শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “মরুৎগণ কর্তৃক প্রদত্ত হওয়ায় ভরদ্বাজের নাম হয় বিতথ। বিতথের পুত্র মন্যু এবং মন্যু থেকে বৃহৎক্ষত্র, জয়, মহাবীর্য, নর এবং গর্গ, এই পাঁচ পুত্রের জন্ম হয়। এই পাঁচ পুত্রের অন্যতম নরের পুত্র সঙ্কৃতি।”
“হে পাণ্ডু বংশোদ্ভুত মহারাজ পরীক্ষিৎ! সঙ্কৃতির পুত্র গুরু এবং রন্তিদেব। রন্তিদেবের মহিমা কেবল ইহলোক মনুষ্যদের দ্বারাই নয়, পরলোকে দেবতাদের দ্বারাও কীর্তিত হয়। রন্তিদেব কখনও কিছু উপার্জন করার চেষ্টা করতেন না। দৈবক্রমে তিনি যা প্রাপ্ত হতেন তাই কেবল তিনি গ্রহণ করতেন এবং অতিথি এলে তিনি সব কিছুই তাদের দান করতেন। তার ফলে তাঁকে তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে অনেক দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হত। প্রকৃতপক্ষে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় তাঁর নিজের এবং আত্মীয়স্বজনদের শরীর কম্পমান হত, তবুও রন্তিদেব সর্বদাই অত্যন্ত সহিষ্ণু এবং ধীর ছিলেন। একসময় আটচল্লিশ দিন উপবাস করার পর, রন্তিদেব সকালবেলায় একটু জল এবং দুধ ও ঘি দিয়ে তৈরি কিছু অন্ন প্রাপ্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি যখন তাঁর পরিবারবর্গের সঙ্গে তা ভোজন করতে যাবেন, তখন এক ব্রাহ্মণ অতিথি এসে উপস্থিত হন। রন্তিদেব সর্বত্র এবং সর্বভূতে ভগবানের উপস্থিতি অনুভব করতেন। তাই তিনি সেই অতিথিকে সমাদর করে শ্রদ্ধা সহকারে তাঁকে সেই অন্নের একভাগ প্রদান করেছিলেন। সেই ব্রাহ্মণ অতিথিটি সেই অন্ন আহার করে সেখান থেকে চলে গিয়েছিলেন। তারপর রন্তিদেব অবশিষ্ট অন্ন স্বজনদের মধ্যে বিভাগ করে দিয়ে যখন স্বয়ং ভোজন করতে যাবেন, তখন এক শূদ্র অতিথি এসে উপস্থিত হলেন। সেই শূদ্রকে ভগবৎ-সম্বন্ধে দর্শন করে রাজা রন্তিদেব তাঁকেও অন্নের ভাগ প্রদান করেছিলেন। সেই শূদ্র চলে গেলে, আর একজন অতিথি কুকুর পরিবেষ্টিত হয়ে সেখানে এসে বলেছিল, “হে রাজন্! আমি এবং এই কুকুরগুলি ক্ষুধায় অত্যন্ত কাতর। দয়া করে আমাদের কিছু আহার্য প্রদান করুন।” রাজা রন্তিদেব পরম আদরে অবশিষ্ট অন্ন কুকুর এবং কুকুরের স্বামী অতিথিকে বহু সম্মান সহকারে প্রদান করেছিলেন এবং তাদের নমস্কার করেছিলেন। তারপর, কেবল পানীয় জল অবশিষ্ট ছিল, তাও কেবলমাত্র একজনের তৃপ্তি সাধনের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু রাজা যখন সেই জল পান করতে যাবেন, তখন এক চণ্ডাল সেখানে উপস্থিত হয়ে বলেছিল, ‘হে রাজন্! যদিও আমি অত্যন্ত নীচ কুলোদ্ভুত, দয়া করে আমাকে কিছ পানীয় জল দান করুন।’ সেই পরিশ্রান্ত চণ্ডালের দৈন্যযুক্ত বাক্য শ্রবণ করে মহারাজ রন্তিদেব অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিলেন এবং অমৃতের মতো মধুর এই কথাগুলি বলেছিলেন। আমি ভগবানের কাছে অষ্ট-যোগসিদ্ধি কামনা করি না এবং জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তিও কামনা করি না। আমি যেন কেবল সমস্ত জীবের সঙ্গে থেকে তাদের সমস্ত দুঃখভোগ করতে পারি, যাতে তারা তাদের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত হতে পারে। জীবন ধারণেচ্ছু এই দীন চণ্ডালের জীবন রক্ষার জন্য জল দানের দ্বারা আমার ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি, দেহের কম্পন, বিষাদ, দুঃখ, শোক, মোহ সব কিছুই নিবৃত্ত হয়েছে। এই বলে, জল পিপাসায় অত্যন্ত ম্রিয়মান হওয়া সত্ত্বেও রাজা রন্তিদেব তাঁর জল সেই চণ্ডালকে দান করেছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন স্বভাবতই অত্যন্ত কৃপালু এবং ধীর। ফলাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিদের বাসনা অনুসারে ফল প্রদানে সক্ষম ব্রহ্মা, শিব আদি দেবতাগণ তখন রন্তিদেবের সম্মুখে তাঁদের স্বরূপ প্রদর্শন করেছিলেন, কারণ তাঁরাই ব্রাহ্মণ, শূদ্র, চণ্ডাল ইত্যাদিরূপে তাঁর কাছে এসেছিলেন। দেবতাদের কাছ থেকে কোন প্রকার জড়-জাগতিক লাভ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা রাজা রন্তিদেবের ছিল না। তিনি তাঁদের প্রণতি নিবেদন করেছিলেন, কিন্তু যেহেতু তিনি ভগবান বাসুদেবে অনুরক্ত ছিলেন, তাই তিনি ভক্তি সহকারে শ্রীবাসুদেবের শ্রীপাদপদ্মে তাঁর চিত্ত সন্নিবিষ্ট করেছিলেন।
হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! রাজা রন্তিদেব যেহেতু কৃষ্ণভাবনাময় নিষ্কাম শুদ্ধ ভক্ত ছিলেন, তাই ভগবানের মায়া তাঁর কাছে নিজেকে প্রকট করতে পারেননি। পক্ষান্তরে, তাঁর কাছে মায়া একটি স্বপ্নের মতো প্রতিভাত হত। যাঁরা মহারাজ রন্তিদেবের আদর্শ অনুসরণ করেছিলেন, তাঁরা তাঁর কৃপার প্রভাবে নারায়ণ-পরায়ণ শুদ্ধ ভক্ত হয়েছিলেন। এইভাবে তাঁরা শ্রেষ্ঠ যোগীতে পরিণত হয়েছিলেন।”
“গর্গ থেকে শিনি এবং শিনি থেকে গার্গ্য জন্মগ্রহণ করেন। গার্গ্য ক্ষত্রিয় হলেও তাঁর থেকে এক ব্রাহ্মণ-বংশের উদ্ভব হয়। মহাবীর্য থেকে দুরিতক্ষয় নামক পুত্রের জন্ম হয়, যাঁর পুত্রদের নাম ত্রয্যারুণি, কবি এবং পুষ্করারুণি। যদিও দুরিতক্ষয়ের এই পুত্ররা ক্ষত্রিয়বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তবুও তাঁরা ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছিলেন। বৃহৎক্ষত্রের হস্তী নামক পুত্র হস্তিনাপুর নগরী (বর্তমান দিল্লী) স্থাপন করেন। হস্তীর অজমীঢ়, দ্বিমীঢ় এবং পুরমীঢ়, এই তিন পুত্র। প্রিয়মেধ আদি অজমীঢ়ের বংশধরগণ সকলে ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন। অজমীঢ় থেকে বৃহদিষু নামক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। বৃহদিষুর পুত্র বৃহদ্ধনু, বৃহদ্ধনু থেকে বৃহৎকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুত্র জয়দ্রথ। জয়দ্রথের পুত্র বিশদ এবং তাঁর পুত্র স্যেনজিৎ। স্যেনজিতের রুচিরাশ্ব, দৃঢ়হনু, কাশ্য এবং বৎস নামক চার পুত্র ছিলেন। রুচিরাশ্বের পুত্র পার এবং পারের পুত্র পৃথুসেন ও নীপ। নীপের একশত পুত্র ছিলেন। রাজা নীপ শুকের কন্যা কৃত্বীর গর্ভে ব্রহ্মদত্ত নামক এক পুত্র উৎপন্ন করেন। ব্রহ্মদত্ত, যিনি ছিলেন একজন মহান যোগী, তিনি তাঁর পত্নী সরস্বতীর গর্ভে বিষ্বক্সেন নামক এক পুত্র উৎপন্ন করেন। মহর্ষি জৈগীষব্যের উপদেশে বিষ্বক্সেন যোগশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। বিষ্বক্সেন থেকে উদক্সেনের জন্ম হয় এবং উদক্সেন থেকে ভল্লাটের জন্ম হয়। এঁরা সকলেই বৃহদিষুর বংশধর। দ্বিমীঢ়ের পুত্র যবীনর এবং তাঁর পুত্র কৃতিমান্। কৃতিমানের পুত্র সত্যধৃতি নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। সত্যধৃতি থেকে দৃঢ়নেমি নামক পুত্রের জন্ম হয়। দৃঢ়নেমি সুপার্শ্বের পিতা। সুপার্শ্ব থেকে সুমতি, সুমতির পুত্র সন্নতিমান্, সন্নতিমান্ থেকে কৃতী জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্রহ্মার কাছ থেকে যোগশক্তি লাভ করে সামবেদের পাচ্যসামের ছ’টি সংহিতা শিক্ষাদান করেন। কৃতীর পুত্র নীপ, নীপ থেকে উগ্রায়ুধ; উগ্রায়ুধের পুত্র ক্ষেম্য; ক্ষেম্যর পুত্র সুবীর এবং সুবীরের পুত্র রিপুঞ্জয়। রিপুঞ্জয় থেকে বহুরথ নামক এক পুত্র উৎপন্ন হয়। পুরুমীঢ় নিঃসন্তান ছিলেন। অজমীঢ়ের নলিনী নাম্নী ভার্যার গর্ভে নীলের জন্ম হয়। নীলের পুত্র শান্তি। শান্তির পুত্র সুশান্তি, সুশান্তির পুত্র পুরুজ এবং পুরুজের পুত্র অর্ক। অর্ক থেকে ভর্ম্যাশ্ব এবং ভর্ম্যাশ্ব থেকে মুদ্গল, যবীনর, বৃহদ্বিশ্ব, কাম্পিল্ল এবং সঞ্জয় নামক পাঁচ পুত্রের জন্ম হয়। ভর্ম্যাশ্ব তাঁর পুত্রদের বলেছিলেন, “হে পুত্রগণ! তোমরা আমার পাঁচটি রাজ্যের ভার গ্রহণ কর, কারণ তোমরা সেই কার্য সম্পাদনে সমর্থ।” এই কারণে তাঁর পঞ্চপুত্র পঞ্চাল নামে অভিহিত হন। মুদ্গল থেকে মৌদ্গল্য ব্রাহ্মণবংশের উৎপত্তি হয়। ভর্ম্যাশ্বের পুত্র মুদ্গলের যমজ পুত্র এবং কন্যা উৎপন্ন হয়। পুত্রটির নাম দিবোদাস এবং কন্যাটির নাম অহল্যা। অহল্যার গর্ভে পতি গৌতমের ঔরসে শতানন্দ নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। শতানন্দের পুত্র সত্যধৃতি ধনুর্বিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। সত্যধৃতির পুত্র শরদ্বান্। উর্বশীকে দর্শন করে তাঁর বীর্য স্খলিত হয়ে শরঘাসের গুচ্ছে পতিত হয়। সেই বীর্য থেকে সর্বমঙ্গলময় একটি পুত্র এবং কন্যার জন্ম হয়। মহারাজ শান্তনু মৃগয়া করতে গিয়ে সেই যমজ পুত্র এবং কন্যাটিকে দর্শন করে কৃপাপূর্বক তাদের তাঁর গৃহে নিয়ে আসেন। তার ফলে বালকটির নাম হয় কৃপ এবং বালিকাটির নাম হয় কৃপী। কৃপী পরবর্তীকালে দ্রোণাচার্যের পত্নী হয়েছিলেন।”
একবিংশতি অধ্যায়- ভরতের বংশ বিবরণ
17 May 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, নবম স্কন্ধ- মুক্তি