শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “যযাতির চতুর্থ পুত্র অনুর সভানর, চক্ষু, পরেষ্ণু নামক তিন পুত্র ছিল। হে রাজন্! সভানর থেকে কালনর নামক এক পুত্রের জন্ম হয় এবং কালনরের পুত্র সৃঞ্জয়। সৃঞ্জয় থেকে জনমেজয় নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। জনমেজয়ের পুত্র মহাশাল, মহাশালের পুত্র মহামনা এবং মহামনার উশীনর ও তিতিক্ষু নামক দুই পুত্র ছিল। উশীনরের শিবি, বর, কৃমি এবং দক্ষ- এই চার পুত্র। শিবির চার পুত্র- বৃষাদর্ভ, সুধীর, মদ্র এবং আত্ম-তত্ত্ববিৎ কেকয়। তিতিক্ষুর পুত্র রুষদ্রথ। রুষদ্রথ থেকে হোম, হোম থেকে সুতপা এবং সুতপা থেকে বলি জন্মগ্রহণ করেন। মহীপতি বলির পত্নীর গর্ভে দীর্ঘতমার ঔরসে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুহ্ম, পুণ্ড্র এবং ওড্র নামক ছয় পুত্রের জন্ম হয়। অঙ্গ আদি এই ছয় পুত্র পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের পূর্বভাগে ছ’টি রাজ্যের রাজা হয়েছিলেন এবং সেই রাজ্যগুলি সেখানকার রাজাদের নাম অনুসারে বিখ্যাত হয়েছিল। অঙ্গ থেকে খলপান নামক এক পুত্রের জন্ম হয় এবং খলপানের পুত্র দিবিরথ। দিবিরথের থেকে ধর্মরথ নামক এক পুত্রের জন্ম হয় এবং তাঁর পুত্র চিত্ররথ, যিনি রোমপাদ নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। রোমপাদ নিঃসন্তান ছিলেন এবং তাই তাঁর সখা মহারাজ দশরথ তাঁকে তাঁর শান্তা নাম্নী কন্যাকে দান করেন। রোমপাদ তাঁকে তাঁর কন্যারূপে গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে শান্তার সঙ্গে ঋষ্যশৃঙ্গের বিবাহ হয়। দেবতারা বারিবর্ষণ না করায় বারাঙ্গনাগণ নৃত্য, সঙ্গীত, অভিনয়, আলিঙ্গন এবং পূজার দ্বারা ঋষ্যশৃঙ্গকে মোহিত করে বন থেকে নিয়ে আসেন এবং তখন তাঁকে পৌরোহিত্যে বরণ করা হয়। ঋষ্যশৃঙ্গ আসার পর বৃষ্টি হয়। তারপর ঋষ্যশৃঙ্গ নিঃসন্তান মহারাজ দশরথের পুত্র উৎপাদনের জন্য এক যজ্ঞ করেন এবং তার ফলে অপুত্রক মহারাজ দশরথের জন্ম হয়। ঋষ্যশৃঙ্গের কৃপায় রোমপাদ থেকে চতুরঙ্গের জন্ম হয় এবং চতুরঙ্গ থেকে পৃথুলাক্ষের জন্ম হয়। পৃথুলাক্ষের পুত্র বৃহদ্রথ, বৃহৎকর্মা, বৃহদ্ভানু। জ্যেষ্ঠ বৃহদ্রথ থেকে বৃহন্মনা নামক এক পুত্রের জন্ম হয় এবং বৃহন্মনার পুত্র জয়দ্রথ। জয়দ্রথের পত্নী সম্ভূতির গর্ভে বিজয়ের জন্ম হয়। বিজয় থেকে ধৃতি, ধৃতি থেকে ধৃতব্রত, ধৃতব্রত থেকে সৎকর্মা এবং সৎকর্মা থেকে অধিরথের জন্ম হয়। গঙ্গার তীরে খেলা করার সময় অধীরথ একটি পেটিকার মধ্যে এক শিশু প্রাপ্ত হন। কুমারী অবস্থায় সেই শিশুটির জন্ম হওয়ার ফলে কুন্তী তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন। অধিরথ নিঃসন্তান ছিলেন বলে সেই শিশুটিকে তাঁর পুত্ররূপে পালন করেন। (পরবর্তীকালে এই পুত্রটি কর্ণ নামে বিখ্যাত হন)”
“হে রাজন্! কর্ণের একমাত্র পুত্র বৃষসেন। যযাতির তৃতীয় পুত্র দ্রুহ্যুর পুত্র বভ্রু এবং বভ্রুর পুত্র সেতু। সেতুর পুত্র আরব্ধ, আরব্ধের পুত্র গান্ধার এবং গান্ধারের পুত্র ধর্ম। ধর্মের পুত্র ধৃত, ধৃতের পুত্র দুর্মদ এবং দুর্মদের পুত্র প্রচেতা। প্রচেতার একশত পুত্র ছিল। প্রচেতার পুত্রগণ ভারতবর্ষের উত্তর দিকে বৈদিক সভ্যতাবিহীন ম্লেচ্ছদেশ অধিকার করেছিলেন এবং সেখানকার রাজা হয়েছিলেন। যযাতির দ্বিতীয় পুত্র তুর্বসু, তাঁর পুত্র বহ্নি, বহ্নির পুত্র ভর্গ এবং ভর্গ থেকে ভানুমান্ জন্মগ্রহণ করেন। ভানুমানের পুত্র ত্রিভানু এবং তাঁর পুত্র উদারচিত্ত করন্ধম। করন্ধমের পুত্র মরুত। মরুত অপুত্রক হওয়ায় পুরুবংশজাত মহারাজ দুষ্মন্তকে তাঁর পুত্ররূপে গ্রহণ করেছিলেন। মহারাজ দুষ্মন্ত রাজসিংহাসনের অভিলাষী হওয়ায়, মরুতকে তাঁর পিতারূপে অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও তাঁর প্রকৃত বংশে (পুরুবংশে) ফিলে গিয়েছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! এখন আমি মহারাজ যযাতির জ্যেষ্ঠ পুত্র যদুর বংশ বর্ণনা করব। এই বর্ণনা পরম পবিত্র এবং মানুষের সর্ব-পাপনাশক। কেবল এই বর্ণনা শ্রবণ করার ফলে মানুষ তার সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়।”
“সমস্ত জীবের অন্তর্যামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিত্য স্বয়ংরূপ নরাকৃতি প্রকটপূর্বক যদুবংশে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যদুর চার পুত্র- সহস্রজিৎ, ক্রোষ্টা, নল এবং রিপু। এই চার পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সহস্রজিতের পুত্র শতজিৎ। শতজিতের মহাহয়, রেণুহয় এবং হৈহয় নামক তিন পুত্র ছিল। হৈহয়ের পুত্র ধর্ম এবং ধর্মের পুত্র নেত্র। ইনি কুন্তির পিতা। কুন্তি থেকে সোহঞ্জির জন্ম হয়। সোহঞ্জি থেকে মহিষ্মান্ এবং ভদ্রসেনক জন্মগ্রহণ করেন। ভদ্রসেনের পুত্র দুর্মদ এবং ধনক। ধনক কৃতবীর্যের জনক। কৃতাগ্নি, কৃতবর্মা, কৃতৌজা- এই তিনজনও ধনকের পুত্র। কৃতবীর্যের পুত্র অর্জুন। তিনি (কার্তবীর্যার্জুন) সপ্তদ্বীপ সমন্বিত সমগ্র পৃথিবীর অধীশ্বর হয়েছিলেন এবং ভগবানের অবতার দত্তাত্রেয় থেকে যোগশক্তি প্রাপ্ত হয়ে অষ্টসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। এই পৃথিবীর অন্য কোন রাজাই যজ্ঞ, দান, তপস্যা, যোগশক্তি, বিদ্যা, বীর্য অথবা দয়ার দ্বারা কার্তবীর্যার্জুনের সমকক্ষ হতে পারবেন না। কার্তবীর্যার্জুন পঁচাশি হাজার বছর ধরে পূর্ণ শারীরিক বল এবং অব্যাহত স্মৃতিশক্তি নিয়ে জড় ঐশ্বর্য উপভোগ করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর ছয় ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অক্ষয় জড় ঐশ্বর্যসমূহ ভোগ করেছিলেন। পরশুরামের সঙ্গে যুদ্ধে কার্তবীর্যার্জুনের এক হাজার পুত্রের মধ্যে কেবল পাঁচজন জীবিত ছিলেন। তাঁদের নাম যথাক্রমে জয়ধ্বজ, শূরসেন, বৃষভ, মধু এবং ঊর্জিত। জয়ধ্বজের তালজঙ্ঘ নামক পুত্রের একশত পুত্র ছিল। তালজঙ্ঘ নামক সেই বংশের সমস্ত ক্ষত্রিয়রা ঔর্ব ঋষির শক্তির প্রভাবে শক্তিমান মহারাজ সগর কর্তৃক ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তালজঙ্ঘের পুত্রদের মধ্যে বীতিহোত্র ছিলেন জ্যেষ্ঠ। বীতিহোত্রের পুত্র মধুর বৃষ্ণি নামক এক বিখ্যাত পুত্র ছিল। মধুর একশত পুত্রের মধ্যে বৃষ্ণি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। যদু, মধু ও বৃষ্ণি থেকে যাদব, মাধব এবং বৃষ্ণিবংশের উদ্ভব হয়।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! যদু, মধু এবং বৃষ্ণির প্রবর্তিত বংশ যাদব, মাধব এবং বৃষ্ণিবংশ নামে পরিচিত। যদুর পুত্র ক্রোষ্টার বৃজিনবান্ নামক এক পুত্র ছিল। বৃজিনবানের পুত্র স্বাহিত। স্বাহিতের পুত্র বিষদ্গু, বিষদ্গুর পুত্র চিত্ররথ এবং চিত্ররথের পুত্র শশবিন্দু। মহাভাগ্যশালী শশবিন্দু মহাযোগী ছিলেন এবং তিনি চতুর্দশ মহারত্নের অধিকারী ছিলেন। তাই তিনি সারা পৃথিবীর সম্রাট হয়েছিলেন। মহাযশা শশবিন্দুর দশ হাজার পত্নী ছিল এবং প্রতিটি পত্নীতে তিনি এক লক্ষ পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। অতএব তাঁর পুত্রদের সংখ্যা ছিল ছিল দশ সহস্র লক্ষ। সেই সমস্ত পুত্রদের মধ্যে পৃথুশ্রবা, পৃথুকীর্তি প্রমুখ ছয়জন ছিলেন প্রধান। পৃথুশ্রবার পুত্র ধর্ম, ধর্মের পুত্র উশনা। উশনা একশত অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। উশনার পুত্র রুচক। রুচকের পঞ্চ পুত্র- পুরুজিৎ, রুক্ম, রুক্মেষু, পৃথু এবং জ্যামঘ। তাঁদের বৃত্তান্ত শ্রবণ করুন।”
“জ্যামঘ অপুত্রক ছিলেন, তবুও তাঁর পত্নী শৈব্যার ভয়ে তিনি অন্য কোন ভার্যা গ্রহণ করতে পারেননি। জ্যামঘ একসময় তাঁর শত্রুগৃহ থেকে উপভোগের জন্য একটি কন্যাকে নিয়ে আসছিলেন, কিন্তু শৈব্যা তাকে দেখে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর পতিকে বললেন- “হে বঞ্চক! রথে আমার উপবেশন স্থানে উপবিষ্ট এই কন্যাটি কে?” জ্যামঘ তখন উত্তর দিয়েছিলেন, “এই কন্যাটি তোমার পুত্রবধু হবে।” সেই পরিহাস বাক্য শ্রবণ করে শৈব্যা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি বন্ধ্যা এবং আমার কোন সপত্নীও নেই। অতএব এই কন্যা আমার পুত্রবধু হবে কি করে? বল দেখি?” জ্যামঘ উত্তর দিয়েছিলেন, “হে রাজ্ঞী! তুমি যে পুত্র প্রসব করবে, এই কন্যা সেই পুত্রের পুত্রবধূ হবে।” জ্যামঘ বহুকাল পূর্বে দেবতা এবং পিতৃদের আরাধনা করে তাঁদের প্রসন্নতা বিধান করেছিলেন। এখন তাঁদের কৃপায় জ্যামঘের বাক্য সত্যে পরিণত হয়েছিল। শৈব্যা বন্ধা হলেও দেবতাদের কৃপায় তিনি গর্ভবতী হয়েছিলেন এবং যথাসময়ে বিদর্ভ নামক এক পুত্র প্রসব করেছিলেন। সেই শিশুটির জন্মের পূর্বে যে কন্যাটিকে পুত্রবধূরূপে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, সেই সৎস্বভাবা কন্যাটিকে বিদর্ভ বিবাহ করেছিলেন।”
ত্রয়োবিংশতি অধ্যায়- যযাতির পুত্রদের বংশ বিবরণ
20 May 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, নবম স্কন্ধ- মুক্তি