দ্বাদশ অধ্যায়- অঘাসুর বধ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, একদিন শ্রীকৃষ্ণ বনে প্রাতঃভোজন করার মনস্থ করেছিলেন। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি তাঁর শৃঙ্গধ্বনির দ্বারা সমস্ত গোপবালক এবং গোবৎসদের নিদ্রাভঙ্গ করেছিলেন। তারপর কৃষ্ণ এবং গোপবালকেরা তাঁদের বৎসদের সামনে নিয়ে ব্রজভূমি থেকে বনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। তখন শত-সহস্র গোপবালকেরা তাঁদের শত-সহস্র গোবৎসদের সামনে নিয়ে ব্রজভূমিতে তাঁদের গৃহ থেকে মহানন্দে বেরিয়ে এসে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। সেই বালকেরা ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর এবং তাঁরা সকলেই খাবারের ঝোলা, শিঙা, বেণু এবং গোবৎস তাড়নের যষ্টি ধারণ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ গোপবালক এবং তাঁদের গোবৎসগণ সহ বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তখন অসংখ্য গোবৎস একত্রিত হয়েছিল। তারপর সমস্ত গোপবালকেরা আনন্দে মত্ত হয়ে সেই বনে খেলা করতে শুরু করেছিলেন। যদিও সেই সমস্ত বালকদের মায়েরা তাঁদের কাচ, গুঞ্জা, মুক্তা এবং স্বর্ণ অলঙ্কারের দ্বারা সাজিয়ে দিয়েছিলেন, তবুও তাঁরা যখন বনে গিয়েছিলেন, তখন তাঁরা ফল, সবুজ পাতা, ফুলের স্তবক, ময়ূরপুচ্ছ এবং কোমল রঙিন ধাতুর দ্বারা নিজেদের আরও অলঙ্কৃত করেছিলেন। গোপবালকেরা পরস্পরের খাবারের ঝোলা চুরি করতেন। কোন বালক যখন বুঝতে পারতেন যে, তাঁর ঝোলাটি কেউ চুরি করে নিয়েছে, তখন অন্য বালকেরা সেটি দূরে ছুঁড়ে দিতেন এবং সেখানে যে সমস্ত বালকেরা ছিল, তাঁরা তা নিয়ে আরও দূরে ছুঁড়ে দিতেন। যাঁর ঝোলা তিনি যখন কাঁদতেন, তখন অন্য বালকেরা হাসতে হাসতে তাঁকে তা ফিরিয়ে দিতেন। কৃষ্ণ যদি কখনও বনের শোভা দর্শন করার জন্য দূরে চলে যেতেন, তখন বালকেরা ‘আমি ছুটে গিয়ে প্রথমে কৃষ্ণকে স্পর্শ করব! আমি কৃষ্ণকে প্রথমে স্পর্শ করব!’ বলে ছুটে গিয়ে কৃষ্ণকে স্পর্শ করে আনন্দ লাভ করতেন। এই সমস্ত বালকেরা বিভিন্নভাবে খেলা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ বাঁশি বাজাতেন, কেউ শিঙাধ্বনি করতেন, কেউ ভ্রমরের গুঞ্জনের অনুকরণ করতেন, অন্য কেউ কোকিলের কূজনের অনুকরণ করতেন। কেউ মাটিতে উড়ন্ত পাখির ছায়ার পিছনে ধাবিত হয়ে পাখির ওড়ার অনুকরণ করতেন, কেউ হংসের মনোহর গতির অনুকরণ করতেন। কেউ বকের অনুকরণে তাদের সঙ্গে চুপচাপ বসে থাকতেন এবং অন্য কেউ ময়ূরের নৃত্যের অনুকরণ করতেন। কোন কোন বালক বৃক্ষস্থ বানর-শিশুদের আকর্ষণ করতেন, কেউ-বা তাদের সঙ্গে বৃক্ষে আরোহণ করে মুখভঙ্গি করতেন এবং অন্য কেউ এক শাখা থেকে অন্য শাখায় লাফ দিতেন। কোন বালক ঝরনায় গিয়ে ব্যাঙের সঙ্গে লাফ দিয়ে জলপ্রবাহ লঙ্ঘন করতেন এবং জলে তাঁদের প্রতিবিম্বের প্রতি উপহাস করতেন। তাঁরা তাঁদের প্রতিধ্বনির প্রতি ভর্ৎসনাও করতেন। এইভাবে সমস্ত গোপবালকেরা ব্রহ্মজ্যোতিতে লীন হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষী জ্ঞানীদের কাছে ব্রহ্মানন্দের উৎসস্বরূপ দাস্যভাবাপন্ন ভক্তদের পরম প্রভু এবং মায়াশ্রিত ব্যক্তিদের কাছে এক সাধারণ নরশিশুরূপে প্রতীয়মান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে খেলা করতেন। সেই সমস্ত গোপবালকেরা তাঁদের জন্ম-জন্মান্তরের পুঞ্জীভূত পুণ্যকর্মের ফলে এইভাবে ভগবানের সঙ্গলাভ করার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। তাঁদের সৌভাগ্য কে বিশ্লেষণ করতে পারে? যোগীরা বহু জন্ম-জন্মান্তর ধরে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম ইত্যাদি অনুশীলনের দ্বারা কঠোর তপস্যা করে, তাঁদের চিত্ত স্থির করার সত্ত্বেও যে ভগবানের চরণরেণু লাভ করতে পারেন না, তিনি স্বয়ং ব্রজবাসীদের নেত্রগোচর হয়ে তাঁদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। সেই ব্রজবাসীদের মহাসৌভাগ্যের কথা কে বর্ণনা করতে পারে?”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, তারপর সেখানে অঘাসুর নামক এক মহাদৈত্য আবির্ভূত হয়েছিল, দেবতারা যার মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছিলেন। দেবতারা প্রতিদিন অমৃত পান করেন, কিন্তু তাঁরাও সেই মহা অসুরের ভয়ে ভীত হয়ে তার মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছিলেন। বনে গোপবালকেরা যে দিব্য আনন্দ উপভোগ করেছিলেন সেই অসুরটি তা সহ্য করতে পারেনি। কংস কর্তৃক প্রেরিত অঘাসুর ছিল পূতনা এবং বকাসুরের কনিষ্ঠ ভ্রাতা। তাই সে কৃষ্ণ প্রমুখ গোপবালকদের দর্শন করে চিন্তা করেছিল, ‘এই কৃষ্ণ আমার ভগ্নী এবং ভ্রাতা, পূতনা ও বকাসুরকে বধ করেছে। তাই তাদের উভয়ের তৃপ্তি সাধনের জন্য, আমি এই কৃষ্ণকে তার অনুচর অন্যান্য গোপবালকগণ সহ হত্যা করব।’ অঘাসুর চিন্তা করেছিল- আমি যদি কৃষ্ণ এবং তার অনুচরদের আমার পরলোকগত ভ্রাতা এবং ভগ্নীর জন্য তিল এবং উদকরূপ ব্যবহার করতে পারি, তা হলে আপনা থেকেই সমস্ত ব্রজবাসীদেরও মৃত্যু হবে, কারণ এই সমস্ত বালকেরা তাদের প্রাণতুল্য। প্রাণ না থাকলে দেহের আবশ্যকতা থাকে না; তেমনই, তাদের পুত্রদের মৃত্যু হলে স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত ব্রজবাসীদেরও মৃত্যু হবে। এইভাবে বিবেচনা করে সেই খলপ্রকৃতি অঘাসুর এক বিশাল পর্বতের মতো স্থূল এবং এক যোজন দীর্ঘ এক বিশাল অজগরের রূপ ধারণ করেছিল। সেই অদ্ভুত অজগরের রূপ ধারণ করে, সে এক বিশাল পর্বতের কাছে গুহার মতো তাঁর মুখ বিস্তার করে, কৃষ্ণ এবং তাঁর সহচর গোপবালকদের গ্রাস করার জন্য পথে শয়ন করেছিল। তার নিম্ন ওষ্ঠ পৃথিবীতে এবং উপরের ওষ্ঠ আকাশের মেঘ স্পর্শ করেছিল। তার মুখের প্রান্তভাগ ছিল বিশাল পর্বতের গুহার মতো এবং তার মুখের মধ্যভাগ অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। তার জিহ্বা বিস্তৃত পথের মতো, তার নিঃশ্বাস প্রখর উষ্ণ বায়ুর মতো এবং তার চোখ দুটি ছিল জ্বলন্ত অগ্নির মতো। সেই অসুরের বিশাল অজগরের মতো অদ্ভুত রূপ দর্শন করে বালকেরা মনে করেছিলেন যে, সেটি নিশ্চয়ই বৃন্দাবনের একটি রম্য স্থান। তারপর তাঁরা সেটির সঙ্গে এক বিশাল অজগরের মুখের সাদৃশ্য কল্পনা করেছিলেন। অর্থাৎ, বালকেরা নির্ভয়ে মনে করেছিলেন যে, এটি তাঁদের লীলা উপভোগের জন্য এক বিশাল অজগরের আকৃতি অনুসারে তৈরী একটি মূর্তি। বালকেরা বলেছিল- হে বন্ধুগণ! এটি কি মৃত, নাকি একটি জীবন্ত অজগর আমাদের গ্রাস করার জন্য মুখ বিস্তার করে রয়েছে? আমাদের এই সন্দেহ দূর কর। তারপর তাঁরা স্থির করেছিলেন- হে বন্ধুগণ! ঠিকই বলেছ, এটি নিশ্চয়ই একটি জীবন্ত প্রাণী, যে আমাদের গ্রাস করার জন্য এখানে বসে আছে। তার উপরের ওষ্ঠ সূর্যকিরণে রঞ্জিত মেঘের মতো এবং নিম্ন ওষ্ঠ সেই মেঘের রক্তিম প্রতিবিম্বের মতো। বাম এবং দক্ষিণে যে দুটি পর্বতের গুহা, সেগুলি তার মুখের প্রান্তদ্বয় এবং উচ্চ পর্বত শৃঙ্গগুলি তার দাঁত। এই পশুটির জিহ্বার দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ একটি বিস্তৃত পথের মতো এবং তার মুখগহ্বর পর্বতের গুহার মতো অতিশয় অন্ধকারাচ্ছন্ন। দাবানলের মতো উষ্ণ বায়ু তার মুখ থেকে নির্গত নিঃশ্বাস এবং সে যে-সমস্ত প্রাণীদের আহার করেছে, তাদের মৃতদেহ থেকে দগ্ধ মাংসের দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। তখন বালকেরা বলেছিলেন, ‘এই প্রাণীটি কি এখানে আমাদের গ্রাস করতে এসেছে? তাই যদি হয়ে থাকে, তা হলে সে এক্ষুণি বকাসুরের মতো নিহত হবে।’ তারপর তাঁরা বকাসুরের শত্রু শ্রীকৃষ্ণের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এবং উচ্চৈঃস্বরে হাসতে হাসতে ও করতালি দিতে দিতে তাঁরা সেই অজগরের মুখে প্রবেশ করেছিলেন।”
“সকলের হৃদয়ে অন্তর্যামীরূপে বিরাজমান ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কৃত্রিম অজগরটি সম্বন্ধে বালকদের পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে শুনেছিলেন। তাঁরা জানতেন না যে, সেটি প্রকৃতপক্ষে ছিল অঘাসুর নামক একটি অসুর, যে একটি অজগরের রূপ ধারণ করেছিল। সেই কথা জেনে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সঙ্গীদের সেই অসুরটির মুখে প্রবেশ করতে নিষেধ করতে চেয়েছিলেন। কৃষ্ণ যখন চিন্তা করেছিলেন কিভাবে গোপবালকদের অঘাসুরের মুখে প্রবেশ করা থেকে নিবৃত্ত করা যায়, ততক্ষণে তাঁরা অসুরটির মুখের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। অসুরটি কিন্তু তাঁদের গিলে ফেলেনি, কারণ সে কৃষ্ণ কর্তৃক নিহত তার আত্মীয়দের কথা চিন্তা করে, তার মুখে কৃষ্ণের প্রবেশের প্রতীক্ষা করছিল। কৃষ্ণ দেখেছিলেন যে, সমস্ত গোপবালকেরা, যাঁরা তাঁকে ছাড়া আর কিছু জানতেন না, তাঁরা তাঁর হাতের বাইরে চলে গেছেন এবং সাক্ষাৎ মৃত্যুরূপী অঘাসুরের উদরে অগ্নিতে তৃণের মতো প্রবেশ করেছেন এবং তাঁরা এখন সম্পূর্ণ অসহায়। কৃষ্ণের পক্ষে তাঁর গোপসখাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অসহনীয় ছিল। তাই তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা যেন তা আয়োজিত হয়েছে দেখে, কৃষ্ণ ক্ষণিকের জন্য বিষ্ময়ান্বিত হয়েছিলেন এবং তাঁর যে এখন কি করা কর্তব্য, তা বুঝে উঠতে পারেননি। এখন কি করা কর্তব্য? এই অসুরটির সংহার এবং ভক্তদের জীবন রক্ষা কি করে একসঙ্গে করা সম্ভব? অনন্ত শক্তিসম্পন্ন শ্রীকৃষ্ণ যুগপৎ সেই দুটি কার্য সম্পাদনের উপায় স্থির করার জন্য ক্ষণকাল অপেক্ষা করেছিলেন এবং তারপর সেই উপায় স্থির করে তিনি অঘাসুরের মুখে প্রবেশ করেছিলেন। কৃষ্ণ যখন অঘাসুরের মুখে প্রবেশ করেছিলেন, তখন মেঘের অন্তরালে দেবতারা ভয়ে হাহাকার করে উঠেছিলেন এবং অঘাসুরের বান্ধব কংস আদি অসুরেরা আনন্দিত হয়েছিল।”
“অবিনশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন মেঘের অন্তরালে দেবতাদের হাহাকার শ্রবণ করেছিলেন, তখন তিনি নিজেকে এবং তাঁর সহচর গোপবালকদের রক্ষা করার জন্য তাঁদের চূর্ণ করতে অভিলাষী অসুরটির গলার ভিতরে নিজেকে বর্ধিত করতে লাগলেন। তারপর শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শরীর বর্ধন করার ফলে, অসুরটি যদিও এক বিশাল আকৃতি ধারণ করেছিল, তবুও তার শ্বাসরুদ্ধ হয় এবং তার চোখ দুটি বেরিয়ে আসে। অসুরটির প্রাণবায়ু কিন্তু কোন নির্গমনের পথ দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারেনি এবং তাই অবশেষে অসুরটির ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে তা বেরিয়ে এসেছিল। অসুরের সমস্ত প্রাণ মস্তকের সেই ছিদ্রপথে বহির্গত হলে, শ্রীকৃষ্ণ মৃত গোবৎস এবং গোপবালকদের তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাতের দ্বারা তাঁদের পুনরায় জীবিত করেছিলেন। তারপর মুক্তিদাতা মুকুন্দ তাঁর সখা এবং বৎসগণ সহ অসুরের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। সেই বিশাল অজগরের শরীর থেকে দশ দিক উদ্ভাসিত করে এক মহাজ্যোতি নির্গত হযে, মৃত সর্পটির মুখ থেকে শ্রীকৃষ্ণের বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত আকশে অবস্থান করছিল। তারপর শ্রীকৃষ্ণ বেরিয়ে এলে, দেবতাদের সম্মুখে সেই জ্যোতি কৃষ্ণের শরীরে প্রবেশ করেছিল। তারপর, সকলে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে, দেবতারা নন্দনকানন জাত পুষ্প বর্ষণ করতে শুরু করেছিলেন, স্বর্গের অপ্সরারা নৃত্য করতে শুরু করেছিলেন এবং গন্ধর্বেরা সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রার্থনা নিবেদন করতে শুরু করেছিলেন। বাদকেরা দুন্দুভি বাজাতে শুরু করেছিলেন এবং ব্রাহ্মণেরা বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে স্তব করেছিলেন। এইভাবে, স্বর্গ এবং পৃথিবী উভয় স্থানে সকলেই তাঁদের নিজ নিজ কার্য অনুষ্ঠান করে শ্রীকৃষ্ণের মহিমা কীর্তন করেছিলেন। ব্রহ্মা যখন তাঁর ধামের নিকটে সঙ্গীত, বাদ্য এবং জয়ধ্বনি সহকারে সেই উৎসবের ধ্বনি শ্রবণ করেছিলেন, তখন তিনি সেই উৎসব দর্শন করতে সত্বর সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই প্রকার মহিমা দর্শন করে তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, অঘাসুরের অজগররূপী শরীরটি শুকিয়ে গিয়ে কেবল একটি বিশাল চর্মরূপে বৃন্দাবনে ব্রজবাসীদের একটি দর্শনীয় স্থানরূপে দীর্ঘকাল সেখানে ছিল। শ্রীকৃষ্ণের নিজেকে এবং তাঁর সহচরদের মৃত্যুমুখ থেকে উদ্ধার এবং মহাসর্পরূপী অঘাসুর মোচনের সেই ঘটনাটি ঘটেছিল, যখন কৃষ্ণের বয়স ছিল পাঁচ বছর। ব্রজভূমিতে সেই ঘটনাটি এক বছর পরে, যেন সেই দিনই ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রকাশ করা হয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণ সর্ব কারণের পরম কারণ। জড় জগতের কার্য এবং কারণ, উচ্চ ও নীচ, সব কিছুই পরম নিয়ন্তা ভগবানেরই দ্বারা সৃজিত। শ্রীকৃষ্ণ যখন নন্দ মহারাজ এবং মা যশোদার পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তা তিনি তাঁর অহৈতুকী কৃপাবশতই করেছিলেন। তাই তাঁর পক্ষে তাঁর অনন্ত ঐশ্বর্য প্রদর্শন করা মোটেই আশ্চর্যজনক নয়। বস্তুতপক্ষে, তিনি এমনই মহাকৃপা প্রদর্শন করেছিলেন যে, মহাপাপী অঘাসুরও সারূপ্য-মুক্তি লাভ করে তাঁর পার্ষদত্ব লাভ করেছিল, যা জড় জগতের পাপপরায়ণ ব্যক্তিদের পক্ষে লাভ করা প্রকৃতপক্ষে অসম্ভব। কেউ যদি কেবল একবার মাত্র অথবা বলপূর্বক ভগবানের অঙ্গপ্রতিমা মনের মধ্যে স্থাপন করেন, তা হলে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় তিনি পরম গতি প্রাপ্ত হন, যা অঘাসুরের হয়েছিল। তা হলে, যিনি সমস্ত জীবের চিন্ময় আনন্দের উৎস এবং যাঁর প্রভাবে মায়া সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়, সেই স্বয়ং অবতারী ভগবান স্বয়ং যাঁদের অন্তরে প্রবিষ্ট হন, অথবা যাঁরা সর্বদা তাঁর শ্রীপাদপদ্মের চিন্তা করেন, তাঁদের সম্বন্ধে আর কি বলার আছে?”
শ্রীল সূত গোস্বামী বললেন- “হে তত্ত্বজ্ঞানী ঋষিগণ, শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা অত্যন্ত অদ্ভুত। তাঁর মাতৃগর্ভে অবস্থান কালে যিনি তাঁকে রক্ষা করেছিলেন, সেই শ্রীকৃষ্ণের এই সমস্ত লীলা শ্রবণ করে পরীক্ষিৎ মহারাজের চিত্ত স্থির হয়েছিল এবং তিনি পুনরায় শুকদেব গোস্বামীর কাছে সেই সমস্ত পুণ্য লীলা সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করলেন- “হে মহর্ষি, অতীতে যা ঘটেছিল তা বর্তমানে ঘটেছে বলে বর্ণনা করা হল কেন? শ্রীকৃষ্ণ কৌমার অবস্থায় অঘাসুর বধের লীলাবিলাস করেছিলেন। তা হলে তাঁর পৌগণ্ড অবস্থায় সেই ঘটনাটি সম্প্রতি ঘটেছে বলে বালকেরা বর্ণনা করলেন কেন? হে মহাযোগী, গুরুদেব, আপনি দয়া করে বলুন কেন তা হয়েছিল। আমি তা জানতে অত্যন্ত উৎসুক। আমার মনে হয় এটি শ্রীকৃষ্ণের অন্য আর একটি মায়া ব্যতীত আর কিছু নয়। হে গুরুদেব, আমরা যদিও নিকৃষ্টতম ক্ষত্রিয়, তবুও আমরা ধন্য, কারণ আমরা আপনার কাছে ভগবানের পরম পবিত্র কথামৃত সর্বদা পান করার সুযোগ লাভ করেছি।”
শ্রীল সূত গোস্বামী বললেন- “হে ভগবদ্ভক্তপ্রবর শৌনক, মহারাজ পরীক্ষিৎ শ্রীল শুকদেব গোস্বামীকে এইভাবে প্রশ্ন করলে, শুকদেব গোস্বামীর হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ হওয়ায় তাঁর সমস্ত বাহ্যেন্দ্রিয়ের বৃত্তি অপহৃত হয়েছিল। তিনি অতি কষ্টে বাহ্যজ্ঞান লাভ করে মহারাজ পরীক্ষিতের কাছে কৃষ্ণকথা বলতে শুরু করলেন।”

Leave a Reply

June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

Blog Stats

  • 140,943 hits