বিংশতি অধ্যায়- পূরুর বংশ বিবরণ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে ভারত! যে বংশে আপনি জন্মগ্রহণ করেছেন, যে বংশে বহু রাজর্ষি ও ব্রাহ্মণ বংশের আবির্ভাব হয়েছে, আমি এখন সেই পূরু-বংশের বর্ণনা করব। এই পূরুর বংশে মহারাজ জনমেজয় আবির্ভূত হয়েছিলেন। জনমেজয়ের পুত্র প্রচিন্বান্ এবং তাঁর পুত্র প্রবীর। তারপর, প্রবীর থেকে মনুস্যু এবং মনুস্যু থেকে চারুপদের জন্ম হয়। চারুপদের পুত্র সুদ্যু এবং সুদ্যুর পুত্র বহুগব। বহুগবের পুত্র সংযাতি এবং সংযাতি থেকে অহংযাতি নামক এক পুত্র উৎপন্ন হয়। অহংযাতির পুত্র রৌদ্রাশ্ব। রৌদ্রাশ্বের ঋতেয়ু, কক্ষেয়ু, স্থণ্ডিলেয়ু, কৃতেয়ুক, জলেয়ু,সন্নতেয়ু, ধর্মেয়ু, সত্যেয়ু, ব্রতেয়ু এবং বনেয়ু নামক দশটি পুত্র ছিল। এই দশ পুত্রের মধ্যে বনেয়ু ছিলেন কনিষ্ঠ। জগদাত্মা থেকে উৎপন্ন দশটি ইন্দ্রিয় যেমন প্রাণের অধীনে কার্য করে, ঠিক তেমনই এই দশ পুত্র রৌদ্রাশ্বের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীনে কার্য করতেন। তাঁরা সকলেই ঘৃতাচী নামক অপ্সরা থেকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ঋতেয়ুর রন্তিনাব নামক এক পুত্র ছিল এবং রন্তিনাবের সুমতি, ধ্রুব এবং অপ্রতিরথ নামক তিনটি পুত্র ছিল। অপ্রতিরথের কেবল একটিমাত্র পুত্র ছিল, যার নাম ছিল কণ্ব। কণ্বের পুত্র মেধাতিথি। প্রস্কন্ন আদি মেধাতিথির সমস্ত পুত্ররাই ছিলেন ব্রাহ্মণ রন্তিনাবের পুত্র সুমতির রেভি নামক এক পুত্র ছিলেন। এই রেভির পুত্র মহারাজ দুষ্মন্ত বিখ্যাত ছিলেন।”
“একসময় রাজা দুষ্মন্ত যখন বনে মৃগয়া করতে গিয়ে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে কণ্ব মুনির আশ্রমে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন তিনি লক্ষ্মীদেবীর মতো সুন্দরী এক রমণীকে তাঁর প্রভার দ্বারা সমস্ত আশ্রমকে অলোকিত করে থাকতে দেখেছিলেন। রাজা স্বভাবতই তাঁর সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে কয়েকজন সৈন্য পরিবৃত হয়ে তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে বলেছিলেন। সেই পরমা সুন্দরী রমণীকে দর্শন করে রাজা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন এবং তাঁর মৃগয়াজনিত শ্রান্তি দূর হয়েছিল। তিনি কামসন্তপ্ত হয়ে হাসতে হাসতে তাঁকে মধুর বাক্যে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। হে কমললোচনা সুন্দরী! তুমি কে? তুমি কার কন্যা? কি উদ্দেশ্যে তুমি এই নির্জন বনে অবস্থান করছ? হে পরমা সুন্দরী! আমার মনে হচ্ছে যে, তুমি নিশ্চয়ই কোন ক্ষত্রিয়ের কন্যা। যেহেতু আমি পূরুবংশীয়, তাই আমার চিত্ত কখনও অধর্মে প্রবৃত্ত হয় না।”
শকুন্তলা বললেন- “আমি বিশ্বামিত্রের কন্যা। আমার মা মেনকা আমাকে বনে পরিত্যাগ করে চলে যান। হে বীর! পরম শক্তিমান কণ্ব মুনি এই সমস্ত বিষয় অবগত আছে। আমি আপনার কি সেবা করতে পারি বলুন? হে কমলনয়ন রাজা! দয়া করে এখানে উপবেশন করুন এবং আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করুন। আমাদের নীবার অন্ন রয়েছে, তা আপনি গ্রহণ করুন। আর যদি আপনি চান, তা হলে নিঃসঙ্কোচে এখানে অবস্থান করতে পারেন।”
রাজা দুষ্মন্ত উত্তর দিয়েছিলেন- “হে সুন্দর ভ্রূ-সমন্বিতা শকুন্তলা! তুমি মহর্ষি বিশ্বামিত্রের বংশে জন্মগ্রহণ করেছ। তোমার আতিথেয়তা তোমার বংশের উপযুক্ত। আর তা ছাড়া, রাজকন্যারা তাঁদের পতিকে স্বয়ং বরণ করেন। শকুন্তলা যখন মৌন থেকে মহারাজ দুষ্মন্তের প্রস্তাব অঙ্গীকার করেছিলেন, তখন বিবাহ-ধর্মবিৎ রাজা বৈদিক প্রণব (ওঁকার) উচ্চারণ করে গান্ধর্ববিধি অনুসারে তাঁকে বিবাহ করেছিলেন। অমোঘবীর্য রাজা দুষ্মন্ত মহিষী শকুন্তলার গর্ভে বীর্যাধান করেছিলেন এবং প্রত্যূষে তাঁর প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। তারপর যথাসময়ে শকুন্তলা একটি পুত্র প্রসব করেছিলেন। কণ্ব মুনি বনে নবজাত শিশুটির সমস্ত সংস্কার সম্পাদন করেছিলেন। পরে, এই বালকটি এত শক্তিশালী হয়েছিল যে, সে বলপূর্বক সিংহকে ধরে তার সঙ্গে খেলা করত। রমণীশ্রেষ্ঠা শকুন্তলা ভগবানের অংশ অবতার এবং দুর্দমনীয় বিক্রমশালী পুত্রকে নিয়ে তাঁর পতি দুষ্মন্তের কাছে উপনীত হয়েছিলেন। রাজা যখন তাঁর নির্দোষ পত্নী এবং পুত্রকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন, তখন এক আকাশবাণী হয়েছিল এবং সেখানে উপস্থিত সকলে তা শুনতে পেয়েছিলেন।”
সেই দৈববানী বলেছিল- “হে মহারাজ দুষ্মন্ত! পুত্র প্রকৃতপক্ষে পিতারই, মাতা কেবল হাপরের চর্মের মতো আধার মাত্র। বৈদিক নির্দেশ অনুসারে পিতাই পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন। অতএব, তোমার পুত্রকে পালন কর এবং শকুন্তলাকে অবমাননা করো না। হে মহারাজ দুষ্মন্ত! যে ব্যক্তি বীর্য প্রদান করেন তিনিই পিতা এবং তাঁর পুত্র তাঁকে যমরাজের হাত থেকে রক্ষা করে। তুমিই এই বালকের প্রকৃত স্রষ্টা। শকুন্তলা সত্য কথাই বলছে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “মহারাজ দুষ্মন্তের মৃত্যুর পর মহাযশস্বী এই পুত্র সপ্তদ্বীপের অধিপতি হয়েছিলেন। ভগবানের অংশাংশসম্ভূত বলে তাঁর মহিমা পৃথিবীতে কীর্তিত হয়েছিল। দুষ্মন্তের পুত্র মহারাজ ভরতের ডান হাতে চক্র চিহ্ন এবং পায়ে পদ্মকোষের চিহ্ন বর্তমান ছিল। মহা অভিষেক বিধি অনুসারে ভগবানের পূজা করে তিনি সারা পৃথিবীর একচ্ছত্র সম্রাট হয়েছিলেন। তারপর মমতাপুত্র ভৃগু মুনির পৌরোহিত্যে তিনি গঙ্গার মোহানা থেকে শুরু করে উৎস পর্যন্ত সমস্ত প্রদেশে পঞ্চাশটি অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন এবং প্রয়াগের সঙ্গম থেকে উৎস পর্যন্ত যমুনার তীরে আটাত্তরটি অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। তিনি সর্বোত্তম স্থানে যজ্ঞাগ্নি স্থাপন করেছিলেন এবং ব্রাহ্মণদের প্রভূত ধন দান করেছিলেন। বস্তুতপক্ষে তিনি এত গাভী দান করেছিলেন যে, হাজার হাজার ব্রাহ্মণেরা প্রত্যেকেই তাঁর ভাগে এক বদ্ব (১৩,০৮৪) গাভী প্রাপ্ত হয়েছিলেন। মহারাজ দুষ্মন্তের পুত্র ভরত সেই যজ্ঞে তিন হাজার তিনশ অশ্ব বন্ধন করে অন্যান্য রাজাদের বিস্মিত করেছিলেন। তিনি দেবতাদেরও বৈভব অতিক্রম করেছিলেন, কারণ তিনি পরম গুরু ভগবান শ্রীহরিকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন। মহারাজ ভরত যখন মষ্ণার নামক যজ্ঞ (অথবা মষ্ণার নামক স্থানে অনুষ্ঠিত যজ্ঞ) অনুষ্ঠান করেছিলেন, তখন তিনি চোদ্দ লক্ষ শুভ্র দন্তবিশিষ্ট কৃষ্ণবর্ণ শ্রেষ্ঠ হস্তী স্বর্ণ অলঙ্কারে আচ্ছাদিত করে দান করেছিলেন। কেউ যেমন তার বাহুবলের দ্বারা স্বর্গলোক প্রাপ্ত হতে পারেন না (কারণ কে তার হাত দিয়ে স্বর্গলোক স্পর্শ করতে পারে?), তেমনই মহারাজ ভরতের অদ্ভুত কার্যকলাপ কেউই অনুকরণ করতে পারেন না। অতীতে কেউ এই প্রকার কার্যকলাপ অনুষ্ঠান করতে পারেননি এবং ভবিষ্যতেও কেউ তা করতে পারবেন না। মহারাজ ভরত যখন দিগ্বিজয় করতে গিয়েছিলেন, তখন তিনি কিরাত, হূণ, যবন, পৌন্ড্র, কঙ্ক, খস, শক এবং বৈদিক নীতি ও ব্রহ্মণ্য সংস্কৃতির বিরোধী সমস্ত রাজাদের পরাজিত করেছিলেন অথবা বধ করেছিলেন। পুরাকালে অসুরেরা দেবতাদের পরাজিত করে রসাতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল এবং দেবতাদের স্ত্রী এবং কন্যাদেরও সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। মহারাজ ভরত সেই সমস্ত সঙ্গীগণসহ স্ত্রীদের অসুরদের কবল থেকে উদ্ধার করেছিলেন এবং দেবতাদের কাছে তাঁদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। মহারাজ ভরত সাতাশ হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীতে এবং স্বর্গলোকে তাঁর প্রজাদের সমস্ত আবশ্যকতাগুলি পূর্ণ করেছিলেন। তিনি সর্বদিকে তাঁর আদেশ এবং সৈন্য প্রেরণ করেছিলেন। সারা বিশ্বের শাসনকর্তারূপে স¤্রাট ভরতের রাজ্যলক্ষ্মী এবং অপ্রতিহত সৈনিকের ঐশ্বর্য ছিল। তাঁর পুত্র এবং পরিবার তাঁর কাছে প্রাণতুল্য ছিল। কিন্তু অবশেষে সেই সবই আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের প্রতিবন্ধকরূপে উপলব্ধি করতে পেরে, তিনি বিষয়ভোগ থেকে বিরত হয়েছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! মহারাজ ভরতের তিনজন মনোমুগ্ধকর পত্নী ছিলেন, যাঁরা ছিলেন বিদর্ভরাজের কন্যা। তাঁরা তিন জনই যখন পুত্র প্রসব করেছিলেন এবং সেই পুত্রগণ রাজার অনুরূপ না হওয়ায় তাঁরা মনে করেছিলেন যে রাজা তাঁদের ব্যভিচারিণী বলে মনে করে তাঁদের ত্যাগ করতে পারেন, সেই আশঙ্কায় তাঁরা তাদের পুত্রদের মেরে ফেলেছিলেন। এইভাবে সন্তান উৎপাদনের সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ায়, মহারাজ ভরত পুত্রলাভের জন্য মরুৎস্তোম নামক এক যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেন। তার ফলে মরুৎ নামক দেবতাগণ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে, তাঁকে ভরদ্বাজ নামক এক পুত্র প্রদান করেন। বৃহস্পতি নামক দেবতা যখন তাঁর ভ্রাতার গর্ভবতী পত্নী মমতার সঙ্গে মৈথুনে লিপ্ত হওয়ার বাসনা করেছিলেন, তখন গর্ভস্থ পুত্রটি তাঁকে নিবারতি করে, কিন্তু বৃহস্পতি তাকে অভিশাপ দিয়ে বলপূর্বক মমতার গর্ভে বীর্য ত্যাগ করেন। অবৈধ পুত্র উৎপাদন করার ফলে তাঁর পতি তাঁকে পরিত্যাগ করতে পারেন, এই ভয়ে অত্যন্ত ভীতা হয়ে মমতা সেই শিশুটিকে ত্যাগ করতে ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু দেবতারা শিশুটির নাম নির্বাচন করে সেই সমস্যার সমাধান করেছিলেন।”
বৃহস্পতি মমতাকে বলেছিলেন, “হে মূর্খ রমণী! যদিও এই বালক এক ব্যক্তির পত্নীর গর্ভে অন্য ব্যক্তির বীর্য থেকে জন্মগ্রহণ করেছে, তবুও একে তোমার পালন করা উচিত।” সেই কথা শুনে মমতা উত্তর দিয়েছিলেন, “হে বৃহস্পতি, তুমি একে পালন কর!” এই বলে বৃহস্পতি এবং মমতা উভয়েই সেখানে থেকে চলে গিয়েছিলেন। এইভাবে বালকটির নাম হয়েছিল ভরদ্বাজ। দেবতারা যদিও সেই শিশুটিকে পালন করতে মমতাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, তবুও মমতা ব্যভিচারের ফলে জাত সেই পুত্রটিকে নিরর্থক বলে মনে করে পরিত্যাগ করেছিলেন। তখন মরুৎ নামক দেবতাগণ সেই বালকটিকে পালন করেন এবং মহারাজ ভরত যখন সন্তানের অভাবে নিরাশ হয়েছিলেন, তখন তাঁরা সেই শিশুটিকে পুত্ররূপে তাঁকে প্রদান করেন।”

Leave a Reply

May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Blog Stats

  • 140,959 hits