শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “নন্দ মহারাজ ছিলেন স্বভাবতই উদারচিত্ত এবং শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন তিনি আনন্দে বিহ্বল হয়েছিলেন। তাঁকে স্নান করিয়ে এবং স্বয়ং পবিত্র হয়ে তিনি বস্ত্র এবং অলঙ্কারে সজ্জিত হয়েছিলেন এবং বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। সেই ব্রাহ্মণদের দ্বারা স্বস্তিবাচন করিয়ে তিনি যথাবিধি পুত্রের জাতকর্ম সম্পাদন করিয়েছিলেন এবং দেবতা ও পিতৃপুরুষদের পূজার আয়োজনও করেছিলেন। নন্দ মহারাজ ব্রাহ্মণদের বস্ত্র এবং অলঙ্কারে বিভূষিত কুড়ি লক্ষ ধেনু এবং রত্নসমূহ ও সোনার জরির কাজ করার বস্ত্রের দ্বারা আবৃত সাতটি তিলের পর্বত প্রদান করেছিলেন।”
“হে রাজন্, কালের দ্বারা ভূমি প্রভৃতি দ্রব্য শুদ্ধ হয়, স্নানের দ্বারা দেহ শুদ্ধ হয়; শৌচের দ্বারা অপবিত্র বস্তু শুদ্ধ হয়; সংস্কারের দ্বারা জন্ম শুদ্ধ হয়; তপস্যার দ্বারা ইন্দ্রিয় শুদ্ধ হয়, পূজার দ্বারা ব্রাহ্মণ শুদ্ধ হন; দানের দ্বারা জড় সম্পত্তি শুদ্ধ হয়; সন্তোষের দ্বারা মন শুদ্ধ হয়; এবং আত্মজ্ঞানের দ্বারা বা কৃষ্ণভক্তির দ্বারা আত্মা শুদ্ধ হয়। ব্রাহ্মণেরা সমগ্র বাতাবরণ পবিত্রকারী মঙ্গলময় বৈদিক মন্ত্র পাঠ করেছিলেন সূত (পৌরাণিক ইতিবৃত্ত কথক), মাগধ (রাজবংশের ইতিবৃত্ত কীর্তনকারী), বন্দী (উপস্থিত বিষয় বর্ণনাকারী) এবং গায়কেরা স্তব আদি কীর্তন করেছিলেন। তখন ভেরি ও দুন্দুভিও নিনাদিত হয়েছিল। নন্দ মহারাজের বাসস্থান ব্রজপুর বিচিত্র ধ্বজা, পতাকা, ফুলের মালার দ্বারা নির্মিত তোরণ, বস্ত্রখণ্ড এবং আম্রপল্লবের দ্বারা সুসজ্জিত হয়েছিল। গৃহের অঙ্গন, দ্বার ও মধ্যভাগ সুন্দরভাবে মার্জিত হয়েছিল এবং ধৌত হয়েছিল। গাভী, বৃষ এবং গোবৎসদের সমস্ত শরীর হলুদ, তেল এবং নানা রঙের খনিজের মিশ্রনে লিপ্ত হয়েছিল। তাদের মস্তক ময়ূরপুচ্ছের দ্বারা বিভূষিত হয়েছিল এবং ফুলমালা, বস্ত্র ও স্বর্ণ অলঙ্কারের দ্বারা তাদের বিভূষিত করা হয়েছিল।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, গোপগণ বহুমূল্য বস্ত্র, আভরণ, কঞ্চুক এবং উষ্ণীষে শোভিত হয়ে, নানা প্রকার উপহার হাতে নিয়ে নন্দ মহারাজের গৃহে এসেছিলেন। মা যশোদার একটি পুত্র হয়েছে শুনে গোপীরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন এবং তাঁরা বস্ত্র, অলঙ্কার, কাজল প্রভৃতি দ্বারা নিজেদের সাজাতে শুরু করেছিলেন। নব বিকশিত কুঙ্কুমের কেশরে মুখপদ্ম সুশোভিত করে, গোপস্ত্রীগণ উপহার হাতে নিয়ে মা যশোদার গৃহাভিমুখে প্রস্থান করেছিলেন। তাঁদের স্বাভাবিক সৌন্দর্যবশত তাঁদের নিতম্ব ছিল বিশাল এবং স্তনযুগল সুডৌল এবং দ্রুত গতিতে গমন করার ফলে তা সঞ্চালিত হচ্ছিল। গোপীদের কর্ণে অত্যন্ত উজ্জ্বল মণিময় কুণ্ডল এবং কন্ঠদেশে পদকসমূহ এবং হস্তযুগলে বলয় শোভা পাচ্ছিল। তাঁরা বিচিত্র বসন পরিধান করেছিলেন এবং তাঁদের কেশাগ্র থেকে পথে ফুল ঝড়ে পড়ছিল। এইভাবে গোপীরা যখন নন্দ মহারাজের গৃহে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁদের কুণ্ডল, পয়োধর এবং মালা আন্দোলিত হওয়ায় তাঁরা অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়েছিলেন। গোপস্ত্রী এবং গোপকন্যাগণ নবজাত শিশু কৃষ্ণকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, “তুমি ব্রজের রাজা হয়ে সমস্ত ব্রজবাসীদের পালন কর।” তাঁরা হরিদ্রাচূর্ণ এবং তৈল মিশ্রিত জলের দ্বারা ভগবানকে অভিষিক্ত করে স্তুতিগান করেছিলেন। এইভাবে বিশ্বেশ্বর অনন্ত শ্রীকৃষ্ণ নন্দগৃহে সমাগত হলে, মহোৎসবে বিচিত্র বাদ্যসমুহ বাদিত হয়েছিল। আনন্দে গোপেরা এক অন্যকে দধি, ক্ষীর, ঘৃত এবং জল দ্বারা সিঞ্চন এবং ননীর দ্বারা বিলেপন করতে করতে সেই সমস্ত দ্রব্য ইতস্তত নিক্ষেপ করেছিলেন। মহামতি নন্দ ভগবান শ্রীবিষ্ণুর প্রসন্নতা বিধানের জন্য সমস্ত গোপ-গোপীদের বস্ত্র, অলঙ্কার ও গাভী প্রদান করেছিলেন এবং তার ফলে সর্বতোভাবে তাঁর পুত্রের মঙ্গল বিধান করেছিলেন। তিনি সূত, মাগধ, বন্দী এবং বিদ্যোপজীবীদের অভিলষিত দ্রব্য দান করে তাদের সন্তুষ্টিবিধান করেছিলেন। বলদেবের মাতা মহা সৌভাগ্যবতী রোহিণীদেবীও নন্দ মহারাজ এবং যশোদা মায়ের দ্বারা সম্মানিতা হয়েছিলেন এবং দিব্য বস্ত্র, মাল্য, কণ্ঠাভরণ আদি অলঙ্কারে বিভূষিতা হয়ে তিনি সমাগতা স্ত্রীলোকদের সম্মান করার জন্য ইতস্তত বিচরণ করতে লাগলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! নন্দ মহারাজের গৃহ ভগবানের এবং তাঁর চিন্ময় গুণাবলীর শাশ্বত ধাম। তাই তা সর্বদাই সর্ব ঐশ্বর্যমণ্ডিত। তবুও শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের সময় থেকে তা লক্ষ্ণীদেবীর বিহারস্থল হয়েছিল।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে কুরু-কুলরক্ষক মহারাজ পরীক্ষিৎ, তারপর নন্দ মহারাজ গোপদের গোকুল রক্ষায় নিযুক্ত করে কংসের বার্ষিক কর প্রদানের জন্য মথুরায় গমন করেছিলেন। বসুদেব যখন জানতে পেরেছিলেন যে, তাঁর পরম বন্ধু ও ভ্রাতা নন্দ মহারাজ মথুরায় এসেছেন এবং কংসকে কর প্রদান করেছেন, তখন তিনি নন্দ মহারাজের বাসস্থানে গমন করেছিলেন। নন্দ মহারাজ যখন শুনলেন যে, বসুদেব তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন, তখন তিনি প্রেম এবং স্নেহে অত্যন্ত অভিভূত হয়েছিলেন, যেন তাঁর দেহে প্রাণ ফিরে এসেছে। তখন তিনি তাঁর দুই বাহুর দ্বারা বসুদেবকে আলিঙ্গন করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! নন্দ মহারাজ কর্তৃক এইভাবে আদৃত ও সম্মানিত হয়ে বসুদেব সুখে উপবেশন করেছিলেন এবং তাঁর দুই পুত্রের প্রতি গভীর প্রেমের ফলে তিনি তাদের সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন। হে ভ্রাতা নন্দ মহারাজ! এই বৃদ্ধাবস্থায় তোমার পুত্র লাভের কোন আশাই ছিল না। তাই সম্প্রতি তোমার যে পুত্র জন্মগ্রহণ করেছে, তা মহাভাগ্যের বিষয়। ভাগ্যক্রমে আমি আজ তোমাকে দর্শন করলাম। এই সৌভাগ্য লাভ করে আমার মনে হচ্ছে, যেন আমি পুনর্জন্ম লাভ করেছি। এই সংসারে অন্তরঙ্গ বন্ধুর সাক্ষাৎ এবং প্রিয় আত্মীয়ের দর্শন অত্যন্ত দুর্লভ। নদীর তরঙ্গে ভাসমান তৃণ, কাষ্ঠ ইত্যাদি যেমন নদীর স্রোতবেগের দ্বারা বাহিত হয়ে একত্রে থাকতে পারে না, তেমনই আমরাও আমাদের বিচিত্র অদৃষ্ট এবং কালের তরঙ্গে প্রবাহিত হওয়ার ফলে, বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে একত্রে অবস্থান করতে পারি না। হে সখা নন্দ মহারাজ, তুমি যেখানে তোমার বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হয়ে বাস করছ, সেই বন গাভী আদি পশুদের পক্ষে অনুকূল তো? আমি আশা করি সেখানে কোন রোগ নেই এবং তাদের কোন অসুবিধা নেই। সেই স্থানে নিশ্চয়ই যথেষ্ঠ জল, ঘাস এবং তৃণগুল্ম রয়েছে। আমার পুত্র বলদেব তুমি এবং তোমার পত্নী যশোদা দেবীর দ্বারা লালিত-পালিত হয়ে তোমাদের পিতা এবং মাতা বলে মনে করছে তো? তোমার গৃহে সে তার মাতা রোহিণী সহ কুশলে অবস্থান করছে তো? আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবেরা যখন যথাযথভাবে অবস্থিত থাকেন, তখন বৈদিক নির্দেশ অনুসারে ধর্ম, অর্থ এবং কাম সুসম্পাদিত হয়। তা না হলে, সুহৃদদের ক্লেশ উপস্থিত হলে এই ত্রিবর্গ সুখদায়ক হয় না।”
নন্দ মহারাজ বললেন- “হায়! রাজা কংস দেবকীর গর্ভজাত তোমার বহু পুত্রকে হত্যা করেছে। কনিষ্ঠা একটি মাত্র কন্যা অবশিষ্টা ছিল, সেও স্বর্গলোকে চলে গেছে। প্রতিটি মানুষই অদৃষ্টের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যা মানুষের কর্মফল নির্ধারিত করে। অর্থাৎ, অদৃষ্টের ফলেই মানুষের পুত্র অথবা কন্যা লাভ হয় এবং পুত্র অথবা কন্যা যখন থাকে না, তখন তাও অদৃষ্টের ফলেই হয়ে থাকে। অদৃষ্টই সব কিছুর পরম নিয়ন্তা। যে ব্যক্তি তা জানেন, তিনি কখনও মোহিত হন না।”
বসুদেব নন্দ মহারাজকে বললেন- “হে ভ্রাতঃ, তুমি কংসকে বার্ষিক কর প্রদান করেছ এবং আমার সঙ্গেও তোমার সাক্ষাৎকার হয়েছে, আর অধিক দিন তুমি এখানে থেকো না। গোকুলে ফিরে যাওয়াই তোমার পক্ষে শ্রেয়স্কর, কারণ আমি জানি যে, সেখানে কোন উপদ্রব হতে পারে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বসুদেব নন্দ মহারাজকে এইভাবে উপদেশ দিলে, সঙ্গী গোপসহ নন্দ মহারাজ বসুদেবের অনুমতি নিয়ে শকটে বৃষ যোজন করে গোকুলে গমন করেছিলেন।”
পঞ্চম অধ্যায়- নন্দ মহারাজ এবং বসুদেবের মিলন
09 Jun 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়