অষ্টম অধ্যায়- শ্রীকৃষ্ণের মুখের মধ্যে বিশ্বরূপ প্রদর্শন

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, তারপর যদুবংশীয় পুরোহিত তপস্বীপ্রবর গর্গমুনি বসুদেব কর্তৃক প্রেরিত হয়ে নন্দ মহারাজের গৃহে গিয়েছিলেন। নন্দ মহারাজ গর্গমুনিকে তাঁর গৃহে উপস্থিত দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন এবং উঠে দাঁড়িয়ে কৃতাঞ্জলি সহকারে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। গর্গমুনি যদিও তাঁর গোচরীভূত ছিলেন, তবুও নন্দ মহারাজ গর্গমুনিকে অধোক্ষজ অর্থাৎ জড় ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির অতীত বলে মনে করেছিলেন। গর্গমুনিকে যথাযথভাবে আতিথ্য সৎকার করা হলে তিনি সুখে উপবেশ করেছিলেন এবং নন্দ মহারাজ তখন অত্যন্ত বিনীত বচনে তাঁকে বলতে লাগলেন- “হে মুনিবার, যেহেতু আপনি ভগবানের ভক্ত তাই আপনি সর্বতোভাবে পূর্ণ। তবুও আমার কর্তব্য আপনার সেবা করা। দয়া করে আমাকে বলুন আমি আপনার জন্য কি করতে পারি? হে প্রভু, আপনার মতো মহাজনেরা যে স্বীয় আশ্রম পরিত্যাগ করে অন্যত্র গমন করেন তা নিজের স্বার্থে নয়, পক্ষান্তরে আমার মতো দীন হৃদয় গৃহস্থদের পরম মঙ্গলের জন্য। তা ছাড়া তাঁদের এক স্থান থেকে আর এক স্থানে যাওয়ার আর কোন কারণ নেই। হে মহাত্মা, আপনি জ্যোতিষ শাস্ত্রের জ্ঞান প্রণয়ন করেছেন, যার দ্বারা মানুষ তার অদৃশ্য অতীত এবং বর্তমানকে জানতে পারে। এই জ্ঞানের দ্বারা যে কোন ব্যক্তি বুঝতে পারে তার পূর্ব জীবনে সে কি করেছে এবং কিভাবে তা তার বর্তমান জীবনকে প্রভাবিত করছে। আপনি তা জানেন। প্রভু, আপনি বিশেষভাবে জ্যোতিষশাস্ত্র সম্বন্ধে পূর্ণরূপে অবগত হওয়ার ফলে, ব্রাহ্মণদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তাই আপনি স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত মানুষের গুরু। তাই আপনি যেহেতু কৃপা করে আমার গৃহে এসেছেন, দয়া করে আপনি আমার পুত্র দুটির সংস্কার করুন।”
গর্গমুনি বললেন- “হে নন্দ মহারাজ, আমি যদুবংশের পুরোহিত, সেই কথা সর্বত্র প্রসিদ্ধ। তাই আমি যদি তোমার পুত্রদের সংস্কারকর্ম অনুষ্ঠান করি, তা হলে কংস তাদের দেবকীর পুত্র বলে মনে করবে। কংস এক মহাকূটনীতিজ্ঞ এবং পাপাত্মা। তাই, যে বালক তাকে হত্যা করবে সে ইতিমধ্যেই অন্যত্র জন্মগ্রহণ করেছে, এই কথা দেবকীর কন্যা যোগমায়ার কাছ থেকে শুনে, দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান কন্যা সেই কথা শুনে এবং বসুদেবের সঙ্গে তোমার বন্ধুত্বের কথা অবগত থাকার ফলে, কংস যদি জানতে পারে যে, যদুবংশের পুরোহিত আমার দ্বারা এই সংস্কার অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা হলে কংস নিশ্চয়ই সন্দেহ করবে যে, কৃষ্ণ দেবকী এবং বসুদেবের পুত্র। তখন সে কৃষ্ণকে হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে। তা হলে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে।”
নন্দ মহারাজ বললেন- “হে মহর্ষি, আপনি যদি মনে করেন যে, আপনি সংস্কারকার্য সম্পাদন করলে কংস সন্দিহান হবে, তা হলে গোপনে বৈদিক মন্ত্র উচ্চরণ করে আমার গৃহের সংলগ্ন এই গোশালায়, সকলের অগোচরে, এমন কি আমার আত্মীয়স্বজনেরও অগোচরে, এই কর্তব্য সংস্কার সম্পাদন করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে নির্জনে নামকরণ সংস্কার করাই গর্গমুনির ইচ্ছা ছিল। তখন নন্দ মহারাজ কর্তৃক বিশেষভাবে প্রার্থিত হয়ে, তিনি এক নির্জন স্থানে কৃষ্ণ এবং বলরামের নামকরণ সংস্কার সম্পাদন করেছিলেন।”
গর্গমুনি বললেন- “এই রোহিণীর পুত্র তাঁর দিব্য গুণাবলীর দ্বারা তাঁর সুহৃদবর্গকে রমন করবেন বা আনন্দ প্রদান করবেন বলে, তিনি রাম নামে বিখ্যাত হবেন। তিনি অসাধারণ বল প্রদর্শন করবেন বলে, তিনি বল নামেও বিখ্যাত হবেন। অধিকন্তু যেহেতু তিনি বসুদেবের বংশ এবং নন্দ মহারাজের বংশ যুক্ত করবেন, তাই তার নাম হবে সঙ্কর্ষণ। তোমার পুত্র কৃষ্ণ প্রতি যুগে তাঁর শ্রীমূর্তি প্রকাশ করেন। পূর্বে ইনি শুক্ল, রক্ত ও পীতবর্ণ ধারণ করে প্রকাশিত হয়েছিলেন, সম্প্রতি কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে প্রকট হয়েছেন (অন্য দ্বাপর যুগে ইনি (শ্রীরামচন্দ্র রূপে) শুকপক্ষীর মতো বর্ণ ধারণ করে আবির্ভূত হন। এই সমস্ত অবতারেরা এখন শ্রীকৃষ্ণতে সমবেত হয়েছেন।) কোন কারণে, তোমার এই পরম সুন্দর পুত্রটি পূর্বে বসুদেবের পুত্ররূপে প্রকটিত হয়েছিলেন। তাই অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা এঁকে বাসুদেব বলে থাকেন। তোমার এই পুত্রের গুণ এবং কর্ম অনুসারে বহু নাম এবং রূপ আছে, তা আমি জানি। সাধারণ লোকেরা তা জানে না। গোপ এবং গোকুলের আনন্দবর্ধক এই শিশুটি তোমাদের মঙ্গল সাধন করবে এবং এঁর কৃপায় তোমরা অনায়াসে সমস্ত বিঘ্ন অতিক্রম করতে পারবে।”
“হে নন্দ মহারাজ! ইতিহাসে বর্ণনা করা হয়েছে যে, পুরাকালে অরাজকতার সময়, ইন্দ্র যখন সিংহাসন চ্যুত হয়েছিলেন এবং মানুষেরা দস্যু-তস্করদের দ্বারা উৎপীড়িত হয়েছিল, তখন এই শিশুটি আবির্ভূত হয়ে দস্যু-তস্করদের পরাজিত করে সকলকে রক্ষা করেছিলেন এবং সমৃদ্ধি সাধন করেছিলেন। অসুরেরা ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পক্ষ অবলম্বনকারী দেবতাদের কখনও পরাভূত করতে পারে না। তেমনই যে ব্যক্তি বা সম্প্রদায় শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অনুরক্ত, তাঁরা অত্যন্ত ভাগ্যবান, কারণ শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অত্যন্ত প্রীতি যুক্ত হওয়ার ফলে, তাঁরা কখনও কংসের অনুচরসদৃশ অসুরদের দ্বারা (অথবা অন্তরের শত্রু ইন্দ্রিয়ের দ্বারা) পরাভূত হন না। অতএব, হে নন্দ মহারাজ, তোমার এই পুত্রটি গুণ, ঐশ্বর্য, কীর্তি এবং প্রভাবে নারায়নেরই সমতুল্য। তুমি অত্যন্ত সাবধানতা সহকারে এই শিশুটিকে পালন কর।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “গর্গমুনি নন্দ মহারাজকে এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করে যখন তাঁর গৃহের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করেছিলেন, তখন নন্দ মহারাজ নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান বলে মনে করে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। তার অল্পকাল পরেই রাম এবং কৃষ্ণ দুজনেই হাত এবং জানু অবলম্বন করে ব্রজে হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছিলেন। এইভাবে তাঁরা শিশুর মতো খেলা করার আনন্দ উপভোগ করেছিলেন। যখন কৃষ্ণ এবং বলরাম তাঁদের জানুতে ভর দিয়ে ব্রজভূমিতে গোময় এবং গোমূত্র থেকে উৎপন্ন কর্দমাক্ত ভূমিতে সরীসৃপের মতো বক্রগতিতে বিচরণ করতেন, তখন তাঁদের কিঙ্কিণীর ধ্বনি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর শোনাত। অন্যদের কিঙ্কিণীর ধ্বনি শ্রবণ করে অত্যন্ত হৃষ্টচিত্তে তাঁরা তাঁদের অনুসরণ করতেন, যেন তাঁরা তাঁদের মায়ের কাছে যাচ্ছেন, কিন্তু যখন তাঁরা দেখতেন যে, তাঁরা অন্য ব্যক্তি, তখন যেন তাঁরা ভীত হয়ে তাঁদের মাতা যশোদা এবং রোহিণীর কাছে ফিরে আসতেন। পঙ্করূপ অঙ্গরাগে সজ্জিত সুন্দর শিশু দুটি যখন তাঁদের মায়েদের কাছে যেতেন, তখন যশোদা এবং রোহিণী গভীর স্নেহভরে তাঁদের কোলে তুলে নিয়ে স্বতঃক্ষরিত স্তনদুগ্ধ পান করাতেন। তাঁরা যখন স্তন পান করতেন, তখন শিশু দুটি ঈষৎ হাসতেন এবং তখন তাঁদের মুখে ছোট ছোট দাঁতগুলি দেখা যেত। তাঁদের সেই অল্প দন্তযুক্ত বদন নিরীক্ষণ করে তাঁদের মায়েরা অত্যন্ত আনন্দিত হতেন। নন্দ মহারাজের অন্তঃপুরে গোপরমণীরা শিশু কৃষ্ণ এবং বলরামের লীলাবিলাস দর্শনের আনন্দ উপভোগ করতেন। শিশু দুটি গোবৎসদের পুচ্ছ ধারণ করতেন এবং সেই বৎসগুলি তাঁদের আকর্ষণ করে ইতস্তত ধাবিত হত। তখন ব্রজরমণীরা তাঁদের গৃহকার্য পরিত্যাগ করে সেই সমস্ত লীলা দর্শন করে হাসতেন এবং পরম আনন্দ উপভোগ করতেন। মা যশোদা এবং রোহিণী যখন শৃঙ্গধারী গাভী, অগ্নি, কুকুর, বিড়াল, বানর প্রভৃতি দংষ্ট্রীগণ এবং কণ্টক, অসি ও ভূমিতে অন্যান্য অস্ত্র প্রভৃতি থেকে রক্ষা করতে পারতেন না এবং অত্যন্ত উৎকন্ঠিত হওয়ার ফলে তাঁদের গৃহকর্ম ব্যাহত হত, তখন তাঁরা বাৎসল্য রস পোষক চাপল্য নামক সঞ্চারি ভাব প্রাপ্ত হতেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, অল্প সময়ের মধ্যেই রাম এবং কৃষ্ণ জানুঘর্ষণ ব্যতীত তাঁদের চরণের দ্বারা অনায়াসে গোকুলে বিচরণ করতে শুরু করেছিলেন। তারপর, বলরাম সহ ব্রজের অন্যান্য গোপবালকদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ খেলতে শুরু করেছিলেন। এইভাবে তাঁরা গোপরমণীদের আনন্দ উৎপাদন করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত আকর্ষণীয় শিশুসুলভ চাপল্য দর্শন করে, সমস্ত গোপীরা শ্রীকৃষ্ণের কার্যকলাপ বার বার শোনার জন্য মা যশোদার কাছে এসে এইভাবে বলতেন। ‘হে সখী যশোদা, তোমার পুত্র কখনও গোদোহনের পূর্বেই আমাদের গৃহে এসে গোবৎসদের বন্ধন মুক্ত করে দেয় এবং তার ফলে গৃহস্বামী ক্রুদ্ধ হলে সে হাসতে থাকে। কখনও কখনও সে চুরি করার নানা উপায় উদ্ভাবন করে। সুস্বাদু দই, মাখন এবং দুধ চুরি করে ভক্ষণ করে। সেখানে বানরেরা সমবেত হলে, সে তাদেরও তা ভাগ করে দেয় এবং উদরপূর্তিবশত বানরেরা যখন আর খেতে চায় না, তখন সে ভাণ্ডগুলি ভেঙ্গে ফেলে। কখনও কখনও সে যদি কোন গৃহে মাখন এবং দুধ চুরি করার সুযোগ না পায়, তা হলে সে গৃহস্বামীর প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে নিদ্রিত শিশুদের চিমটি কেটে জাগিয়ে দেয়। তারপর শিশুরা যখন ক্রন্দন করতে শুরু করে, তখন কৃষ্ণ পালিয়ে যায়। ‘দধি এবং দুগ্ধ প্রভৃতি দ্রব্য যখন কৃষ্ণ ও বলরামের হাতের নাগালের বাইরে অনেক উঁচুতে শিকায় ঝুলানো থাকত, তখন তারা পিঁড়ির উপর উঠে অথবা উদুখলের উপর দাঁড়িয়ে তা লাভ করার উপায় রচনা করে থাকে। আর তা সত্ত্বেও যদি তা তাদের হাতের নাগালের বাইরে থাকে, তখন তারা পাত্রের মধ্যস্থ দ্রব্য অবগত হয়ে, সেই পাত্রটি ফুটো করে দেয়। যখন গোপীগণ গৃহকার্যে ব্যস্ত থাকেন, তখন কৃষ্ণ-বলরাম অন্ধকার গৃহে প্রবেশপূর্বক তাদের দেহের মূল্যবান মণির আলোকে সে স্থান আলোকিত করে, স্বকীয় কার্যের সহায় প্রদীপরূপে কল্পনা করে থাকে। ‘কৃষ্ণের দুষ্টুমি ধরা পড়ে গেলে গৃহস্বামী যখন তাকে বলতেন, ‘ওরে চোর!’ এবং কৃত্রিমভাবে কৃষ্ণের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করতেন, তখন কৃষ্ণ প্রগল্‌ভতা প্রকাশ করে বলতেন, ‘আমি চোর নই, তুমিই চোর।’ কখনও কখনও কৃষ্ণ ক্রুদ্ধ হয়ে আমাদের গৃহের পরিষ্কার স্থানে মল-মূত্র ত্যাগ করে, কিন্তু সখী যশোদা, দেখ, এই পাকা চোরটি তোমার সামনে একটি সুশীল বালকের মতো বসে রয়েছে।’ গোপীরা যখন শ্রীকৃষ্ণের সভয় নয়নযুক্ত মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করে যশোদার কাছে তাঁর চাপল্যের কথা প্রকাশ করতেন, তখন মা যশোদা সেই মজার কথা শুনে মৃদু হাসতেন এবং তাঁর চিন্ময় শিশুটিকে তিরস্কার করতে পারতেন না।”
“একদিন শ্রীকৃষ্ণ যখন বলরাম প্রভৃতি গোপবালকদের সঙ্গে খেলা করছিলেন, তখন তাঁর সাথীরা এসে মা যশোদার কাছে নিবেদন করেছিলেন, “মাতঃ, কৃষ্ণ মাটি খেয়েছে।’ কৃষ্ণের খেলার সাথীদের কাছে সেই কথা শুনে, হিতৈষিণী মা যশোদা কৃষ্ণের হাত ধরে ভয়চকিত নেত্রে তাঁর মুখের ভিতরে দেখে তাঁকে ভর্ৎসনাপূর্বক এই কথাগুলি বলেছিলেন। হে অশান্তচিত্ত কৃষ্ণ, তুমি কেন নির্জন স্থানে মটি খেয়েছ? তোমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরাম সহ তোমার খেলার সাথীরা সেই কথা বলছে। তুমি কেন এই কাজ করেছ? কৃষ্ণ তখন বললেন- ‘মা আমি কখনও মাটি খাইনি। এরা সকলে মিথ্যা বাদী। তুমি যদি মনে কর যে এরা সত্যি কথা বলছে, তা হলে তুমি নিজেই আমার মুখের মধ্যে দেখ। মা যশোদা কৃষ্ণকে বলেছিলেন, ‘যদি তুমি মাটি না খেয়ে থাক, তা হলে তোমার মুখ খোল।’ এইভাবে মাতা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে নন্দ মহারাজ এবং যশোদার পুত্র কৃষ্ণ একটি নরশিশুরূপে তাঁর লীলা প্রদর্শন করার জন্য তাঁর মুখব্যাদান করেছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যদিও সর্ব ঐশ্বর্যপূর্ণ, তবুও তাঁর সেই ঐশ্বর্য মা যশোদার বাৎসল্য স্নেহ বিচলিত করেনি। তাঁর ঐশ্বর্য স্বাভাবিকভাবেই প্রদর্শিত হয়েছিল, কারণ কোন স্থিতিতেই তাঁর ঐশ্বর্যের অভাব হয় না। উপযুক্ত সময়ে তা প্রকাশিত হয়।’
“কৃষ্ণ যখন তাঁর মায়ের আদেশে তাঁর মুখব্যাদান করেছিলেন, তখন মা যশোদা তাঁর মধ্যে স্থাবর, জঙ্গম, অন্তরীক্ষ, দিক্, পর্বত, দ্বীপ, সমুদ্র, ভূতল, প্রবাহ-বায়ু, অগ্নি, চন্দ্র, তারকা, জ্যোতিশ্চক্র, জল, তেজ, পবন, আকাশ, অহঙ্কারের বিকার থেকে সৃষ্ট সমস্ত বস্তু, ইন্দ্রিয়সমূহ, মন, তন্মাত্র, সত্ত্ব, রজ এবং তমোগুণ, জীবের আয়ু, স্বভাব, কর্মবাসনা এবং বিভিন্ন প্রকার শরীর দর্শন করেছিলেন। তিনি বৃন্দাবন-ধাম সহ সমগ্র জগৎ এবং সেই সঙ্গে নিজেকেও দর্শন করে তাঁর পুত্রের অনিষ্ট আশঙ্কায় ভীতা হয়েছিলেন। (মা যশোদা মনে মনে বিতর্ক করতে লাগলেন-) এটি কি স্বপ্ন, অথবা বহিরঙ্গা শক্তির মোহময়ী সৃষ্টি? এটি কি আমার নিজের বুদ্ধির দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে, অথবা এটি আমার এই শিশুরই কোন যোগশক্তি? অতএব, যিনি চিত্ত, মন, কার্য, বাণী এবং তর্কের অতীত, যিনি সমস্ত জগতের মূল কারণ, যিনি সমগ্র জগৎ পালন করেন এবং যাঁর দ্বারা এই জগতের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়, আমি সেই ভগবানের শরণাগত হই এবং তাঁর শ্রীপাদপদ্মে আমার প্রণতি নিবেদন করি। কারণ তিনি সমস্ত চিন্তা, অনুমান এবং ধ্যানের অতীত। তিনি আমার জড় কার্যকলাপের অতীত। ভগবানের মায়র প্রভাবে আমি ভ্রান্তভাবে মনে করছি যে, নন্দ মহারাজ আমার পতি, কৃষ্ণ আমার পুত্র এবং যেহেতু আমি নন্দ মহারাজের মহিষী, তাই সমস্ত গোধন সহ গোপ এবং গোপীরা আমার প্রজা। প্রকৃতপক্ষে, আমি ভগবানের নিত্য দাসী এবং তিনি আমার পরম আশ্রয়।
“ভগবানের কৃপায় মা যশোদা প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন, কিন্তু তার পরেই ভগবান তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তি যোগমায়ার দ্বারা তাঁকে পুনরায় বাৎসল্য প্রেমে মোহিত করে ফেললেন। তৎক্ষণাৎ যোগমায়ার প্রভাবে কৃষ্ণের মুখে বিশ্বরূপ দর্শন করার ব্যাপার বিস্মৃত হয়ে, মা যশোদা পূর্বের মতো তাঁর পুত্রটিকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। তখন তাঁর সেই চিন্ময় পুত্রটির প্রতি তাঁর স্নেহ অত্যন্ত বর্ধিত হয়েছিল। ভগবানের মহিমা বেদত্রয়, উপনিষদ্, সাংখ্যযোগ এবং অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্রে কীর্তিত হয়, তবুও মা যশোদা সেই ভগবানকে তাঁর শিশুপুত্র বলে মনে করেছিলেন।”
“মা যশোদার পরম সৌভাগ্যের কথা শুনে, পরীক্ষিৎ মহারাজ শুকদেব গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- হে ব্রহ্মন্, ভগবান যাঁর স্তন্য পান করেছিলেন, সেই যশোদাদেবী এবং নন্দ মহারাজ পূর্বে এমন কি তপস্যা করেছিলেন, যার ফলে তাঁরা সেই প্রেমময়ী সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন? শ্রীকৃষ্ণ যদিও বসুদেব এবং দেবকীর প্রতি এতই প্রসন্ন ছিলেন যে, তিনি তাঁদের পুত্ররূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তবুও তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের উদার বাল্যলীলা উপভোগ করতে পারেননি, যা এতই মহান যে, কেবল তা কীর্তন করার ফলে জড় জগতের সমস্ত কলুষ দূর হয়ে যায়। নন্দ মহারাজ এবং মা যশোদা কিন্তু পূর্ণরূপে সেই সমস্ত লীলা উপভোগ করেছিলেন এবং তাই তাঁদের স্থিতি বসুদেব এবং দেবকী থেকে শ্রেষ্ঠ।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বসুশ্রেষ্ঠ দ্রোণ তাঁর পত্নী ধরাসহ যখন ব্রহ্মার আদেশ পালন করছিলেন, তখন তাঁরা ব্রহ্মাকে বলেছিলেন- দয়া করে আমাদের পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করার অনুমতি দিন, যাতে পরমপুরুষ বিশ্বেশ্বর ভগবানের প্রতি যেন আমাদের পরমা ভক্তি লাভ হয়, যে ভক্তির বলে জীব জড় জগতের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা থেকে উদ্ধার লাভ করতে পারে। ব্রহ্মা যখন বলেছিলেন ‘তথাস্তু’, তখন ভগবানেরই সমতুল্য পরম সৌভাগ্যবান দ্রোণ ব্রজপুর বৃন্দাবনে পরম প্রসিদ্ধ নন্দ মহারাজরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তাঁর পত্নী ধরা মা যশোদারূপে আবির্ভূতা হয়েছিলেন। হে ভরতকুলপ্রবর মহারাজ পরীক্ষিৎ! তারপর ভগবান যখন নন্দ মহারাজ এবং যশোদাদেবীর পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন তাঁর প্রতি তাঁদের অবিচলিত বাৎসল্য প্রেম নিরন্তর বর্তমান ছিল এবং তাদের সান্নিধ্যে বৃন্দাবনবাসী সমস্ত গোপ এবং গোপীরাও কৃষ্ণভক্তি লাভ করেছিলেন। এইভাবে ব্রহ্মার বর সফল করার জন্য কৃষ্ণ বলরাম সহ ব্রজভূমি বৃন্দাবনে বাস করেছিলেন। তাঁর বিবিধ বাল্যলীলা প্রদর্শন করে, তিনি নন্দ মহারাজ এবং অন্যান্য ব্রজবাসীদের আনন্দ বর্ধন করেছিলেন।”

Leave a Reply

June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

Blog Stats

  • 140,959 hits