মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন- “হে প্রভু! আপনি ইতিপূর্বেই চন্দ্র এবং সূর্যবংশের রাজাদের অত্যন্ত মহান এবং বিস্ময়জনক চরিত্র বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। হে মুনিশ্রেষ্ঠ! আপনি অত্যন্ত পুণ্যবান এবং ধর্মনিষ্ঠ যদুবংশেরও বর্ণনা করেছেন। এখন সেই যদুবংশে বলদেব সহ অবতীর্ণ ভগবান শ্রীবিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের অদ্ভুত মহিমান্বিত লীলাসমুহ আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। বিশ্বাত্মা, জগৎকারণ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যদুবংশে অবতীর্ণ হয়ে যে যে লীলা প্রকাশ করেছিলেন, সেই লীলা এবং চরিতাবলী আমাদের কাছে আনুপূর্বিক বর্ণনা করুন। ভগবানের মহিমা কীর্তন শ্রৌত পরম্পরায় সাধিত হয়, অর্থাৎ শ্রীগুরুর মুখপদ্ম থেকে শিষ্য শ্রবণের দ্বারা তা হৃদয়ঙ্গম করেন। এই কীর্তনের আনন্দ তাঁরাই আস্বাদন করতে পারেন, যাঁরা অলীক এবং ক্ষণস্থায়ী জড় জগতের বিষয়ের আলোচনায় আগ্রহশীল নন। ভগবানের মহিমা কীর্তন সংসার-বন্ধনে আবদ্ধ বদ্ধ জীবের ভবরোগের মহৌষধ। অতএব পশুঘাতী অথবা আত্মঘাতী ব্যতীত কে ভগবানের এই মহিমা কীর্তন শ্রবণ না করবে? শ্রীকৃষ্ণের চরণ-কমলরূপী নৌকা আশ্রয় করে আমার পিতামহ অর্জুন আদি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দেববিজয়ী অতিরথ ভীষ্মাদিরূপ তিমিঙ্গিলসঙ্কুল কৌরব সেনাবাহিনীর সমুদ্রকে ভগবানের কৃপায় গোষ্পদের মতো অবলীলক্রমে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আমার মা শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করেছিলেন বলে, ভগবান সুদর্শন চক্র হস্তে তাঁর গর্ভে প্রবেশ করে অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্রে নষ্টপ্রায় কুরু এবং পাণ্ডবকুলের শেষ বংশধর আমার এই শরীর রক্ষা করেছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত জীবের অন্তরে এবং বাইরে শাশ্বত কালরূপে- অর্থাৎ পরমাত্মারূপে এবং বিরাটরূপে তাঁর শক্তির দ্বারা প্রকাশিত হয়ে সকলকে নিষ্ঠুর মৃত্যুরূপে অথবা জীবনরূপে মুক্তি প্রদান করেন। দয়া করে সেই ভগবানের দিব্য চরিতাবলী বর্ণনা করুন।”
“হে শুকদেব গোস্বামী! আপনি পূর্বে বলেছেন যে, দ্বিতীয় চতুর্ব্যূহের সঙ্কর্ষণ, রোহিণীর পুত্র বলরামরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। বলরামের দেহান্তর না হলে, তাঁর পক্ষে প্রথমে দেবকীর গর্ভে এবং তারপর রোহিণীর গর্ভে অবস্থান কিভাবে সম্ভব হয়েছিল? দয়া করে সেই কথা বর্ণনা করুন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেন তাঁর পিতা বসুদেবের গৃহ থেকে বৃন্দাবনে নন্দ মহারাজের গৃহে নিজেকে স্থানান্তরিত করেছিলেন? যাদবেশ্বর ভগবান তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে বৃন্দাবনে কোথায় অবস্থান করেছিলেন? শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন এবং মথুরা উভয় স্থানেই বাস করেছিলেন। তিনি সেখানে কি করেছিলেন? তিনি কেন তাঁর মাতুল কংসকে বধ করেছিলেন? এই প্রকার স্বজন বধ যদিও শাস্ত্রানুমোদিত নয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরীর জড় নয়, তবুও তিনি মনুষ্যরূপে আবির্ভূত হন। তিনি কত বছর বৃষ্ণিদের সঙ্গে ছিলেন? তাঁর কত পত্নী ছিল? তিনি কত বছর দ্বারকায় বাস করেছিলেন? হে মহর্ষি! আপনি শ্রীকৃষ্ণের বিষয়ে সব কিছু জানেন। দয়া করে আপনি যে-সম্বন্ধে আমি প্রশ্ন করেছি এবং প্রশ্ন করিনি, সবিস্তারে তাঁর সেই সমস্ত কার্যকলাপ বর্ণনা করুন, কারণ তাঁর প্রতি আমার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে এবং সেই বিষয়ে শ্রবণ করতে আমি অত্যন্ত উৎসুক। আমার মৃত্যু আসন্ন জেনে আমি প্রায়োপবেশনের প্রতিজ্ঞা করে জলপান পর্যন্ত ত্যাগ করেছি, তবুও আপনার মুখপদ্ম-নিঃসৃত কৃষ্ণলীলামৃত পান করার ফলে অত্যন্ত অসহনীয় ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা আমার কোন বিঘ্ন উৎপাদন করছে না।”
শ্রীল সূত গোস্বামী বললেন- “হে ভৃগুনন্দন (শৌনক ঋষি), পরম পূজ্য মহাভাগবত ব্যাসনন্দন শ্রীল শুকদেব গোস্বামী পরীক্ষিৎ মহারাজের সাধু প্রশ্ন শ্রবণ করে গভীর শ্রদ্ধা সহকারে রাজাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। তারপর তিনি কলিকলুষনাশিনী কৃষ্ণলীলা বর্ণনা করতে শুরু করেছিলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজর্ষিশ্রেষ্ঠ! যেহেতু আপনি শ্রীবাসুদেবের কথায় অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়েছেন, তাই নিশ্চিতভাবে আপনার বুদ্ধি আধ্যাত্মিক জ্ঞানে স্থির হয়েছে, যা মানব-জীবনের চরম লক্ষ্য। যেহেতু এই আকর্ষণ অপ্রতিহতা, তাই তা নিশ্চিতরূপে পরম মঙ্গলজনক। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পাদোদ্ভূতা গঙ্গা যেমন ত্রিভুবনকে পবিত্র করে, তেমনই বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের লীলা এবং চরিত্র বিষয়ক প্রশ্ন বক্তা, প্রশ্নকর্তা এবং শ্রোতা এই তিন প্রকার ব্যক্তিকে পবিত্র করে। মাতা বসুন্ধরা গর্বিত রাজবেশধারী দৈত্যদের অসংখ্য সৈন্যের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। মাতা বসুন্ধরা গো-রূপ ধারণ করে কাতর স্বরে ক্রন্দন করতে করতে অশ্রুপূর্ণ নয়নে ব্রহ্মার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে তাঁকে তাঁর দুর্ভাগ্যের কথা নিবেদন করেছিলেন। তারপর মাতা ধরিত্রীর দুঃখের কথা শ্রবণ করে, ব্রহ্মা অন্যান্য দেবতাগণ সহ মাতা ধরিত্রীকে নিয়ে ক্ষীরসমুদ্রের তীরে গিয়েছিলেন। দেবতারা ক্ষীরসমুদ্রের তীরে উপস্থিত হয়ে সমগ্র জগতের নাথ, দেবদেব, সকলের পালনকর্তা এবং দুঃখ-নিবারক ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুকে সমাহিত চিত্তে পুরুষসূক্ত মন্ত্রের দ্বারা উপাসনা করেছিলেন। ব্রহ্মা সমাধিমগ্ন অবস্থায় আকাশে ধ্বনিত ভগবান শ্রীবিষ্ণুর বাণী শ্রবণ করে দেবতাদের বলেছিলেন- হে দেবতাগণ! তোমরা আমার কাছ থেকে পরম পুরুষ ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুর বাণী শ্রবণ কর এবং অবিলম্বে তা সম্পাদন করতে যত্নবান হও।”
ব্রহ্মা দেবতাদের বললেন- “আমরা নিবেদন করার পূর্বেই ভগবান পৃথিবীর কষ্ট অবগত ছিলেন। তাই ভগবান যতদিন তাঁর কালশক্তির দ্বারা পৃথিবীর ভার হরণ করার জন্য পৃথিবীতে বিচরণ করবেন, ততদিন তোমরা তাঁর পুত্র এবং পৌত্ররূপে যদুবংশে অবতীর্ণ হও। সর্বশক্তিমান ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং বসুদেবের পুত্ররূপে আবির্ভূত হবেন। অতএব দেবপত্নীগণও তাঁর প্রসন্নতা বিধানের জন্য সেখানে আবির্ভূত হোন। শ্রীকৃষ্ণের প্রথম অংশ সঙ্কর্ষন বা অনন্ত। তিনি এই জড় জগতে সমস্ত অবতারের আদি উৎস। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পূর্বে এই মূল সঙ্কর্ষণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করার জন্য বলদেবরূপে আবির্ভূত হবেন। ভগবানেরই সমকক্ষ বিষ্ণুমায়া নাম্নী ভগবানের শক্তি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ আবির্ভূত হবেন। এই শক্তি বিভিন্নভাবে কার্য করে জড় এবং চেতন উভয় জগৎকে মোহিত করবেন। তাঁর প্রভুর আদেশে তিনি ভগবানের কার্য সম্পাদন করার জন্য তাঁর বিভিন্ন শক্তিসহ আবির্ভূত হবেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “দেবতাদের এইভাবে উপদেশ দিয়ে এবং মাতা বসুন্ধরাকে আশ্বাস প্রদান করে, পরম শক্তিমান এবং প্রজাপতিদের পতি ব্রহ্মা তঁর ধাম ব্রহ্মলোকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। পুরাকালে যদূপতি শূরসেন মথুরা নগরীতে বাস করে মাথুর এবং শূরসেন নামক দেশসমূহ উপভোগ করেছিলেন। সেই সময় থেকে মথুরা নগরী সমস্ত যদুবংশীয় রাজাদের রাজধানী হয়েছিল। সেই নগরী এবং দেশ মথুরা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেখানে নিত্য বিরাজমান। কিছুকাল পূর্বে, দেববংশীয় (অথবা শূরবংশীয়) বসুদেব দেবকীকে বিবাহ করে তাঁর নববিবাহিতা পত্নীসহ গৃহে প্রত্যাবর্তন করার জন্য রথে আরোহণ করেছিলেন। রাজা উগ্রসেনের পুত্র কংস তাঁর ভগ্নী দেবকীকে তাঁর বিবাহের অবসরে প্রসন্নতা বিধানের জন্য শত শত স্বর্ণময় রথের দ্বারা পরিবৃত হয়ে তাঁর রথের সারথিরূপে অশ্বগণের রশ্মি গ্রহণ করেছিল। দেবকীর পিতা রাজা দেবক তাঁর কন্যাকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। তাই, তাঁর কন্যা এবং জামাতা যখন তাঁর গৃহ থেকে চলে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি যৌতুকস্বরূপ তাঁর কন্যাকে স্বর্ণমালায় বিভূষিত চারশত হস্তী, দশ হাজার অশ্ব, আঠারশ রথ এবং বিবিধ অলঙ্কারে বিভূষিত দুইশত অত্যন্ত সুন্দরী যুবতী দাসী প্রদান করেছিলেন।”
“হে বৎস পরীক্ষিৎ! বর এবং বধূ যখন যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন, তখন তাঁদের যাত্রার শুভকামনা করে শঙ্খ, তূর্য, মৃদঙ্গ এবং দুন্দুভি যুগপৎ নিনাদিত হয়েছিল। কংস যখন অশ্বের রজ্জু গ্রহণ করে রথ চালনা করছিল, তখন পথের মধ্যে তাকে সম্বোধন করে একটি দৈববাণী হয়েছিল- ‘ওরে মূর্খ! তুই যাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিস, তার অষ্টম সন্তান তোকে হত্যা করবে।’ কংস ছিল অত্যন্ত ক্রূরমতি ও পাপী এবং তাই সে ছিল ভোজকুলের কলঙ্ক। সেই দৈববাণী শ্রবণ করে সে তার বাম হস্তে তাঁর ভগ্নীর কেশ ধারণ করে ডান হাতে তার খড়গ উত্তোলন করে তার মস্তক ছেদন করতে উদ্যত হয়েছিল। কংস এতই নিষ্ঠুর, নির্লজ্জ এবং ক্রূর ছিল যে, সে ভগ্নীহত্যারূপ নিন্দিত কর্ম করতে উদ্যত হয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণের পিতা হওয়ার মহাসৌভাগ্য অর্জনকারী বসুদেব তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তখন বলেছিলেন, ‘হে কংস, তুমি ভোজবংশের গৌরব এবং মহান বীরেরা তোমার গুণাবলীর প্রশংসা করে। তোমার মতো একজন গুণবান ব্যক্তি কিভাবে বিবাহ উৎসব বাসরে তার ভগ্নী এক অবলা স্ত্রীকে হত্যা করতে পারে? হে মহাবীর, যার জন্ম হয়েছে, তার দেহের সঙ্গে মৃত্যুরও উৎপত্তি হয়েছে। আজ হোক অথবা একশ বছর পরেই হোক, দেহধারী জীবের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। বর্তমান শরীর পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হলে অর্থাৎ মাটি, জল, আগুন, বায়ু এবং আকাশে লীন হয়ে গেলে, দেহী বা জীব তার কর্মফল অনুসারে বিনা যত্নেই আর একটি দেহ প্রাপ্ত হয়। পরবর্তী শরীর প্রাপ্ত হয়ে সে বর্তমান শরীর ত্যাগ করে। মানুষ যেমন পথ চলার সময় এক পা মাটিতে রেখে তারপর অন্য পা উত্তোলন করে, অথবা কীট যেমন এক তৃণ আশ্রয় করে পূর্বাশ্রিত তৃণ ত্যাগ করে, তেমনই বদ্ধ জীব এক দেহ গ্রহণ করে তার পূর্ববর্তী দেহ ত্যাগ করে। কোন পরিস্থিতি দর্শন করে অথবা সেই সম্বন্ধে শ্রবণ করে মানুষ যেমন সেই পরিস্থিতির চিন্তা করে এবং অনুমান করে এবং তার বর্তমান শরীরের কথা বিবেচনা না করে সেই অবস্থায় বশীভূত হয়ে পড়ে, অনুরূপভাবে মনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সে রাত্রে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেহে অবস্থান করার স্বপ্ন দেখে তার বর্তমান স্থিতি বিস্মৃত হয়। তেমনই জীব তার বর্তমান শরীর ত্যাগ করে আর একটি শরীর গ্রহণ করে (তথা দেহান্তরপ্রাপ্তিঃ) মৃত্যুকালে সকাম কর্মে লিপ্ত মনের চিন্তা, অনুভূতি এবং ইচ্ছা অনুসারে জীব এক বিশেষ শরীর প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ মনের বৃত্তির অনুসারে দেহ গঠিত হয়। মনের চঞ্চলতার ফলে দেহের পরিবর্তন হয়, কারণ তা না হলে আত্মা তার চিন্ময় শরীরে অবস্থান করত। সূর্য, চন্দ্র নক্ষত্র আদি জ্যোতিষ্ক যখন জল অথবা তৈল আদি তরল পদার্থে প্রতিবিম্বিত হয়, তখন বায়ুবেগ জনিত কম্পনের ফলে তাদের বিভিন্ন আকারে প্রতিভাত হয়- কখনও গোল, কখনও দীর্ঘ ইত্যাদি। তেমনই, জীবাত্মা যখন জড় বিষয়ের চিন্তায় মগ্ন থাকে, তখন অজ্ঞানের ফলে বিভিন্ন রূপকে সে তার প্রকৃত পরিচয় বলে মনে করে। অর্থাৎ জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা বিচলিত হওয়ার ফলে সে মনোরথের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন হয়। অতএব, হিংসাত্মক পাপকর্মই যখন পরবর্তী জীবনের ক্লেশজনক দেহের কারণ, তা হলে মানুষ কেন অসৎ কর্ম আচরণ করবে? নিজের মঙ্গলের কথা বিবেচনা করে কখনও অপরের প্রতি হিংসা করা উচিত নয়, কারণ তার ফলে এই জীবনে অথবা পরবর্তী জীবনে সর্বদা শত্রুর দ্বারা অনিষ্ট সাধনের ভয় থাকে। এই দীনা বালিকা দেবকী তোমার কন্যাতুল্যা, স্নেহপাত্রী, কনিষ্ঠা ভগ্নী। তুমি দীনবৎসল, অতএব একে বধ করা তোমার যোগ্য নয়। বস্তুতই সে তোমার স্নেহের পাত্রী।’ ”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে কুরুকুল শ্রেষ্ঠ! কংস ছিল অত্যন্ত নৃশংস এবং রাক্ষদের অনুবর্তী। তাই বসুদেবের সৎ উপদেশের দ্বারা তাকে শান্ত করা যায়নি অথবা ভয় প্রদর্শন করা যায়নি। সে ইহলোকে অথবা পরলোকে পাপকর্মের ফলাফলের কোন বিচার করেনি। বসুদেব যখন দেখলেন যে, কংস তার ভগ্নী দেবকীকে হত্যা করতে বদ্ধপরিকর, তখন তিনি অত্যন্ত গভীরভাবে চিন্তা করে কংসকে নিরস্ত করার আর একটি উপায় স্থির করেছিলেন। বুদ্ধিমান মানুষের কর্তব্য যতক্ষণ পর্যন্ত বুদ্ধি এবং বল রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যু থেকে পরিত্রাণ লাভের চেষ্টা করা। এটি প্রতিটি দেহধারী ব্যক্তির কর্তব্য। এইভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও যদি মৃত্যুকে এড়ান না যায় তা হলে তার কোন অপরাধ হয় না।”
“বসুদেব বিবেচনা করেছিলেন- মৃত্যুরূপ কংসকে আমার সব কটি পুত্র দান করে আমি দেবকীর প্রাণ রক্ষা করতে পারি। আমার পুত্রের জন্মের পূর্বে যদি কংসের মৃত্যু হয়, অথবা আমার পুত্রের হাতে তার মৃত্যু হবে বলে বিধাতা যখন ব্যবস্থা করেছেন, তখন নিশ্চয়ই আমার পুত্রদের মধ্যে কোন এক পুত্র তাকে হত্যা করবে। অতএব আপাতত আমি তার কাছে প্রতিজ্ঞা করতে পারি যে, আমার পুত্রদের আমি তাকে দান করব, তা হলে কংস আশ্বস্ত হবে, আর তারপর যদি যথাসময়ে কংসের মৃত্যু হয়, তখন আর আমাদের ভয়ের কোন কারণ থাকবে না। অগ্নি যেমন কখনও কখনও সমীপস্থ কাষ্ঠ পরিত্যাগ করে দূরস্থিত কাষ্ঠ দহন করে, তখন বুঝতে হবে যে, তার কারণ হচ্ছে অদৃষ্ট বা দৈব। তেমনই, জীব যখন এক প্রকার শরীর পরিত্যাগ করে আর এক প্রকার শরীর গ্রহণ করে, তখন বুঝতে হবে যে, অদৃষ্ট ব্যতীত তার আর অন্য কোন কারণ নেই। বসুদেব তাঁর জ্ঞান অনুসারে এইভাবে বিবেচনা করে, পাপাত্মা কংসকে বহু সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তার কাছে এই প্রস্তাব রেখেছিলেন। বসুদেবের মন তাঁর পত্নীর এই বিপদে উৎকন্ঠায় পূর্ণ ছিল, কিন্তু নিষ্ঠুর, নির্লজ্জ, পাপী কংসকে প্রসন্ন করার জন্য বাহ্যে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘হে সৌম্য, তুমি দৈববাণী থেকে যা শ্রবণ করেছ, তাতে তোমার ভগ্নী দেবককী থেকে তোমার ভয়ের কোর কারণ নেই। তোমার মৃত্যুর কারণ হবে তার পুত্ররা। অতএব আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে, তোমার ভয়ের কারণস্বরূপ দেবকীর পুত্রদের জন্ম হওয়া মাত্রই আমি তাদের তোমার হস্তে সমর্পণ করব।’ ”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “কংস বসুদেবের যুক্তিতে সম্মত হয়েছিল এবং বসুদেবের কথায় পূর্ণরূপে বিশ্বাস করে ভগ্নীবধ থেকে নিবৃত্ত হয়েছিল। বসুদের কংসের প্রতি প্রসন্ন হয়ে এবং তাকে আরও প্রশংসা করে তাঁর গৃহে প্রবেশ করেছিলেন। তারপর সমস্ত দেবতা এবং ভগবানের মাতা দেবকী যথাসময়ে একটি সন্তান প্রসব করেছিলেন। এইভাবে তিনি প্রতি বৎসর একের পর এক আটটি পুত্র এবং সুভদ্রা নাম্নী একটি কন্যা প্রসব করেছিলেন। বসুদেব প্রতিজ্ঞাভঙ্গ-রূপ অসত্যের ভয়ে অত্যন্ত ভীত হয়েছিলেন। তাই তিনি কীর্তিমান নামক তাঁর প্রথম পুত্রটিকে গভীর মনোবেদনা সত্ত্বেও কংসের হস্তে অর্পণ করেছিলেন। সত্যনিষ্ঠ সাধুদের কাছে কোন কার্য দুঃসহ? যাঁরা ভগবানকে একমাত্র বাস্তব বস্তু বলে জানেন, তাঁদের আবার কোন্ বিষয়ের অপেক্ষা আছে? যাদের স্বভাব নিন্দিত, তাদের অকার্য কি থাকতে পারে? আর যাঁরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে সর্বতোভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন, তাঁরা কি না পরিত্যাগ করতে পারেন?”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ কংস যখন দেখল যে, বসুদেব সত্যনিষ্ঠাপূর্বক সমত্ব প্রাপ্ত হয়ে তার হস্তে তাঁর পুত্রটিকে সমর্পণ করেছেন, তখন সে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিল এবং হাসিমুখে সে এই কথাগুলি বলেছিল। হে বসুদেব, তোমার এই শিশুটিকে নিয়ে তুমি ঘরে ফিরে যাও। তোমার প্রথম পুত্র থেকে আমার কোন ভয় নেই। তোমার এবং দেবকীর অষ্টম পুত্রের দ্বারা আমার মৃত্যু নির্দিষ্ট হয়েছে। বসুদেব ‘তাই হোক’ বলে তাঁর শিশু-সন্তানটিকে নিয়ে গৃহে ফিরে গিয়েছিলেন, কিন্তু কংস যেহেতু ছিল চরিত্রহীন এবং অজিতেন্দ্রিয়, তাই বসুদেব জানতেন যে, কংসের বাক্যে বিশ্বাস স্থাপন করা যায় না।”
“হে ভরতকুলতিলক মহারাজ পরীক্ষিৎ, নন্দ মহারাজ আদি গোপগণ, সেই সমস্ত গোপদের পত্নীগণ, বসুদেব প্রমুখ বৃষ্ণিবংশীয়গণ, দেবকী প্রভৃতি যদুকুল-ললনাগণ, নন্দ মহারাজ ও বসুদেবের জ্ঞাতি, বন্ধু ও সুহৃৎগণ, এমন কি বাহ্যদৃষ্টিতে যাঁরা ছিলেন কংসের অনুগত জন, তাঁরা সকলেই ছিলেন দেবতাতুল্য। একসময় ভক্তপ্রবর নারদ কংসের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, কিভাবে পৃথিবীর ভারস্বরূপ দৈত্যরা নিহত হবে। তার ফলে কংস অত্যন্ত ভীত এবং সংশয়াচ্ছন্ন হয়েছিল। দেবর্ষি নারদ চলে যাওয়ার পর, কংস সমস্ত যাদবদের দেবতা এবং দেবকীর গর্ভসম্ভূত সন্তানদের তার মৃত্যুর কারণ বিষ্ণু বলে মনে করে, দেবকী ও বসুদেবকে বন্দী করে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছিল। বিষ্ণু তাকে হত্যা করবেন সেই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে, কংস দেবকীর প্রতিটি পুত্রকে বিষ্ণু বলে মনে করে তাদের একের পর এক হত্যা করেছিল। এই পৃথিবীতে রাজারা প্রায়ই ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের লোভে নির্বিচারে তাদের শত্রুদের হত্যা করে। তারা তাদের খেয়াল-খুশিমতো যে কোন ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারে, এমন কি তাদের মাতা, পিতা ভ্রাতা অথবা বন্ধুদেরও। পূর্বজন্মে কংস ছিল কালনেমি নামক এক মহা অসুর এবং বিষ্ণু তাকে সংহার করেছিলেন। নারদ মুনির কাছে সেই কথা জানতে পেরে কংস যাদবদের সঙ্গে বিরুদ্ধাচরণ করতে শুরু করেছিল। উগ্রসেনের অত্যন্ত বলবান পুত্র কংস যদু ভোজ এবং অন্ধকদের অধিপতি এবং নিজ পিতা উগ্রসেনকে কারাগারে নিক্ষেপ করে শূরসেন নামক দেশসমূহ অধিকার করেছিল।”
প্রথম অধ্যায়- শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবঃ ভূমিকা
24 May 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, দশম স্কন্ধ- আশ্রয়