পঞ্চদশ অধ্যায়- ভগবানের যোদ্ধা অবতার পরশুরাম

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! উর্বশীর গর্ভে পুরূরবার ছ’টি পুত্র উৎপন্ন হয়েছিল। তাঁদের নাম আয়ু, শ্রুতায়ু, সত্যায়ু, রয়, বিজয় এবং জয়। শ্রুতায়ুর পুত্র বসুমান্; সত্যায়ুর পুত্র শ্রুতঞ্জয়; রয়ের পুত্র এক; জয়ের পুত্র অমিত এবং বিজয়ের পুত্র ভীম। ভীমের পুত্র কাঞ্চন, কাঞ্চনের পুত্র হোত্রক এবং হোত্রকের পুত্র জহ্নু, যিনি এক গণ্ডূষে গঙ্গার সমস্ত জল পান করেছিলেন। জহ্নুর পুত্র পুররু, পুরুর পুত্র বলাক, বলাকের পুত্র অজক এবং অজকের পুত্র কুশ। কুশের কুশাম্বু, নয়, বসু এবং কুশনাভ নামক চার পুত্র। কুশাম্বুর পুত্র গাধি। মহারাজ গাধির সত্যবতী নামে এক কন্যা ছিল। ঋচীক নামক এক ব্রাহ্মণ ঋষি সেই কন্যাকে মহারাজ গাধির কাছে প্রার্থনা করেন। কিন্তু গাধি মনে করেছিলেন যে, ঋচীক তাঁর কন্যার পতি হওয়ার যোগ্য নন এবং তাই তিনি সেই ব্রাহ্মণকে বলেছিলেন, ‘হে দ্বিজবর! আমরা কুশিক বংশজাত সম্ভ্রান্ত ক্ষত্রিয়, তাই আমার কন্যার পণস্বরূপ দক্ষিণ ও বাম কর্ণের মধ্যে একটি শ্যামবর্ণ কর্ণ বিশিষ্ট এবং চন্দ্রের মতো উজ্জ্বল সহস্র অশ্ব প্রদান করুন।’ রাজা গাধি যখন এই প্রস্তাব করেছিলেন, তখন ঋচীক মুনি তাঁর মনোভাব বুঝতে পেরে বরুণদেবের কাছে গিয়েছিলেন এবং তাঁর কাছ থেকে গাধির শর্ত অনুসারে এক হাজার অশ্ব নিয়ে এসেছিলেন। সেই অশ্বগুলি গাধিকে দান করে তিনি রাজার সুন্দরী কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। তারপর ঋচীক মুনির পত্নী এবং শাশুড়ি উভয়েই পুত্রার্থিনী হয়ে ঋচীককে চরু প্রস্তুত করতে প্রার্থনা করেছিলেন। তার ফলে ঋচীক মুনি তাঁর পত্নীর জন্য ব্রাহ্মণমন্ত্র এবং তাঁর শাশুড়ির জন্য ক্ষত্রিয়মন্ত্রে দুটি চরু প্রস্তুত করে স্নান করতে গিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে, সত্যবতীর মাতা মনে করেছিলেন যে, সত্যবতীর জন্য নির্মিত চরু অবশ্যই শ্রেষ্ঠ হবে, এই মনে করে তিনি তাঁর কন্যার কাছে সেই চরু প্রার্থনা করেছিলেন। সত্যবতী তাই তাঁর চরু তাঁর মাকে প্রদান করে, তাঁর মায়ের জন্য নির্মিত চরু নিজে ভক্ষণ করেছিলেন। স্নান করে গৃহে ফিরে এসে ঋচীক মুনি যখন বুঝতে পারলেন যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে কি হয়েছে, তখন তিনি তাঁর পত্নী সত্যবতীকে বলেছিলেন, ‘তুমি এক অত্যন্ত অন্যায় কার্য করেছ। তোমার পুত্র ঘোর দ-ধর ক্ষত্রিয় স্বভাবসম্পন্ন হবে এবং তোমার ভ্রাতা ব্রহ্মতত্ত্ববিৎ হবে।’ সত্যবতী ঋচীক মুনিকে বিনয়নম্র বাক্যের দ্বারা প্রসন্ন করে অনুরোধ করেছিলেন যে, তাঁর পুত্র যেন ক্ষত্রিয়ের মতো উগ্র স্বভাবসম্পন্ন না হয়। ঋচিক মুনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তা হলে তোমার পৌত্র ক্ষত্রিয়ভাবাপন্ন হবে।’ তার ফলে সত্যবতীর পুত্ররূপে জমদগ্নি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সত্যবতী পরে অত্যন্ত পুণ্যবতী জগৎ পবিত্রকারিণী কৌশিকী নদী হয়েছিলেন। তাঁর পুত্র জমদগ্নি রেনুর কন্যা রেণুকাকে বিবাহ করেছিলেন। জমদগ্নির বীর্য থেকে রেণুকার গর্ভে বসুমান্ আদি বহু পুত্রের জন্ম হয়। তাঁদের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্র রাম বা পরশুরাম নামে বিখ্যাত। পণ্ডিতেরা এই পরশুরামকে কার্তবীর্যকুল বিনাশকারী এবং ভগবান বাসুদেবের অংশ বলে কীর্তন করেন। পরশুরাম পৃথিবীকে একবিংশতিবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। রজ এবং তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত ক্ষত্রিয়রা অত্যন্ত গর্বিত হয়ে অধর্ম পরায়ণ হয়েছিল এবং ব্রাহ্মণদের দ্বারা প্রবর্তিত ধর্মনীতির অবমাননা করতে শুরু করেছিল। পৃথিবীর ভার অপনোদন করার জন্য পরশুরাম তাদের অপরাধ গর্হিত না হলেও তাদের সংহার করেছিলেন।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ শুকদেব গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন- “অজিতেন্দ্রিয় ক্ষত্রিয়রা ভগবান পরশুরামের কাছে এমন কি অপরাধ করেছিল, যার ফলে তিনি ক্ষত্রিয়কুলকে বার বার বিনাশ করেছিলেন?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হৈহয়দের রাজা ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠ কার্তবীর্যার্জুন ভগবান শ্রীনারায়ণের অংশের অংশ দত্তাত্রেয়ের আরাধনা করে এক হাজার বাহু, শত্রুদের মধ্যে দুর্দমনীয়ত্ব এবং অপ্রতিহত ইন্দ্রিয় বল, সৌন্দর্য, তেজ, বীর্য, যশ এবং অণিমা- লঘিমা আদি যোগসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। এইভাবে অত্যন্ত ঐশ্বর্য লাভ করে, তিনি বায়ুর মতো অপ্রতিহত গতিবিশিষ্ট হয়ে সারা ব্রহ্মা-ে বিচরণ করতেন। একসময় গর্বোদ্ধত কার্তবীর্যার্জুন বৈজয়ন্তী মালা ধারণ করে স্ত্রীরত্নে পরিবৃত হয়ে নর্মদা নদীর জলে আনন্দ উপভোগ করতে করতে তাঁর বাহুর দ্বারা সেই নদীর স্রোত অবরোধ করেছিলেন। কার্তবীর্যার্জুনের বাহুর দ্বারা অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে নদীর প্রবাহ বিপরীত দিকে প্রবাহিত হওয়ায় মাহিষ্মতী নগরীর নিকটে নর্মদার তটে স্থাপিত দশানন রাবণের শিবির প্লাবিত হচ্ছিল। কার্তবীর্যার্জুনের এই প্রভাব বীরাভিমানী রাবণ সহ্য করতে পারল না। রাবণ যখন স্ত্রীদের সমক্ষে কার্তবীর্যার্জুনকে অপমান করতে চেয়েছিল, তখন কার্তবীর্যার্জুন অনায়াসে তাকে বন্দী করে মাহিষ্মতী নগরীতে একটি বানরের মতো অবরুদ্ধ করে রেখে, তারপর অবজ্ঞা ভরে তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। একসময় কার্তবীর্যার্জুন মৃগয়ার্থে বিজন বনে বিচরণ করতে করতে যদৃচ্ছাক্রমে জমদগ্নির আশ্রমে প্রবিষ্ট হয়েছিলেন। তপস্যা-পরায়ণ জমদগ্নি মুনি সাদরে সৈন্য, অমাত্য এবং বাহকগণ সহ রাজাকে অভ্যর্থনা করেছিলেন এবং তাঁর কামধেনুর দ্বারা অতিথি-সৎকারের সমস্ত সামগ্রী সরবরাহ করেছিলেন। কার্তবীর্যার্জুন মনে করেছিলেন, কামধেনু রত্নের অধিকারী হওয়ার ফলে জমদগ্নির ঐশ্বর্য এবং শক্তি তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ। তাই তাঁর অনুচর হৈহয়গণ সহ তিনি জমদগ্নির আতিথ্যে সন্তুষ্ট হননি। পক্ষান্তরে তাঁরা অগ্নিহোত্রীয় কামধেনুটি অধিকার করার অভিলাষ করেছিলেন। জড় শক্তির গর্বে গর্বিত হয়ে কার্তবীর্যার্জুন তাঁর লোকদের জমদগ্নির কামধেনুটি হরণ করতে প্ররোচিত করেছিলেন এবং তখন তারা বলপূর্বক বৎস সহ রোরুদ্যমানা কামধেনুটিকে কার্তবীর্যার্জুনের রাজধানী মাহিষ্মতীতে নিয়ে এসেছিল। তারপর কার্তবীর্যার্জুন কামধেনু নিয়ে চলে গেলে, জমদগ্নির কনিষ্ঠ পুত্র পরশুরামের আশ্রমে ফিরে এসে কার্তবীর্যার্জুনের দৌরাত্ম শ্রবণ করে আহত সর্পের মতো ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ পরশুরাম তাঁর ভয়ঙ্কর কুঠার, বর্ম, ধনুক এবং তূণ গ্রহণ করে হাতির পিছনে সিংহ যেভাবে ধাবিত হয়, সেইভাবে কার্তবীর্যার্জুনের পিছনে ধাবিত হয়েছিলেন। রাজা কার্তবীর্যার্জুন যখন রাজধানী মাহিষ্মতী পুরীতে প্রবেশ করেছিলেন, তখন তিনি ভৃগুকুলতিলক পরশুরামকে কুঠার, বর্ম, ধেনুক এবং বাণ নিয়ে তাঁর দিকে দ্রুতবেগে আসতে দেখেতে পেয়েছিলেন। পরশুরামের পরনে ছিল কৃষ্ণাজিন চর্ম এবং তাঁর জটা ঠিক সূর্যের মতো দ্যুতিমান প্রতিভাত হচ্ছিল। পরশুরামকে দেখে কার্তবীর্যার্জুন ভীত হয়ে তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হস্তী, রথ, অশ্ব, পদাতিক, গদা, খড়গ, বাণ, ঋষ্টি, শতঘ্নি এবং শক্তিসহ সপ্তদশ অক্ষৌহিণী সৈন্য প্রেরণ করেছিলেন, কিন্তু ভগবান পরশুরাম একাকীই সেই সমস্ত সৈন্য সংহার করেছিলেন। শত্রুসৈন্যদের বিনাশ সাধনে অত্যন্ত দক্ষ ভগবান পরশুরাম মন এবং বায়ুর বেগে ধাবিত হয়ে তাঁর কুঠারের আঘাতে শত্রুদের ছিন্নভিন্ন করতে লাগলেন। তিনি যে দিকেই গমন করছিলেন, সেখানেই বিপক্ষ সৈন্যরা ছিন্ন বাহু, ছিন্ন ঊরু এবং ছিন্ন কন্ধর হয়ে ভূপতিত হচ্ছিল, তা ছাড়া তাদের সারথিরা, হস্তী ও অশ্ব বাহনেরাও নিহত হয়েছিল। ভগবান পরশুরাম তাঁর কুঠার এবং বাণের দ্বারা কার্তবীর্যার্জুনের সৈনিকদের বর্ম, ধ্বজা, ধনুক এবং দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করেছিলেন এবং তাদের রক্তে রণভূমি কর্দমাক্ত হয়ে উঠেছিল। এই পরাজয় দর্শন করে কার্তবীর্যার্জুন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে দ্রুতবেগে রণভূমিতে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন ভগবান পরশুরামকে বধ করার বাসনায় কার্তবীর্যার্জুন তাঁর এক হাজার বাহুর দ্বারা একসঙ্গে পাঁচশ ধনুকে বাণ যোজনা করেছিলেন। কিন্তু শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ভগবান পরশুরাম কেবল একটি ধনুক থেকে এত বাণ নিক্ষেপ করেছিলেন যে, সেগুলি তৎক্ষণাৎ কার্তবীর্যার্জুনের হস্তধৃত সমস্ত ধনুক এবং বাণ ছিন্নভিন্ন করেছিল। কার্তবীর্যার্জুনের বাণ ছিন্নভিন্ন হলে তিনি স্বহস্তে বহু পর্বত ও বৃক্ষসমূহ উৎপাটন করে, পরশুরামকে হত্যা করার জন্য দ্রুতবেগে তাঁর প্রতি ধাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরশুরাম তখন বলপূর্বক তাঁর কুঠারের দ্বাা কার্তবীর্যার্জুনের সাপের ফণার মতো সব ক’টি হাত কেটে ফেলেছিলেন। তারপর, পরশুরাম ছিন্নবাহু কার্তবীর্যার্জুনের মস্তক পর্বতশৃঙ্গের মতো ছেদন করেছিলেন। কার্তবীর্যার্জুনের দশ হাজার পুত্র তাদের পিতাকে নিহত হতে দেখে ভয়ে পলায়ন করেছিল। তারপর শত্রুনিধন করে পরশুরাম অত্যন্ত ক্লেশপ্রাপ্তা কামধেনুটিকে মুক্ত করে বৎস সহ আশ্রমে ফিরিয়ে নিয়ে এসে তাঁর পিতা জমদগ্নিকে প্রদান করেছিলেন। পরশুরাম তাঁর পিতা এবং ভ্রাতাদের কাছে কার্তবীর্যার্জুনকে নিধন করার বৃত্তান্ত বর্ণনা করেছিলেন। সেই কথা শুনে জমদগ্নি তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, ‘হে মহাবীর পরশুরাম! তুমি সর্বদেবময় রাজাকে অকারণে বধ করে পাপ করেছ। হে বৎস! আমরা ব্রাহ্মণ, আমাদের ক্ষমাগুণের ফলে আমরা সকলের পূজ্য হয়েছি। এই ক্ষমাগুণের ফলে সমগ্র ব্রাহ্মাণ্ডের গুরু ব্রহ্মা এই ব্রহ্মাণ্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ পদ প্রাপ্ত হয়েছেন। ব্রাহ্মণের কর্তব্য সূর্যের মতো দীপ্তিশালী ক্ষমাগুণের অনুশীলন করা। ক্ষমাশীল পুরুষদের প্রতি ভগবান শ্রীহরি প্রসন্ন হন। হে বৎস! সার্বভৌম রাজাকে বধ করা ব্রাহ্মণবধ থেকে গুরুতর। কিন্তু তুমি যদি কৃষ্ণভাবনাময় হও এবং তীর্থস্থানের সেবা কর, তা হলে তুমি সেই মহাপাপ থেকে মুক্ত হতে পার।’ ”

Leave a Reply

May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Blog Stats

  • 140,963 hits