ত্রয়োদশ অধ্যায়- ব্রহ্মা কর্তৃক গোপবালক এবং গোবৎস হরণ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে ভক্তশ্রেষ্ঠ, পরম ভাগ্যবান পরীক্ষিৎ, আপনি অতি উত্তম প্রশ্ন করেছেন। যেহেতু নিরন্তর ভগবানের লীলা শ্রবণ করা সত্ত্বেও আপনি তা নিত্য নতুন বলে অনুভব করছেন। জীবনের সার গ্রহণকারী পরমহংস ভক্তদের হৃদয় শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আসক্ত এবং তিনিই তাঁদের জীবনের লক্ষ্য। সর্বক্ষণ শ্রীকৃষ্ণের কথা আলোচনা করাই তাঁদের স্বভাব, যেন সেই বিষয়গুলি নিত্য নতুন। বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা যেমন নারী এবং যৌন বিষয়ের প্রতি আসক্ত, তাঁরাও তেমনই কৃষ্ণকথার প্রতি আসক্ত। হে রাজন, গভীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করুন। ভগবানের লীলা যদিও অত্যন্ত গোপনীয় এবং সাধারণ মানুষেরা তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না, তবুও আমি আপনার কাছে সেই বিষয়ে বলব, কারণ গুরুগণ অনুগত প্রিয় শিষ্যের কাছে অত্যন্ত গুহ্যতত্ত্বও বলে থাকেন। মৃত্যুস্বরূপ অঘাসুরের মুখ থেকে গোপবালক এবং গোবৎসদের রক্ষা করে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের নদীর তীরে নিয়ে এসে বলেছিলেন, ‘হে বন্ধুগণ, দেখ এই নদীর তীর মনোরম পরিবেশের প্রভাবে কি অপূর্ব সুন্দর রূপ ধারণ করেছে। আর দেখ বিকশিত পদ্মফুলগুলি কিভাবে তাদের সৌরভের দ্বারা ভ্রমর এবং পাখিদের কলরব বনরাজিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এখানকার বালুকা অত্যন্ত নির্মল এবং কোমল। তাই এটিই আমাদের খেলার সর্বোত্তম স্থান। আমরা অত্যন্ত ক্ষুধার্ত এবং অনেক বেলাও হয়ে গেছে। তাই আমার মনে হয়, এখানেই আমাদের ভোজন করা উচিত। গোবৎসরা এখানে জলপান করে কাছেই ধীরে ধীরে তৃণ ভক্ষণ করুক। শ্রীকৃষ্ণের প্রস্তাব মেনে নিয়ে, গোপবালকেরা গোবৎসদের নদী থেকে জলপান করাতে গিয়েছিলেন এবং তারপর সবুজ কোমল তৃণময় ক্ষেত্রে তাদের গাছে বেঁধে রেখেছিলেন। তারপর বালকেরা তাঁদের খাবার ঝোলা খুলে মহা আনন্দে কৃষ্ণের সঙ্গে ভোজন করতে শুরু করেছিলেন। পদ্মফুলের কর্ণিকার চারদিকে যেমন পাপড়ি এবং পাতা শোভা পায়, তেমনই বনের মধ্যে ব্রজবালকেরা শ্রীকৃষ্ণের চারদিকে বহু পঙ্‌ক্তিতে উপবিষ্ট হয়ে শোভা পাচ্ছিলেন। তাঁরা সকলেই কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এবং মনে করছিলেন কৃষ্ণ হয়ত তাঁর দিকে তাকাবেন। এইভাবে তাঁরা বনভোজনের আনন্দ উপভোগ করছিলেন। গোপবালকদের মধ্যে কেউ ফুল, কেউ পাতা, কেউ পল্লব, কেউ অঙ্কুর, কেউ ফল, কেউ শিকা, কেউ গাছের বাকল এবং কেউ বা পাথরকে তাঁদের ভোজন পাত্র কল্পনা করে তার উপর তাঁদের খাবার রেখেছিলেন। কৃষ্ণসহ গোপবালকেরা নিজ নিজ গৃহ থেকে নিয়ে আসা বিভিন্ন প্রকার অন্ন-ব্যঞ্জনের স্বাদ পৃথক পৃথক দর্শন করিয়ে এবং পরস্পরকে তা আস্বাদন করিয়ে, তাঁরা হাসতে হাসতে এবং অন্যদের হাসাতে হাসাতে ভোজন করতে লাগলেন। শ্রীকৃষ্ণ যজ্ঞভূক- অর্থাৎ, তিনি কেবল যজ্ঞের নৈবেদ্যই ভোজন করেন- কিন্তু তাঁর বাল্যলীলা প্রদর্শন করার জন্য তিনি তাঁর উদর ও বস্ত্রের মধ্যে ডানদিকে বংশী এবং বামকক্ষে শৃঙ্গ ও বেত্র, হাতে দধি মিশ্রিত অন্নগ্রাস এবং আঙ্গুলের মধ্যে উপযুক্ত ফলের টুকরা ধারণ করে পদ্মের কর্ণিকার মতো অবস্থিত হয়ে তাঁর সখাদের দিকে তাকিযে, তাঁদের সঙ্গে পরিহাসপূর্বক তাঁদের আনন্দ উৎপাদন করে ভোজন করছিলেন। তখন স্বর্গের অধিবাসীরা যজ্ঞভুক ভগবানকে তাঁর সখাদের সঙ্গে এইভাবে বনভোজন করতে দেখে, আশ্চর্যান্বিত হয়ে সেই অপূর্ব লীলা দর্শন করছিলেন।’ ”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, কৃষ্ণগতপ্রাণ গোপবালকেরা যখন এইভাবে বনভোজন করছিলেন, তখন গোবৎসগণ সবুজ ঘাসের লোভে দূরে বনের মধ্যে প্রবেশ করেছিল। শ্রীকৃষ্ণ যখন দেখলেন যে, তাঁর সখা গোপবালকেরা ভীত হয়েছেন, তখন স্বয়ং ভয়েরও ভয়ঙ্কর নিয়ন্তা তাঁদের ভয় দূর করার জন্য বলেছিলেন- ‘হে সখাগণ! তোমরা তোমাদের ভোজনের আনন্দ থেকে নিবৃত্ত হয়ো না। আমি গিয়ে তোমাদের গোবৎসদের এখানে ফিরিয়ে নিয়ে আসব। তারপর, দধিমিশ্রিত অন্ন হাতে নিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সখাদের প্রসন্নতা বিধানের জন্য পর্বতে, পর্বত-কন্দরে, কুঞ্জে এবং সংকীর্ণ স্থানে, সর্বত্র তাঁর সখাদের গোবৎসদের অন্বেষণ করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, ব্রহ্মা, যিনি পূর্বে আকাশে অবস্থানপূর্বক পরম শক্তিমান শ্রীকৃষ্ণের অঘাসুর বধ এবং তার উদ্ধারকার্য দর্শন করে অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন, এখন তিনি তাঁর নিজের ঐশ্বর্য প্রকট করে, একজন সাধারণ গোপবালকের মতো লীলাবিলাসকারী বাল্য-লীলাপরায়ণ শ্রীকৃষ্ণের মহিমা দর্শন করতে চেয়েছিলেন। তাই, শ্রীকৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে ব্রহ্মা সমস্ত গোপবালকদের এবং গোবৎসদের সেখান থেকে অন্যত্র নিয়ে যান। এইভাবে তিনি শ্রীকৃষ্ণের লীলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, কারণ অচিরেই তিনি দেখতে পাবেন শ্রীকৃষ্ণ কত শক্তিশালী। তারপর, শ্রীকৃষ্ণ গোবৎসদের দেখতে না পেয়ে নদীর তীরে ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু সেখানেও তিনি গোপবালকদের দেখতে পেলেন না। তখন তিনি সর্বত্র গোবৎস এবং গোপবালকদের অণ্বেষণ করতে লাগলেন, যেন তিনি বুঝতে পারেননি কি হয়েছে। কৃষ্ণ যখন গোবৎস এবং তাদের রক্ষক গোপবালকদের বনে কোথাও খুঁজে পেলেন না, তখন তিনি সহসা বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেটি ব্রহ্মার কার্য। তারপর ব্রহ্মা এবং গোবৎস এবং গোপবালকদের মাতাদের সন্তোষ উৎপাদনের জন্য সমগ্র জগতের স্রষ্টা শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে গোবৎস এবং গোপবালক রূপে বিস্তার করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাসুদেব রূপের দ্বারা নিজেকে অপহৃত গোপবালক এবং গোবৎসদের সংখ্যা অনুযায়ী সুকোমল অঙ্গ, হস্ত-পদ, আদি উপাঙ্গ, যষ্টি, বিষাণ, বেণু, শিক্য, তাঁদের ভূষণ, এবং অলঙ্কার, নাম, বয়স এবং রূপ এবং তাঁদের কার্যকলাপ এবং স্বভাব অনুসারে নিজেকে যুগপৎ বিস্তার করেছিলেন। এইভাবে নিজেকে বিস্তার করে পরম সুন্দর শ্রীকৃষ্ণ ‘সমগ্র জগৎ বিষ্ণুময়’ এই উক্তির সত্যতা প্রমাণ করেছিলেন। এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ সেই সমস্ত গোবৎস এবং গোপবালক রূপে অবিকলভাবে নিজেকে বিস্তার করেছিলেন এবং স্বয়ং তাঁদের নেতারূপে প্রতীয়মান হয়ে, অন্যান্য দিনের মতো তাঁদের সঙ্গসুখ উপভোগ করতে করতে তাঁর পিতা নন্দ মহারাজের স্থান ব্রজভূমিতে প্রবেশ করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, তখন শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে বিভিন্ন গোবৎস এবং গোপবালক রূপে বিভক্ত করে যথানির্দিষ্ট গোশালায় গোবৎসরূপে এবং বিভিন্ন গৃহে বিভিন্ন বালকরূপে প্রবেশ করেছিলেন। গোপবালকদের জননীগণ তাঁদের পুত্রদের বংশী এবং বিষাণের ধ্বনি শ্রবণ করে, তৎক্ষণাৎ তাঁদের গৃহস্থালির কার্য থেকে উত্থিত হয়ে তাঁদের পুত্রদের কোলে তুলে নিয়েছিলেন এবং দুহাত দিয়ে আলিঙ্গন করে, কৃষ্ণের প্রতি গভীর প্রেমে ক্ষরিত স্তনদুগ্ধ পান করিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণই সব কিছু, কিন্তু তখন গভীর প্রেম এবং স্নেহ ব্যক্ত করে তাঁরা পরমব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণকে দুধ পান করাবার বিশেষ আনন্দ অনুভব করেছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মাতাদের স্তনদুগ্ধ পান করেছিলেন যেন তা ছিল অমৃত। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, তারপর যে যে সময় যে যে লীলা তা সমাধানপূর্বক শ্রীকৃষ্ণ সন্ধ্যাবেলা ব্রজে প্রত্যাবর্তন করে, প্রতিটি গোপবালকের গৃহে প্রবেশ করেছিলেন এবং ঠিক পূর্বের বালকটির মতো আচরণ করেছিলেন। এইভাবে তিনি তাঁদের মাতাদের আনন্দ প্রদান করেছিলেন। মায়েরা তৈলমর্দন, স্নান, চন্দন আদি লেপন, অলঙ্কার, রক্ষামন্ত্র উচ্চারণ, তিলক, ভোজন প্রভৃতির দ্বারা তাদের পালন করেছিলেন। এইভাবে মাযেরা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেছিলেন। তারপর, সমস্ত গাভীগণ গোশালায় উপনীত হয়ে উচ্চ হাম্বা রবে তাঁদের নিজ নিজ বৎসদের আহ্বান করত। বৎসগণ তাদের কাছে এরে, তাদের মায়েরা বার বার তাদের দেহ লেহন করত এবং তাদের স্তন থেকে ক্ষরিত দুধ প্রচার পরিমাণে তাদের পান করাত।”
“পূর্বে, শুরু থেকেই গোপীদের শ্রীকৃষ্ণের প্রতি মাতৃস্নেহ বর্তমান ছিল। বস্তুতপক্ষে কৃষ্ণের প্রতি তাঁদের স্নেহ তাঁদের নিজেদের পুত্রদের থেকেও অধিক ছিল। এইভাবে তাঁদের স্নেহ প্রদর্শনে কৃষ্ণ এবং তাঁদের পুত্রদের মধ্যে পার্থক্য ছিল, কিন্তু এখন সেই পার্থক্য দূর হয়ে গেল। ব্রজবাসী গোপ ও গোপীদের শ্রীকৃষ্ণের প্রতি পূর্বেই তাঁদের নিজেদের পুত্রদের থেকেও অধিক স্নেহ ছিল, কিন্তু এখন, এক বছর ধরে তাঁদের নিজেদের পুত্রদের প্রতি তাঁদের স্নেহ ক্রমশ বর্ধিত হয়েছিল, কারণ শ্রীকৃষ্ণ এখন তাঁদের পুত্র হয়েছেন। তাঁদের পুত্ররূপী কৃষ্ণের প্রতি তাঁদের স্নেহ অপরিমিতভাবে বৃদ্ধি লাভ করেছিল। প্রতিদিন তাঁদের পুত্রদের প্রতি তাঁরা নব নব স্নেহের অনুপ্রেরণা লাভ করতেন, ঠিক যেভাবে তাঁরা শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসতেন। এইভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোপবালক এবং গোবৎসরূপে নিজেকে বিস্তার করে নিজেই নিজেকে পালন করেছিলেন। এইভাবে তিনি বৃন্দাবনের বনে এবং গোষ্ঠে এক বছর ধরে লীলাবিলাস করেছিলেন।”
“এইভাবে বছর পূর্ণ হওয়ার পাঁচ-ছয় রাত্রি পূর্বে, একদিন বলরাম সহ শ্রীকৃষ্ণ গোচারণ করতে করতে বনে প্রবেশ করেছিলেন। তারপর, গোবর্ধন পর্বতের উপরে তৃণভক্ষণ করতে করতে গাভীগণ সবুজ ঘাসের অণ্বেষণে যখন নীচের দিকে তাকিয়েছিল, তখন তারা ব্রজের অনতিদূরে বিচরণশীল বৎসদের দেখতে পেয়েছিল। গাভীগণ যখন গোবর্ধন পর্বতের উপর থেকে তাদের বৎসদের দর্শন করেছিল, তখন বৎসদের প্রতি বর্ধিত স্নেহবশত তারা আত্মবিস্মৃত হয়েছিল এবং তাদের পালকদের অতিক্রম করে সেই পথ অত্যন্ত দুর্গম হলেও পদযুগল একত্র করে হুঙ্কার করতে করতে তাদের বৎসদের প্রতি ধাবিত হয়েছিল। তাদের স্তন থেকে তখন দুধ ক্ষরিত হচ্ছিল, তাদের মস্তক এবং পুচ্ছ উন্নত হয়েছিল এবং তাদের গ্রীবার সঙ্গে কুকুদ আন্দোলিত হচ্ছিল। এইভাবে তারা অতি বেগে তাদের বৎসদের দুধপান করাবার জন্য ছুটে গিয়েছিল। গাভীরা যদিও পুনরায় সন্তান প্রসব করেছিল, তবুও পূর্ব বৎসদের প্রতি স্নেহাধিক্যবশত গোবর্ধন পর্বত থেকে ছুটে এসে তারা স্তন থেকে ক্ষরিত দুধ তাদের পান করিয়েছিল এবং এমনভাবে তাদের দেহ লেহন করছিল, যেন মনে হচ্ছিল যে তারা তাদের গিলে ফেলতে চাইছে। গোপেরা গোবৎসদের কাছে যাওয়ার সময় গাভীদের গতি রোধ করতে অক্ষম হওয়ার ফলে লজ্জিত এবং ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁরা অতিকষ্টে সেই দুর্গম পথ অতিক্রম করে, সেখানে পৌছে গোবৎসদের সঙ্গে তাঁদের পুত্রদের দেখতে পেয়েছিলেন এবং গভীর স্নেহে অভিভূত হয়েছিলেন। তখন গোপেরা তাদের পুত্রদের দর্শন করে বাৎসল্য প্রেমে আপ্লুত হয়েছিলেন। তাদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করায়, তখন তাঁদের ক্রোধ সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা তাঁদের পুত্রদের কোলে তুলে নিয়ে, বাহুর দ্বারা আলিঙ্গনপূর্বক মস্তক আঘ্রাণ করে পরম আনন্দ লাভ করেছিলেন। বয়স্ক গোপেরা তাঁদের পুত্রদের আলিঙ্গন করে গভীর আনন্দ অনুভব করার পর, অতি কষ্টে ক্রমশ আলিঙ্গন থেকে নিবৃত্ত হয়ে গোচারণে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের পুত্রদের কথা স্মরণ করে তাঁদের নয়ন অশ্রুপূর্ণ হয়েছিল। বয়সাধিক্যের ফলে স্তনপান থেকে বিরত বৎসদের প্রতি গাভীদের এই প্রকার নিরন্তর স্নেহাধ্যিক্য দর্শন করে, বলরাম তার কারণ জানতে না পেরে, এইভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। কি আশ্চর্যের বিষয়? এই সমস্ত গোপবালক এবং গোবৎসদের প্রতি সমস্ত ব্রজবাসীদের, এমনকি আমারও অনুরাগ অপূর্বভাবে বর্ধিত হচ্ছে, ঠিক যেমন সমস্ত জীবেরা পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আমাদের প্রেম বর্ধিত হয়। এই মায়া কি প্রকার? তা কি দেবী, মানবী না আসুরী? তা কোথা থেকেই বা এল? তা নিশ্চয়ই আমার প্রভু কৃষ্ণরই মায়া। তা না হলে তা আমাকে মোহাচ্ছন্ন করল কি করে? এইভাবে চিন্তা করে বলরাম জ্ঞানচক্ষুর দ্বারা দেখতে পেলেন যে, সমস্ত গোবৎস এবং কৃষ্ণের সখারা শ্রীকৃষ্ণরূপেই প্রকাশ পাচ্ছেন। শ্রীবলদেব বলেছিলেন, ‘হে পরমেশ্বর! আমি পূর্বে মনে করেছিলাম যে, এই সমস্ত বালকেরা শ্রেষ্ঠ দেবতা এবং এই সমস্ত গোবৎসরা নারদ আদি মহির্ষ, কিন্তু এখন আমি দেখতে পাচ্ছির যে, প্রকৃতপক্ষে আমার এই ধারণা সত্য নয়। পরন্তু পৃথকরূপে প্রতীয়মান এদের মধ্যে তোমাকেই প্রকাশিত দেখছি। এক এবং অদ্বিতীয় হওয়া সত্ত্বেও তুমিই গোবৎস এবং বালকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন রূপে বিরাজমান। এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করে সমস্ত কথা তুমি আমার কাছে সংক্ষেপে প্রকাশ কর।’ বলদেব এইভাবে অনুরোধ করলে শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত বৃত্তান্ত তাঁকে বলেছিলেন এবং বলদেব তখন তা বুঝতে পেরেছিলেন।”
“ব্রহ্মা যখন (তাঁর গণনা অনুসারে) এক ত্রুটিমাত্র কাল পরে ফিরে এলেন, তখন তিনি দেখলেন যে, যদিও মানুষের গণনা অনুসারে এক বছর অতীত হয়েছে, তবুও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঠিক পূর্বের মতো তাঁর অংশরূপী বালক ও গোবৎসদের সঙ্গে খেলা করছেন। ব্রহ্মা চিন্তা করতে লাগলেন- গোকুলে যত বালক এবং গোবৎস ছিল, আমি তাদের আমার মায়াশয্যায় শায়িত রেখেছি এবং তারা আজ পর্যন্ত জেগে ওঠেনি। সমসংখ্যক বালক এবং গোবৎস এক বছর ধরে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে খেলা করছে, তবুও তারা আমার মায়ায় মোহিত বালকদের থেকে ভিন্ন। তারা কারা? তারা এল কোথা থেকে? এইভাবে ব্রহ্মা দীর্ঘকাল ধরে চিন্তা করেও ভিন্নভাবে বর্তমান দুই দল বালকের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারলেন না। তিনি জানতে চেষ্টা করেছিলেন কারা আসল এবং কারা নকল, কিন্তু তিনি তা বুঝতে পারলেন না। এইভাবে ব্রহ্মা যখন সর্বব্যাপী, মোহমুক্ত অথচ বিশ্বের মোহজনক ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে মোহিত করতে চেষ্টা করেছিলেন, তখন ব্রহ্মা স্বয়ং তাঁর নিজেরই মায়ার দ্বারা মোহিত হয়েছিলেন। হিমজনিত অন্ধকার যেভাবে তামসী রাত্রির অন্ধকার বিনাশ করতে পারে না এবং দিনের বেলা জোনাকির আলোর যেমন কোন মূল্যই থাকে না, তেমনই মহাপুরুষের প্রতি প্রযুক্ত নিকৃষ্ট ব্যক্তির মায়া কিছুই করতে পারে না; পক্ষান্তরে, সেই নিকৃষ্ট ব্যক্তির সামর্থ্যই কেবল নষ্ট হয়।”
“ব্রহ্মা যখন এইভাবে দেখছিলেন, তখন তাঁর সম্মুখেই সমস্ত গোবৎস এবং গোপবালকেরা জলধর শ্যামবিগ্রহ এবং পীতবর্ণ রেশমের বস্ত্র পরিহিতরূপে দৃষ্ট হলেন। তাঁরা সকলেই চতুর্ভুজ। তাঁদের চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম। তাঁদের মাথায় মুকুট, কানে কুণ্ডল, বক্ষঃস্থলে হার এবং গলদেশে বনফুলের মালা। তাঁদের দক্ষিণ বক্ষের উপরিভাগে শ্রীবৎস চিহ্ন, বাহুতে অঙ্গদ, ত্রিরেখাঙ্কিত কম্বুকন্ঠে কৌস্তুভ মণি এবং হাতে কঙ্কন। তাঁদের পায়ে পাদবলয় এবং কটিতে পবিত্র সূত্র। এইভাবে তাঁরা শোভা পাচ্ছিলেন। শ্রবণ, কীর্তন আদি পরম পবিত্র কার্যকলাপের মাধ্যমে ভগবানের আরাধনায় রত ভক্তদের দ্বারা নিবেদিত সুকোমল, নবীন তুলসী-পত্রের মালার দ্বারা তাঁদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেহের প্রতিটি অঙ্গ পূর্ণরূপে সজ্জিত ছিল। সেই বিষ্ণুমূর্তিগণ জ্যোৎস্নার মতো নির্মল হাসির দ্বারা এবং অরুণবর্ণ নেত্রের দৃষ্টিপাতের দ্বারা, যেন সত্ত্ব এবং রজোগুণের মাধ্যমে তাঁদের ভক্তদের বাসনা সৃষ্টি করছিলেন এবং পালন করছিলেন। চতুর্মুখ ব্রহ্মা থেকে নগণ্য জীব পর্যন্ত স্থাবর এবং জঙ্গম সকলেই মূর্তিমান হয়ে, নৃত্য-গীত প্রভৃতি বিবিধ উপচারের দ্বারা তাদের ক্ষমতা অনুসারে, পৃথক পৃথকভাবে সেই সমস্ত বিষ্ণুমূর্তিদের আরাধনা করছিলেন। সেই সমস্ত বিষ্ণুমূর্তি অণিমা আদি সিদ্ধি, অজা প্রভৃতি শক্তি এবং মহত্তত্ত্ব প্রভৃতি চতুর্বিংশতি তত্ত্বের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। তখন ব্রহ্মা দেখলেন কাল, স্বভাব, সংস্কার, কাম, কর্ম এবং গুণ প্রভৃতি সর্বতোভাবে তাদের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ভগবানের শক্তির অধীন হয়ে এবং মূর্তিমান হয়ে, সেই সমস্ত বিষ্ণুমূর্তিদের উপাসনা করছিলেন। সেই সমস্ত বিষ্ণুমূর্তি সত্ত্ব, জ্ঞান, অনন্ত ও আনন্দময় এবং তাঁরা কালের প্রভাবের অতীত। উপনিষদ অধ্যয়নরত জ্ঞানীরা তাঁদের মাহাত্ম্য স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেন না। এইভাবে ব্রহ্মা পরব্রহ্মকে দর্শন করলেন, যাঁর শক্তির দ্বারা চরাচর সমগ্র বিশ্ব প্রকাশিত হয়েছে। তিনি তখন সমস্ত গোবৎস এবং গোপবালকদেরও ভগবানের বিস্তাররূপে দর্শন করেছিলেন। তারপর সেই সমস্ত বিষ্ণুমূর্তিদের জ্যোতির প্রভাবে ব্রহ্মার একাদশ ইন্দ্রিয় বিস্ময়ে আলোড়িত হয়েছিল এবং চিন্ময় আনন্দে স্তম্ভিত হয়েছিল। তিনি তখন বহু লোকের পূজনীয় গ্রাম্যদেবতার সম্মুখে শিশুর খেলার পুতুলের মতো মৌনভাবে অবস্থান করতে লাগলেন।”
“পরমব্রহ্ম তর্কের অগোচর, তিনি স্বয়ং প্রকাশ, আনন্দময় এবং জড়া প্রকৃতির অতীত। বেদান্তের দ্বারা অবান্তর জ্ঞান নিরস্ত হলে তাঁকে জানা যায়। যে ভগবানের মহিমা সমস্ত চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তির প্রকাশের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার দ্বারা সরস্বতীর ঈশ্বর ব্রহ্মা মোহিত হয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, “এটি কি?” এবং তারপর তিনি আর দর্শন পর্যন্ত করতে পারেননি। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মার অবস্থা বুঝতে পেরে যোগমায়ার যবনিকা উন্মোচন করেছিলেন। তখন ব্রহ্মা বাহ্যচেতনা লাভ করে, মৃত ব্যক্তির বেঁচে ওঠার মতো উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। অতি কষ্টে তাঁর চক্ষু উন্মীলিত করে, তিনি নিজেকে সহ এই ব্রহ্মাণ্ড দর্শন করেছিলেন। তারপর, চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করে ব্রহ্মা তাঁর সম্মুখে সেখানকার অধিবাসীদের জীবিকার উপায়স্বরূপ বৃক্ষে পরিপূর্ণ সর্ব ঋতুতে সমান সুখদায়ক বৃন্দাবন ধাম দর্শন করলেন। বৃন্দাবন ভগবানের চিন্ময় ধাম, যেখানে ক্ষুধা, তৃষ্ণা অথবা ক্রোধ নেই। সেখানে স্বাভাবিক শত্রুভাবাপন্ন মানুষ এবং হিংস্র পশুরা পরস্পরের প্রতি চিন্ময় বন্ধুত্ব সহকারে একত্রে বাস করে। তারপর ব্রহ্মা দেখলেন যে, অদ্বিতীয়, পূর্ণ জ্ঞানময়, অসীম পরমব্রহ্ম গোপবংশে একটি শিশুর ভূমিকা অবলম্বন করে একাকী, তাঁর হাতে অন্নগ্রাস ধারণ করে, ঠিক পূর্বের মতো সর্বত্র গোবৎস এবং তাঁর সখা গোপবালকদের অন্বেষণ করছেন। তা দর্শন করে ব্রহ্মা দ্রুত তাঁর হংসবাহন থেকে নেমে এসে, স্বর্ণদণ্ডের মতো ভূমিতে পতিত হয়ে তাঁর মস্তকের চারটি মুকুটের অগ্রভাগের দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্ম স্পর্শ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণকে প্রণতি নিবেদন করে, তিনি তাঁর আনন্দাশ্রু জলে তাঁর শ্রীপাদপদ্মের অভিষেক করেছিলেন। দীর্ঘকাল বার বার শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে পতিত হয়ে এবং উঠে দাঁড়িয়ে প্রণতি নিবেদন করে, ব্রহ্মা শ্রীকৃষ্ণের মহিমা যা তিনি পূর্বে দর্শন করেছিলেন, তা বার বার স্মরণ করতে লাগলেন। তখন ধীরে ধীরে উঠে তাঁর চোখ দুটি মুছে ব্রহ্মা মুকুন্দকে দর্শন করেছিলেন। তারপর অবনত মস্তকে, একাগ্রচিত্তে, কম্পিত কলেবরে, গদ্‌গদ স্বরে এবং অত্যন্ত বিনীতভাবে ব্রহ্মা তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বন্দনা করতে শুরু করেছিলেন।”

Leave a Reply

June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

Blog Stats

  • 140,959 hits