শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, যমলার্জুন বৃক্ষ দুটি পতিত হলে, নন্দ মহারাজ আদি গোপেরা সেই ভয়ঙ্কর শব্দ শুনে বজ্রপাত হয়েছে বলে আশঙ্কা করে সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁরা সেখানে এসে ভূতলে পতিত অর্জুন বৃক্ষ দুটি দেখতে পেলেন। যদিও তাঁরা দেখতে পেরেছিলেন যে, বৃক্ষ দুটি নিপতিত হয়েছে, কিন্তু বিভ্রান্ত হওয়ার ফলে, তাঁরা বৃক্ষ দুটির পতনের কারণ নির্ণয় করতে পারলেন না। শ্রীকৃষ্ণ রজ্জুর দ্বারা আবদ্ধ হয়ে উদূখল আকর্ষণ করেছিলেন। কিন্তু সে বৃক্ষ দুটি উৎপাটন করল কি করে? প্রকৃতপক্ষে কে সেটি করেছে? এই ঘটনার সূত্রটি কোথায়? এই সমস্ত আশ্চর্যজনক বিষয় চিন্তা করে গোপেরা উদ্বিগ্ন এবং বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। তখন সমস্ত গোপবালকেরা বলেছিল- কৃষ্ণই তা করেছে। সে যখন দুটি বৃক্ষের মাঝখানে যায়, তখন উদূখলটি বক্রভাবে তাদের মাঝখানে আটকে যায় এবং শ্রীকৃষ্ণ সেই উদূখলটি আকর্ষণ করায় বৃক্ষ দুটি পতিত হয়। তারপর দুজন অতি সুন্দর পুরুষ সেই বৃক্ষ দুটি থেকে বেরিয়ে আসে। আমরা স্বচক্ষে তা দর্শন করেছি।”
“গভীর বাৎসল্য প্রেমের ফলে, নন্দ মহারাজ প্রমুখ গোপেরা বিশ্বাস করতে পারেননি যে, শ্রীকৃষ্ণ এত আশ্চর্যজনকভাবে বৃক্ষ দুটি উৎপাটন করেছিলেন। তাই তাঁরা বালকদের কথায় বিশ্বাস করতে পারেননি। তাঁদের মধ্যে কারও কারও মনে কিন্তু সন্দেহ হয়েছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন, ‘যেহেতু ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, কৃষ্ণ নারায়ণের সমতুল্য হবে, তাই সে এই কার্য করেও থাকতে পারে।’ নন্দ মহারাজ তাঁর পুত্রকে রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় উদূখল আকর্ষণ করতে দেখে হাসি মুখে তাঁকে বন্ধন মুক্ত করেছিলেন। গোপীরা বলতেন, ‘কৃষ্ণ, তুমি যদি নাচ, তা হলে আমরা তোমাকে এই লাড্ডুটি দেব।’ এই প্রকার বাক্যের দ্বারা অথবা করতালির দ্বারা তারা নানাভাবে কৃষ্ণকে উৎসাহিত করতেন। তিনি সর্বশক্তিমান ভগবান হওয়া সত্ত্বেও হাসতে হাসতে তাঁদের ইচ্ছামতো নাচতেন, যেন তিনি ছিলেন তাঁদের হাতের পুতুল। কখনও কখনও তাঁদের অনুরোধে তিনি উচ্চৈঃস্বরে গান করতেন। এইভাবে কৃষ্ণ সর্বতোভাবে গোপীদের বশীভূত ছিলেন। কখনও কখনও মা যশোদা এবং তাঁরা সখীরা কৃষ্ণকে বলতেন, ‘এটা নিয়ে এস’ অথবা ‘ওটা নিয়ে এস।’ কখনও কখনও তাঁরা তাঁকে কাঠের পিঁড়ি, পাদুকা অথবা ধান মাপার কাঠের পাত্র নিয়ে আসতে বলতেন। মায়ের দ্বারা আদিষ্ট হয়ে কৃষ্ণ তা আনার চেষ্টা করতেন। কখনও কখনও তিনি যেন তা ওঠাতে অক্ষম, এইভাবে তিনি তা ছুঁয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কখনও আবার তাঁর আত্মীয়বর্গের হর্ষ উৎপাদন করার জন্য তাঁর হাত তুলে বিক্রম প্রকাশ করতেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভৃত্যদের দ্বারা কিভাবে বশীভূত হন, তা তাঁর কার্যকলাপ হৃদয়ঙ্গমে সক্ষম জগতে তাঁর শুদ্ধ ভক্তদের নিকট প্রদর্শন করেছিলেন। এইভাবে তিনি তাঁর বালকোচিত কার্যকলাপের দ্বারা ব্রজবাসীদের আনন্দ বর্ধন করেছিলেন।”
“একসময় এক ফল বিক্রয়িণী ‘হে ব্রজবাসীগণ, তোমরা যদি ফল কিনতে চাও, তা হলে এখানে এস!’ বলে ফল বিক্রয় করছিল, তখন সর্বফল প্রদাতা শ্রীকৃষ্ণ ফল লাভের উদ্দেশ্যে কিছু ধান নিয়ে তার বিনিময়ে ফল গ্রহণের আশায় সেখানে গিয়েছিলেন। দ্রুতবেগে ছুটে যাওয়ার সময় শ্রীকৃষ্ণের হাত থেকে প্রায় সমস্ত ধান পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই ফল বিক্রয়িণী কৃষ্ণের দু হাত ভরে ফল দিয়েছিল এবং তার ফলে তার ফলের ঝুড়িটি তৎক্ষণাৎ মণি-মাণিক্যে পূর্ণ হয়েছিল।”
“যমলার্জুন বৃক্ষ উৎপাটনের পর, একদিন রোহিণীদেবী নদীর তীরে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে অন্যান্য বালকদের সঙ্গে ক্রীড়ারত কৃষ্ণ এবং বলরামকে ডাকতে গিয়েছিলেন। অন্যান্য বালকদের সঙ্গে খেলায় অত্যন্ত আসক্ত হওয়ার ফলে, রোহিনীদেবীর আহ্বানে কৃষ্ণ এবং বলরাম ঘরে ফিরে এলেন না। তাই রোহিণীদেবী মা যশোদাকে পাঠিয়েছিলেন তাঁদের ডেকে আনতে, কারণ মা যশোদা কৃষ্ণ-বলরামের প্রতি অধিক স্নেহশীলা ছিলেন। কৃষ্ণ এবং বলরাম তাঁদের খেলায় এত আসক্ত ছিলেন যে, অনেক বেলা হয়ে গেলেও তাঁরা তাঁদের খেলার সাথীদের সঙ্গে খেলেছিলেন। তাই মা যশোদা তাঁদের খাওয়ার জন্য ডেকেছিলেন। কৃষ্ণ এবং বলরামের প্রতি তাঁর বাৎসল্য স্নেহবশত তাঁর স্তন থেকে দুগ্ধ ক্ষরিত হচ্ছিল। মা যশোদা বললেন- হে বৎস কৃষ্ণ, হে কমলনয়ন, তুমি এখন অঅমার কাছে এসে স্তন পান কর। হে বৎস, তুমি নিশ্চয়ই এখন ক্ষুধায় অত্যন্ত কাতর হয়েছ এবং এতক্ষণ ধরে খেলার ফলে শ্রান্ত হয়েছে। আর এখন খেলার প্রয়োজন নেই। হে কুলনন্দন, বৎস বলদেব, তোমার ছোট ভাই কৃষ্ণসহ শ্রীঘ্র এখানে এস। তোমরা সেই সকালবেলায় ভোজন করেছ, অতএব এখন তোমাদের ভোজন করা উচিত। হে বৎস বলরাম, নন্দ মহারাজ ভোজন অভিলাষী হয়ে তোমাদের জন্য প্রতীক্ষা করছেন। অতএব তোমাদের আনন্দ বিধানের জন্য এখানে এস। কৃষ্ণ এবং তোমার সঙ্গে যে সমস্ত ছেলেরা খেলা করছে, তারাও এখন তাদের ঘরে ফিরে যাক।”
“মা যশোদা কৃষ্ণকে বললেন- হে বৎস, সারাদিন খেলা করার ফলে তোমার শরীর ধুলায় মলিন হয়েছে, অতএব এখন এস, স্নান করে পরিষ্কার হবে। আজ তোমার জন্মনক্ষত্র। তাই পবিত্র হয়ে ব্রাহ্মণদের গাভী দান কর। দেখ দেখ, তোমাদের সমবয়সী খেলার সাথীরা তাদের মায়েদের দ্বারা পরিমার্জিত হয়ে সুন্দর অলঙ্কারে বিভূষিত হয়েছে। তোমরাও এখন স্নান এবং আহার করে অলঙ্কারের দ্বারা ভূষিত হও। তারপর তোমরা আবার তোমাদের বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পার। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, মা যশোদা গভীর স্নেহের ফলে সমস্ত ঐশ্বর্যের চূড়ামণি শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর পুত্র বলে মনে করেছিলেন। তার ফলে তিনি বলরাম সহ তাঁর হাত ধরে তাঁকে গৃহে নিয়ে এসেছিলেন এবং তারপর তাঁদের স্নান, প্রসাধন এবং ভোজন করিয়েছিলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তারপর একসময় বৃহদ্বনে মহা উৎপাত হচ্ছে দেখে নন্দ মহারাজ প্রমুখ বৃদ্ধ গোপগণ সকলে মিলিত হয়ে বিবেচনা করেছিলেন, ব্রজে যে বার বার উপদ্রব হচ্ছে তা বন্ধ করার জন্য কি করা কর্তব্য। গোকুলের সেই সভায় দেশ, কাল ও অর্থতত্ত্বে অভিজ্ঞ এবং জ্ঞানে ও বয়সে সব চাইতে প্রবীণ উপানন্দ নামক গোপ রাম এবং কৃষ্ণের মঙ্গলের জন্য এই প্রস্তাবটি করেছিলেন- হে গোপগণ, গোকুলের হিতসাধন করার জন্য আমাদের এই স্থান ত্যাগ করা উচিত। কারণ রাম, কৃষ্ণ প্রভৃতি বালকদের প্রাণ বিনাশক নানা প্রকার মহা উৎপাত এখানে সর্বদা ঘটছে। বালক কৃষ্ণ কেবল ভগবানেরই কৃপায়, তাকে হত্যা করতে বদ্ধপরিকর পূতনা রাক্ষসীর হাত থেকে কোন না কোনভাবে রক্ষা পেয়েছিল। তারপর, পুনরায় ভগবানেরই কৃপায় শকটটি তার উপর পড়েনি। তারপর ঘূর্ণিঝড়রূপী তৃণাবর্ত নামক দৈত্য তাকে হত্যা করার জন্য ভয়ঙ্করভাবে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু সেখান থেকে দৈত্যটি শিলার উপর পতিত হয়, সেই ক্ষেত্রেও ভগবান শ্রীবিষ্ণু বা তাঁর পার্ষদেরা শিশুটিকে রক্ষা করেছিলেন। সেদিনও, বৃক্ষ দুটির পতন হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণ অথবা তার খেলার সাথীদের মৃত্যু হয়নি, যদিও তারা বৃক্ষ দুটির অতি নিকটে অথবা মাঝখানে ছিল। সেটিও ভগবানেরই কৃপা বলে মনে করতে হবে। এই সমস্ত উপদ্রব কোন অজ্ঞাত অসুরের দ্বারা হচ্ছে। অন্য কোন উৎপাত করতে আসার পূর্বেই আমাদের কর্তব্য এই সমস্ত বালকদের নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়া, যেখানে এই ধরনের কোন উৎপাত হবে না। নন্দীশ্বর এবং মহাবনের মাঝখানে বৃন্দাবন নামক একটি স্থান রয়েছে। এই স্থানটি অত্যন্ত উপযুক্ত, কারণ সেখানে গাভী আদি পশুদের জন্য সুন্দর সবুজ ঘাস, লতা এবং গুল্ম রয়েছে। সেখানে অত্যন্ত সুন্দর কানন এবং উঁচু পর্বত রয়েছে এবং সেই স্থানটি গোপ, গোপী এবং আমাদের পশুদের সুখদায়ক সমস্ত সুযোগ সুবিধায় পূর্ণ। অতএব, চল, আমরা আজই, এখনই সেখানে যাই। আর বিলম্ব করার কোন প্রয়োজন নেই। তোমরা যদি আমার এই প্রস্তাবে সম্মত হও, তা হলে এখনই সমস্ত শকট প্রস্তুত করে গাভীদের পুরোভাগে নিয়ে চল এবং আমরা সেখানে গমন করি।”
“উপানন্দের সেই উপদেশ শ্রবণ করে সমস্ত গোপেরা একমত হয়ে ‘সাধু সাধু’ বলে তা সমর্থন করেছিলেন এবং তাঁদের গৃহস্থালির সমস্ত উপকরণ, পরিচ্ছদ এবং অন্যান্য সমস্ত সামগ্রী শকটে স্থাপন করে, অচিরেই বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, তখন বৃদ্ধ, বালক, রমণী এবং গৃহস্থালির সমস্ত উপকরণ শকটে স্থাপন করে এবং গাভীদের সামনে রেখে গোপেরা অতি যত্নে ধনুর্বাণ ধারণপূর্বক ভেরী এবং শৃঙ্গের শব্দে চতুর্দিক মুখরিত করে তাঁদের পুরোহিতগণ সহ যাত্রা শুরু করেছিলেন। গোপ রমণীরা সুন্দর বসনে সজ্জিত হয়ে নব কুমকুমের দ্বারা তাঁদের স্তনযুগল রঞ্জিত করে, কন্ঠদেশে পদক ধারণপূর্বক শকটে আরোহন করেছিলেন এবং গমনকালে তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের লীলা গান করছিলেন। কৃষ্ণ এবং বলরামের বিরহ সহনে অশক্ত মা যশোদা এবং রোহিণী দেবী কৃষ্ণ এবং বলরামকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের লীলা শ্রবণ করতে করতে শকটে আরোহণ করেছিলেন। এই অবস্থায় তখন তাঁদের অত্যন্ত সুন্দর দেখাচ্ছিল। এইভাবে তাঁরা সমস্ত ঋতুতে সমান সুখদায়ক বৃন্দাবন ধামে প্রবেশ করে, শকটসমূহের দ্বারা অর্ধচন্দ্রাকারে তাঁদের সাময়িক নিবাসস্থান রচনা করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, রাম এবং কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবন, গোবর্ধন এবং যমুনা নদীর তট দর্শন করেছিলেন, তখন তাঁরা উভয়েই অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। এইভাবে কৃষ্ণ এবং বলরাম ছোট্ট বালকের মতো আধো আধো স্বরে কথা বলে সমস্ত ব্রজবাসীদের দিব্য আনন্দ প্রদান করেছিলেন। যথাসময়ে তাঁরা গোবৎসদের রক্ষণাবেক্ষণ করার উপযুক্ত বয়সে পদার্পণ করেছিলেন। কৃষ্ণ এবং বলরাম তাঁদের গৃহের অদূরে নানাবিধ খেলার উপকরণ নিয়ে, অন্য গোপবালকদের সঙ্গে খেলা করেছিলেন এবং গোবৎসদের চারণ করেছিলেন। কখনও কখনও কৃষ্ণ এবং বলরাম তাঁদের বাঁশি বাজাতেন, কখনও কখনও তাঁরা গাছ থেকে ফল পাড়বার জন্য সূতায় পাথর বেঁধে তা ছুঁড়তেন, কখনও কখনও তাঁরা কেবল পাথরই ছুঁড়তেন এবং কখনও আবার তাঁদের পায়ের নূপুর বাজিয়ে বেল অথবা আমলকী আদি ফল নিয়ে পা দিয়ে তা আঘাত করে খেলতেন। কখনও কখনও তাঁরা কম্বল দিয়ে নিজেদের ঢেকে কৃত্রিম গাভী এবং বৃষরূপ ধারণ করে উচ্চৈঃস্বরে শব্দ করে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করতেন এবং কখনও আবার তাঁরা অন্যান্য পশুদের শব্দ অনুকরণ করতেন। এইভাবে তাঁরা দুটি সাধারণ নরশিশুর মতো বিহার করেছিলেন।”
“একদিন রাম এবং কৃষ্ণ যখন তাঁদের খেলার সাথীদের সঙ্গে যমুনার তীরে গোবৎস চারণ করছিলেন তখন তাঁদের বধ করার জন্য একটি অসুর সেখানে আসে। ভগবান যখন দেখলেন যে, একটি অসুর গোবৎসের রূপ ধারণ করে গোবৎসদের মধ্যে প্রবেশ করেছে, তখন তিনি বলদেবকে সেই অসুরটি দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘আর একটি অসুর এখানে এসেছে।’ তারপর তিনি ধীরে ধীরে সেই অসুরটির কাছে গিয়েছিলেন, যেন তিনি অসুরটির অভিপ্রায় কিছুই বুঝতে পারেননি। তারপর শ্রীকৃষ্ণ সেই অসুরটির পিছনের পা এবং লেজটি ধরে প্রচণ্ড বেগে অসুরটি দেহত্যাগ না করা পর্যন্ত তা ঘোরাতে থাকেন এবং তারপর তা একটি কপিত্থ বৃক্ষের উপর ছুড়ে ফেলেন। যখন সেই বিশালকায় দৈত্যের দেহের ভারে কপিত্থ বৃক্ষটি ভেঙ্গে পড়ে, তখন সেই অসুরটির দেহটিও ভূপতিত হয়। অসুরের মৃত দেহটি দর্শন করে সমস্ত গোপবালকেরা উচ্ছ্বসিতভাবে বলে উঠেছিলেন, ‘কৃষ্ণ! খুব ভাল হয়েছে! খুব ভাল হয়েছে! তোমাকে ধন্যবাদ!’ স্বর্গের দেবতারাও অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন এবং তাই তাঁরা ভগবানের উপর পুষ্প বর্ষণ করেছিলেন। সেই অসুরটিকে সংহার করার পর কৃষ্ণ এবং বলরাম তাঁদের প্রাতঃরাশ সমাপ্ত করেছিলেন এবং গোবৎসদের চারণ করতে করতে ইতস্তত বিচরণ করেছিলেন। কৃষ্ণ এবং বলরাম সমস্ত জগতের পালক, কিন্তু এখন তাঁরা গোপালক রূপে গোবৎসদের পালন করেছিলেন।”
“একদিন কৃষ্ণ-বলরাম সহ সমস্ত বালকেরা তাঁদের নিজ নিজ গোবৎসদের জল পান করাবার জন্য জলাশয়ের নিকট উপস্থিত হয়ে তাদের জল পান করিয়েছিলেন এবং তারপর তাঁরা নিজেরাও জল পান করেছিলেন। বালকেরা সেই জলাশয়ের নিকটে বজ্রাঘাতে ভগ্ন গিরিশৃঙ্গ সদৃশ একটি বিশাল শরীর দর্শন করেছিলেন। এই প্রকার এক বিশাল প্রাণী দর্শন করে তাঁরা ভীত হয়েছিলেন। সেই বিশালকায় অসুরটি ছিল বকাসুর। সেই এক তীক্ষ্ণচঞ্চু বকের রূপ ধারণ করেছিল। সেখানে এসে সে সহসা শ্রীকৃষ্ণকে গ্রাস করেছিল। বলরাম এবং অন্যান্য বালকেরা যখন দেখলেন যে, বিশাল বকটি শ্রীকৃষ্ণকে গ্রাস করেছে, তখন তাঁরা প্রাণহীন ইন্দ্রিয়ের মতো প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। ব্রহ্মারও পিতা গোপাল-বালকরূপী শ্রীকৃষ্ণ অগ্নির মতো উত্তপ্ত হয়ে সেই অসুরের তালুমূল দহন করেছিলেন এবং তার ফলে সেই বকাসুর তৎক্ষণাৎ তাঁকে উদ্গীরণ করেছিল। কৃষ্ণকে গ্রাস করা সত্ত্বেও অক্ষত দেখে, সে পুনরায় তার তীক্ষ্ণ চঞ্চুর দ্বারা শ্রীকৃষ্ণকে আক্রমণ করেছিল। বৈষ্ণবদের পতি শ্রীকৃষ্ণ যখন দেখলেন যে, কংসের সখা বকাসুর পুনরায় তাঁকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছে, তখন তিনি তাঁর হাত দিয়ে সেই অসুরের চঞ্চুদ্বয় ধারণ করে সমস্ত গোপবালকদের সম্মুখে বীরণ ঘাসের মতো তাকে দ্বিধা বিভক্ত করেছিলেন। এইভাবে অসুরটিকে বধ করে শ্রীকৃষ্ণ দেবতাদেরও আনন্দ বিধান করেছিলেন। তখন স্বর্গের দেবতারা বকাসুরের শত্রু শ্রীকৃষ্ণের উপর নন্দনকানন জাত মল্লিকা পুষ্প বর্ষণ করেছিলেন এবং দুন্দুভি ও শঙ্খ বাজিয়ে তাঁর স্বত করে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তা দেখে গোপবালকেরা বিস্মিত হয়েছিলেন। প্রাণ ফিরে এলে যেমন ইন্দ্রিসমূহ মান্ত হয়, তেমনই এই বিপদ থেকে কৃষ্ণ মুক্ত হলে, বলরাম প্রভৃতি বালকেরা যেন তাঁদের প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন। তাঁরা সুস্থ চিত্তে শ্রীকৃষ্ণকে আলিঙ্গন করেছিলেন এবং তারপর তাঁদের নিজ নিজ গোবৎসদের একত্র করে তাঁরা ব্রজভূমিতে ফিরে গিয়ে, উচ্চৈঃস্বরে সেই ঘটনাটি কীর্তন করেছিলেন।”
“বনে বকাসুর বধের ঘটনা শ্রবণ করে গোপ এবং গোপীরা অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করে এবং সেই ঘটনা শ্রবণ করে তাঁদের মনে হয়েছিল যে, শ্রীকৃষ্ণ এবং অন্যান্য বালকেরা যেন মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসেছেন। তাই তাঁরা নীরব নয়নে শ্রীকৃষ্ণ এবং বালকদের দর্শন করতে লাগলেন এবং তাঁদের নিরাপদ দেখে তাঁদের থেকে চোখ ফেরাতে পারলেন না।”
“নন্দ মহারাজ আদি গোপেরা বলতে লাগলেন- এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, এই বালক শ্রীকৃষ্ণের অনেক প্রকার মৃত্যুর কারণ উপস্থিত হয়েছে, কিন্তু ভগবানের কৃপায় সেই সমস্ত ভয়ের কারণেরই মৃত্যু হয়েছে। এই সমস্ত দৈত্যরা ছিল অতন্ত ভয়ঙ্কর এবং তারা মৃত্যুর কারণ হলেও এই বালকে কৃষ্ণকে হত্যা করতে পারেনি। পক্ষান্তরে, যেহেতু তারা একটি অসহায় বালককে হত্যা করতে এসেছিল, তাই তার কাছে আসামাত্রই তারা অগ্নিতে পতঙ্গের মতো নিহত হয়েছে। ব্রহ্মতত্ত্বজ্ঞদের বাণী কখনও মিথ্যা হয় না। এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়, গর্গমুনি যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা এখন আমরা সবিস্তারে অনুভব করছি। এইভাবে নন্দ মহারাজ প্রমুখ গোপেরা পরম আনন্দে শ্রীকৃষ্ণ এবং বলরামের লীলা সম্বন্ধীয় কথা আস্বাদন করেছিলেন এবং তার ফলে তাঁরা সংসার-দুঃখ অনুভব করেননি। এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ এবং বলরাম লুকোচুরি খেলা, সেতুনির্মাণ এবং বানরের মতো লম্ফন প্রভৃতি শিশুসুলভ খেলায় রত থেকে ব্রজভূমিতে তাদের শৈশব অতিবাহিত করেছিলেন।”
একাদশ অধ্যায়- শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা
23 Jun 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়