শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “মগধ রাজ জরাসন্ধের আশ্রয়ে এবং প্রলম্ব, বক, চাণুর, তৃণাবর্ত, অঘাসুর, মুষ্টিক, অরিষ্ট, দ্বিবিদ, পূতনা, কেশী, ধেনুক, বাণ, নরকাসুর এবং অন্যান্য অসুর ভূপতিদের সহায়তায় পরাক্রমশালী কংস, যদুবংশীয় রাজাদের উৎপীড়ন করতে আরম্ভ করেছিল। আসুরিক রাজাদের দ্বারা উৎপীড়িত হয়ে যাদবেরা তাঁদের রাজ্য পরিত্যাগ করে কুরু, পঞ্চাল, কেকয়, শাল্ব, বিদর্ভ, নিষধ, বিদেহ এবং কোশল আদি রাজ্যে প্রবেশ করেছিলেন। কংসের কয়েকজন আত্মীয় কিন্তু কংসের নীতি এবং আচরণ অনুসরণ করতে লাগল। উগ্রসেনের পুত্র কংস দেবকীর ছ’টি পুত্র বিনাশ করলে, শ্রীকৃষ্ণের অংশ দেবকীর সপ্তম পুত্ররূপে তাঁর গর্ভে প্রবেশ করে তাঁর হর্ষ এবং শোক বর্ধন করেছিলেন। মহান ঋষিগণ এই অংশকে শ্রীকৃষ্ণের দ্বিতীয় চতুর্ব্যূহ সঙ্কর্ষণ বা অনন্ত বলে সম্বোধন করেন।
বিশ্বাত্মা ভগবান তাঁর অনুগত ভক্ত যাদবদের কংসের আক্রমণের ভয় থেকে রক্ষা করার জন্য যোগমায়াকে এইভাবে আদেশ দিয়েছিলেন- হে সমগ্র জগতের পূজনীয়া এবং সমস্ত জীবের মঙ্গল বিধানকারিণী, তুমি ব্রজে যাও, যেখানে বহু গোপ এবং গোপীগণ বাস করেন। সেই অতি মনোরম স্থানে, যেখানে বহু গাভী বাস করে, সেখানে বসুদেবের পত্নী রোহিণী নন্দ মহারাজের গৃহে অবস্থান করছেন। তাই বসুদেবের অন্য পত্নীগণও কংসের ভয়ে অজ্ঞাতসারে সেখানে বাস করছেন। তুমি সেখানে যাও। দেবকীর গর্ভে সঙ্কর্ষণ বা শেষ নামক আমার অংশ বিরাজ করছেন, অক্লেশে তাঁকে রোহিণীর গর্ভে স্থানান্তরিত কর। হে সর্বমঙ্গলময়ী যোগমায়া! আমি তখন আমার পূর্ণ ষড়ৈশ্বর্য সহ দেবকীর পুত্ররূপে আবির্ভূত হব এবং তুমিও নন্দ মহারাজের মহারাণী মা যশোদার কন্যারূপে আবির্ভূত হবে। সকলের জড় বাসনা পূর্ণ করতে তোমার ক্ষমতা সর্বশ্রেষ্ঠ বলে সাধারণ মানুষ পশুবলির দ্বারা এবং বিবিধ উপকরণের দ্বারা মহাসমারোহে তোমার পূজা করবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মায়াদেবীকে এই বলে আশীর্বাদ করেছিলেন- পৃথিবীতে মানুষেরা বিভিন্ন স্থানে তোমার দুর্গা, ভদ্রকালী, বিজয়া, বৈষ্ণবী, কুমুদা, চণ্ডিকা, কৃষ্ণা, মাধবী, কন্যকা, মায়া, নারায়ণী, ঈশানী, শারদা, অম্বিকা প্রভৃতি নামকরণ করবে। দেবকীর গর্ভ থেকে রোহিণীর গর্ভে আকৃষ্ট হওয়ার ফলে রোহিণীনন্দন সঙ্কর্ষণ নামে অভিহিত হবেন। গোকুলবাসী লোকসমূহের আনন্দবিধান করার জন্য রাম এবং তাঁর অমিত বলের জন্য তিনি বলভদ্র নামে কীর্তিত হবেন।”
“ভগবানের দ্বারা এইভাবে আদিষ্ট হয়ে যোগমায়া তৎক্ষণাৎ সেই আদেশ শিরোধার্য করেছিলেন। ওঁ উচ্চারণের দ্বারা তিনি যে তাঁর সেই আদেশ পালন করবেন তা প্রতিপন্ন করেছিলেন। তারপর ভগবানকে প্রদক্ষিণ করে তিনি পৃথিবীতে নন্দগোকুল নামক স্থানে গমন করেছিলেন এবং ভগবানের নির্দেশ অনুসারে কার্য করেছিলেন। যোগমায়ার দ্বারা দেবকীর সন্তান যখন রোহিণীর গর্ভে আকৃষ্ট হয়েছিলেন, তখন দেবকীর মনে হয়েছিল যে, তাঁর গর্ভপাত হয়েছে এবং তার ফলে সমস্ত পুরবাসীরা ‘হায়, দেবকীর গর্ভ নষ্ট হল!’ এই বলে উচ্চস্বরে বিলাপ করতে লাগলেন। এইভাবে সমস্ত জীবের পরমাত্মা এবং ভক্তদের সমস্ত ভয় বিনাশকারী ভগবান তাঁর সমস্ত ঐশ্বর্য সহ বসুদেবের চিত্তে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বসুদেব তাঁর হৃদয়ে ভগবানকে ধারণ করে, ভগবানের চিন্ময় জ্যোতির প্রভাবে সূর্যের মতো দীপ্তিশালী হয়েছিলেন। তাই ইন্দ্রিয় অনুভূতির দ্বারা তাঁকে দর্শন করা অথবা তাঁর সমীপবর্তী হওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। বস্তুতপক্ষে, তাঁর সেই তেজ কংস আদি জীবমাত্রেরই দুঃসহ হয়েছিল। তারপর পরম ঐশ্বর্যমণ্ডিত, সমস্ত জগতের মঙ্গল বিধানকারী ভগবান তাঁর অংশ সহ বসুদেবের চিত্ত থেকে দেবকীর চিত্তে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। এইভাবে বসুদেবের দ্বারা দীক্ষিত হয়ে, দেবকী সমস্ত চেতনার উৎস, সর্বকারণের কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর হৃদয়ে ধারণ করে পরম সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়েছিলেন, ঠিক যেভাবে উদীয়মান চন্দ্রকে ধারণ করে পূর্বদিক সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়। দেবকী সর্বকারণের পরম কারণ, সমগ্র জগতের আশ্রয় ভগবানকে তাঁর মধ্যে ধারণ করেছিলেন, কিন্তু কংসের গৃহে কারারুদ্ধ হওয়ার ফলে তাঁর সেই চিন্ময় সৌন্দর্য কেউ দর্শন করতে পারেনি, ঠিক যেমন পাত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত অগ্নির শিখা কেউ দেখতে পায় না, অথবা জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তা বিতরণ না করা হলে যেমন মানুষের তাতে কোন লাভ হয় না। দেবকীর অন্তরে ভগবান বিরাজমান থাকায় তাঁর প্রভার দ্বারা কারাগৃহ আলোকিত হয়েছিল। তাঁকে আনন্দময়, শুদ্ধ এবং হাস্যোজ্জ্বল দর্শন করে কংস মনে মনে বিচার করেছিল, ‘আমার প্রাণনাশক ভগবান শ্রীবিষ্ণু নিশ্চয়ই দেবকীর গর্ভে প্রবেশ করেছে, কারণ পূর্বে দেবকী কখনও এই রকম আনন্দময় এবং প্রভাবতী ছিল না।’ কংস ভেবেছিল, এখন আমার কি করা কর্তব্য? ভগবান, যিনি তাঁর উদ্দেশ্য জানেন (পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্), তিনি তাঁর বিক্রম পরিত্যাগ করবেন না। দেবকী একটি স্ত্রী, সে আমার ভগ্নী এবং অধিকন্তু সে গর্ভবতী। আমি যদি তাকে বধ করি, তা হলে আমার যশ, ঐশ্বর্য, আয়ু নিশ্চিতরূপে বিনষ্ট হবে। যে ব্যক্তি অত্যন্ত নিষ্ঠুর, সে জীবিত অবস্থায়ও মৃত, কারণ জীবিত অবস্থায় এবং তার মৃত্যুর পর সকলেই তাকে অভিশাপ প্রদান করতে থাকে। আর মৃত্যুর পর সেই দেহাত্মাভিমানী ব্যক্তি নিঃসন্দেহে অন্ধতম নামক নরকে প্রবেশ করে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে বিচার করে কংস ভগবানের প্রতি বৈরীভাব পোষণ করতে বদ্ধপরিকর হওয়া সত্ত্বেও ভগ্নীবধরূপ জঘন্য কার্য থেকে বিরত হয়েছিল। সে স্থির করেছিল যে, ভগবানের জন্ম হওয়া পর্যন্ত সে অপেক্ষা করবে এবং তারপর যা করণীয় তা করবে। কংস সিংহাসনে অথবা তার ঘরে উপবেশন করার সময়, শয্যায় শয়ন করার সময়, কোন স্থানে অবস্থান করার সময়, ভোজন করার সময় অথবা বিচরণ করার সময় সর্বদাই তার শত্রু ভগবান হৃষীকেশকে কেবল দর্শন করেছিল। অর্থাৎ, তার সর্বব্যাপক শত্রুর কথা চিন্তা করে কংস প্রতিকূলভাবে কৃষ্ণভাবনায় ভাবিত হয়েছিল। নারদ, দেবল, ব্যাস প্রমুখ ঋষিগণ এবং ইন্দ্র, চন্দ্র, বরুণ প্রভৃতি দেবতাগণ সহ ব্রহ্মা এবং শিব অদৃশ্যভাবে দেবকীর কক্ষে আগমন করে, সকলে একত্রে সর্ব আশীর্বাদ প্রদানকারী ভগবানের প্রসন্নতা বিধানের জন্য স্তব করতে লাগলেন।”
দেবতারা প্রার্থনা করেছিলেন, “হে ভগবান! আপনি সত্যসঙ্কল্প, অর্থাৎ আপনি যা সঙ্কল্প করেন, তার সত্যতা সংরক্ষণ করেন এবং কেউই তা রোধ করতে পারে না। তাই আপনি সত্যব্রত। সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয় এই ত্রিবিধ কালে আপনি সমানভাবে বর্তমান থাকেন বলে আপনি ত্রিসত্য। সম্পূর্ণরূপে সত্যনিষ্ঠ না হলে আপনার অনুগ্রহ লাভ করা যায় না। তাই মিথ্যাশ্রয়ী ব্যক্তিরা কখনও আপনাকে লাভ করতে পারে না। আপনি সৃষ্টির সমস্ত উপাদানে সক্রিয় তত্ত্ব পরম সত্য এবং তাই আপনি অন্তর্যামী। আপনি সকলের প্রতি সমদর্শী এবং আপনার উপদেশ সর্বলোকের, সর্বকালের উপযোগী। আপনি সমস্ত সত্যের আদি। তাই আমরা আপনাকে প্রণতি নিবেদন করে আপনার শরণ গ্রহণ করি, দয়া করে আপনি আমাদের রক্ষা করুন। এই দেহ (সমষ্টি ও ব্যষ্টি) আদি বৃক্ষস্বরূপ, প্রকৃতি তার আশ্রয় এবং সুখ ও দুঃখ তার দুটি ফল। সত্ত্ব, রজ ও তম- এই তিনটি গুণ তার মূল। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ- এই চারটিই রস, যা আস্বাদন হয় পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শোক, মোহ, জরা, মৃত্যু, ক্ষুধা ও পিপাসা- এই ছ’টি পরিস্থিতিতে। এই বৃক্ষের সাতটি আবরণ হচ্ছে- ত্বক্, রুধির, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা ও শুক্র এবং এই বৃক্ষের আটটি শাখা হচ্ছে পাঁচটি স্থূল ও তিনটি সূক্ষ্ম উপাদান- মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ, মন ও বুদ্ধি এবং অহঙ্কার। এই বৃক্ষরূপ দেহের নটি ছিদ্র- দুটি চক্ষু, দুটি কর্ণ, দুটি নাসিকা, মুখ, পায়ু এবং উপস্থ এবং তার দশটি পত্র হচ্ছে দেহের মধ্যস্থিত দশ প্রকার বায়ু। এই শরীররূপী বৃক্ষে দুটি পক্ষী রয়েছে- জীবাত্মা এবং পরমাত্মা।”
“হে ভগবান! এই সংসাররূপ আদি বৃক্ষের আপনিই একমাত্র উপাদান কারণ। আপনিই তার একমাত্র পালনকর্তা এবং প্রলয়ের পর আপনার মধ্যেই সব কিছু সংরক্ষণ হয়। যারা আপনার মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন, তারা এই জগতের পিছনে যে আপনি রয়েছেন তা দেখতে পায় না, কিন্তু তত্ত্বজ্ঞানী ভক্তদের দৃষ্টি তাদের মতো নয়। হে ভগবান, আপনি সর্বদা পূর্ণ জ্ঞানময় এবং সমস্ত জীবদের কল্যাণ সাধনের জন্য আপনি বিবিধ অবতাররূপে আবির্ভূত হন এবং তারা সকলেই জড় সৃষ্টির অতীত শুদ্ধ সত্ত্বে বিরাজমান। এই সমস্ত অবতাররূপে আপনি যখন আবির্ভূত হন, তখন আপনি সাধু এবং ভক্তদের আনন্দবিধান করেন, কিন্তু অভক্তদের বিনাশ করেন। হে কমলনয়ন ভগবান! সমস্ত অস্তিত্বের আশ্রয়স্বরূপ আপনার চরণকমলের ধ্যান করে এবং মহাজনদের পদাঙ্ক অনুসরণপূর্বক সেই চরণকমলকে ভগসাগর উত্তীর্ণ হওয়ার তরণীরূপে গ্রহণ করে অনায়াসে ভবসাগর উত্তীর্ণ হওয়া যায়, কারণ ভবসাগর তখন গোষ্পদসদৃশ হয়ে যায়। হে প্রভু! আপনি সূর্যের মতো এই জড় জগতের সমস্ত অন্ধকার দূর করেন। আপনি সর্বদা আপনার ভক্তের বাসনা পূর্ণ করতে প্রস্তুত থাকেন এবং তাই আপনি বাঞ্ছাকল্পতরু নামে পরিচিত। ভয়ঙ্কর ভগসাগর পার হবার জন্য আচার্যগণ যে পন্থা অবলম্বন করেছেন, তাঁরা এই জগতে সেই পন্থাটি রেখে গেছেন এবং যেহেতু আপনি আপনার ভক্তদের প্রতি অত্যন্ত কৃপালু, তাই তাঁদের সাহায্য করার জন্য আপনি এই পন্থা অবলম্বন করেন। (যদি কেউ বলে যে, ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয়ের অন্বেষণকারী ভক্ত ছাড়াও বহু ভক্তিবিমুখ ব্যক্তি রয়েছে, যারা মুক্তি লাভের জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছে, তাদের কি হবে? তার উত্তরে ব্রহ্মা আদি দেবতারা বলেছেন- ) হে পদ্মলোচন! অভক্তরা পরম পদ লাভ করার জন্য কঠোর তপস্যা এবং কৃচ্ছ্রসাধনের পন্থা অবলম্বন করে নিজেদের মুক্ত বলে মনে করতে পারে, কিন্তু ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে প্রীতি না থাকায় তাদের বুদ্ধি অবিশুদ্ধ। তারা তাদের কল্পিত পরম পদ থেকে অধঃপতিত হয়, কারণ তারা আপনার শ্রীপাদপদ্মকে অনাদর করেছে। হে মাধব! হে লক্ষ্মীপতি ভগবান! আপনার সঙ্গে পূর্ণপ্রেমে সম্পর্কযুক্ত ভক্তরা যদি কখনও ভক্তিপথ থেকে ভ্রষ্টও হন, তবুও তাঁরা অভক্তদের মতো অধঃপতিত হন না, কারণ আপনি তাঁদের রক্ষা করেন। তাই তাঁরা নিঃশঙ্কচিত্তে বিঘ্ন উৎপাদনকারীদের মস্তকে পদার্পণ করে ভক্তিপথে অগ্রসর হতে থাকেন।”
“হে ভগবান! এই জগতের পালন করার সময় আপনি ত্রিগুণাতীত, বিশুদ্ধ সত্ত্বময় শরীর সমন্বিত অবতারদের প্রকাশ করেন। এইভাবে যখন আপনি আবির্ভূত হন, তখন আপনি জীবদের বেদক্রিয়া, যোগ, তপস্যা এবং আপনার ভাবনায় আনন্দমগ্ন হওয়ার সমাধির পন্থা শিক্ষাদান করে তাদের মঙ্গল সাধন করেন। এইভাবে বৈদিক বিধান অনুসারে আপনি পূজিত হন। হে সর্ব কারণের পরম কারণ ভগবান! আপনার চিন্ময় শরীর যদি গুণাতীত না হত, তা হলে কেউই জড় পদার্থ এবং চিন্ময় তত্ত্বের পার্থক্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারত না। আপনার উপস্থিতির ফলেই কেবল জড়া প্রকৃতির নিয়ন্তা আপনার চিন্ময় প্রকৃতি হৃদয়ঙ্গম করা যায়। আপনার চিন্ময় স্বরূপের উপস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত না হলে, আপনার চিন্ময় প্রকৃতি হৃদয়ঙ্গম করার অত্যন্ত কঠিন। হে ভগবান, যারা কল্পনার দ্বারা কেবল অনুমান করে, তারা কখনও আপনার নাম এবং রূপ নিরূপণ করতে পারে না। ভক্তির দ্বারাই কেবল আপনার নাম, রূপ এবং গুণ নিশ্চিতভাবে হৃদয়ঙ্গম করা যায়। হে ভগবান! আপনার শ্রীপাদপদ্মে আবিষ্টচিত্ত হয়ে যাঁরা আপনার দিব্য নাম ও রূপ নিরন্তর শ্রবণ, কীর্তন ও ধ্যান করেন এবং অন্যদের স্মরণ করান, তাঁরা সর্বদা চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত এবং তাই তাঁরা আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। হে ভগবান! আপনার আবির্ভাবের ফলে তৎক্ষণাৎ এই পৃথিবী থেকে অসুরদের ভার অপনীত হয়েছে, সেটি আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমরা যথার্থই ভাগ্যবান, কারণ এই পৃথিবীতে এবং স্বর্গলোকে আপনার শ্রীপাদপদ্মের শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্মের চিহ্ন আমরা দর্শন করতে পারব। হে ভগবান, আপনি সকাম কর্মের ফলে এই জড় জগতের জন্মগ্রহণকারী এক সাধারণ জীব নন। তাই এই জগতে আপনার আবির্ভাব বা জন্ম আপনার হ্লাদিনী শক্তি দ্বারা সম্পাদিত লীলাবিলাস ছাড়া আর কিছু নয়। তেমনই, আপনার বিভিন্ন অংশ জীবদের জন্ম, মৃত্যু, জরা ইত্যাদি আপনার বহিরঙ্গা শক্তির দ্বারা সম্পাদিত হয়ে থাকে। হে পরমেশ্বর ভগবান! আপনি পূর্বে মৎস্য, অশ্ব, কূর্ম, নৃসিংহ, বরাহ, হংস, রামচন্দ্র, পরশুরাম এবং দেবতাদের মধ্যে বামনদেব রূপে অবতীর্ণ হয়ে আমাদের এবং ত্রিভুবনকে কৃপাপূর্বক রক্ষা করেছেন। দয়া করে এখন আবার পৃথিবীর ভার হরণ করে আমাদের রক্ষা করুন। হে কৃষ্ণ! হে যদুত্তম! আমরা শ্রদ্ধা সহকারে আপনাকে আমাদের প্রণতি নিবেদন করি। হে মাতঃ দেবকী, ভাগ্যক্রমে আমাদের মঙ্গলের জন্য সাক্ষাৎ পরম পুরুষ ভগবান বলদেব সহ আপনার গর্ভস্থ হয়েছেন। তাই আপনার হস্তে নিহত হওয়ার অভিলাষী কংসের থেকে আপনার কোন ভয় নেই। আপনার নিত্য পুত্র কৃষ্ণ সমস্ত যদুবংশের রক্ষক হবেন। এইভাবে চিন্ময় পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর স্তব করে সমস্ত দেবতারা ব্রহ্মা এবং শিবকে তাঁদের অগ্রভাগে রেখে স্বর্গলোকে ফিরে গিয়েছিলেন।”
দ্বিতীয় অধ্যায়- দেবতাদের দ্বারা গর্ভস্থ শ্রীকৃষ্ণের বন্দনা
03 Jun 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়