শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বিদর্ভ তাঁর পিতা কর্তৃক পুত্রবধূরূপে অঙ্গীকৃত কন্যার গর্ভে কুশ, ক্রথ এবং রোমপাদ নামক তিনটি পুত্র উৎপাদন করেন। রোমপাদ বিদর্ভকুলের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। রোমপাদের পুত্র বভ্রু। বভ্রু থেকে কৃতি নামক পুত্রের জন্ম হয়। কৃতির পুত্র উশিক এবং উশিকের পুত্র চেদি। চেদি থেকে চৈদ্যাদি নৃপতিদের জন্ম হয়। ক্রথের পুত্র কুন্তি; কুন্তির পুত্র বৃষ্ণি; বৃষ্ণির পুত্র নির্বৃতি এবং নির্বৃতির পুত্র দশার্হ। দশার্হ থেকে ব্যোম; ব্যোম থেকে জীমূত; জীমূত থেকে বিকৃতি; বিকৃতি থেকে ভীমরথ; ভীমরথ থেকে নবরথ; এবং নবরথ থেকে দশরথ জন্মগ্রহণ করেন। দশরথ থেকে শকুনির জন্ম হয় এবং শকুনির পুত্র করম্ভি। করম্ভির পুত্র দেবরাত এবং দেবরাতের পুত্র দেবক্ষত্র। দেবক্ষত্রের পুত্র মধু এবং তাঁর পুত্র কুরুবশ। কুরুবশ থেকে অনু নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। অনুর পুত্র পুরুহোত্র, পুরুহোত্রের পুত্র অয়ু এবং অয়ুর পুত্র সাত্বত জন্মগ্রহণ করেন। হে মহান আর্য নৃপতি! সাত্বতের ভজমান, ভজি, দিব্য, বৃষ্ণি, দেবাবৃধ, অন্ধক এবং মহাভোজ নামক সাতটি পুত্র ছিল। ভজমানের এক পত্নীর গর্ভে নিম্লোচি, কিঙ্কণ এবং ধৃষ্টি- এই তিন পুত্রের জন্ম হয় এবং অপর পত্নীর গর্ভে শতাজিৎ, সহস্রাজিৎ ও অযুতাজিৎ নামক তিনটি পুত্রের জন্ম হয়। দেবাবৃধের পুত্র বভ্রু। দেবাবৃধ এবং বভ্রুর মাহাত্মসূচক দুটি বিখ্যাত শ্লোক রয়েছে, যেগুলি আমাদের পূর্বপুরুষগণ কীর্তন করেছেন এবং দূর থেকে আমরাও শ্রবণ করেছি। এমন কি, এখনও তাঁদের মাহাত্মসূচক সেই শ্লোকগুলি আমরা শ্রবণ করি (কারণ পূর্বে আমরা যা শ্রবণ করেছি তা এখনও কীর্তিত হচ্ছে)। “অতএব মানুষদের মধ্যে বভ্রু শ্রেষ্ঠ এবং দেবাবৃধ দেবতাদের সমতুল্য। বভ্রু এবং দেবাবৃধের সঙ্গ প্রভাবে তাঁদের বংশের চোদ্দ হাজার পঁয়ষট্টি পুরুষ মুক্তিলাভ করেছিলেন।” অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ রাজা মহাভোজের বংশে ভোজ রাজাগণ জন্মগ্রহণ করেন।”
“হে পরন্তপ মহারাজ পরীক্ষিৎ! বৃষ্ণির পুত্র সুমিত্র এবং যুধাজিৎ। যুধাজিৎ থেকে শিনি এবং অনমিত্রের জন্ম হয় এবং অনমিত্র থেকে নিঘ্ন নামক পুত্রের জন্ম হয়। নিঘ্নের দুই পুত্র সত্রাজিৎ এবং প্রসেন। অনমিত্রের শিনি নামক যে অন্য এক পুত্র ছিল, তাঁর পুত্র সত্যক। সত্যকের পুত্র যুযুধান এবং যুযুধানের পুত্র জয়। জয় থেকে কুণি নামক এক পুত্রের জন্ম হয় এবং কুণির পুত্র যুগন্ধর। অনমিত্রের অন্য এক পুত্র বৃষ্ণি। বৃষ্ণি থেকে শ্বফল্ক এবং চিত্ররথ নামক দুই পুত্রের জন্ম হয়। শ্বফল্কের পত্নী গান্দিনীর গর্ভে অক্রূরের জন্ম হয়। অক্রূর ছিলেন জ্যেষ্ঠ, তা ছাড়া আরও বারোজন বিখ্যাত পুত্রের জন্ম হয়। এই বারোজন পুত্রের নাম আসঙ্গ, সারমেয়, মৃদুর, মৃদুবিৎ, গিরি, ধর্মবৃদ্ধ, সুকর্মা, ক্ষেত্রোপেক্ষ, অরিমর্দন, শত্রুুঘ্ন, গন্ধমাদ এবং প্রতিবাহু। এই দ্বাদশ পুত্রের সুচারা নাম্নী এক ভগ্নী ছিল। অক্রূরের দেববান্ এবং উপদেব এই দুই পুত্র। চিত্ররথের পৃথু, বিদূরথ প্রভৃতি বহু পুত্র ছিল। তাঁরা সকলেই বৃষ্ণিকুলনন্দন নামে বিখ্যাত হন। অন্ধকের চার পুত্র- কুকুর, ভজমান, শুচি এবং কম্বলবর্হিষ। কুকুরের পুত্র বহ্নি এবং বহ্নির পুত্র বিলোমা। বিলোমার পুত্র কপোতরোমা এবং তাঁর পুত্র অনু। তুম্বুরু এই অনুর সখা ছিলেন। অনু থেকে অন্ধকের জন্ম হয়; অন্ধক থেকে দুন্দুভি এবং দুন্দুভি থেকে অবিদ্যোতের জন্ম হয়। অবিদ্যোতের পুত্র পুনর্বসু। পুনর্বসুর আহুক এবং আহুকী নামক একটি পুত্র ও কন্যা ছিল। আহুকের দুই পুত্র দেবক ও উগ্রসেন। দেবকের চারপুত্র- দেববান্, উপদেব, সুদেব এবং দেববর্ধন। তাঁর শান্তিদেবা, উপদেবা, শ্রীদেবা, দেবরক্ষিতা, সহদেবা, দেবকী এবং ধৃতদেবা নামক সাতটি কন্যাও ছিল। তাঁদের মধ্যে ধৃতদেবা ছিলেন জ্যেষ্ঠা। শ্রীকৃষ্ণের পিতা বসুদেব সেই ভগ্নীদের বিবাহ করেছিলেন। কংস, সুনামা, ন্যগ্রোধ, কঙ্ক, শঙ্কু, সুহূ, রাষ্ট্রপাল, ধৃষ্টি এবং তুষ্টিমান্ উগ্রসেনের পুত্র। কংসা, কংসবতী, কঙ্কা, শূরভু এবং রাষ্ট্রপালিকা- এঁরা উগ্রসেনের কন্যা। বসুদেবের কনিষ্ঠ ভ্রাতারা তাঁদের বিবাহ করেন। চিত্ররথের পুত্র বিদূরথ, বিদূরথের পুত্র শূর এবং শূরের পুত্র ভজমান। ভজমানের পুত্র শিনি, শিনির পুত্র ভোজ এবং ভোজের পুত্র হৃদিক। হৃদিকের তিন পুত্র- দেবমীঢ়, শতধনু এবং কৃতবর্মা। দেবমীঢ়ের পুত্র শূর, শূরের মারিষা নাম্নী এক পত্নী ছিল। রাজা শূর তাঁর পত্নী মারিষার গর্ভে বসুদেব, দেবভাগ, দেবশ্রবা আনক, সৃঞ্জয়, শ্যামক, কঙ্ক, শমীক, বৎসক এবং বৃক- এই দশটি নিষ্পাপ পুত্র উৎপাদন করেন। বসুদেবের জন্মের সময় দেবতারা আনক এবং দুন্দুভি বাজিয়েছিলেন। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের উপযুক্ত স্থান বসুদেব আনকদুন্দুভি নামেও অভিহিত হন। মহারাজ শূরের পাঁচ কন্যা- পৃথা, শ্রুতদেবা, শ্রুতকীর্তি, শ্রুতশ্রবা এবং রাজাধিদেবী। শূর তাঁর অপুত্রক সখা কুন্তিকে পৃথানাম্নী কন্যা দান করেছিলেন এবং তাই পৃথার আর এক নাম কুন্তী। একসময় দুর্বাসা পৃথার পিতা কুন্তির গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন এবং পৃথা তখন পরিচর্যার দ্বারা তাঁকে সন্তুষ্ট করে, যে কোন দেবতাকে আহ্বান করার এক অলৌকিক শক্তি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সেই শক্তি পরীক্ষা করার জন্য পরম পবিত্রা কুন্তী সূর্যদেবকে আহ্বান করেছিলেন। কুন্তী সূর্যদবকে আহ্বান করা মাত্রই সূর্যদেব তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং কুন্তী তখন অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি সূর্যদেবকে বলেছিলেন, “আমি কেবল এই অলৌকিক শক্তির প্রভাব পরীক্ষা করছিলাম। অকারণে আপনাকে আহ্বান করেছি বলে আমি অত্যন্ত দুঃখিত। দয়া করে আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং ফিরে যান।”
সূর্যদেব বললেন- “হে সুন্দরী পৃথা! দেবদর্শন কখনও ব্যর্থ হয় না। তাই আমি তোমার গর্ভে আমার বীর্য আধান করব এবং তার ফলে তোমার এক পুত্র হবে। তুমি অবিবাহিতা, তাই যাতে তোমার যোনি অক্ষত থাকে, সেই ব্যবস্থা আমি করব। এই কথা বলে সূর্যদেব পৃথার গর্ভে বীর্য আধান করেছিলেন এবং তারপর স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। তারপর, তৎক্ষণাৎ কুন্তীর গর্ভে দ্বিতীয় সূর্যদেবের মতো একটি শিশুর জন্ম হয়েছিল। কুন্তী লোকাপবাদের ভয়ে বহু কষ্টে পুত্রস্নেহ পরিত্যাগ করে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই শিশুটিকে একটি পেটিকাবদ্ধ করে নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! আপনার অত্যন্ত পুণ্যবান এবং পরাক্রমশালী প্রপিতামহ মহারাজ পাণ্ডু পরে কুন্তীকে বিবাহ করেছিলেন। করূষের রাজা বৃদ্ধশর্মা কুন্তীর ভগ্নী শ্রতদেবাকে বিবাহ করেছিলেন এবং তাঁর গর্ভে দন্তবক্রের জন্ম হয়। সনকাদি ঋষিদের অভিশাপে দন্তবক্র পূর্বে দিতির পুত্র হিরণ্যাক্ষরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কেকয়ের রাজা ধৃষ্টকেতু কুন্তীর আর এক ভগ্নী শ্রুতকীর্তিকে বিবাহ করেছিলেন। শ্রুতকীর্তির গর্ভে সন্তর্দন আদি পাঁচটি পুত্রের জন্ম হয়। কুন্তীর আর এক ভগ্নী রাজাধিদেবীর গর্ভে জয়সেনের বিন্দ এবং অনুবিন্দ নামক দুই পুত্রের জন্ম হয়। চেদিরাজ দমঘোষ শ্রুতশ্রবাকে বিবাহ করেন। শ্রুতশ্রবার পুত্র শিশুপাল, যার জন্ম বৃত্তান্ত ইতিমধ্যেই (সপ্তম স্কন্ধে) বর্ণিত হয়েছে। বসুদেবের ভ্রাতা দেবভাগের পত্নী কংসার গর্ভে চিত্রকেতু এবং বৃহদ্বল নামক দুই পুত্রে জন্ম হয়। বসুদেবের ভ্রাতা দেবশ্রবা কংসবতীকে বিবাহ করেন এবং তাঁর গর্ভে সুবীর ও ইষুমান্ নামক দুই পুত্রের জন্ম হয়। কঙ্ক থেকে তাঁর পত্নী কঙ্কার গর্ভে বক, সত্যজিৎ ও পুরুজিৎ- এই তিন পুত্রের জন্ম হয়। রাজা সৃঞ্জয় থেকে তাঁর পত্নী রাষ্ট্রপালিকার গর্ভে বৃষ, দুর্মর্ষণ আদি পুত্রদের জন্ম হয়। রাজা শ্যামক থেকে তাঁর পত্নী শূরভূমির গর্ভে হরিকেশ এবং হিরণ্যাক্ষ নামক দুই পুত্রের জন্ম হয়। তারপর বৎসক মিশ্রকেশী নাম্নী অপ্সরা পত্নীর গর্ভে বৃক প্রভৃতি পুত্র উৎপাদন করেন। বৃক দুর্বাক্ষী নাম্নী পত্নী থেকে তক্ষ, পুষ্কর, শাল আদি পুত্রদের উৎপাদন করেন। সমীক থেকে তাঁর ভার্যা সুদামনীর গর্ভে সুমিত্র, অর্জুনপাল প্রভৃতি পুত্রদের জন্ম হয়। রাজা আনক তাঁর পত্নী কর্ণিকা নাম্নী ভার্যা থেকে ঋতধামা এবং জয় নামক দুটি পুত্র উৎপাদন করেন। দেবকী, পৌরবী, রোহিণী, ভদ্রা, মদিরা, রোচনা, ইলা আদি আনকদুন্দুভির (বসুদেবের) পত্নী। তাঁদের মধ্যে দেবকী ছিলেন মুখ্যা। বসুদেব তাঁর পত্নী রোহিণীর গর্ভে বল, গদ, সারণ, দুর্মদ, বিপুল, ধ্রুব কৃত আদি পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। পৌরবীর গর্ভে ভূত, সুভদ্র, ভদ্রবাহু, দুর্মদ, ভদ্র আদি দ্বাদশ পুত্রের জন্ম হয়। নন্দ, উপনন্দ, কৃতক, শূর আদি পুত্রদের মদিরার গর্ভে জন্ম হয়। ভদ্রা (কৌশল্যা) কেশী নামক এক পুত্র প্রসব করেন। বসুদেব তাঁর রোচনা নাম্নী পত্নীতে হস্ত, হেমাঙ্গদ আদি পুত্র উৎপাদন করেছিলেন এবং ইলা নাম্নী পত্নীর গর্ভে উরুবল্ক প্রভৃতি যদুশ্রেষ্ঠ পুত্রদের উৎপাদন করেছিলেন। আনকদুন্দুভির (বসুদেবের) ধৃতদেবা নাম্নী পত্নীর গর্ভে বিপৃষ্ঠ নামক পুত্রের জন্ম হয়। বসুদেবের শান্তিদেবা নাম্নী পত্নীর গর্ভে প্রশম, প্রসিত প্রভৃতি পুত্রের জন্ম হয়। বসুদেবের উপদেবা নাম্নী ভার্যার গর্ভে রাজন্য, কল্প, বর্ষ প্রভৃতি দশটি পুত্র হয় এবং শ্রীদেবা নাম্নী ভার্যার গর্ভে বসু, হংস, সুবংশ প্রভৃতি ছয় পুত্রের জন্ম হয়। বসুদেবের ঔরসে দেবরক্ষিতার গর্ভে গদা প্রভৃতি নয়টি পুত্রের জন্ম হয়। সাক্ষাৎ ধর্মস্বরূপ বসুদেবের সহদেবা নাম্নী পত্নীর গর্ভে শ্রুত, প্রবর প্রমুখ আট পুত্রের জন্ম হয়। প্রবর, শ্রুত আদি সহদেবার আটটি পুত্র সাক্ষাৎ অষ্টবসুর অবতার ছিলেন। দেবকীর গর্ভেও বসুদেবের আটটি অতি যোগ্য পুত্র হয়। তাঁরা ছিলেন, কীর্তিমান্্, সুষেণ, ভদ্রসেন, ঋজু, সম্মর্দন, ভদ্র এবং শেষনাগের অবতার সঙ্কর্ষণ। অষ্টম পুত্র সাক্ষাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তোমার অত্যন্ত সৌভাগ্যশালিনী পিতামহী সুভদ্রা বসুদেবের কন্যা ছিলেন। তখন ধর্মের ক্ষয় এবং অধর্মের বৃদ্ধি হয়, তখন পরম নিয়ন্তা ভগবান শ্রীহরি স্বেচ্ছাপূর্বক অবতরণ করেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! ভগবানের ইচ্ছা ব্যতীত তাঁর আবির্ভাব, তিরোভাব, অথবা কার্যকলাপের আর কোন কারণ নেই। পরমাত্মারূপে তিনি সব কিছুই জানেন। তাই এমন কোন কারণ নেই যা তাঁকে প্রভাবিত করতে পারে, এমন কি সকাম কর্মের ফলও তাঁকে প্রভাবিত করতে পারে না। পরমেশ্বর ভগবান তাঁর কৃপার দ্বারা জীবদের উদ্ধার এবং তাঁদের জন্ম, মৃত্যু ও বৈষয়িক জীবনের আয়ুষ্কাল নিবৃত্তির জন্য তাঁর মায়াশক্তির মাধ্যমে এই জড় জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় সাধন করে থাকেন। এইভাবে তিনি জীবদের ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে সক্ষম করছেন। অসুরেরা রাজপুরুষের বেশে রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে, কিন্তু রাজার কর্তব্য সম্বন্ধে তাদের কোন ধারণা নেই। তার ফলে ভগবানের ব্যবস্থাপনায় বিশাল সামরিক শক্তির অধিকারী এই সমস্ত অসুরেরা পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করে এবং তার ফলে পৃথিবীতে অসুরদের মহাভার লাঘব হয়। ভগবানের ইচ্ছায় অসুরেরা তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে, যাতে তাদের সংখ্যা লাঘব হয় এবং ভক্তরা কৃষ্ণভক্তির মার্গে উন্নতি সাধন করার সুযোগ পায়। সঙ্কর্ষণ বা বলরাম সহ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মা, শিব আদি দেবতাদের কল্পনারও অতীত কর্মসমূহ সম্পাদন করেছিলেন। (যেমন, শ্রীকৃষ্ণ ভূভার হরণ করার জন্য বহু অসুরদের সংহার করার উদ্দেশ্যে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের আয়োজন করেছিলেন।) ভবিষ্যতে এই কলিযুগে যে সমস্ত ভক্ত জন্মগ্রহণ করবেন, তাঁদের প্রতি অহৈতুকী কৃপা প্রদর্শন করার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমনভাবে আচরণ করেছিলেন যে, কেবল তা স্মরণ করার ফলে মানুষ সংসারের সমস্ত শোক এবং দুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারবে। (অর্থাৎ তিনি এমনভাবে আচরণ করেছিলেন যার ফলে ভবিষ্যতের সমস্ত ভক্তরা ভগবদ্গীতায় কথিত কৃষ্ণভাবনামৃতের উপদেশ গ্রহণ করে সংসারের সমস্ত দুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারবেন।) শুদ্ধ এবং দিব্য কর্ণের দ্বারা ভগবানের মহিমা গ্রহণ করার ফলেই ভক্তরা তৎক্ষণাৎ সকাম কর্মের প্রবল বাসনা থেকে মুক্ত হয়ে যান। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভোজ, বৃষ্ণি, অন্ধক, মধু, শূরসেন, দশার্হ, কুরু, সৃঞ্জয় এবং পাণ্ডুবংশের সহায়তায় বিবিধ কার্যকলাপ অনুষ্ঠান করেছিলেন। তাঁর মধুর হাস্য, স্নেহপূর্ণ আচরণ, উপদেশ এবং গোবর্ধন-ধারণ আদি অলৌকিক লীলা এবং সর্বাঙ্গ সুন্দর মূর্তির দ্বারা সমগ্র মানব-সমাজকে আনন্দ প্রদান করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের মুখমণ্ডল মকরাকৃতি কর্ণকুণ্ডল আদি অলঙ্কারের দ্বারা শোভিত। তাঁর কর্ণযুগল অত্যন্ত সুন্দর, তাঁর গণ্ডযুগল দীপ্যমান এবং তাঁর হাসি সকলের মনোমুগ্ধকর। তাঁর দর্শনে উৎসবের আনন্দ অনুভূত হয়। তাঁর মুখমণ্ডল এবং শ্রীঅঙ্গ দর্শনে সকলেই পূর্ণরূপে তৃপ্ত হন, কিন্তু ভক্তরা চোখের পলক পড়ায় নিমেষের জন্য তাঁর দর্শন আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে, অসহিষ্ণু হয়ে স্রষ্টার প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করেন। লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বসুদেবের পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর অতি অন্তরঙ্গ ভক্তদের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক বিস্তার করার জন্য তিনি তাঁর জন্মের পরেই তাঁর পিতৃগৃহ ত্যাগ করে বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন। বৃন্দাবনে ভগবান বহু অসুরদের সংহার করেছিলেন এবং তারপর দ্বারকায় ফিরে গিয়ে বৈদিক প্রথা অনুসারে বহু স্ত্রীরত্ন বিবাহ করে তাঁদের গর্ভে শত শত পুত্র উৎপাদন করেছিলেন এবং গৃহস্থ-জীবনের আদর্শ স্থাপনের উদ্দেশ্যে তাঁর নিজের পূজার জন্য বহু যজ্ঞানুষ্ঠান করেছিলেন। তারপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভূভার হরণ করার জন্য কুরুবংশীয়দের মধ্যে কলহের সৃষ্টি করেছিলেন। কেবলমাত্র তাঁর দৃষ্টিপাতের দ্বারা তিনি কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে সমস্ত আসুরিক রাজাদের বিনাশ সাধন করেছিলেন এবং অর্জুনের বিজয় ঘোষণা করেছিলেন। অবশেষে তিনি উদ্ধবকে পরতত্ত্ব এবং ভক্তি সম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করে তাঁর স্বরূপে স্বধামে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।”
চতুর্বিংশতি অধ্যায়- পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ
23 May 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, নবম স্কন্ধ- মুক্তি