শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তারপর ভগবানের আবির্ভাবের শুভক্ষণে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড সত্ত্বগুণ, সৌন্দর্য এবং শান্তিতে পূর্ণ হয়েছিল। তখন রোহিণী, অশ্বিনী আদি নক্ষত্রগণ আবির্ভূত হয়েছিল। সূর্য, চন্দ্র এবং অন্যান্য সমস্ত গ্রহ ও তারকাগণ শান্তভাব ধারণ করেছিল। সমগ্র দিক অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিল এবং মেঘশূণ্য আকাশে তারকারাজি ঝলমল করছিল। নগর, গাম, খনি এবং গোচারণ ভূমির দ্বারা অলঙ্কৃত পৃথিবী তখন এক মঙ্গলময় রূপ ধারণ করেছিল। স্বচ্ছ জলে পূর্ণ হয়ে নদীগুলি প্রবাহিত হচ্ছিল এবং হ্রদ আদি বিশাল জলাশয়গুলি পদ্মফুলে পূর্ণ হয়ে এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য ধারণ করেছিল। ফুল ও পত্রে পূর্ণ মনোহর বৃক্ষগুলিতে কোকিল আদি বিহঙ্গ এবং অলিকুল মধুর স্বরে গুঞ্জন করছিল। পুণ্য গন্ধবাহী সুখস্পর্শ বিশুদ্ধ বায়ু প্রবাহিত হতে লাগল এবং যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণেরা যখন তাঁদের যজ্ঞাগ্নি প্রজ্বলিত করলেন, তখন সেই অগ্নি বাযুর দ্বারা বিচলিত না হয়ে স্থিরভাবে জ্বলতে লাগল। এইভাবে যখন জন্মরহিত ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আবির্ভাবের সময় হল, তখন কংস আদি অসুরদের উৎপীড়নে নিপীড়িত সাধু এবং ব্রাহ্মণেরা অন্তরে প্রসন্নতা অনুভব করলেন এবং তখন স্বর্গলোকে যুগপৎ দুন্দুভি বাজতে লাগল। কিন্নর এবং গন্ধর্বরা মঙ্গলগীত গাইতে শুরু করেছিলেন, সিদ্ধ এবং চারণেরা স্তব নিবেদন করেছিলেন এবং অপ্সরাগণ সহ বিদ্যাধরেরা আনন্দে নৃত্য করতে শুরু করেছিলেন। দেবতা এবং ঋষিরা আনন্দে পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন এবং আকশে মেঘেরা সমুদ্রের তরঙ্গের ধ্বনির অনুকরণে মন্দ মন্দ গর্জন করনতে লাগল। তখন সকলের হৃদয়ে বিরাজমান ভগবান শ্রীবিষ্ণু পূর্বদিকে উদিত পূর্ণচন্দ্রের মতো গভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত্রে সচ্চিদানন্দ স্বরূপিণী দেবকীর হৃদয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বসুদেব তখন দেখলেন যে, সেই নবজাত শিশুটির নয়নযুগল পদ্মের মতো, তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম। তাঁর বক্ষে শ্রীবৎস চিহ্ন এবং গলদেশে কৌস্তুভমণি বিরাজমান। তাঁর পরনে পীত বসন, তাঁর অঙ্গকান্তি নিবিড় মেঘের মতো শ্যামল, তাঁর কেশদাম উজ্জ্বল এবং তাঁর মুকুট ও কর্ণকুণ্ডল বৈদূর্যমণিচ্ছটায় অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল। সেই শিশুটি অত্যন্ত দীপ্তিশালী মেখলা, কেয়ূর বলয় প্রভৃতি অলঙ্কারে শোভিত। তাঁর অসাধারণ পুত্রটিকে দর্শন করে বসুদেবের নয়নযুগল বিষ্ময়ান্বিত হয়েছিল। চিন্ময় আনন্দে মগ্ন হয়ে তিনি শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব উৎসবে মনে মনে দশ হাজার গাভী ব্রাহ্মণদের দান করেছিলেন। হে ভরতকুলনন্দন মহারাজ পরীক্ষিৎ, বসুদেব বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেই শিশুটি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীনারায়ণ। সেই সত্য নিশ্চিতভাবে হৃদয়ঙ্গম করে তিনি নির্ভয় হয়েছিলেন এবং অবনত শরীরে কৃতাঞ্জলি হয়ে একাগ্রচিত্তে স্বাভাবিক কান্তির দ্বারা সূতিকাগৃহ উজ্জ্বলকারী সেই বালককে স্তব করতে লাগলেন।”
বসুদেব বললেন- “হে ভগবান! আপনি এই জড় জগতের অতীত পরম পুরুষ এবং পরমাত্মা। চিন্ময় জ্ঞানের দ্বারা পরমেশ্বর ভগবানরূপে আপনার স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করা যায়। আমি এখন পূর্ণরূপে আপনার স্থিতি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছি। হে ভগবান! আপনি সেই পুরুষ যিনি প্রথমে তাঁর বহিরঙ্গা শক্তির দ্বারা এই জড় জগৎ সৃষ্টি করেছেন। এই ত্রিগুণাত্মক বিশ্ব সৃষ্টি করে আপনি যেন তাতে প্রবেশ করেছেন বলে প্রতীত হয়, যদিও প্রকৃতপক্ষে আপনি প্রবিষ্ট হননি। মহত্তত্ত্ব অবিভাজ্য, কিন্তু জড়া প্রকৃতির গুণের ফলে তা মাটি, জল, আগুন, বায়ু এবং আকাশে বিভক্ত বলে মনে হয়। জীবশক্তির ফলে (জীবভূত), এই সমস্ত বিভক্ত শক্তিগুলি মিলিত হয়ে দৃশ্য জগৎকে প্রকাশ করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই জড় জগতের সৃষ্টির পূর্বে মহত্তত্ত্ব বিদ্যমান ছিল। তাই, মহত্তত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে কখনই সৃষ্টিতে প্রবেশ করে না। তেমনই, আপনি যদিও আপনার উপস্থিতির ফলে আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়েছেন, তবুও ইন্দ্রিয়ের দ্বারা, মনের দ্বারা অথবা বাণীর দ্বারা আপনাকে অনুভব করা যায় না (অবাঙ্মনসগোচর)। আমাদের ইন্দ্রিয়ের দ্বারা আমরা কোন কোন বস্তু দর্শন করতে পারি, সব কিছু দর্শন করতে পারি না। যেমন, আমাদের চক্ষুর দ্বারা আমরা দর্শন করতে পারি, কিন্তু রস আস্বাদন করতে পারি না। তেমনই, আপনি আমাদের ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির অতীত। যদিও আপনি জড়া প্রকৃতির সংস্পর্শে রয়েছেন, তবুও আপনি প্রকৃতির দ্বারা প্রভাবিত নন। আপনি সব কিছুর মূল কারণ, সর্বব্যাপ্ত, অবিচ্ছিন্ন পরমাত্মা। তাই আপনি বাহ্য ও অন্তরশূণ্য। আপনি কখনও দেবকীর গর্ভে প্রবেশ করেননি; পক্ষান্তরে, আপনি পূর্বেই সেখানে বিদ্যমান ছিলেন। যে ব্যক্তি জড়া প্রকৃতির তিন গুণ থেকে উৎপন্ন দেহ আদি দৃশ্য বস্তুকে আত্মা থেকে স্বতন্ত্র বলে মনে করে, সে তার অস্তিত্বের মূল ভিত্তি সম্বন্ধে অবগত নয় এবং তাই সে একটি মূর্খ। যাঁরা বিজ্ঞ, তাঁরা এই প্রকার মনোভাব বর্জন করেছেন, কারণ পূর্ণরূপে বিবেচনা করে, তাঁরা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন যে, আত্মা বিনা দেহ এবং ইন্দ্রিয়ের অস্তিত্ব অবাস্তব। মূর্খদের সিদ্ধান্ত যদিও পরিত্যাগ করা হয়েছে, তবুও মূর্খেরা তাকেই বাস্তব বলে মনে করে। হে ভগবান, বেদজ্ঞ পণ্ডিতেরা বলেন যে, নিষ্ক্রিয়, নির্গুণ এবং নির্বিকার আপনার দ্বারা এই জগতের সৃষ্টি, পালন এবং সংহার কার্য হয়। পরব্রহ্ম-স্বরূপ আপনাতে কোন বিরোধ নেই। যেহেতু জড়া প্রকৃতির তিন গুণ- সত্ত্ব, রজ এবং তম আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন, তাই সব কিছু আপনা হতেই সম্পাদিত হয়। হে প্রভু! আপনার স্বরূপ জড়া প্রকৃতির তিনগুণের অতীত, তবুও ত্রিলোক পালনের জন্য আপনি সত্ত্বগুণে শ্রীবিষ্ণুর শুক্লরূপ ধারণ করেন; সৃষ্টির জন্য রজোগুণবহুল রক্তবর্ণ হন এবং প্রলয়ের সময় তমোগুণবহুল কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেন। হে ভগবান, আপনি সমগ্র সৃষ্টির অধীশ্বর, আপনি এখন এই জগৎ রক্ষা করার জন্য আমার গৃহে আবির্ভূত হয়েছেন। আমি নিশ্চিতভাবে জানি, সারা পৃথিবী জুড়ে ক্ষত্রিয় রাজার বেশধারী অসুরদের যে সেনাবাহিনী বিচরণ করছে, তাদের আপনি সংহার করবেন। নিরীহ জনসাধারণদের রক্ষা করার জন্য আপনি অবশ্যই তাদের সংহার করবেন। হে সুরেশ্বর! আপনি আমাদের গৃহে জন্মগ্রহণ করবেন এই ভবিষ্যদ্বাণী শ্রবণ করে, অসভ্য কংস আপনার অগ্রজদের হত্যা করেছে। তার সেনানায়কদের কাছে আপনার আবির্ভাবের কথা শ্রবণ করা মাত্রই, আপনাকে হত্যা করতে সে অস্ত্র নিয়ে এখানে আসবে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তারপর কংসের ভয়ে ভীতা দেবকী মহাপুরুষের লক্ষণযুক্ত পুত্রকে দর্শন করে অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে তাঁর স্তব করতে লাগলেন।”
“দেবকী বললেন, “হে ভগবান! বেদ অনেক। তাদের মধ্যে কয়েকটি আপনাকে মন এবং বাক্যের অগোচর বলে বর্ণনা করে। তবুও আপনি সমগ্র জগতের আদি উৎস। আপনি ব্রহ্মা- সর্ববৃহৎ, সুর্যের মতো জ্যোতির্ময়। আপনার কোন জড় কারণ নেই, আপনি নির্বিকার ও নির্বিশেষ এবং আপনার কোন জড় বাসনা নেই। এইভাবে বেদে আপনাকে বাস্তব বস্তু বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তাই, হে ভগবান, আপনি প্রত্যক্ষভাবে সমস্ত বৈদিক বাণীর উৎস এবং আপনাকে জানা হলে ক্রমশ সব কিছু জানা হয়ে যায়। আপনি ব্রহ্মজ্যোতি এবং পরমাত্মা থেকে ভিন্ন, তবুও আপনি তাঁদের থেকে অভিন্ন। সব কিছু আপনি থেকেই উদ্ভুত হয়। নিঃসন্দেহে আপনি সর্বকারণের কারণ ভগবান শ্রীবিষ্ণু, অর্থাৎ সমস্ত দিব্য জ্ঞানের আলোক। কোটি কোটি বছর পর প্রলয়ের সময় যখন ব্যক্ত এবং অব্যক্ত সব কিছুই কালশক্তির দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়, তখন পঞ্চমহাভূত সূক্ষ্ণ তন্মাত্রে প্রবেশ করে এবং ব্যক্ত পদার্থসমূহ অব্যক্ততে লীন হয়ে যায়। তখন অনন্তশেষনাগ নামক আপনিই বর্তমান থাকেন। হে প্রকৃতির প্রবর্তক! এই অদ্ভুত সৃষ্টি যে কালের নিয়ন্ত্রণাধীনে কার্য করছে, নিমেষ থেকে শুরু করে বছর পর্যন্ত সেই মহাকাল বিষ্ণুস্বরূপ আপনারই আর একটি রূপ। আপনার লীলা-বিলাসের জন্য আপনি কালের নিয়ন্তারূপে কার্য করেন, কিন্তু আপনি সমস্ত সৌভাগ্যের আধার। আমি সর্বতোভাবে আপনার শরণাগত হই। এই জড় জগতে কেউই বিভিন্ন গ্রহলোকে পলায়ন করেও জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধির কবল থেকে মুক্ত হতে পারে না। কিন্তু, হে ভগবান, আপনি এখন আবির্ভূত হয়েছেন বলে মৃত্যু আপনার ভয়ে পলায়ন করছে এবং জীবেরা আপনার কৃপায় আপনার শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় লাভ করে পরম শান্তিতে অবস্থান করছে। হে ভগবান! আপনি আপনার ভক্তের সমস্ত ভয় দূর করেন, তাই আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি, আপনি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর কংসের ভয় থেকে আমাদের রক্ষা করুন। যোগীরা ধ্যানে আপনার বিষ্ণুরূপ দর্শন করে। যারা জড় চক্ষুর দ্বারা দর্শন করে, তাদের নিকট দয়া করে আপনি এই রূপ গোচরীভূত করবেন না। হে মধুসূদন! আপনার আবির্ভাবের ফলে আমি কংসের ভয়ে অধিক থেকে অধিকতর উদ্বিগ্ন হয়েছি। তাই কংস যাতে বুঝতে না পারে যে, আপনি আমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন, কৃপাপূর্বক আপনি তার উপায় করুন। হে ভগবান! আপনি সর্বব্যাপ্ত পরমেশ্বর এবং শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম সুশোভিত আপনার চিন্ময় চতুর্ভূজ রূপ এই জগতের পক্ষে অস্বাভাবিক। দয়া করে আপনি আপনার এই রূপ সংবরণ করুন ( এবং একটি সাধারণ নরশিশুর রূপ ধারণ করুন, যাতে আমি আপনাকে কোথাও লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারি)। প্রলয়ের সময় সমগ্র চরাচর সৃষ্টি আপনার চিন্ময় শরীরে প্রবেশ করে এবং আপনি অনায়াসে তা ধারণ করেন। কিন্তু এই সেই চিন্ময় রূপ আমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছে। মানুষ তা বিশ্বাস করতে পারবে না এবং তাই আমি তাদের উপহাসাস্পদ হব।”
ভগবান বললেন- “হে সতী, স্বায়ম্ভুব মন্বন্তরে তোমার পূর্বজন্মে তুমি পৃশ্নি নামে জন্মগ্রহণ করেছিলে এবং বসুদেব ছিল অতি পুণ্যবান প্রজাপতি সুতপা। তারপর তোমরা ব্রহ্মার আদেশে প্রজাসৃষ্টির জন্য ইন্দ্রিয়সমূহ সংযত করে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। হে পিতা! হে মাতা! তোমরা বিভিন্ন ঋতুতে বর্ষা, বায়ু, রৌদ্র, প্রবল তাপ এবং প্রচণ্ড শীত সহ্য করেছিলে। যৌগিক প্রাণায়ামের দ্বারা দেহের অভ্যন্তরে শ্বাস রোধ করে এবং গাছের শুষ্ক পাতা ও বায়ুমাত্র সেবন করে তোমরা তোমাদের হৃদয় কলুষমুক্ত করেছিলে। এইভাবে আমার কাছ থেকে বর লাভের আশায় তোমরা শান্তচিত্তে আমার আরাধনা করেছিলেন। এইভাবে তোমরা আমার চেতনায় (কৃষ্ণভাবনায়) মগ্ন হয়ে বারো হাজার দিব্য বৎসর ধরে কঠোর তপস্যা করেছিলে। হে নিষ্পাপ মাতা দেবকী! নিরন্তর শ্রদ্ধা এবং ভক্তি সহকারে হৃদয়ে আমার কথা চিন্তা করে কঠোর তপস্যায় সেই বারো হাজার দিব্য বৎসর অতিক্রান্ত হলে, আমি তোমাদের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলাম। যেহেতু আমি শ্রেষ্ঠ বরদাতা, তাই এই কৃষ্ণরূপে তোমাদের সম্মুখে আবির্ভূত হয়ে তোমাদের বাসনা অনুসারে আমার কাছ থেকে বর প্রার্থনা করতে বলেছিলাম। তোমরা তখন ঠিক আমার মতো পুত্র লাভের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলে। তোমরা, নিঃসন্তান দম্পতি মৈথুনধর্মে আকৃষ্ট হয়ে দেবমায়ার প্রভাবে আমার প্রতি চিন্ময় প্রেমবশত আমাকে তোমাদের পুত্ররূপে আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। তাই তোমরা এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্তি কামনা করনি। আমি চলে যাওয়ার পর, সেই বর প্রাপ্ত হয়ে তোমরা আমার মতো পুত্র লাভের জন্য মৈথুনধর্ম আচরণ করেছিলে এবং আমি তোমাদের বাসনা পূর্ণ করেছিলাম। ইহলোকে তোমাদের মতো সচ্চরিত্র এবং সরলতা প্রভৃতি গুণ সমন্বিত অন্য কাউকে না পেয়ে, আমি পৃশ্নিগর্ভ নামে তোমাদের পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেছিলাম। পরবর্তী যুগে যখন তোমরা পুনরায় অদিতি এবং কশ্যপরূপে আবির্ভূত হয়েছিলে, তখন আমি তোমাদের পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেছিলাম। তখন আমার নাম হয়েছিল উপেন্দ্র এবং খর্বাকৃতি হওয়ার ফলে আমি বামন নামেও বিখ্যাত হয়েছিলাম। হে সতী! সেই আমিই এখন তৃতীয়বার তোমাদের পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেছি। আমার এই বাক্য সত্য বলে জানবে। আমার পূর্ব জন্মের কথা স্মরণ করাবার জন্যই আমি তোমাদের এই বিষ্ণুরূপ প্রদর্শন করিয়েছি। তা না হলে, আমি যদি একটি সাধারণ নরশিশুরূপে আবির্ভূত হতাম, তবে তোমরা বিশ্বাস করতে না যে, শ্রীবিষ্ণুই তোমাদের পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তোমরা উভয়েই তোমাদের পুত্ররূপে আমার কথা চিন্তা কর, কিন্তু তোমরা জান যে, আমি ভগবান। এইভাবে স্নেহপূর্বক নিরন্তর আমার চিন্তা করে তোমরা পরম সিদ্ধি লাভ করবে, অর্থাৎ ভগবদ্ধামে ফিরে যাবে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে তাঁর পিতা-মাতাকে উপদেশ দিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নীরব হয়েছিলেন। তাঁদের সমক্ষেই তিনি তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা নিজেকে একটি প্রাকৃত শিশুতে রূপান্তরিত করেছিলেন। (অর্থাৎ, তিনি নিজেকে তাঁর আদি স্বরূপে রূপান্তরিত করেছিলেন- কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ম্।) তারপর, ভগবানের অনুপ্রেরণায় বসুদেব যখন নবজাত শিশুটিকে কোলে নিয়ে সূতিকাগৃহ থেকে বাইরে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় ভগবানের চিন্ময়ী শক্তি যোগমায়া নন্দ মহারাজের পত্নীর কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যোগমায়ার প্রভাবে সমস্ত দ্বাররক্ষকেরা ইন্দ্রিয়বৃত্তি রহিত হয়ে গভীর নিদ্রায় মগ্ন হয়েছিল এবং অন্যান্য পুরবাসীরাও গভীর নিদ্রায় অভিভূত হয়েছিলেন। সূর্যের উদয়ে যেমন অন্ধকার আপনা থেকেই দূর হয়ে যায়, তেমনই, শ্রীকৃষ্ণকে কোলে নিয়ে বসুদেব সমাগত হওয়া মাত্রই লৌহ খিলকযুক্ত শৃঙ্খলের দ্বারা আবদ্ধ বিশাল কপাটগুলি আপনা থেকে উন্মুক্ত হয়েছিল। তখন মেঘ মন্দ মন্দ গর্জন সহকারে বারি বর্ষণ করছিল বলে, ভগবানের অংশ অনন্তশেষনাগ দরজা থেকেই বসুদেব এবং তাঁর চিন্ময় শিশুটিকে সেই বৃষ্টিপাত থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁর ফণা বিস্তার করে বসুদেবের অনুগমন করেছিলেন। নিরন্তর ইন্দ্রদেবের বর্ষণে যমুনা নদী গভীর জলরাশির বেগজাত তরঙ্গে ফেনিল এবং ভয়ানক আবর্তসমূহে আকুল হয়েছিল। কিন্তু সমুদ্র যেভাবে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রকে সেতুবন্ধন করতে দিয়ে পথ প্রদান করেছিল, যমুনা নদীও সেইভাবে বসুদেবকে নদী পার হওয়ার পথ প্রদান করল। নন্দ মহারাজের গৃহে পৌছে বসুদেব দেখলেন যে, সমস্ত গোপেরা গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত। তিনি তখন তাঁর পুত্রটিকে যশোদার শয্যায় স্থাপন করে যোগমায়ারূপিণী তাঁর কন্যাকে গ্রহনপূর্বক পুনরায় কংসের কারাগারে ফিরে এসেছিলেন। বসুদেব সেই কন্যাটিকে দেবকীর শয্যায় স্থাপনপূর্বক তাঁর পায়ে লৌহশৃঙ্খল বন্ধন করে পূর্বের মতো আবদ্ধভাবে অবস্থান করলেন। প্রসববশত পরিশ্রান্তা যশোদাদেবী গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়েছিলেন এবং তাই তিনি বুঝতে পারেননি তাঁর পুত্র হয়েছিল, না কন্যা হয়েছিল।”
তৃতীয় অধ্যায়- শ্রীকৃষ্ণের জন্ম
04 Jun 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়