতোষিক অন্যত্র খুঁজে পাওয়া যায়, তা বিচার করে আমার চিত্ত মোহগ্রস্ত হচ্ছে। আপনি সমস্ত আশীর্বাদের মূর্ত প্রকাশ, যা আপনি বৃন্দাবনের গোপ-সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের প্রদান করেন। ভক্তরূপে ছদ্মবেশের দ্বারা পূতনার নিজেকে গোপন করার বিনিময়ে আপনি ইতিমধ্যেই নিজেকে পূতনা ও তার পরিবারের সদস্যদের পারিতোষিকরূপে প্রদান করবার বন্দোবস্ত করেছেন। কিন্তু যাঁদের গৃহ, ধন, সুহৃৎ, প্রিয়জন, দেহ, পুত্র, প্রাণ ও মন সমস্ত কিছুই কেবলমাত্র আপনাতে সমর্পিত, বৃন্দাবনের সমস্ত ভক্তদের প্রদানের জন্য আপনি কি রেখেছেন?
“হে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, যতক্ষণ মানুষ আপনার ভক্ত না হয়, ততক্ষণ তাদের জড় আসক্তি ও বাসনা হয়ে থাকে তস্করস্বরূপ, তাদের গৃহাদি কারাগার-স্বরূপ এবং তাদের পারিবারিক আসক্তি জনিত মোহ পায়ের শৃঙ্খলস্বরূপ হয়ে থাকে। হে প্রভু, যদিও জড় অস্তিত্বের সঙ্গে আপনার কোনই সম্পর্ক নেই, তবুও আপনার শরণাগত ভক্তগণের জন্য বহুবিধ আনন্দরাশি বিস্তার করার উদ্দেশ্যে আপনি এই পৃথিবীতে এসে জড় জাগতিক জীবনের অনুকরণ করেন। যারা বলে, “আমি কৃষ্ণ সম্বন্ধে সব কিছু জানি,” তারা সেভাবেই চিন্তা করুক। এই বিষয়ে আমি বেশি কিছু বলতে ইচ্ছা করি না। হে প্রভু, এইমাত্র বলি যে, আপনার ঐশ্বর্যসমূহ আমার মন, দেহ ও বাক্যের অগোচর। হে কৃষ্ণ, আমি এখন স্থান ত্যাগ করার জন্য বিনীতভাবে অনুমতি প্রার্থনা করছি। প্রকৃতপক্ষে আপনি সর্বজ্ঞ ও সর্বদর্শী। অবশ্যই আপনি সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর, তবুও এই একটি ব্রহ্মাণ্ড আমি আপনাকে অর্পণ করলাম। হে শ্রীকৃষ্ণ, আপনি পদ্মসদৃশ বৃষ্ণিবংশের আনন্দ প্রদান করেন এবং ভূমি, দেবতা, ব্রাহ্মণ ও গাভীগণ দ্বারা গঠিত মহাসমুদ্রকে বিস্তার করেন। আপনি অধর্মের গাঢ় অন্ধকার নাশ করেন এবং পৃথিবীতে আবির্ভূত অসুরদের বিরোধিতা করেন। হে পরমেশ্বর ভগবান, যতকাল পর্যন্ত এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব থাকবে এবং যতকাল পর্যন্ত সূর্য কিরণ দান করবে, ততকাল পর্যন্ত আপনার প্রতি আমি প্রণাম নিবেদন করব।”
“শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে তাঁর স্তুতি নিবেদন করে, ব্রহ্মা তাঁর পরম আরাধ্য, অনন্ত পরমেশ্বর ভগবানকে তিনবার প্রদক্ষিণ করলেন এবং নতজানু হয়ে তাঁর পাদপদ্মে প্রণাম নিবেদন করলেন। ব্রহ্মাণ্ডের পদে নিয়োজিত সৃষ্টিকর্তা তারপর তাঁর নিজ ধামে ফিরে গেলেন। পরমেশ্বর ভগবান তাঁর পুত্র ব্রহ্মাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি প্রদানের পর, এক বছর পূর্বে গোবৎসা যেখানে ছিল, সেখান থেকে তাদের নদী তটে যেখানে তিনি ভোজন করছিলেন এবং পূর্বের মতো তাঁর গোপসখারা অবস্থান করছিলেন, সেখানে নিয়ে এলেন। হে রাজন্, যদিও বালকেরা তাঁদের প্রাণেশ্বর বিহনে পুরো এক বৎসর অতিক্রান্ত করে শ্রীকৃষ্ণের মায়াশক্তিতে আচ্ছাদিত ছিলেন, তবুও তাঁরা সেই এক বৎসরকে কেবল অর্ধক্ষণ বলে মনে করেছিলেন। ভগবানের মায়া শক্তির দ্বারা যাদের মন মোহাচ্ছন্ন, বস্তুত তারা কি-ই না বিস্মৃত হতে পারে? সেই মায়াশক্তির দ্বারা সমগ্র জগৎ অবিরত মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকে এবং এই বিস্মৃতির পরিবেশে কেউই তার আত্মস্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না।”
“গোপসখারা শ্রীকৃষ্ণকে বললেন- “তুমি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছ! তোমার অনুপস্থিতিতে আমরা এমন কি এক গ্রাসও ভোজন করিনি। অনুগ্রহ করে এখানে এস এবং নিশ্চিন্তে ভোজন কর। অতঃপর ভগবান হৃষীকেশ হাস্য সহকারে তাঁর গোপসখাদের সঙ্গে ভোজন সমাপন করলেন। তাঁরা যখন বন থেকে তাঁদের আলয় ব্রজে প্রত্যাগমন করছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ গোপবালকদের মৃত সর্প অঘাসুরের চামড়াটি দেখালেন। শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত দেহ ময়ুরপুচ্ছ ও পুষ্পের দ্বারা সুশোভিত ছিল এবং বনজ ধাতুর দ্বারা রঞ্জিত ছিল, আর তাঁর বাঁশের বংশী উচ্চস্বরে ও উৎসব মুখরিত হয়ে ধ্বনি করছিল। যখনই তিনি তাঁর গোবৎসদের নাম ধরে ডাকছিলেন, তখনই তার গোপসখাগণ তাঁর মহিমা কীর্তন করে সমগ্র জগৎ পবিত্র করছিলেন। এভাবেই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পিতা নন্দ মহারাজের গোষ্ঠে প্রবেশ করলেন এবং তাঁর সৌন্দর্যের দর্শন তৎক্ষণাৎ সমস্ত গোপীনয়নের মহা উৎসব-স্বরূপ হয়েছিল। যেইমাত্র গোপবালকেরা ব্রজের গ্রামে পৌঁছলেন, তখনই তাঁরা কীর্তন করছিলেন, “আজ কৃষ্ণ একটি ভীষণ সর্পকে সংহার করে আমাদের রক্ষা করেছে!’ বালকদের কয়েকজন কৃষ্ণকে যশোদানন্দন এবং অন্যরা নন্দদুলাল রূপে বর্ণনা করছিলেন।”
পরীক্ষিৎ মহারাজ বললেন- “হে ব্রাহ্মণ, গোপ-স্ত্রীগণ নিজ পুত্রদের প্রতিও যে প্রেম আগে কখনও অনুভব করেননি, সেই অভূতপূর্ব প্রেম পরপুত্র শ্রীকৃষ্ণের প্রতি কিভাবে বিকশিত হল? দয়া করে তা বর্ণনা করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, সমস্ত জীবের কাছে অত্যন্ত প্রিয় অবশ্যই তার নিজের আত্মা। পুত্রাদি, ধনসম্পদ ইত্যাদি সেই আত্মার প্রিয় হবার ফলেই তা প্রিয়ভাজন হয়। হে রাজশ্রেষ্ঠ, এই কারণে দেহধারী জীব আত্মকেন্দ্রিক হয়- তার অধিকৃত বিষয়াদি যেমন পুত্র, ধন ও গৃহ অপেক্ষা নিজের দেহ ও আত্মায় অধিকতর অনুরক্ত হয়। হে রাজশ্রেষ্ঠ, বাস্তবিকই, যে সমস্ত ব্যক্তি মনে করে দেহ আত্মা, তাদের কাছে দেহ যেরূপ অতি প্রিয় হয়, সেভাবেই দেহ সম্পর্কিত বস্তু তত প্রিয় হয় না। যদি কোনও ব্যক্তি তাঁর দেহটিকে ‘আমি’র পরিবর্তে ‘আমার’ জ্ঞান করার স্তরে আসেন, তিনি নিশ্চিতভাবে তাঁর দেহটিকে নিজের আত্মার চেয়ে প্রিয় জ্ঞান করেন না। শেষ পর্যন্ত, দেহটি ক্রমশ বৃদ্ধ ও ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলেও, ক্রমাগত জীবিত থাকার আকাঙ্ক্ষা তাঁর সুদৃঢ় থাকে। অতএব, সমস্ত দেহধারী জীবের কাছে নিজের আত্মই অত্যন্ত প্রিয়তম হয় এবং কেবলমাত্র এই আত্মার সন্তুষ্টির জন্যই স্থাবর ও জঙ্গম জীব সমন্বিত এই নিখিল জগৎ অস্তিত্বশীল। তোমার জানা উচিত শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত জীবের মূল আত্মা। তাঁর অহৈতুকী কৃপাবশত সমগ্র জগতের মঙ্গলের জন্য তিনি সাধারণ মানুষরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির প্রভাবে তিনি এটি করেছেন। এই জগতে যাঁরা শ্রীকৃষ্ণকে যথাযথভাবে জানেন, তাঁরা স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত বস্তুকে পরম পুরুষোত্তম ভগবানের প্রকাশিত বিভিন্ন রূপের মতো দর্শন করেন। সংস্কার মুক্ত এই প্রকার ব্যক্তিরা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত অন্য বস্তুকেই স্বীকার করেন না। জড়া প্রকৃতির আদি, অব্যক্ত রূপই সমস্ত জড় বস্তুর উৎস এবং পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই সূক্ষ্ণ জড়া প্রকৃতির উৎস। তা হলে তাঁর থেকে ভিন্ন কি নিরূপিত হতে পারে? যিনি জড় জগতের আশ্রয়স্বরূপ এবং মুর দানবের শত্রু মুরারিরূপে খ্যাত, সেই ভগবানের পাদপদ্মরূপ নৌকায় যাঁরা আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, তাঁদের কাছে এই ভব-সমুদ্র গোষ্পদতুল্য। পরমপদ বৈকুন্ঠ লাভই তাঁদের লক্ষ্য। পদে পদে বিপদ-সঙ্কুল এই জড় জগৎ তাঁদের জন্য নয়। যেহেতু আপনি আমার কাছে যা জানতে চেয়েছিলেন, তাই আমি শ্রীহরির পঞ্চম বর্ষে কৃত সকল কার্যকলাপ বা পৌগণ্ডে কীর্তিত হয়েছিল, তা সম্পূর্ণরূপে আপনার নিকট বর্ণনা করলাম। অঘাসুর বধ, বনের তৃণের উপর ভোজন, ভগবানের চিন্ময় রূপের প্রকাশ এবং ব্রহ্মার দ্বারা নিবেদিত অপূর্ব স্তব- গোপসখাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ভগবান মুরারির এই সমস্ত লীলা যে ব্যক্তি শ্রবণ ও কীর্তন করেন, তিনি সমস্ত বাঞ্ছিত বস্তু লাভ করেন। এভাবেই বালকেরা লুকোচুরি খেলা, খেলার সেতু নির্মাণ, বানরের মতো লম্ফ প্রদান ইত্যাদি ক্রীড়ার মাধ্যমে বৃন্দাবন ভূমিতে তাঁদের কৌমারকাল অতিবাহিত করেছিলেন।”

Leave a Reply

July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits