শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! যযাতি ছিলেন অত্যন্ত স্ত্রৈণ। কিন্তু কালক্রমে কামভোগের প্রতি বিরক্ত হয়ে এবং তার কুফল বুঝতে পেরে তিনি সেই জীবন ত্যাগ করেছিলেন এবং তাঁর প্রিয়তমা পত্নীকে এই কাহিনীটি শুনিয়েছিলেন।”
“হে প্রিয়তমা পত্নী, শুক্রাচার্যের কন্যা! এই পৃথিবীতে আমার মতো আচরণশীল এক ব্যক্তি ছিল। তার জীবনকাহিনী আমি বর্ণনা করছি, তুমি শ্রবণ কর। এই প্রকার গৃহাসক্ত ব্যক্তির জীবনকাহিনী শ্রবণ করে বানপ্রস্থীরা সর্বদা অনুশোচনা করেন। একটি ছাগ বনের মধ্যে ইন্দ্রিয়তপ্তি সাধনের জন্য আহার্যের অন্বেষণ করতে করতে দৈবক্রমে একটি কূপের মধ্যে নিজ কর্মফলে পতিতা একটি ছাগীকে দেখতে পেল। সেই ছাগীর উদ্ধারের উপায় পরিকল্পনা করে, সেই কামুক ছাগ তার শিঙের অগ্রভাগের দ্বারা কূপের তটের মৃত্তিকা অপসারিত করে বেরিয়ে আসার পথ তৈরী করেছিল। সুন্দর নিতম্বিনী সেই ছাগী কূপ থেকে উত্তীর্ণ হয়ে, অত্যন্ত সুন্দর দর্শন ছাগটিকে দর্শন করে তাকে পতিরূপে বরণ করতে বাসনা করেছিল। ছাগী সেই ছাগকে পতিরূপে বরণ করলে, অন্য অনেক ছাগী তার সুন্দর শরীর, সুন্দর শ্মশ্রু, বীর্যস্খলনে দক্ষতা এবং মৈথুনের অভিজ্ঞতা দর্শন করে সেই ছাগকে পতিত্বে বরণ করতে অভিলাষিণী হয়েছিল। পিশাচী ভর করলে মানুষ যেমন উন্মাদ হয়ে যায়, তেমনই সেই ছাগশ্রেষ্ঠ বহু ছাগীর দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে কামক্রীড়ায় লিপ্ত হয়েছিল এবং তার ফলে আত্ম-উপলব্দিরূপ তার প্রকৃত কর্তব্য বিস্মৃত হয়েছিল। যে ছাগী কূপে পড়েছিল, সে তার প্রিয়তম ছাগকে অন্য এক ছাগীর সঙ্গে মৈথুনরত দর্শন করে, সেই ছাগের কর্ম সহ্য করতে পারল না। অন্য ছাগীর সঙ্গে তার পতির আচরণ দর্শনে দুঃখিতা হয়ে সেই ছাগী বিচার করেছিল যে, সেই ছাগটি প্রকৃতপক্ষে তার সুহৃৎ নয়, সেই অত্যন্ত নিষ্ঠুর হৃদয় এবং ক্ষণকালের জন্য কেবল সে সুহৃদের মতো আচরণ করছে। তাই সেই কামুক পতিকে পরিত্যাগ করে সে তার পূর্বপালকের কাছে ফিরে গিয়েছিল। সেই স্ত্রৈণ ছাগ অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে সেই ছাগীকে সন্তুষ্ট করার জন্য যথাসাধ্য তোষামোদ করতে করতে তার পিছনে পিছনে গমন করেছিল, কিন্তু তবুও সে তাকে প্রসন্ন করতে পারল না। সেই ছাগী তখন অন্য এক ছাগীর পালনকর্তা এক ব্রাহ্মণের বাসস্থানে গিয়েছিল এবং সেই ব্রাহ্মণ ক্রুদ্ধ হয়ে ছাগটির লম্বমান অণ্ডদ্বয় ছিন্ন করেছিল। কিন্তু সেই ছাগের অনুরোধে ব্রাহ্মণ তাঁর যোগশক্তির প্রভাবে তার অণ্ডদ্বয় পুনরায় সংযোজিত করেছিল। হে প্রিয়ে! যখন সেই ছাগের অণ্ডদ্বয় পুনরায় সংযুক্ত করা হল, তখন সেই ছাগ কূপে লব্ধ ছাগীর সঙ্গে বহুকাল বিষয়ভোগ করেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত তার কামবাসনা তৃপ্ত হয়নি।”
“হে সুভ্রু! আমি ঠিক ছাগের মতো, কারণ আমি এতই মন্দবুদ্ধি যে, তোমার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে আমার স্বরূপ উপলব্ধির প্রকৃত কর্তব্য বিস্মৃত হয়েছি। ধান, যব আদি খাদ্যশস্য, স্বর্ণ, পশু, স্ত্রী আদি পৃথিবীর সমস্ত বস্তু থাকা সত্ত্বেও কামুক ব্যক্তির মন প্রসন্ন হয় না। কোন কিছুই তার প্রীতি উৎপাদন করতে পারে না। অগ্নিতে ঘি ঢালার ফলে যেমন সেই আগুন কখনও নেভানো যায় না, পক্ষান্তরে তা ক্রমশ বর্ধিতই হতে থাকে, ঠিক তেমনই কাম্যবস্তুর উপভোগের দ্বারা কখনও কামনার নিবৃত্তিসাধন করা যায় না। (প্রকৃতপক্ষে, স্বেচ্ছায় ভোগবাসনা ত্যাগ করতে হয়)। মানুষ যখন নির্মৎসর হন এবং কারও অমঙ্গল কামনা করেন না, তখন তিনি সমদৃষ্টিসম্পন্ন হন। এই প্রকার ব্যক্তির কাছে সর্বদিকই সুখময় হয়ে ওঠে। যারা জড় সুখভোগের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত, তাদের পক্ষে ইন্দ্রিয়সুখ পরিত্যাগ করা অত্যন্ত কঠিন। এমন কি বার্ধক্যের ফলে অক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তারা ইন্দ্রিয়-সুখের বাসনা পরিত্যাগ করতে পারে না। তাই, যাঁরা প্রকৃতই সুখাভিলাষী, তাঁদের অবশ্য কর্তব্য সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার কারণস্বরূপ এই সমস্ত অতৃপ্ত বাসনা ত্যাগ করা। মাতা, ভগ্নী অথবা কন্যার সঙ্গে এক আসনে উপবেশন করা উচিত নয়, কারণ ইন্দ্রিয়গুলি এতই প্রবল যে, তা বিদ্বান ব্যক্তিকেও যৌনজীবনে আকৃষ্ট করতে পারে। আমি পূর্ণ এক হাজার বছর ধরে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করেছি, তবুও প্রতিদিন আমার ভোগবাসনা বর্ধিত হয়েছে। অতএব আমি এখন এই সমস্ত ভোগবাসনা পরিত্যাগ করে ভগবানের ধ্যানে মনোনিবেশ করব। মনের দ্বারা সৃষ্ট দ্বন্দ্বভাব থেকে মুক্ত এবং নিরহঙ্কার হয়ে, আমি বনের পশুদের সঙ্গে বনে বনে বিচরণ করব। যে ব্যক্তি জানেন যে, জড় সুখ ভাল অথবা মন্দ, এই জীবনে অথবা পরবর্তী জীবনে ও এই লোক অথবা স্বর্গ আদি লোকেরই হোক না কেন তা অনিত্য এবং নিরর্থক এবং যে বুদ্ধিমান ব্যক্তি সেই কথা জেনে তা উপভোগ করার চেষ্টা করেন না, এমন কি তার চিন্তা পর্যন্ত করেন না, তিনিই আত্মদর্শী। এই প্রকার আত্ম-তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি ভালভাবে জানেন যে, জড় সুখই সংসার-বন্ধন এবং স্বরূপ বিস্মরণের একমাত্র কারণ।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “সমস্ত জড় বাসনা থেকে মুক্ত হয়ে রাজা যযাতি তাঁর পত্নী দেবযানীকে এই কথা বলার পরে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র পূরুকে তাঁর যৌবন প্রত্যর্পণ করে পূরুর কাছ থেকে নিজের জরা গ্রহণ করেছিলেন। মহারাজ যযাতি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে দ্রুহ্যুকে, দক্ষিণ দিকে যদুকে, পশ্চিম দিকে তুর্বসুকে এবং উত্তর দিকে তাঁর পুত্র অনুকে অধীশ্বর করেছিলেন। এইভাবে তিনি তাঁর রাজ্য বিভাগ করে দিয়েছিলেন। যযাতি তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র পূরুকে সারা পৃথিবীর সম্রাট এবং সমস্ত ধন-সম্পদের আধিপত্যে অভিষিক্ত করে এবং অগ্রজাত পুত্রদের পূরুর অধীনে স্থাপনপূর্বক বনে গিয়েছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! রাজা যযাতি বহু বছর ধরে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করেছিলেন, কিন্তু পাখা গজালে পক্ষীশাবক যেভাবে নীড় পরিত্যাগ করে, তেমনই যযাতিও ক্ষণিকের মধ্যে সমস্ত ইন্দ্রিয়সুখ পরিত্যাগ করেছিলেন। মহারাজ যযাতি যেহেতু সর্বতোভাবে ভগবান বাসুদেবের শরণাগত হয়েছিলেন, তাই তিনি জড়া প্রকৃতির গুণজাত সমস্ত কলুষ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর অধ্যাত্ম উপলব্ধির ফলে তিনি তাঁর মনকে পরব্রহ্ম বাসুদেবে স্থির করতে পেরেছিলেন এবং এইভাবে তিনি পরিশেষে ভগবানের পার্ষদত্ব লাভ করেছিলেন। মহারাজ যযাতির কাছে ছাগ এবং ছাগীর কাহিনী শ্রবণ করে দেবযানী বুঝতে পেরেছিলেন যে, পতি-পত্নীর মনোরঞ্জনের জন্য পরিহাসচ্ছলে তা বর্ণিত হলেও, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল তাঁর স্বরূপ সম্বন্ধে তাঁর চেতনাকে জাগরিত করা। তারপর শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানী বুঝতে পেরেছিলেন যে, পতি, পুত্র, বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গ পানীয়শালায় পথিকদের মিলনের মতো। সমাজ, সুহৃদ এবং প্রেমের এই সম্পর্ক ঠিক একটি স্বপ্নের মতো ভগবানের মায়ার দ্বারা বিরচিত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় দেবযানী এই জড় জগতে তাঁর কাল্পনিক স্থিতি পরিত্যাগ করেছিলেন। তাঁর মনকে সর্বতোভাবে শ্রীকৃষ্ণে স্থির করে, তিনি তাঁর স্থূল এবং সূক্ষ্ম দেহের বন্ধন থেকে মুক্তিলাভ করেছিলেন। হে ভগবান বাসুদেব! আপনি সমগ্র জগতের স্রষ্টা। পরমাত্মারূপে আপনি সকলের হৃদয়ে বিরাজ করেন এবং আপনি অণুর থেকে অণুতর, তবুও আপনি বৃহৎ থেকে বৃহত্তর এবং সর্বব্যাপ্ত। আপনার কোন কিছু করণীয় নেই বলে মনে হয় যেন আপনি সর্বতোভাবে শান্ত। তার কারণ আপনি সর্বব্যাপ্ত এবং সর্ব-ঐশ্বর্য সমন্বিত। আমি তাই আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
ঊনবিংশতি অধ্যায়- রাজা যযাতির মুক্তিলাভ
13 May 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, নবম স্কন্ধ- মুক্তি