শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে কুরুনন্দন মহারাজ পরীক্ষিৎ! পিতা কর্তৃক এইভাবে আদিষ্ট হয়ে, পরশুরাম সেই আদেশ অঙ্গীকারপূর্বক এক বছর তীর্থপর্যটন করে আশ্রমে ফিরে এসেছিলেন। একসময় জমদগ্নির পত্নী রেণুকা গঙ্গায় জল আনতে গিয়ে পদ্মফুলের মালায় শোভিত গন্ধর্বরাজকে অপ্সরাদের সঙ্গে খেলা করতে দেখেছিলেন। গঙ্গায় জল আনতে গিয়ে অপ্সরাদের সঙ্গে ক্রীড়ারত গন্ধর্বরাজকে দর্শন করে রেণুকা তাঁর প্রতি ঈষৎ স্পৃহাবতী হয়েছিলেন এবং হোমের সময় যে অতিবাহিত হচ্ছিল, সেই কথা তাঁর স্মরণ হল না। তারপর, যজ্ঞের সময় অতিবাহিত হয়েছে দেখে রেণুকা তাঁর পতির অভিশাপের ভয়ে ভীতা হয়েছিলেন এবং গৃহে ফিরে এসে জলের কলসি তাঁর সামনে রেখে কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মানা হয়েছিলেন। জমদগ্নি তাঁর পত্নীর এই ব্যভিচার অবগত হয়েছিলেন। তাই তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর পুত্রদের বলেছিলেন, ‘হে পুত্রগণ, এই পাপীয়সী রমণীকে হত্যা কর!’ কিন্তু তাঁর পুত্ররা তাঁর আদেশ পালন করেনি। জমদগ্নি তখন তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র পরশুরামকে তাঁর আদেশ অমান্যকারী পুত্রদের এবং মানসে ব্যভিচারিণী মাতাকে বধ করতে বলেছিলেন। পিতার সমাধি এবং তপস্যার প্রভাব অবগত ছিলেন বলে পরশুরাম তৎক্ষণাৎ তাঁর মাতা এবং ভ্রাতাদের বধ করেছিলেন। সত্যবতীর পুত্র জমদগ্নি পরশুরামের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে তাঁকে তাঁর ইচ্ছা অনুসারে বর প্রার্থনা করতে বলেছিলেন। পরশুরাম তখন বলেছিলেন, ‘আমার মাতা এবং ভ্রাতারা পুনরুজ্জীবিত হোক এবং আমি যে তাঁদের হত্যা করেছি সেই কথা যেন তাঁদের কখনও স্মরণ না হয়। আমি এই বর প্রার্থনা করি।’ তারপর, জমদগ্নির বরে পরশুরামের মাতা এবং ভ্রাতারা জীবিত হয়েছিলেন, যেন নিদ্রাবসানে তাঁরা সুখে জেগে উঠেছিলেন। পরশুরাম তাঁর পিতার আদেশে স্বজন বধ করেছিলেন। কারণ তিনি তাঁর পিতার তপস্যা, জ্ঞান এবং বীর্য অবগত ছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! কার্তবীর্যার্জুনের যে সমস্ত পুত্ররা পরশুরামের বীর্যে পরাভূত হয়েছিল, তারা তাদের পিতার বধের সর্বদা স্মরণ করার ফলে, কখনও শান্তি লাভ করতে পারেনি। একসময় পরশুরাম যখন বসুমান্ প্রভৃতি ভ্রাতাদের সঙ্গে আশ্রম থেকে বনে গিয়েছিলেন, তখন কার্তবীর্যার্জুনের পুত্ররা সেই সুযোগে পূর্বশত্রুতার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জমদগ্নির আশ্রমে এসেছিল। কার্তবীর্যার্জুনের পুত্ররা পাপকর্ম করতে দৃঢ়সঙ্কল্প ছিল। তাই তারা যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার জন্য যজ্ঞাগ্নির সম্মুখে উপবিষ্ট উত্তমশ্লোক ভগবানের ধ্যানে মগ্ন জমদগ্নিকে দেখতে পেয়ে তাঁকে হত্যা করেছিল। পরশুরামের মাতা অর্থাৎ জমদগ্নির পত্নী রেণুকা অত্যন্ত করুণভাবে তাঁর পতির প্রাণভিক্ষা করেছিলেন, কিন্তু কার্তবীর্যার্জুনের ক্ষত্রিয়াধম পুত্ররা এতই নিষ্ঠুর ছিল যে, তাঁর আকুল আবেদনে কর্ণপাত না করে তারা বলপূর্বক জমদগ্নির মস্তক ছিন্ন করে নিয়ে গিয়েছিল। পতির মৃত্যুতে অত্যন্ত শোকার্তা হয়ে পতিব্রতা রেণুকা তাঁর নিজের শরীরে নিজেই করাঘাত করতে করতে ‘হে রাম! হে প্রিয় পুত্র রাম!’ বলে বিলাপ করেছিলেন। পরশুরাম সহ জমদগ্নির পুত্ররা বহু দূর থেকে ‘হা রাম, হা পুত্র!’ রেণুকার এই আর্তনাদ শ্রবণ করে দ্রুত আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন এবং তাঁদের পিতা জমদগ্নি যে নিহত হয়েছেন তা দেখেছিলেন। দুঃখ, ক্রোধ, অমর্ষ, আর্তি এবং শোকের বেগে অত্যন্ত বিমোহিত হয়ে জমদগ্নির পুত্ররা উচ্চস্বরে ক্রন্দন করতে করতে বলেছিলেন, ‘হে পিতা, হে সাধু, হে পরম ধার্মিক, আপনি আমাদের পরিত্যাগ করে স্বর্গে চলে গেছেন!’ এইভাবে বিলাপ করতে করতে পরশুরাম তাঁর পিতার মৃতদেহ ভ্রাতাদের হস্তে সমর্পণ করে, তাঁর কুঠার নিয়ে পৃথিবী থেকে সমস্ত ক্ষত্রিয়দের সংহার করতে মনস্থ করেছিলেন।”
“হে রাজন্! তারপর পরশুরাম ব্রহ্মহত্যার পাপে হতশ্রী মাহিষ্মতী নগরীতে গিয়ে, সেই নগরীর মাঝখানে কার্তবীর্যার্জুনের পুত্রদের মস্তকের দ্বারা এক বিশাল পর্বত নির্মাণ করেছিলেন। কার্তবীর্যার্জুনের এই সমস্ত পুত্রদের রক্তে ভগবান পরশুরাম ব্রাহ্মণ-বিদ্বেষী রাজাদের ভয়াবহ এক নদী সৃষ্টি করেছিলেন। ক্ষত্রিয়রা যেহেতু পাপাচরণ করতে শুরু করেছিল, তাই পরশুরাম তাঁর পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধের অছিলায় পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন এবং সমন্তপঞ্চকে তাদের রক্তে তিনি ন’টি হ্রদ নির্মাণ করেছিলেন। তারপর, পরশুরাম তাঁর পিতার মস্তক তাঁর দেহে সংযোজিত করে কুশঘাসের উপর তা স্থাপন করেছিলেন। যজ্ঞ অনুষ্ঠানের দ্বারা তিনি সমস্ত দেবতা এবং জীবদের অন্তর্যামী সর্বব্যাপ্ত পরমাত্মা বাসুদেবের পূজা করতে শুরু করেছিলেন। যজ্ঞ সম্পন্ন করে পরশুরাম হোতাকে পূর্বদিক, ব্রহ্মাকে দক্ষিণ দিক, অধ্বর্যুকে পশ্চিম দিক, উদ্গাতাকে উত্তর দিক এবং ঈশান, অগ্নি, নৈর্ঋত এবং বায়ু এই চারটি দিক অন্যান্য পুরোহিতদের দক্ষিণাস্বরূপ প্রদান করেছিলেন। তিনি মধ্যভাগ কশ্যপকে, আর্যাবর্ত উপদ্রষ্ট্রাকে এবং অবশিষ্ট স্থান সদস্যবর্গকে প্রদান করেছিলেন। তারপর, যজ্ঞ অনুষ্ঠান সম্পাদন করে পরশুরাম অবভৃথ স্নান করেছিলেন। সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে, পরশুরাম সরস্বতী নদীর তীরে মেঘশূণ্য নির্মল আকাশে সূর্যের মতো বিরাজ করতে লাগলেন। এইভাবে পরশুরামের দ্বারা পূজিত হয়ে জমদগ্নি পূর্ণস্মৃতিসহ, পুনর্জীবন লাভ করেছিলেন এবং সপ্তর্ষিমণ্ডলে সপ্তম ঋষি হয়েছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, পরবর্তী মন্বন্তরে জমদগ্নির পুত্র কমলনয়ন ভগবান পরশুরাম বৈদিক জ্ঞানের মহান প্রবর্তক হবেন। অর্থাৎ, তিনি সপ্তর্ষিদের অন্যতম হবেন। ভগবান পরশুরাম এখনও একজন স্থিতধী ব্রাহ্মণরূপে মহেন্দ্র পর্বতে বর্তমান আছেন। ক্ষত্রিয়দের অস্ত্র পরিত্যাগ করে তিনি পূর্ণরূপে প্রশান্ত রয়েছেন। সিদ্ধ, চারণ ও গন্ধর্বেরা তাঁর উন্নত চরিত্র ও কার্যকলাপের জন্য সর্বদা তাঁর পূজা করেন এবং বন্দনা করেন। এইভাবে বিশ্বাত্মা, ভগবান, ঈশ্বর, শ্রীহরি ভৃগুবংশে অবতীর্ণ হয়ে পৃথিবীর ভারস্বরূপ অবাঞ্ছিত নৃপতিদের বহুবার বধ করেছিলেন। মহারাজ গাধির পুত্র বিশ্বামিত্র ছিলেন প্রদীপ্ত অগ্নির মতো তেজস্বী। তিনি তপস্যার প্রভাবে ক্ষত্রিয়ের পদ থেকে তেজস্বী ব্রাহ্মণের পদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, বিশ্বামিত্রের একশত এক পুত্র ছিল, তাদের মধ্যে মধ্যম পুত্রের নাম মধুচ্ছন্দা। তার সম্পর্কে অন্য সমস্ত পুত্ররাও মধুচ্ছন্দা নামে অভিহিত হত। বিশ্বামিত্র ভৃগুবংশোদ্ভুত অজীগর্তের পুত্র শুনঃশেফকে নামান্তরে দেবরাতকে পুত্ররূপে গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বামিত্র তাঁর পুত্রদের আদেশ দিয়েছিলেন শুনঃশেফকে তাঁদের জ্যেষ্ঠভ্রাতারূপে গ্রহণ করতে। শুনঃশেফের পিতা শুনঃশেফকে মহারাজ হরিশ্চন্দ্রের যজ্ঞে বলি দেওয়ার জন্য বিক্রয় করেছিলেন। শুনঃশেফকে যজ্ঞমণ্ডপে নিয়ে আসা হলে, তিনি দেবতাদের স্তব করে তাদের কৃপায় পাশবন্ধন থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। ভৃগুবংশে জন্ম হলেও শুনঃশেফ ছিলেন আধ্যাত্মিক জীবনে অত্যন্ত উন্নত এবং তাই সেই যজ্ঞে দেবতারা তাঁকে রক্ষা করেছিলেন। তার ফলে তিনি গাধিবংশে দেবরাত নামে প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন। মধুচ্ছন্দা নামক পঞ্চাশজন জ্যেষ্ঠ পুত্র শুনঃশেফকে তাঁদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতারূপে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। তার ফলে বিশ্বামিত্র তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা বৈদিক সংস্কৃতির বিরোধী ম্লেচ্ছ হও।’ জ্যেষ্ঠ মধুচ্ছন্দারা এইভাবে অভিশপ্ত হলে, পঞ্চাশজন কনিষ্ঠ ভ্রাতাসহ মধুচ্ছন্দা স্বয়ং তাঁর পিতার কাছে উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন, ‘হে পিতা! আপনি যা ভাল মনে করেন, আমরা তাই পালন করব।’ এইভাবে কনিষ্ঠ মধুচ্ছন্দারা শুনঃশেফকে তাঁদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতারূপে গ্রহণ করে বলেছিলেন, “আমরা আপনার আদেশ পালন করব।’ বিশ্বামিত্র তখন তাঁর অনুগত পুত্রদের বলেছিলেন, ‘যেহেতু তোমরা শুনঃশেফকে তোমাদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতারূপে গ্রহণ করেছ, তাই আমি তোমাদের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। আমার আদেশ পালন করে তোমরা আমাকে যোগ্য পুত্রদের পিতা বানিয়েছ এবং তাই আমি তোমাদের আশীর্বাদ করি তোমরাও পুত্রবন্ত হবে।’ বিশ্বামিত্র বললেন, ‘হে কুশিকগণ! এই দেবরাত আমার পুত্র এবং তোমাদেরই একজন। তোমরা তাঁর আদেশ পালন কর।’ হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! বিশ্বামিত্রের অষ্টক, হারীত, জয় ও ক্রতুমান আদি অন্য বহু পুত্র ছিল। বিশ্বামিত্র তাঁর কিছু পুত্রকে অভিশাপ দিয়েছিলেন এবং অন্যদের বরদান করেছিলেন। তার ফলে কৌশিক গোত্র নানা প্রকার ভিন্ন ভিন্ন প্রবরত্ব প্রাপ্ত হয়। কিন্তু সমস্ত পুত্রের মধ্যে দেবরাতকেই জ্যেষ্ঠ বলে বিবেচনা করা হয়।”
ষোড়শ অধ্যায়- ভগবান পরশুরামের পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয়করণ
06 May 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, নবম স্কন্ধ- মুক্তি