শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “একদিন গৃহের সমস্ত পরিচারিকারা যখন অন্যান্য কাজে ব্যস্ত ছিল, তখন মা যশোদা স্বয়ং দধি মন্থন করতে শুরু করেছিলেন। দধি মন্থন করার সময় তিনি শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা স্মরণপূর্বক তাঁর সেই সমস্ত কার্যকলাপ বর্ণনা করে গান করছিলেন। যশোদাদেবী কেশর-পীত বর্ণের শাড়ি পরিধান করে, তার বিশাল নিতম্বদেশে কোমরবন্ধ বেঁধে দধিমন্থন দণ্ডের রজ্জুর আকর্ষণ করছিলেন। তখন তাঁর হাতের কঙ্কণ ও কানের কুণ্ডল দোদুল্যমান ও শব্দায়মান হয়েছিল এবং তাঁর সর্বাঙ্গ কম্পিত হচ্ছিল। পুত্রস্নেহে তাঁর স্তনযুগল দুধের দ্বারা সিক্ত হয়েছিল। তাঁর সুন্দর ভ্রূযুগল সমন্বিত মুখমণ্ডল ঘর্মাক্ত হয়েছিল এবং তাঁর কবরী থেকে মালতী ফুল ঝরে পড়ছিল। মা যশোদা যখন দধিমন্থন করছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর স্তনদুগ্ধ পান করার অভিলাষী হয়ে তাঁর কাছে এসেছিলেন এবং তাঁর আনন্দ উৎপাদন করার জন্য মন্থনদণ্ড ধারণ করে তাঁর দধিমন্থন কার্যে বাধা দিয়েছিলেন। মা যশোদা তখন কৃষ্ণকে কোলে তুলে নিয়ে তাঁর স্তনদুগ্ধ পান করতে দিয়ে স্মিত হেসে তাঁর মুখমণ্ডল দর্শন করছিলেন। গভীর স্নেহে আপনা থেকে তাঁর স্তন থেকে দুধ ক্ষরিত হচ্ছিল। কিন্তু তিনি যখন দেখেছিলেন যে, চুলার উপরে রাখা দুধের পাত্র থেকে দুধ উথলে পড়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি দুগ্ধপানে অতৃপ্ত তাঁর পুত্রকে পরিত্যাগ করে দ্রুতবেগে প্রস্থান করেছিলেন। কৃষ্ণ তখন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর অরুণবর্ণ ওষ্ঠদেশে দাঁত দিয়ে দংশনপূর্বক, কপট অশ্রুপাত করে একটি পাথরের টুকরো দিয়ে দধিমন্থনের পাত্র ভেঙ্গেছিলেন। তারপর তিনি ঘরের ভিতর গিয়ে নির্জনে সদ্যমথিত ননী খেতে শুরু করেছিলেন। মা যশোদা চুলা থেকে গরম দুধ নামিয়ে রেখে, দধিমন্থন স্থানে ফিরে এসে দেখলেন যে, দধিভাণ্ড ভগ্ন হয়েছে এবং সেখানে কৃষ্ণকে না দেখতে পেয়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেটি কৃষ্ণরই কার্য। কৃষ্ণ তখন উল্টাভাবে রাখা একটি উদূখলের উপর বসে তাঁর ইচ্ছামতো দই, ননী আদি দুগ্ধজাত দ্রব্য বানরদের বিতরণ করছিলেন। চুরি করার ফলে তাঁর মা তাঁকে তিরস্কার করতে পারেন বলে মনে করে, শঙ্কিতভাবে ইতস্তত দৃষ্টিপাত করছিলেন। মা যশোদা তখন তাঁকে এই অবস্থায় দেখে ধীরে ধীরে তাঁর পিছনে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর মাকে ছড়ি হাতে সেখানে উপস্থিত দেখলেন, তখন তিনি দ্রুতবেগে উদূখলের উপর থেকে লাফ দিয়ে নেমে এসে পলায়ন করেছিলেন, যেন তিনি অত্যন্ত ভয়ভীত হয়েছেন। যাঁকে যোগীরা কঠোর তপস্যার বলে পরমাত্মারূপে তাঁর ধ্যান করার দ্বারা ব্রহ্মে লীন হওয়ার চেষ্টা করেও তাঁকে প্রাপ্ত হয় না, মা যশোদা সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর পুত্র বলে মনে করে তাঁকে ধরার জন্য তাঁর পিছনে ধাবিত হয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের অনুধাবনকারিণী সুমধ্যমা যশোদাদেবীর গতি তার নিতম্বভারে মন্থর হয়েছিল। দ্রুতবেগে শ্রীকৃষ্ণের পিছনে ধাবিত হওয়ার ফলে তাঁর কবরী শিথিল হওয়ায় তা থেকে ফুলগুলি স্খলিত হয়ে তাঁর অনুগমন করছিল। অবশেষে তিনি শ্রীকৃষ্ণকে ধরে ফেলেছিলেন। মা যশোদা তাঁকে ধরে ফেললে, কৃষ্ণ অত্যন্ত ভীত হয়ে তাঁর অপরাধ স্বীকার করেছিলেন। মা যশোদা তখন দেখলেন যে, কৃষ্ণ ক্রন্দন করতে করতে তাঁর হাত দিয়ে নয়নযুগল ঘর্ষণ করার ফলে, তাঁর সারা মুখে কাজল লেগে গেছে। মা যশোদা তখন তাঁর সুন্দর পুত্রটিক হাত দিয়ে ধরে মৃদু ভর্ৎসনা করতে লাগলেন। মা যশোদা সর্বদাই কৃষ্ণের প্রতি গভীর স্নেহে বিহ্বল থাকতেন এবং তাই তিনি জানতেন না শ্রীকৃষ্ণ কে এবং তাঁর প্রভাব কি রকম? কৃষ্ণের প্রতি মাতৃস্নেহবশত তিনি কখনও জানার চেষ্টাও করেননি যে, তিনি কে ছিলেন? তাই তিনি যখন দেখলেন যে, তাঁর পুত্রটি অত্যন্ত ভীত হয়েছেন, তখন তিনি তাঁর হাতের ছড়িটি ফেলে দিয়ে তাঁকে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলেন, যাতে তিনি আর কোন দুষ্টুমি না করতে পারেন।”
“ভগবানের আদি-অন্ত নেই, বাহ্য-অন্তর নেই, পূর্ব-পশ্চাৎ নেই। অর্থাৎ তিনি সর্বব্যাপ্ত। যেহেতু তিনি কালের নিয়ন্ত্রণাধীন নন, তাই তাঁর কাছে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কোন পার্থক্য নেই। তিনি তাঁর চিন্ময় স্বরূপে নিত্য বর্তমান। দ্বৈতভাবের অতীত পরমতত্ত্ব হওয়ার ফলে, যদিও তিনি সব কিছুরই কার্য এবং কারণ, তবুও তিনি কার্য এবং কারণের দ্বৈতভাব থেকে মুক্ত। সেই অব্যক্ত পুরুষ, যিনি সমস্ত ইন্দ্রিয় অনুভূতির অতীত, তিনি এখন একটি নরশিশুরূপে আবির্ভূত হয়েছেন এবং মা যশোদা তাঁকে তাঁর পুত্র বলে মনে করে দড়ি দিয়ে একটি উদূখলে বেঁধে রেখেছেন। মা যশোদা যখন অপরাধী বালকটিকে বাঁধার চেষ্টা করছিলেন, তখন তিনি দেখলেন যে, বন্ধন রজ্জুটি দুই অঙ্গুলি পরিমাণ ছোট। তাই তিনি তখন সেই রজ্জুটির সঙ্গে আর একটি রজ্জু যুক্ত করেছিলেন। সেই নতুন রজ্জুটিও দুই আঙ্গুল ছোট হয়েছিল। তখন তার সঙ্গে আর একটি রজ্জু রোগ করা হয়েছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তা দুই আঙ্গুল ছোট হয়েছিল। এইভাবে মা যশোদা যত রজ্জু জুড়েছিলেন, সেই সবই দুই আঙ্গুল ছোট হতে লাগল। এইভাবে মা যশোদা তাঁর গৃহের সমস্ত রজ্জু একের পর এক যুক্ত করেছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি কৃষ্ণকে বাঁধতে পারলেন না। মা যশোদার সখী প্রতিবেশিনী গোপীরা সেই মজার ব্যাপারটি দর্শন করে হাসছিলেন। মা যশোদাও পরিশ্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও হাসছিলেন। এইভাবে তাঁরা সকলে বিস্মিতা হয়েছিলেন। মা যশোদা পরিশ্রান্ত হয়ে ঘর্মাক্ত কলেবর হয়েছিলেন এবং তাঁর কবরীস্থিত মালা স্খলিত হয়েছিল। বালকৃষ্ণ তাঁর মাকে এইভাবে পরিশ্রান্তা দেখে, তাঁর প্রতি কৃপাপরায়ণ হয়ে বন্ধনগ্রস্ত হয়েছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! শিব, ব্রহ্মা, ইন্দ্র প্রভৃতি মহান দেবতাগণ সহ এই নিখিল বিশ্ব যাঁর বশীভূত, সেই স্বতন্ত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এইভাবে তাঁর ভক্তের বশ্যতা প্রদর্শন করেছেন। মা যশোদা জগতের মুক্তিদাতা শ্রীকৃষ্ণের কাছ যে অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন, সেই প্রকার অনুগ্রহ ব্রহ্মা, মহেশ্বর এমন কি ভগবানের অর্ধাঙ্গ বিলাসিনী লক্ষ্ণীদেবীও প্রাপ্ত হননি। যশোদানন্দন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বতঃস্ফূর্ত প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত ভক্তদের পক্ষে যে রকম সুলভ, মনোধর্মী জ্ঞানী, আত্ম-উপলব্ধির প্রয়াসী তাপস অথবা দেহাত্মবুদ্ধি পরায়ণ ব্যক্তিদের পক্ষে তেমন সুলভ নন। মা যশোদা যখন গৃহকার্যে ব্যস্ত ছিলেন, তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যমলার্জুন বৃক্ষ দুটি দর্শন করেছিলেন, যাঁরা পূর্ব কল্পে দেবতাদের কোষাধ্যক্ষ কুবেরের পুত্র ছিলেন। পূর্বজন্মে নলকূবর ও মনিগ্রীব নামে বিখ্যাত পুত্র দুজন অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালী এবং সৌভাগ্যবান ছিলেন। কিন্তু গর্ব এবং অহঙ্কারের ফলে তাঁরা নারদ মুনির অভিশাপে বৃক্ষত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন।”
নবম অধ্যায়- মা যশোদার রজ্জুর দ্বারা কৃষ্ণকে বন্ধন
18 Jun 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়